সম্পাদকীয়

এখন সবকিছুই প্রায় দেরিতে আসে। বাঙালির জীবনে শীত আসতেও প্রায় এ'মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গেল। 'সমন্বয়' পত্রিকা কিন্তু আমরা ঠিক সময়ে প্রকাশ করতে পেরেছি। পাঠকদের কাছে এটা একটা মন ভালো করা সংবাদ।

জগতের নিয়মে ভালো দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না। তাই দুঃসংবাদ এলো - পড়শি দেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম পীঠস্থান 'ছায়ানট' মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে! বাদ যায়নি 'উদীচী'ও!

আমরা লক্ষ্য করছি 'মব সংস্কৃতি'র আড়ালে মৌলবাদীরা কিভাবে ধীরে ধীরে একটা দেশকে পুরোপুরি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য ধ্বংসের আর কীই বা বাকি আছে?

শুরু হতে বাংলাদেশের এই আন্দোলনে যারা নেতৃত্বে ছিল তারা উগ্র মৌলবাদী সংগঠনের নেতা-কর্মী। আওয়ামী লীগ সরকার আগেই টের পেয়েছিল তারা আন্দোলনের নামে সরকারের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে একটি 'জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র' হিসাবে নির্মাণ করতে চায়। এই কারনে হাসিনা সরকার জাতিকে সতর্কও করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, জনগণ শেখ হাসিনার কথায় কর্ণপাত না করে ছাত্রদের এই পাতানো আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নেমেছিল ও সরকার পতন করেছিল। বিনিময়ে তারা কি পেল? সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আজ সেখানে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের উত্থান হচ্ছে। আজ সবাই বুঝতে পারছে এই মৌলবাদী শক্তির আসল উদ্দেশ্য কি?

সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়, দুষ্কৃতী নয়। যাঁদের মধ্যে থাকে মানবিকতাবোধ। তাঁরা মানুষকে আঘাত করতে পারেনা। তাঁরা মানুষের মধ্যে সৃজনশীলতার বীজ বপন করতে পারে। অপরদিকে ঈশ্বরের বাণী আত্মস্থ করেও 'হিংসা' নামক ব্যাধি দূরীভূত করতে না পারা দুষ্কৃতীরা ঈশ্বরের উপর বিচারের দায়িত্ব না ছেড়ে নিজেরাই বিচারের দায়িত্ব নিয়ে হিংসার মাধ্যমে পৃথিবীতে অশান্তি ছড়িয়ে চলেছে। রবিঠাকুরের কথায়, "প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।"

'ছায়ানট' ধ্বংস করা যায় না। বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সানজিদা খাতুনের ছবি ছিঁড়ে, মূর্তি নষ্ট করে মুক্তচিন্তার গতিরোধ করা যায় না। এভাবে উগ্র মৌলবাদীরা সুস্থ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ধ্বংস করতে পারবে না।

এই আঘাতের ক্ষত বুকে নিয়েও 'ছায়ানট' তার নিজস্ব ভঙ্গিতে সুস্থ সংস্কৃতির প্রসার করে যাবে। আসলে ধ্বংসকারীরা জানে না - "ধর্মের মাঝে আশ্রয় দিল যারা/ আবর্জনায় রচে তারা নিজ কারা।"

বাংলাদেশের আপামর সংস্কৃতিপ্রেমী, মুক্তচিন্তার মানুষের মননে আজ যে মর্মবেদনা আমরা তার সমব্যথী।


১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫