[৯ ডিসেম্বর, ২০২০। অনন্তলোকে চলে গিয়েছিলেন পাওলো রোসি (Paolo Rossi)। আর এর ১৭ বছর ৮ মাস আগেই সেখানে চলে গিয়েছিলেন কলকাতার এক ফুটবল জাদুকর কৃশানু দে।
অনন্তলোকে তাঁদের এই 'কথোপকথন' শুনে ফেলে এটা লিখে ফেলেছিলাম ৯ ডিসেম্বর, ২০২০-র পরের দিন।]
"আপনিও এসে গেলেন রোসিদা? আর আপনার আসাটা বিশ্ব ফুটবল দিবসের আগের দিনটাতে! এই বছরটায় আমাদের এখানে ফুটবলপাড়া তো জমজমাট হয়ে গেল।"
"কেন ভাই… হ্যাঁ নামটা বলো তো তোমার। আমার চেয়ে তো অনেক ছোট তুমি, বছর ছ'য়েকের, যা মনে হয়। কবে এলে এখানে? আমি তো ৬৪ বছর বয়সে এলাম। তুমি কত বছরে এলে?"
"আমি কৃশানু দে, ভালবেসে 'রন্টু' বলে সবাই। ১৭ বছর আগে এসেছি, তখন আমি ৪১। পালমোনারি ডিজঅর্ডার হয়েছিল।"

"অত তাড়াতাড়ি? আমারটা দুরারোগ্য রোগ ছিল। তা তোমার দেশ থেকে কে কে এলো এ বছর? ক'দিন আগেই তো আর্জেন্টাইন যুবরাজও এসেছেন, জানলাম। তিনিও তো চার বছরের জুনিয়রই ছিলেন আমার থেকে।"
"হ্যাঁ, ওঁনার সাথেও কথা হল গত মাসের ২৫ তারিখেই। কি খেলোয়াড় ছিলেন, উফ্! আমাকে 'ইন্ডিয়ার তিনি' বলে ডাকতেন ফুটবল সমাজের অনেকে, ১৯৮৬-তে ২৪ বছর বয়সেই মারডেকাতে হ্যাটট্রিক করার পর থেকে। যাই হোক, এই বছরের মার্চে আমাদের দেশের এক বিখ্যাত ফুটবলার-কাম-কোচ এলেন, আমার আসার তারিখেই মানে ২০ তারিখে আর এপ্রিলের শেষ দিনে এলেন আমাদের দেশের এক অসাধারণ স্কিমার-কাম-স্কোরার শিল্পী ফুটবলার। প্রথমজন ৮৪ বছর বয়সে আর দ্বিতীয়জন ৮২ বছর বয়সে। দারুণ আছি সবার সঙ্গে এখন। আপনার কথা কিছু বলুন। আমি যে বছর প্রথম বড় দলে আসি, সেবারই তো আপনি কামাল করে দিলেন স্পেন বিশ্বকাপে।"
"সেই ১৯৮২। তার আগে ১৯৭৮-এ, সেমিফাইনাল গ্রুপে হল্যান্ডের কাছে হারি আমরা আর আমি নেহাত খারাপ খেলিনি সেবারও। ১৯৭৯-তে জুভেন্তাসের হয়ে খেলার সময় বিশ্বে সর্বাধিক মূল্য ছিল আমার। ১৯৮০-তে সাসপেন্ড করল সিরি এ-তে গটআপের অভিযোগে, জেলও খাটালো। আমি জানি, ভুল ছিল ওটা। সাসপেনসন তুলে ১৯৮২-তে ইতালি টিমে ফেরালো স্পেন বিশ্বকাপের জন্য। ভালো স্ট্রাইকার কোথায় তখন টিমে, কন্টি ছাড়া? ৩টে খেলে ৩ পয়েন্ট নিয়ে ইতালি কোনওমতে ২য় রাউন্ডে গেল, পেরু ম্যাচে প্রথমার্ধ আর ক্যামেরুন ম্যাচে পুরোটা খেললাম। গোল পাইনি, কথা উঠল টিমে রাখা নিয়ে। ২য় রাউন্ডে অন্য দুটো দল আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারালাম আমরা। ওই ম্যাচে ওরা দেখল ১টা লাল আর ৩টে হলুদ কার্ড, একটা হলুদ কার্ড মারাদোনার। আমাদের দুটো হলুদের একটা দেখলাম আমি। কিছুই খেলতে পারিনি। কিন্তু তারপর থেকেই ম্যাজিক, ঈশ্বরের আশীর্বাদে। ব্রাজিল ম্যাচে হ্যাটট্রিক করলাম। প্রথম গোল ক্যাব্রিনির ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে, ৫ মিনিটে। জিকোর ফাইনাল পাসে সক্রেটিস গোল করে সমতা ফেরান ১২ মিনিটে। ২৫ মিনিটে একটা গোলা পাঠালাম ব্রাজিল গোলে, ওদের সেরেজোর ব্যাকপাস ধরে, ২-১। জিকো - সক্রেটিস - ফালকাও - জুনিয়র ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের ওই উইন অর এক্সিট ম্যাচটায়। ৬৮ মিনিটে ফালকাও করলেন ২-২, দারুণ শটে। ড্র হলে উঠে যাবে পরের রাউন্ডে, এই অবস্থাতেই রক্ষণ জমাট না করে মুহূর্মুহূ আক্রমণে গেল ব্রাজিল। খেলা শেষ হবার ১৬ মিনিট আগে কর্নার থেকে ভাসানো বলে ওদের গোলকিপার পেরেজকে এড়িয়ে হেডে ৩-২ করলাম। হ্যাটট্রিকও। তারপরে আমাদের আর একটা গোল বাতিল হয় আর একটা নিশ্চিত গোল বাঁচান আমাদের গোলকিপার দিনো জফ। অঘটন ঘটে গেল। ব্রাজিল আউট, আমরা সেমি-তে। বাকিটা শোনার আগে তোমার কথা কিছু বলো।"

"এটা মনে আছে, আবছা আবছা। ততদিনে আমিও একটু একটু করে সেট হয়ে যাচ্ছি বড় টিমে। ডিফেন্স, হাফ আর ফরোয়ার্ডে তিন/চারজন সিনিয়ার ছাড়া বাকি সব সিনিয়ার সেবার এশিয়াড ক্যাম্পে। প্রথম দিকে সবাই বল পেলেই সিনিয়ারদের দিতে বলত। ততদিনে সবাই বল পেলে আমাকেই দিয়ে দিত। কাটাতাম ভালো, স্কিল করতাম, থ্রু-পাশ দিতাম কিন্তু গোল করার দিকে অত নজর দিতাম না। ওটা আসে আপনাকে দেখে, ওই বছর। তারপরে, এখনো সবাই বলেন যে, পুরো আশির দশক আর নব্বইয়ের দশকের শুরুটা জুড়ে নাকি কলকাতার ঘেরা মাঠে বিকেল হলেই আমার ম্যাজিক শুরু হতো। র্যামপার্টের এক পায়ে খাড়া উপচে ভরা ভিড়টার সবক'টা চোখ পলকহীন তাকিয়ে থাকত আর তিনদিকের ঠাসা গ্যালারি ফলের তোয়াক্কা না করেই চোখে চোখে রাখত আমার ছোট্টখাট্টো বাঁ পাটাকে, যা দেখে চমকাতেন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার আর মিডফিল্ডাররা। কিন্তু চোখ ভরে দেখতেন প্রতিপক্ষ ফরোয়ার্ডরা। যারা আমার বাঁ পায়ের ড্রিবলিং দেখেছেন, তারা নাকি আজও বলেন যে, সময় থমকে গিয়ে মুচকি হাসত চোখ মেলে আর বিস্ফারিত চোখে ফুটবল ঈশ্বর দেখতেন আর ভাবতেন ভুল দেশে ভুল সময়ে জন্মেছি আমি। তখন এক একটা ছোট্ট মোচড়ে নিশ্চিত 'না' রদ হয়ে 'হ্যাঁ' হয়ে যেত মাঠে, আমার ডজে, এটাও বলেন তারাই। তারা এটাও বলেন, আট বছর ইস্টবেঙ্গলে (১৯৮৫, ১৯৮৬, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯৪) আর ছয় বছর মোহনবাগানে খেলা (১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৯২, ১৯৯৩ আর ১৯৯৫) আমাকে খেলতে দেখা আশি-নব্বইয়ের ময়দান নাকি একশ বছর পরেও গর্ব করবে আমার খেলা নিয়ে। ভারতের হয়েও খেলেছি অনেক এরই মধ্যে। ১৯৯৫-এর পরে আর মাত্র ৮ বছর ওখানে থাকার মেয়াদ ছিল আমার। পাততাড়ি গোটাতে হলো ২০০৩-এই। ২০ মার্চ, ২০০৩ তারিখে ভারতের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে ওঠার আনন্দ নাকি অনেকটাই ঢেকে গিয়েছিল আমার এখানে চলে আসার কান্নায়, আজও এটা অনেকেই বলেন। এবার আপনার বাকি কথা বলুন রোসিদা।"
"সেমি-তে পোল্যান্ডকে আমরা হারাই ২-০ গোলে। ২২ আর ৭৩ মিনিটের দুটো গোলই ছিল আমার করা, যথাক্রমে কন্টি আর অ্যান্টোগনির পাস থেকে। ১১ই জুলাই ১৯৮২-র ফাইনালে ৩-১ গোলে পশ্চিম জার্মানীকে হারিয়ে আমরা বিশ্বকাপ জিতি। প্রথম অর্ধ ০-০। তারপরে ৫৭ মিনিটে আমাদের প্রথম গোলটা আমিই দিই। দলের হয়ে একই বিশ্বকাপে ব্যাক-টু-ব্যাক ৬ নম্বর গোল ছিল এটা আমার। আজও মনে হয়, আর কেউ এটা করেনি। টারডেলি আর আলটোবেলির গোলে ৩-০ এগিয়ে যাই ৮১ মিনিটে। ৮৩ মিনিটে ১টা গোল শোধ দেন ব্রাইটনার। বেটিং কাণ্ডে জড়িয়ে জেল খাটা, ফুটবল ভুলে যাওয়া আমি ৬ গোল দিয়ে ওই বিশ্বকাপে 'গোল্ডেন বল' আর 'গোল্ডেন বুট', দুটোই পাই। পুনর্জন্ম হয় আমার ফুটবলের। ওই সময়টাতে আমি গোলের গন্ধ পেতাম বক্সের মধ্যে আর সেই গন্ধ চিনে নিয়ে পৌঁছে যেতাম ঠিক জায়গাতে, ঠিক সময়ে আর ঠিকঠাক হেড বা শটটা নিতাম। প্রতিপক্ষ শুধু জাল থেকে বল ছাড়িয়ে আনত। কিন্তু ১৯৮৬-র বিশ্বকাপে আর খেলা হয়নি আমার। ইতালির হয়ে ৪৮ ম্যাচে ২০ গোল ছিল আমার।জুভেন্টাস, কোমো, ভিকনেজা, আবার জুভেন্টাস, মিলান, ভেরোনার হয়ে খেলে বুটজোড়া খুলে রাখি ১৯৮৭-তে, আমি তখন মাত্র ৩১। তার ৩৩ বছর পরে আজ এখানে এলাম। ব্যস, আমার গল্প শেষ। আজ শুনলাম, ফেসবুক-ট্যুইটারে অনেকেই মনে করছে আমাকে। এটুকুই তো চায় একজন ফুটবলার, তাই না? তা, এখানে প্র্যাকটিসে নামতে চাই কাল থেকে। হবে তো রন্টু?"
"হ্যাঁ, চলুন কাল থেকেই। মারাদোনা, প্রদীপদা, চুণীদা, সবাই তো প্র্যাকটিস করেন, রোজ। আমিও করি আর সেই সঙ্গে আমার সমসাময়িক একজন, সুদীপ চ্যাটার্জিও, যে এসেছে আজ থেকে ১৪ বছর আগে। কাল থেকেই আপনিও প্র্যাকটিস করবেন। লোকজন আজও আমাদের মনে রেখেছে, এটাই অনেক।..."
* * * * * *
সত্তর আর আশির দশক তার ফুটবলীয় রহস্যময়তা নিয়ে আজ সকালের কুয়াশার মতো কালের গহ্বরে আত্মগোপন করে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। অসহায় চোখের জল মিশিয়ে সেটা দেখতে দেখতেই শুনে ফেললাম এই কথোপকথন, আর লিখেও ফেললাম।
সেই সাদা-কালো ছুমন্তরের দিনগুলির মায়াময় গল্পের খাতা পড়ে ফেলুন, এই কথাবার্তার মধ্যে।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
