গল্প ও অণুগল্প

নিখোঁজ কবির ডায়েরি (নবম পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অভিজিৎ রায়


[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]

(নয়)

কলিংবেলটা বাজতেই অরুময় সোফা থেকে উঠে গেলেন দরজার দিকে। আজ বাড়িতে কেউ নেই। সুস্মিতার একটা সেমিনার আছে কলেজের আর বিপ্র ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সাথে ডুয়ার্সে বেড়াতে গেছে। দরজা খুলতেই অরুময় দেখলেন এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। বয়স চল্লিশের ধারেকাছে। তাকে নমস্কার করে বলছেন, "আপনি আমাকে ঠিক চিনবেন না। আমি অঞ্জনা বসু। আপনার অনুরাগী সৃজিত বসুর স্ত্রী।" অরুময় অঞ্জনাকে ভিতরে আসতে বললেন। সোফা দেখিয়ে বললেন, "বসুন"।

- আপনি আমাকে তুমি করে বলুন দাদা। সৃজিতের কাছে কতদিন আপনার কত কথা শুনেছি।

- তা বল, কী কারণে আমার কাছে আসা? সৃজিতের খবর কী?

- ওর জন্যই আসা। গত পাঁচদিনে সৃজিত কি আপনার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেছে?

- মানে? নাতো? কী হয়েছে?

- সৃজিত নিরুদ্দেশ। গত সোমবার দুপুরের পর থেকে ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছে আমরা কেউ জানি না। ফোনটাও বন্ধ। আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেনি এর মধ্যে। আমরা পুলিশে জানিয়েছি। হাসপাতালগুলোতেও খবর নিয়েছি। কোথাও ওর কোনও খবর পাচ্ছি না।

- সে আবার কী? ওকে তো এতটা বাস্তববুদ্ধিহীন মনে হয়নি।

- হ্যাঁ। আমরাও কেউ ভাবতে পারিনি। তাই মনে হল, যদি কোনও কারণে ও আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাহলে ওর কোনও খবর পেতে পারি।

- বুঝলাম। আমার সাথে যোগাযোগ হলে আমি নিশ্চয় জানাব। তার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি কী?

- হ্যাঁ বলুন। ওর লেখালিখি নিয়ে কী বাড়িতে খুব আপত্তি ছিল? ও কী ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছিল ওর লেখক জীবন নিয়ে?

- চাকরিটা চলে যাবার পর থেকে ও একটু অবসাদে ভুগছিল এ কথা সত্যি। তবু লেখালিখি নিয়ে ওর পাগলামিকে আমরা আস্কারাই দিতাম। আমি অবশ্য পাশাপাশি বলতাম যে বাংলা বাজারে লিখে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। তার উপর ও খুবই ঠোঁটকাটা। কাকে কখন কী বলে দেয়! শত্রু বাড়াতে ও ওস্তাদ।

- তুমি অবশ্য ঠিকই বলেছ। কিন্তু আসল কথা কী জানো? যারা প্রকৃত লেখক তারা না লিখে শান্তি পায় না। লিখে টাকা পাওয়াটা তাদের কাছে তুচ্ছ। সংসার অবশ্যই উপার্জন দাবি করতে পারে। কিন্তু তাতে লেখকের লেখা আটকে থাকবে না। মাঝে মধ্যে আমারও এ ব্যাপারে দোষী মনে হয়।

- কেন? আমি যেটুকু সৃজিতকে দেখেছি তাতে লক্ষ্য করেছি আমার কাছে ও কোনওদিন কোনও ধান্দা নিয়ে আসেনি। আমার মনে হচ্ছে আমি যদি ওর লেখালিখি নিয়ে দু'চার কলম কোথাও লিখতাম তাহলে হয়ত ওর মনোবল কিছুটা হলেই বাড়ত।

- তা হতে পারত দাদা। তবে ও কোনওদিনই নিজের জন্য কাউকে কিছু বলতে আগ্রহী নয়।

- সুবোধকে জানিয়েছ? ওর সঙ্গে তো এখন প্রশাসনের খুব ভাল সম্পর্ক। তাতে সুবিধা হতে পারে। আমি তো শারীরিক কারণে প্রায় সবকিছু থেকেই দূরে। বাড়িতেই থাকি বেশিরভাগ সময়। তবে, আমাকে যদি সৃজিত ফোন করে তাহলে নিশ্চিত আমি তোমাকে জানাব। তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও।

অঞ্জনা ফোন নাম্বারটা অরুময় গোস্বামীকে দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে বাইরে। আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি আসবে মনে হচ্ছে। ভিতরে ভিতরে তো সেই কবে থেকে ভিজে যাচ্ছে অঞ্জনা। কোন অভিমানে সৃজিত বাড়ি ছেড়েছে তার কিছুটা হয়ত সে অনুমান করতে পারছে। আর তাই কান্না বাধা মানছে না। ভিতরে ভিতরে সে সবসময় কেঁদে যাচ্ছে। কথায় কথায় সৃজিতকে অপমান করা বা ছোটো দেখানোতে যে দিনের পর দিন সৃজিত অবসাদে ডুবে যাচ্ছিল তা বুঝতে পারলেও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিল না অঞ্জনা। বিভিন্ন দিকের এতটা চাপ সেও নিতে পারছিল না। সৃজিত যেন তার এই হেরে যাওয়া, অবসাদকে এনজয় করছিল আর অঞ্জনার তাতেই অসুবিধা হচ্ছিল। হাল ছেড়ে বসে যাওয়ার মধ্যে সে কোনও গর্ব অনুভব করতে পারছিল না। অঞ্জনা বারবার চাইছিল যে, খোঁচা মেরে সৃজিতের ভিতরের বাঘটাকে জাগিয়ে তুলতে। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে বাঘটা যে ক্রমশ বুড়ো হয়ে গেছে এবং হার স্বীকার করে নিতে শিখে গেছে সেটা মেনে নেওয়াটা অঞ্জনার ক্ষেত্রে খুব অসুবিধা হচ্ছিল।

এখন সোহিনীর জন্য অঞ্জনার কষ্ট হচ্ছে বেশি। মেয়েটা যে বাবাকে এত ভালবাসে তা কখনই বুঝতে পারেনি সে। বেশিরভাগ সময় মেয়ে তার সঙ্গে কাটালেও কীভাবে এবং কেন বাবাকে এত ভালবাসে তা সত্যিই খুব আশ্চর্যজনক লাগছে অঞ্জনার। মোবাইলে উবের বুক করে অপেক্ষা করছিল অঞ্জনা। গাড়িটা এসে পড়তেই চেপে বসল। ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হল একটু পরেই।

(ক্রমশ)