ছাত্রছাত্রীদের বই ছেঁড়ার উল্লাস - এ কোন অবক্ষয়ের উৎসব? পূর্বকোলা বাজারে পরীক্ষার শেষ দিনে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা শুধু দুঃখজনক নয়, লজ্জাজনকও। রাস্তার দু'পাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অসংখ্য ছেঁড়া পাতা, নোটের চিরকুট। কেউ উল্লাসে সেগুলো আকাশে ছুড়ে দিয়েছে, যেন বিজয় উৎসব চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে - কীসের বিজয়! কাকে হারিয়ে এই উল্লাস? এই ছেঁড়া পাতাগুলো কেবল কাগজ নয়; এইগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙ্গনের প্রমাণ, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দলিল।
পরীক্ষার শেষে যখন রাস্তা ভরে যায় ছেঁড়া নোটে, তখন বোঝা যায় - শিক্ষার মন্দিরে কোথাও গভীর অসুখ বাসা বেঁধেছে। আমরা কি এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা পরিশ্রমের বদলে শর্টকাটে বিশ্বাস করে? যারা সততার বদলে সুবিধাবাদে আস্থা রাখে? যদি একজন শিক্ষার্থী মনে করে, 'আমি পারব না, তাই ফাঁকি দিই' - তবে দায় শুধু তার নয়; দায় আমাদের সকলের।
পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ - দায় সবার। আজ নম্বরের প্রতিযোগিতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে চরিত্র গঠন গৌণ হয়ে গিয়েছে। সাফল্যের চেয়ে সাফল্যের প্রচার বড়ো হয়ে উঠেছে। ফলাফল হাতে পেলেই যেন সব নৈতিকতা ধুয়ে মুছে সাফ। অথচ আমরা ভুলে যাচ্ছি, অসৎ পথে অর্জিত সাফল্য সাময়িক; তার ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী। চিরকুট কয়েকটি নম্বর দিতে পারে, কিন্তু কেড়ে নেয় আত্মমর্যাদা। আজ যে হাত পরীক্ষায় অসততার আশ্রয় নিচ্ছে, কাল সেই হাতই কী সমাজের দায়িত্ব নেবে। যে মন সততার মূল্য বোঝে না, সে কি ভবিষ্যতের ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারবে? এভাবে চলতে থাকলে আমরা কাগজে শিক্ষিত, কিন্তু বিবেকে দেউলিয়া এক সমাজের দিকে এগিয়ে যাব। এই দৃশ্য কোনো সাধারণ ঘটনা নয় - এ এক সতর্কবার্তা।
এখনই যদি আমরা জেগে না উঠি, আগামীদিনে অবক্ষয় হবে সেটাই স্বাভাবিক, আর সততা হবে ব্যতিক্রম। অবক্ষয় শুরু হয় ছোটো আপস দিয়ে - আর ধ্বংস শুরু হয় নীরব সমর্থন থেকে। আজ দরকার কঠোর আত্মসমালোচনা। দরকার পরিবারে নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ, বিদ্যালয়ে মূল্যবোধের চর্চা এবং সমাজে সততার প্রতি স্পষ্ট অবস্থান।
আমাদের স্পষ্টভাবে বলতে হবে - শর্টকাট নয়, পরিশ্রমই পথ। প্রতারণা নয়, সততাই শক্তি। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, কাল আমাদের নীরবতাই অপরাধ হয়ে দাঁড়াবে। আজ যদি আমরা প্রতিবাদ করি, আগামীকাল হয়তো রাস্তার দু'পাশে ছেঁড়া চিরকুট নয় - দেখা যাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম।
ঋণ স্বীকার: প্রবীর আদক
১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬