গল্প ও অণুগল্প

স্নেহ



অচিন্ত্য সাহা


বড়দা নিজের লরিটা নিজেই চালাতেন। শিলিগুড়ি, গৌহাটি, আসানসোল, রাঁচি, পাটনা, কখনো কখনো কলকাতার বড়বাজারেও লরি নিয়ে যেতেন। সঙ্গে থাকতো দাদার বিশ্বস্ত সঙ্গী পল্টন ওরফে পল্টুদা। পল্টুদাকে তিনি খুব স্নেহ করতেন। দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাইতে বেশি ভাড়া পেলেও যেতেন না। দুই মেয়ের মায়া উপেক্ষা করে বেশিদূর যেতে মন চাইত না। পাটনা বা গৌহাটি পর্যন্তই যথেষ্ট। শিলিগুড়িতেই বেশি যেতেন। দাদার পরিবারে ছোটো ভাই তিমিরকে নিয়ে পাঁচজন সদস্য। মেজদা, সেজদা, ন'দা সবাই যার যার মতো আলাদা সংসার পেতে অন্যত্র চলে গেছেন। পুরোনো পৈতৃক ভিটেয় মা একাকিনী পড়ে আছেন। জ্যাঠামশাই এবং জ্যাঠাইমা-র মৃত্যুর পর তাঁদের সন্তানসন্ততিকে মানুষ করার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছেন। তাই ওরাই মায়ের দেখাশোনা করে। জনমদুখিনী মায়ের জন্য ভাববার সময় তাঁর নিজের সন্তানদের কারো নেই। অভাবের সংসার হলেও বৌদি সবসময় মায়ের কথা বলতেন। মায়ের জন্য বড়দার কষ্ট হতো। মা পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে আসবেন না। পাশাপাশি বড়দার বাড়িতে একটা মাত্র ঘরে চারজন কোনওমতে মাথা গুঁজে থাকেন। ছোট্ট বারান্দার এককোণে রান্নাবান্না হয়। তিমির তারই একপাশে অতি কষ্টে পড়ে থাকে। বৌদি ওকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখেন। তিমিরের বয়স যখন ছয় বছর তখন বড়দা ওকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য নিজের কাছে এনে রাখেন। বৌদি তখন সন্তানসম্ভবা।

চাঁদের আলোর মতো ফুটফুটে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বৌদি কোলে তুলে নিয়ে দুই গালে চুমু খেতে খেতে বলেন - "আজ থেকে তুই আমার ছেলে।"

দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন কিন্তু বৌদির কথা শুনে তাঁর মুখে হাসির ঝলক দেখা গেল। তিমির শান্ত প্রকৃতির ছেলে। মাত্র ছ'বছর বয়সে মায়ের আঁচল ছেড়ে বৌদির কাছে আশ্রয় লাভ করে। দাদা বাড়ি ফিরতে না পারলে বৌদি তিমিরকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতেন। বৌদির নরম তুলতুলে বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে তিমির পরমানন্দে ঘুমিয়ে থাকত। কোনো কোনোদিন গভীর রাতে দাদা বাড়ি ফিরতেন, তিমির তখনও নিশ্চিন্ত মনে বৌদির বাহুবেস্টনে গভীর ঘুমের দেশে। বৌদির অন্তহীন স্নেহের পরশে তিমির মাতৃস্নেহের সুখ অনুভব করত। দাদা বাড়ি ফিরে এদেরকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতেন। ছোটো ভাইয়ের মায়াভরা মুখখানি দেখে তাঁর বড়ো করুণা হতো। বছর খানেক আগে বাবা অমৃতলোকে পাড়ি দিয়েছেন। তিমিরকে তিনি বড্ড বেশি ভালোবাসতেন। বড়দা সেটাকে মর্যাদা দিতে তিমিরকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন।

সূর্য ওঠার আগেই তিমির ঘুম থেকে উঠে বৌদিকে ডেকে দিয়ে মাঠে চলে যেত। মাঠে অন্যান্য বন্ধুর সাথে ঘন্টাখানেক খেলাধূলা করে পাশের পুকুরে নেমে সাঁতার কেটে স্নান সেরে বাড়ি ফিরে পড়তে বসা। ততক্ষণে বৌদি ঘর মুছে, বাসন মেজে, বাসি কাপড় ধুয়ে রান্নায় বসে গেছেন। বাইরে বেরোনো না থাকলে দাদা তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতেন না। উঠে যদি শুনতে পান যে তিমির পুকুরে সাঁতার কেটে স্নান করেছে তাহলে খুব রাগ করতেন। কেননা গত বছর শীতের সকালে প্রতিদিন পুকুরে সাঁতার কেটে বুকে কফ শ্লেষ্মা বসে গিয়েছিল। হাজারী ডাক্তারের হাতযশ আর বৌদির শুশ্রূষায় সেবার তিমির সেরে উঠেছিল। কিন্তু শরীর খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন স্কুলে যেতে পারেনি। তাই বড়দা তিমিরকে পুকুরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। তবু সাঁতার অন্তপ্রাণ তিমির সাঁতার ছাড়তে পারেনি। বৌদি জানতেন যে তিমির ভালো সাঁতারু। সাঁতারের বিভিন্ন কৌশল রপ্ত করার জন্য স্থানীয় একটা সুইমিং পুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। মাস তিনেক প্র্যাকটিস করার পর ওখানেই শুরু হয় বিভিন্ন বিভাগে সাঁতার প্রতিযোগিতা। শিক্ষানবিশ হিসেবে 'ফ্রি-স্টাইল' এবং 'বাটারফ্লাই' ইভেন্টে প্রথম হয়ে মেডেল এবং শংসাপত্র বৌদির হাতে তুলে দিয়েছিল তিমির। বৌদি খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলেন - "তুই এমন করেই সারাজীবন আমার বুকের মধ্যে থাকিস বাবু।"

তিমির মনে করত বৌদি-মায়ের এই আদর তার জন্য সবচেয়ে বড়ো উপহার। বৌদির আবেষ্টনীতে থেকে তিমির ডান হাতের আঙুল দিয়ে বৌদির নরম তুলতুলে ঠোঁট দুটি নাড়াচাড়া করত।

শিলিগুড়ি থেকে ফেরার পথে কৃষ্ণনগরের অনতিদূরে হাসাডাঙ্গার বিলের কাছে এসে অকস্মাৎ লরির ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়। ভোরের আলো তখনও ফোটেনি মিনিট দশেকের মধ্যে শহরে প্রবেশ করবে - ঠিক সেই সময়ে ঘটল বিপত্তি। পল্টুদা তখন গভীর ঘুমে অচেতন। বড়দা বার দু'য়েক তাকে ডেকে ঘুম ভাঙালেন - "পল্টু নীচে নেমে ইঞ্জিনটা একটু চেক করে দেখ তো ভাই, এই জনমানবহীন এলাকায় গাড়িটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল কেন।"

পল্টুদা ধড়ফড়িয়ে উঠে চোখ দুটো দু'হাতে রগড়ে নিয়ে নীচে নেমে ইঞ্জিন চেক করে বলে, "বড়দা, ইঞ্জিনের ছোটো হুইলারের রাবার ব্যান্ড ছিঁড়ে গেছে।"

"টুল বক্সটা দেখ, ওখানে এক্সট্রা রাবার ব্যান্ড আছে কি না।"

পল্টুদা আগে থেকেই জানত যে, বড়ো হুইলারের ব্যান্ড আছে কিন্তু ছোটো ব্যান্ড নেই। তবুও সে টুল বক্সটা খুলে দেখে বলল - "না বড়দা নেই। আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম অতিরিক্ত ব্যান্ড রাখতে, তুমি আমার কথা শুনলে না।"

"আরে, এটা তো দু'দিন আগে লাগানো হয়েছে। এত তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যাবে তা জানব কী করে? এখন কী করা যায় দেখ।"

টুল বক্সের ভিতর থেকে একটা নাইলনের দড়ি নিয়ে খুব শক্ত করে ইঞ্জিনের মোটরের বড়ো চাকার সাথে ছোটো হুইলারটা বেঁধে দেয় পল্টুদা। পল্টুদার উপস্থিত বুদ্ধিতে ইঞ্জিন চালু হয় গাড়িও চলতেও শুরু করে। পল্টুদা তখনও নীচে দাঁড়িয়ে। গাড়ি থামানোর জন্য পল্টুদা চিৎকার করে। কিন্তু গাড়ির মূল ব্রেকটা নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। স্টিয়ারিংটা ঘুরে গিয়ে গাড়িটা একটা খেজুর গাছে সজোরে ধাক্কা মারে। ঘটনার আকস্মিকতায় পল্টুদা চিৎকার করে ওঠে। দৌড়ে গাড়ির কাছে যখন পৌঁছায় তখন দেখতে পায় বড়দার মাথাটা স্টিয়ারিং-এর ওপর পড়ে প্রচন্ড আঘাতে কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বড়দা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ওভাবেই পড়ে আছেন। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ি চলাচল করে, পল্টুদার চিৎকার শুনে পরপর কয়েকটি গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। তার মধ্যে বহরমপুর থেকে একটা ফাঁকা ফোর হুইলার আসছিল। পল্টুদা হাত দেখিয়ে গাড়িটাকে দাঁড় করায়।

"কী ব্যাপার দাদা, কী হয়েছে?"

"একটু এসো না ভাই, খুব বিপদে পড়েছি।"

পল্টুদা ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা সংক্ষেপে জানায়। ছেলেটার নাম আকিবুল। বয়স খুব অল্প। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর গাড়ির লাইনে এসেছে। বাড়ি দেপাড়া-বিষ্ণুপুরে। ঘটনার কথা শুনে গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে আসে। সময় নষ্ট না করে আকিবুল একাই লরির উপর থেকে বড়দাকে নামিয়ে নিয়ে এলো।

পল্টুদাকে বললো, "দাদা আমার গাড়ির পেছনের দরজাটা খুলে দাও।"

পল্টুদা চটপট কাজ করতে পারে কিন্তু গায়ে তেমন একটা জোর নেই। দৌড়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল। আকিবুল বড়দাকে পাঁজাকোলা করে গাড়ির ভেতরে শুইয়ে দেয়।

"পল্টুদা তুমি কি সাথে যাবে? না গাড়ির কাছে থাকবে?"

পল্টুদা ভাবতে পারল না কী করা উচিত। গাড়ি এখানে ফেলে রাখা যাবে না। অনেক টাকার মাল রয়েছে। গাড়িটা ঠিক থাকলে হয়তো চালিয়ে নিয়ে যেতে পারত। আবার বড়দাকে একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

"আরে কী হলো পল্টুদা? যা করতে হয় তাড়াতাড়ি করো। বেশি দেরি করলে অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে।"

"না না, ভাই, তুমি নিয়ে যাও। আমি বরং..."

"ঠিক আছে। কাকুর নামটা চটপট বলো তো। হাসপাতালে জিজ্ঞেস করলে বলতে হবে তো?"

নিখিল, নিখিল চন্দ্র রায়।"

"ঠিক আছে।"

আকিবুল বড়দাকে নিয়ে খুব জোর গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে ঢুকে পড়ে। ভোরের আলো তখন সবে ফুটতে শুরু করেছে। ইমারজেন্সিতে গিয়ে দেখে ডাক্তারবাবু ঝিমোচ্ছেন আর তাঁর পাশে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার খাতার পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে কীসব লিখে চলেছেন। আকিবুল তাঁকে বিষয়টি বলতেই তিনি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বললেন -

"আরে, শিগগির নিয়ে এসো।"

"আসলে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো, তাছাড়া আমি তো একা -"

"যেভাবে হোক নিয়ে আয় ভাই, আমি ডাক্তারবাবুকে জানাচ্ছি।"

আকিবুল বুঝতে পারল এঁকে কিছু বলে লাভ নেই। যা করার ওকে একাই করতে হবে। দৌড়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে বড়দাকে নামিয়ে নিয়ে এলো। পা দিয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ করে ইমারজেন্সিতে ঢুকে একটা বেডে তাঁকে শুইয়ে দিল। ডাক্তারবাবু ততক্ষণে উঠে বড়দাকে দেখতে লাগলেন। ডাক্তারবাবুর হাতের স্পর্শে তাঁর চেতনা ফিরে এলো। অস্পষ্ট উচ্চারণে "পল্টু, পল্টু..." বলে বার দুয়েক ডাক দিয়ে প্রচন্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগলেন।

আকিবুল ওর গাড়িটাকে একপাশে সরিয়ে একটা সুরক্ষিত জায়গায় রেখে যখন ইমারজেন্সিতে এলো তখন ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন -

"ইনি তোমার কে হন? ঠিক কী ঘটেছিল আমায় বলো তো?"

"সে অনেক কথা ডাক্তারবাবু, পরে বলছি। আগে বলুন রোগীর অবস্থা কেমন? খুব খারাপ কিছু হয়নি তো?"

"হ্যাঁ, প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, তার উপর ছোটোখাটো একটা স্ট্রোক হয়েছে সুতরাং বিপদ তো আছেই। রক্ত দিতে হবে, অন্তত দু'বোতল।"

"আপনি আগে ভর্তি করার ব্যবস্থা করুন। আমি রক্ত জোগাড় করছি।"

আকিবুলের আপ্রাণ চেষ্টায় বড়দার সেযাত্রায় প্রাণরক্ষা হলো বটে কিন্তু তাঁর কাজ করার ক্ষমতা লুপ্ত হয়ে গেল। পল্টুদা আকিবুলের নিঃস্বার্থ সেবায় অবাক হয়ে গিয়েছিল। হারাধন সাহা তাঁর মাল ফিরে পেলেন কিন্তু কোনওরকম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন না। বড়দার জন্য তিনি কোনও দুঃখপ্রকাশ করলেন না এমনকি পল্টুদাকে একটা ধন্যবাদ জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলেন না। বিগত দশ বছর যাবৎ বড়দা হারাধন সাহার মালপত্র আনা-নেওয়ার কাজ করেছেন। অবশেষে নিরুপায় হয়ে বড়দা তাঁর অতি প্রিয় গাড়ি 'সম্রাট'-কে বিক্রি করে দিলেন।

বাজারের ধারদেনা শোধ করার পর খুব সামান্য অর্থ পড়ে রইল। তিমির এবার জয়েন্টের প্রস্তুতি নিচ্ছে, বড়ো মেয়ে ষষ্ঠ এবং ছোটো মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে, পাঁচ পাঁচজনের খোরাকি এবং বড়দার চিকিৎসার খরচ - সব মিলিয়ে মাসে পনেরো ষোলো হাজার টাকার মতো খরচ কোথা থেকে কীভাবে আসবে এই চিন্তায় বৌদি সারারাত ছটফট করেন। কী করবেন ভেবে উঠতে পারেন না। জয়েন্টে ভালো রেজাল্ট করলে তিমির মেডিকেলে ভর্তি হবে। তার জন্য মোটা টাকার প্রয়োজন। বৌদি ভাবতে পারেন না। বড়দা সব বুঝতে পারেন কিন্তু কিছু বলতে পারেন না শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন। আর ক'দিন পরেই দুই মেয়ের বার্ষিক পরীক্ষা। তারপর নতুন ক্লাসে ভর্তি, নতুন বই কেনা..., বৌদি মনস্থির করে নেন... কী করতে হবে।

বিজয়লাল কলেজের পাশে সবেমাত্র গড়ে উঠেছে বস্ত্রবাজার। ওখানে খুচরো ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা অনেকেই দুটো তিনটে করে দোকান নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন। বৌদি ভাবলেন ওখানে একটা দোকান নিয়ে যদি কাপড়ের ব্যবসা করা যায় তাহলে মন্দ হয় না। তিমিরকে সঙ্গে নিয়ে বস্ত্র বাজার কমিটির সম্পাদক সাধনবাবুর সাথে দেখা করলেন। সাধনবাবু বললেন -

"আপাতত যতগুলো দোকান রেডি করা ছিল তার সবক'টি বিক্রি হয়ে গেছে। এবার দ্বিতীয় টাওয়ার শুরু হবে। আপনি বুকিং করে গেলে মাস ছয়েকের মাথায় দোকান পেয়ে যাবেন।"

"ছ' মাস? একটু আগে ব্যবস্থা করা যায় না দাদা? আমি খুব অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন দোকান পেলে ব্যবসা দাঁড় করাতেই ছ' মাস লেগে যাবে ততদিনে আমার পরিবারকে পথে বসতে হবে।"

সাধনবাবুকে বৌদি তাঁর সমস্যার কথা জানালেন। তিনি খুব মন দিয়ে শুনে বললেন -

"দিদিভাই আপনি আগামী পরশুদিন একবার আসুন। দেখি আপনার জন্য কী করতে পারি।"

পরদিন ছিল রবিবার। তিমিরের কলেজ ছুটি ছিল। সে কাকভোরে উঠে বৌদিকে ডেকে বললো -

"বৌদি, চলো বাজারটা একবার দেখে আসি। সপ্তাহে একদিন বাজার বসে। আজ গেলে দেখা যাবে।"

বৌদিকে সাথে নিয়ে তিমির বস্ত্রবাজারে যায়। ওখানে গিয়ে জানতে পারে - রাত দুটো থেকে বাজার শুরু হয় চলে সকাল দশটা সাড়ে দশটা পর্যন্ত। ঘুরে ঘুরে একটা দোকানের সামনে এসে দেখে একটা বোর্ডে লেখা আছে - 'এই দোকান ঘর বিক্রয় হইবে আগ্রহী ব্যক্তিরা সত্বর যোগাযোগ করুন।'

তিমির বলে, "বৌদি, দেখ, সামনের বোর্ডে কী লেখা আছে। আমাদের বোধহয় ছ'মাস অপেক্ষা করতে হবে না।"

বৌদি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে বলেন, "বাবু, এখনই ফোন কর।"

"কিন্তু টাকা?"

"তুই ভাবিস না বাবু। আমি টাকার জোগাড় করে রেখেছি। তুই আগে ফোন কর।"

ফোন করে জানা গেল দোকানটা আকিবুল ওর ভাইয়ের জন্য কিনেছিল কিন্তু ওর ছোটো ভাই দুম করে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। আকিবুলকে ডেকে নিয়ে ওর সাথে কথা বলে তারা দরদাম ঠিক করে নেন। দাম সাধ্যের মধ্যেই আছে দেখে সময় নষ্ট না করে চটজলদি দোকান রেজিস্ট্রি করে নিলেন। আকিবুলকে সস্নেহে বৌদি বললেন,

"আকিবুল, তোর উপকারের কথা কোনওদিন ভুলবো না ভাই, সময় করে একদিন বাড়িতে আসিস কিন্তু।"

আকিবুল মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

এখন প্রতি রোববার হাট বসছে পরে আরও একদিন বাড়তে পারে। বৌদি তাঁর সমস্ত গহনা বন্ধক রেখে টাকার ব্যবস্থা করলেন। তিমিরকে সাথে নিয়ে শান্তিপুর, ফুলিয়া, নবদ্বীপ, চাকদা থেকে শাড়ি এবং জামাকাপড় কিনে আনলেন। বৌদির অক্লান্ত পরিশ্রমে তিন মাসের মধ্যেই ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেল। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে তার উপর ব্যবসার চাপ সামলে বৌদির শরীর ভেঙে গেল। বড়দা সবকিছু লক্ষ্য করেন আর নীরবে চোখের জল ফেলেন।

এতকিছুর মধ্যেও তিমির রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা করে নীটে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে। সে অল-ইন্ডিয়ায় সিক্সথ হয়ে স্কলারশিপ পায়। তিমিরের স্কলারশিপ পাওয়ার পিছনে ওর নিজের অধ্যবসায় যেমন ছিল তেমনি বৌদির অবদান ছিল অপরিসীম। কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য খুব একটা টাকা পয়সা লাগেনি। বৌদির ব্যবসা ক্রমশ বাড়ছে ফলে পরিশ্রমও বাড়ছে। তিমিরকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে হবে। সুতরাং বৌদিকে একা একাই ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বছরখানেক ধরে ব্যবসা করার জন্য তিনি অনেকটাই পরিণত হয়েছেন। এখন আর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শনিবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যতটা সম্ভব বৌদিকে সাহায্য করে। বড়দার অবস্থা আগের থেকে ভালোর দিকে, এখন একটু একটু করে হাঁটাহাঁটি করেন, মেয়েদের কাছে গিয়ে বসেন, কিছু বলার চেষ্টা করেন।

তিমির যেদিন হোস্টেলে চলে যায় সেদিন বৌদি উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিমির দু'হাতে তাঁর চোখের জল মুছে দিয়ে বলে, "কাঁদছো কেন বৌদি-মা? তুমি কাঁদলে আমার পথ পিছল হয়ে যাবে। আমি আসছি, আমাকে আশীর্বাদ করবে না?"

তিমিরকে বুকে নিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বৌদি বলেন, "আনন্দে কাঁদছি রে বাবু, আনন্দে। তুই যখন ডাক্তার হয়ে ফিরবি তখন আমি রাণীর মতো থাকবো। ভালোভাবে থাকিস, সোনা আমার।"

"তোমার স্নেহ আমার রক্ষাকবচ। আমি জানি তুমি সবসময় আমার সাথে আছো। তুমি যে আমার সত্যিকারের মা।"

বৌদি-মা'র চরণ স্পর্শ করে এগিয়ে যায় তিমির। ওর বুকের মধ্যে সযত্নে রক্ষিত আছে বৌদি-মা'র প্রতিমার মতো মুখখানি - স্নেহ, ভালোবাসা, করুণা, মমতার এক জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি।

বৌদি-মা চোখ দুটি আঁচলের খুঁটে মুছে ঘরে ফিরে তিমিরের বাঁধানো ছবিটার সামনে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকেন। যখন চোখ মেলে তাকান তখন দেখতে পান - কী অপূর্ব এক আলোকরশ্মিতে ঘর পূর্ণ হয়ে গেছে! রশ্মির অপরূপ ঔজ্জ্বল্যে বৌদির মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।