বিবিধ

আত্মকথন



অভিজিৎ রায়


শরীর নিজস্ব। আর, ব্যক্তিগত আলাপ প্রসঙ্গে তার কথা টেনে আনা অর্থহীন। মনের ভিতর জমা ক্ষোভ, সব লোভ থেকে ছুটি দিতে পারে -- এই কথা বিশ্বাস করা কঠিন হলেও অবিশ্বাস্য নয়। কীভাবে এ পরাজয় মেনে নেবে? মানিয়ে নেবার জন্য কী কী করতে পার? এই প্রশ্নে আরও ভেঙে পড়ি। নিজেকে অক্ষম, অপদার্থ মনে হয়। কীভাবে নিজেকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলি নিজের কাছে? কীভাবে নিজেকে আরও শক্ত, সংযমী করি তুলি? কীভাবে ভুলি এইসব অভিযোগ আর অপমানের রাশি রাশি ঝড়ের আঘাত? যতবার ভুলি, ভুলে থাকি ততবার আরও আরও আঘাতের জন্য ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হতে হয়। অথচ জীবন পারে না। বারবার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও নিজের কাছে হেরে যেতে হয়। এই পরাজয় নিয়ে বাকি জীবনের আলো অন্ধকারে জেগে ওঠে। অভিমানে অভিমানে অপমান জোটে। তারপর? তার আর পর নেই। ঠিকানা যে নেই তা নয় কিন্তু সে ঠিকানায় নিজেকে নিয়ে যাবার সাহস থাকে না।

শরীরের নিজস্ব মত আছে, মনেরও। শরীরের সঙ্গে শরীরের মতান্তর আর মনের সঙ্গে মনের মনান্তর এড়িয়ে বাঁচার গল্পে কোনও রূপকথা জন্মায় কি না আমরা জানি না। কিন্তু এই সমস্ত বিতর্কে শরীরের মন হারিয়ে যায়। সে ব্যাপারে ফ্রয়েড বা প্লেটো কী বলেছিলেন তা জানলেও প্রসূতিগৃহ থেকে শ্মশানযাত্রা করে ফেলা ভেতো বাঙালির কিছুই যায় আসে না। কিন্তু তারা কি ভালোবাসে না? তাদের ভালোবাসায় শরীর এবং মনের অবস্থান জানতে ইচ্ছে করে। অবসরে লিখতে ইচ্ছে করে সেইসব রূপকথার গল্প। যে গল্পে রাজপুত্র আর রাজকন্যার মাঝখানে কোনও রাক্ষসের দেখা মেলে না। তাদের মন মেলে না, শরীরের মনও না অথচ মিলেমিশে থাকার বাধ্যবাধকতায় কাহিনি আটকে থাকে রূপকথাতেই।

নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে আয়ু ক্ষয় হয়। সমস্ত জয়-পরাজয়ের দ্বন্দ্বে অবসাদের গভীর অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলার পর আর কী লড়াই বাকি থাকে? থাকে না। লড়াই করার জেদ হারিয়ে নিজেকে নিজের সঙ্গে আটকে রাখার এক যুদ্ধ প্রতিমুহূর্তে চলতে থাকে। সেখানে শরীর গৌণ হয়ে পড়ে। মুখ্য ভূমিকায় বিষাদের ক্ষত। সে তখন শরীর এবং মনের গভীরে অসুখের বীজ বপন করতে থাকে। থামে না। মনের অসুস্থতা কীভাবে শরীর ক্ষয় করে সে হিসাব রাখে না কেউ। তবু, নিজের প্রতি নিজের অভিযোগ নিয়ে নিজেকে একা করায় মত্ত হয়ে বাঁচাটুকু অবশিষ্ট থাকে তখনও। অনুভব আর অনুভূতির খেলায় কখনও আনন্দ ফিরে আসে। কখনও অভিযোগের ত্রাসে নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয় শামুকের মতো।

নিজের সঙ্গে নিজে অনবরত কথা বলে ক্লান্ত মানুষটার ভুল বোঝার সুযোগ নেই। নিজেকেও না, সামনের মানুষটাকেও না। ক্রমশ একা হয়ে যাবার পর নিজের একা থাকাটাকে রপ্ত করে নিতে শেখার কোনো বিকল্প নেই। যে পারে, সে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলার শিল্প শিখে নেয়। কেউ কেউ সে কথোপকথন লিখে রাখে আর দু'একজন সেইসব পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়। পাঠকের আতঙ্ক, আশঙ্কা আর ভয় জুড়ে এক ঝরা পাতার গান শোনা যায়। আর মানুষটা কেমন করে যেন আয়ুর ক্ষয় রোধ করে। সবাই যে সেটা পারে এমন নয় কিন্তু চেষ্টা যে করে না তাও নয়। কেউ নিজেকে নিজে বরাভয় দেয়, কেউ নিজের মধ্যে নিজে একা আওড়ায় এই অমূল্য কথোপকথন। নিজেকে বুঝতে চাওয়া তা সে ভুল হোক বা ঠিক কি অসুখ? লোকে অবশ্য তাকে ভুল বোঝে। আত্ম স্বার্থে মগ্ন মানুষের উপাধি জোটে। প্রতারক। বারবার এই স্বার্থপরতার অভিযোগ শুনতে শুনতে মানুষটার নিজের উপর ঘৃণা হয়। সে নিজের পরাজয় কামনা করে। জীবনের পরাজয়। মৃত্যু।

মৃত্যুই কি শেষ পথ? সঠিক সিদ্ধান্ত? এই প্রশ্নের উত্তর না শরীরের আছে না মনের। কিন্তু যে নিজেকে ঘেন্না করে, নিজের শরীর আর মনকে ঘেন্না করে, বিষাদের গোপন আঘাতের ক্ষত নিয়ে তার বেঁচে থাকাটাই তার জীবনের রহস্য। আমরা রহস্য-গল্প, উপন্যাস ভালবাসি কিন্তু জীবনের এই জটিল রহস্য থেকে মুখ লুকিয়ে বেঁচে থাকার ভান করি।

ভান হোক বা অভিনয় যে নামেই ডাকি জীবনের মূল সত্য কিন্তু এইটুকুই। মৃত্যু এখানেই মহৎ। তার ভান নেই। আমাদের শরীর ভান করে আর মন অভিনয় কিন্তু তারপরও আমরা নিজেদের বিজ্ঞাপিত করে তুলি স্যোশাল মিডিয়ায়। অবসাদের ক্ষত গভীর হলে সে অসুখ গৌণ হয়ে পড়ে। তখন নিজের বিজ্ঞাপনে নিজেকে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে। অথচ এইসব ভান বা অভিনয়ের ধারাবিবরণী লিখে রাখার লোভ সংবরণ করা যায় না। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। লিখতে লিখতে পড়া হয়ে যায় অনেকখানি। নিজেকে পড়া আর নতুন করে চেনা। বেচাকেনার হিসাব পরিষ্কার হয়ে যায় বাজার থেকে ঘরে ফেরার পর। লাভের হিসাব নিতে চায় সব্বাই কিন্তু ক্ষতির, কেউ না। ঘরের মানুষ না শোনার ভান করে মুখ ফেরায় কাজে অথবা মেগা সিরিয়ালে।

জীবন কি মেগা সিরিয়াল? বোধহয় নয়। ছোট ছোট, টুকরো টুকরো গল্প। যে গল্প শোনাও জরুরি, বলাও। এই বলে যাওয়া গল্পই যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আমাদের ধনী করে তোলে অভিজ্ঞতায়। আমাদের অবচেতনকে সক্রিয় করে তোলে সহজেই। মুখোমুখি বসে থাকা কাছের মানুষ অথবা ক্রেতা অথবা উপভোক্তাকে মুহূর্তে চিনে নিতে সাহায্য করে এই ছোট ছোট গল্পগুলোই। মেগা সিরিয়ালের বিস্ময়কর মুহূর্তের মতো জীবন ক্যামেরা এগিয়ে, পিছিয়ে বারবার বিস্ময়কে উল্লেখযোগ্য করে তোলে না। শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষাকে আরও কমিয়ে দেয়। বিস্মিত হওয়ার মধ্যে গুরুত্ব নেই। জীবন বেঁচে থাকাকেই বিস্মিত করে তোলে বারবার নিজের মাহাত্ম্য বোঝাতে। কিন্তু আমরা জীবনের মাহাত্ম্য না বুঝতে পেরে বিস্ময়ের মাহাত্ম্য বুঝতেই কাটিয়ে দিই অনেক অনেক মুহূর্তের যোগফল। কারও কারও কাছে সে দীর্ঘ সময় অনন্ত বলে মনে হলেও আমি অন্য মতে বিশ্বাস রাখি।

মানুষ চাইলে মুহূর্তের ভিতর প্রবেশ করতে পারে না। মুহূর্ত চাইলে মানুষকে তার ভিতর প্রবেশাধিকার দিতে পারে। দিতে পারে কিন্তু দেয় কি? হয়তো নয়। হয়তো শুধুমাত্র প্রবেশাধিকারের লোভ দেখিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত নিজেকে বিলীন করে অনন্তের শরীরে। মুহূর্তের মন নিয়ে কথা বলার কি কিছু নেই? নিশ্চয় আছে। মুহূর্ত যদি লোভ দেখাতে জানে বিস্ময়ের, তাহলে সে আরও অনেক ছলাকলা জানে বৈকি! কিন্তু অনন্তের মতো মহান, মহৎ, স্থির এবং নিশ্চিত অনুভবের কাছে সে সবই নিতান্ত মূল্যহীন। মানুষ কি তবে অনন্তের গর্ভে নিজে প্রবেশের অধিকার খুঁজে নিতে পারে? এই প্রশ্নের পিঠোপিঠি বড় হয়ে আমাদের সামনে উঠে আসে আরও এক প্রশ্ন। অনন্ত কি মানুষকে নিজের ভিতরে আমাদের প্রবেশাধিকার দেয়? হয়তো দেয় না। কিন্তু দিতে চায়। অধিকার সবসময়ই অর্জন করতে হয়। মানুষ চাইলে, মানুষ নিজে নিজেকে স্থির, মহান, মহৎ করে তুলতে পারলে সে নিশ্চয় একদিন অনন্তের গর্ভে নিজেকে পুন:স্থাপন করতে পারে। শূন্য থেকে শুরু করে শূন্যে বিলীন হয়ে যাবারই এক নাম অনন্ত আর অন্য নাম জীবন। তাই কি? তবে মুহূর্ত কী? মুহূর্ত শুধুমাত্র সময়ের ভগ্নাংশ অথবা তাও নয়। বলতে পারি, অনুভবের ভগ্নাংশ। আর এই ভগ্নাংশ নিয়ে আমাদের এতো বিস্ময় যে শূন্য নিয়ে বিস্ময়ের অবকাশ মেলে না। আমরা শূন্যের পূর্ণ রূপের সন্ধানে না ছুটে অনেক অনেক ভগ্নাংশের মধ্যে নিজেদের পথ ও ঠিকানা হারিয়ে ফেলি। যেমন মন হারিয়ে ফেলি শরীর-সন্ধানে অথবা শরীরের মন হারিয়ে মনান্তর নিয়ে কাটিয়ে দিই এক বিস্ময়কর জীবন।

শূন্যের গর্ভে যে পূর্ণতার বীজে এই দেহ ধারণের অনন্ত ইতিহাস তাকে আড়াল করে কোন মন আর মানসিক যন্ত্রণার মুহূর্তগুলোকে আমরা বিস্ময়ের অবকাশের কথাশিল্প বানাতে ব্যস্ত, জানি না। জানি না এই দেহের বাইরে এই মনের কোন অস্তিত্ব আমাদের এক নতুন জীবনের সুলুকসন্ধান দিতে পারে! আমার বিস্ময় শুধুমাত্র শরীর মনের তর্কবিতর্কে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই আচ্ছন্নতা থেকে যা লিখি তা আমাকে কোথাও নিয়ে যায় না। প্রকাশ্য আলোয় না, গোপন অন্ধকারে না। শুধুমাত্র অবচেতনের ছায়ান্ধকার পথে হেঁটে যাই মস্তিষ্কের মেদ কমানোর ব্যর্থ প্রয়াসে।

শরীরে মেদ জমে। মস্তিষ্ক শরীরের অংশ কাজেই সেখানেও মেদ জমতেই পারে কিন্তু মনে? ভাবনায়? মেদ যে সেখানেও জমে তা মেনে নিতে কষ্ট হয় না। ভাবনারা যখন চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়ে তখন কি তাকে মেদ গ্রস্ত বলা ভুল হবে? বাস্তবে শরীরের মনে আর মনের শরীরে শুধু হরমোনের খেলা চলে অবিরত। আর, তারই ওলোট ফেরে যাবতীয় মেদের জন্ম আর বড় হয়ে ওঠা। তারাই আমাদের ভাবনাকে আক্রান্ত করে, আচ্ছন্ন করে রাখে আর মতান্তর এবং মনান্তরের জন্য জমি উর্বর করে রাখে। প্লেটো আর ফ্রয়েডের ভিন্ন মতের বীজ মাথাচাড়া দেয় সেই জমিতে এবং নিজের মন আর নিজের শরীর সেই নিয়েই মতান্তরে জড়িয়ে সাদামাটা জীবনকে জটিল আর জটিল জীবনকে সাদামাটা করে ছাড়ে।

কিন্তু এরপরও নতুন প্রশ্ন এসে পড়ে আলোচনায়। এই যে জটিল আর সাদামাটা জীবন নিজেদের অবস্থান বদল করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় কিন্তু দাঁড়ায় কোন মুখে? এই শিবির বদলে তাদের লজ্জা করে না? শরীর সম্বল জীবন আর হৃদয় সম্বল জীবনের কি কোনও মতাদর্শগত বিরোধ নেই? থাকতে পারে না? থাকতে পারে, নাও পারে। শরীর কখনও মনকে উদ্বেলিত করে তুলতে পারে আবার মনও শরীরকে চাগিয়ে তুলতে পারে। কারণ শরীরের অস্তিত্ব আছে বলেই তো মনের শরীর নিয়ে এতো কথা, এত নীরবতা। এ সবই তো আমাদের নিজস্ব। শরীর নিজস্ব, মন নিজস্ব। শুধু আমরাই নিজেদের নিজস্ব হয়ে বাঁচতে শিখলে একটা জীবন মুহূর্ত ছাড়িয়ে অনন্তের দিকে যাত্রা শুরু করতে পারে। এবার কি তবে সেই যাত্রাপথের অপেক্ষা নাকি আরও অনেক নতুন কিছু বলা আর শোনার অপেক্ষা!

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।