বিবিধ

জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদের কিছু অজানা কথা



সঞ্চারী ভট্টাচার্য


আপামর বাঙলীর আবহমান কাল ধরে পুরীর প্রতি মোহ সকলেরই জানা। পুরী দর্শন মানেই জগন্নাথ দর্শন ও সমুদ্র দর্শন। জগন্নাথদেবকে দর্শন করা মানেই জগন্নাথদেবের মন্দিরে পুজো দেওয়া ও তাঁর মহাপ্রসাদ গ্রহণ করা। জগন্নাথদেবর পুজো ও তাঁর মহাপ্রসাদ একে অপরের থেকে পৃথক নয়। অনেকে মনে করেন উড়িষ্যা প্রদেশের খাদ্য সংস্কৃতি বহুলাংশে জগন্নাথদেবের ভোগ দ্বারা প্রভাবিত। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রান্নাঘর অবস্থিত এই শ্রীমন্দিরে, যা প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫,০০০ ভক্তকে প্রসাদ বিতরণ করে। মূলত দুই প্রকার ভোগ জগন্নাথদেবকে নিবেদন করা হয়। সাংখুরি ভোগ, অর্থাৎ ঘি ভাত, ডাল, ডালমা, বেসর, মহুরা, শাক, পিটা, কণিকা, খিচুড়ি ইত্যাদি। অন্যদিকে নিসাংখুরি বা শুকনো ভোগে থাকে বিভিন্নরকম মিষ্টি ব্যঞ্জন - গজা, খাজা, চাকুলি, পুলি, নাদি, নারু, ঝিল্লি, অরিসা, বল্লভ, মালপোয়া ইত্যাদি। রন্ধনে ব্যবহৃত কাঁচা শাকসবজি সবই দেশীয়। বিদেশী সবজি, যেমন ক্যাপসিকাম বা টমেটো ব্যবহার করা হয় না জগন্নাথদেবর ভোগে।

'মাদলা পঞ্জি' অনুযায়ী রাজা যজাতি কেশরী-র সময়কাল থেকে সাংখুরি ভোগ শুরু হয়, যদিও পরবর্তীতে রাজা অনঙ্গ ভীমদেব আরও নতুন ব্যঞ্জন জগন্নাথের ভোগে যুক্ত করেন। ১৫৬৮ থেকে ১৫৭৫ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘলদের আক্রমণের ফলে এই ভোগ নিবেদন বন্ধ থাকে। তবে ১৭৫১ খ্রীস্টাব্দ থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনে ভক্তি সহকারে জগন্নাথদেবের ভোগ নিবেদন চলছে।

জগন্নাথদেবের রান্নাঘর আকারে ১৫০ ফুট লম্বা, ১০০ ফুট চওড়া ও ২০ ফুট উঁচু এবং এটি মন্দির প্রাঙ্গণের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। মোট ২৫০টি মাটির উনান আছে এই হেঁসেলে এবং তা তিন প্রকারের আখা দ্বারা বিভক্ত। যথা, অন্ন চুল্লী, পিঠা চুল্লী ও তুনা চুল্লী। ৯ থেকে ১২টি মাটির পাত্র বসানো হয় এক একটি উনানের উপর। রান্নাঘরের আগুন 'বৈষ্ণব অগ্নি' নামে খ্যাত। এটা বিশ্বাস করা হয় স্বয়ং মা মহালক্ষী সযত্নে নিজের হাতে জগন্নাথদেবের জন্য রান্না করেন, তাই এই আগুন কখনও নেভে না। যেসকল সেবাইত এই রান্নাঘর পরিচালনা, রন্ধন প্রক্রিয়া ও মহাপ্রসাদ বিতরণ করেন, তারা বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন, 'সুপাকর', 'মহাসুপাকর', 'দেউলাকরন', 'রোস পরিচ্ছা', 'রোস অনিমা', 'পালিয়া মহাসুর' ও 'প্রসাদ বড়ু'। এই সুপাকরগন, যারা মহাপ্রসাদ রান্না করেন তাদের দৈনন্দিন এক কঠিন নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়। কোনোরকম গান গাওয়া, কথা বলা এমনকি পান পর্যন্ত চিবোনো নিষেধ এই রান্নাঘরে।

শ্রীমন্দিরে প্রধানতঃ চার প্রকার রন্ধন প্রণালী ব্যবহৃত হয় যেমন, 'ভীমপাক', 'নলপাক', 'সৌরিপাক' ও 'গৌরীপাক'। এটা মানা হয় জগন্নাথের ভোগের পূর্বে অন্নব্যঞ্জনগুলিতে কোনোরকম গন্ধ থাকে না, কিন্তু ভোগের পরে সেই প্রসাদের সুগন্ধে বাতাস মুখরিত হয়। ভগবান জগন্নাথদেবের পরে এই প্রসাদ বিমলা দেবীকে নিবেদন করা হয়। তারপরে তা মহাপ্রসাদে পরিণত হয়, এবং এই নিয়ে শ্রীল লোচন দাস ঠাকুর রচিত 'চৈতন্য মঙ্গল' গ্রন্থে এক সুন্দর লীলাকাহিনী বর্ণিত আছে।

বাঙালীর কাছেও মহাপ্রসাদের এক বিশেষ গুরুত্ব আছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর সন্ন্যাস জীবনের ২৪ বছরের ১৮ বছর পুরুষোত্তম ক্ষেত্র জগন্নাথ পুরীতেই অবস্থান করেন। সেই সময় মহাপ্রভুর গণেরা, অর্থাৎ চৈতন্য অনুগামীরা এই বঙ্গদেশ থেকে পায়ে হেঁটে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে যেতেন, আর সকল গৌড়দেশ থেকে আগত ভক্তদের শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং নিজের হাতে আকন্ঠ মহাপ্রসাদ খাওয়াতেন।

সব তীর্থের মতো জগন্নাথ পুরীর বিশেষত্ব হল এই মহাপ্রসাদ। জগন্নাথ দর্শনের ফল মহাপ্রসাদ গ্রহণ ছাড়া পাওয়া যায় না।


তথ্যসূত্রঃ

১. বইয়ের নামঃ পুরীর কথা; লেখকঃ গুরুদাস সরকার; প্রকাশের সালঃ ১৯২১ (প্রথম প্রকাশ) / ২০২৪ বা তার কাছাকাছি (সাম্প্রতিক সংস্করণ); প্রকাশনার নামঃ গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় (প্রথম) / খড়ি প্রকাশন (সাম্প্রতিক)।
২. বইয়ের নামঃ পুরী তীর্থ; লেখকঃ নগেন্দ্রনাথ মিত্র; প্রকাশের সালঃ ১৯১৫; প্রকাশনার নামঃ গুরুদাস চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা।
৩. বইয়ের নামঃ শ্রীজগন্নাথ মন্দির লুণ্ঠনের ইতিহাস; লেখকঃ সুরেন্দ্র কুমার মিশ্র; প্রকাশের সালঃ ২০০৯ / ২০২২ (বিভিন্ন সংস্করণ); প্রকাশনার নামঃ আনন্দ প্রকাশন, কলকাতা (একটি সংস্করণ)।
৪. বইয়ের নামঃ জগন্নাথ কাহিনী; লেখকঃ দুলেন্দ্র ভৌমিক; প্রকাশের সালঃ ১৯৯২ (প্রথম প্রকাশ) / ২০১৬ (সাম্প্রতিক সংস্করণ); প্রকাশনার নামঃ আনন্দ পাবলিশার্স।
৫. বইয়ের নামঃ পূর্বের মঠ-মন্দিরঃ পুরী ভ্রমণ; লেখকঃ শ্রীকরাচার্য্য আডভি; প্রকাশের সালঃ ২০২৩ / ২০২৫ (বিভিন্ন সংস্করণ); প্রকাশনার নামঃ গিরিজা লাইব্রেরি, কলকাতা।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।