গল্প ও অণুগল্প

আমার মা (চতুর্বিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


মাটির ঘরের দাওয়াতে মাসিমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বেশ কিছু মানুষের হৈচৈ আর চেঁচামেচিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। অবাক চোখে দেখলাম লাঠিসোঁটা নিয়ে লোকগুলো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে কী সব আলোচনা করছে। সেই চিৎকার চেচামেচি হৈ-হুল্লোড় মাসিমার কানে পৌঁছেছিল। ওদের সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কাজল। সে তার বাবা সুধাকান্তকে ডেকে এনে আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো - বাবা দেখো, এই দুষ্টু লোকটা বলছিল ভালো দিদাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। আমরা দিদাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে দেবো না।

একজন মহিলা এগিয়ে এসে কাজলের হাত ধরে বললেন - ছিঃ কাজু! ছিঃ! মানুষের সঙ্গে এইভাবে কথা বলতে হয়? তুমি কীভাবে জানলে যে উনি দুষ্টু? না জেনেশুনে কখনও এমন কথা বলবে না, কেমন?

আমার দিকে তাকিয়ে একপলক দেখে মুখটা নামিয়ে বললেন - কিছু মনে করবেন না দাদা। আসলে কাজু মানে আমার মেয়ে কাজল ওর দিদাকে খুব ভালোবাসে তো তাই ওইরকম বলে ফেলেছে। আমার তো মা নেই, সেই কোন ছোটোবেলায় আমার মা মারা গেছেন। তাই সুলতা মাসিমাকেই নিজের দিদা বলেই জানে।

- ঠিক আছে, ঠিক আছে অত করে বলতে হবে না। কাজল ছেলেমানুষ অতশত বোঝে না।

আমি কাজলের কাছে গিয়ে ওর হাতদুখানি ধরে আদরের সঙ্গে বললাম - শোনো কাজল তোমার দিদা আমার সঙ্গে যেতে রাজি হয়নি। তুমি তোমার দিদাকে খুব যত্নে রেখো কেমন।

কাজলের মা এগিয়ে এসে আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো - আমাকে চিনতে পারছো জয় দাদা?

গলার স্বরে বুঝতে পারলাম না কে এই কাজলের মা। তাই বললাম - মাথায় অতখানি ঘোমটা টানা থাকলে কী মানুষকে শুধু কণ্ঠস্বরে চেনা যায়?

- তাহলে ঘোমটা সরিয়ে দিই দেখি চিনতে পারো কী না।

মাথার ঘোমটা সরালে আমি চমকে উঠলাম, শরীরে, মনে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। এ আমি কাকে দেখছি? আমি কোনোদিন ভাবতেই পারিনি যে, এখানে এসে শিউলিকে দেখতে পাবো। চেহারায় সামান্য একটু পরিবর্তন হলেও শিউলির সেই মিষ্টিমুখটা আমার চোখে ভেসে উঠলো। আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললাম - শিউলি তুই এখানে? তোকে যে এখানে দেখতে পাবো একেবারেই ভাবতে পারিনি। তোকে আর তোর ভাইকে আমরা কত খুঁজেছি।

- যাক চিনতে পেরেছ তাহলে? আমি ভাবলাম আমাকে তোমরা ভুলে গেছ।

উপস্থিত গ্রামবাসী, কাজলের বাবা, সুলতা মাসিমা সবাই যেন বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। আমার মনের গভীরে তখন উত্তপ্ত লাভা টগবগ করে ফুটছে। আমার শৈশবের সেই শিউলি। যার ছবি আমার হৃদয়ের গভীরে খোদাই করা আছে। তাকে ভুলে যাই কী করে? অনেকগুলো প্রশ্ন মনের ভেতর তোলপাড় করে চলেছে - শিউলি এখানে কীভাবে এলো? ওর ছোটো ভাইটিই বা কোথায়? সুধাকান্ত ওকে কীভাবে কোথা থেকে আবিষ্কার করলো? আজ এত কাছাকাছি পেয়েও শিউলিকে আগের মতো করে ভাবতে পারছি না কেন?

সুধাকান্ত এগিয়ে এলো - আপনি কী শিউলির জ্যেঠুর ছেলে জয়? শিউলির মুখে আপনাদের কত কথা শুনেছি। জ্যাঠামশাই, জেঠিমা সব কেমন আছেন? আমার বড্ড ইচ্ছে ছিলো ওঁদেরকে একবার নিজের চোখে দেখে আসি। কতবার ভেবেছি - কলকাতা ছাড়াও আরও কত জায়গায় যাই একবার কী ওঁদের সঙ্গে দেখা হবে না?

- বাবা অনেক বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মা এখনো আছেন কিন্তু ভালো নেই।

- কেন? কী হয়েছে তাঁর? শরীর ভালো আছে তো?

- সে অনেক কথা। পরে একদিন সব বলবো। কিন্তু আপনি বলুন তো শিউলিকে কীভাবে পেলেন? আর ওর ভাইটিই বা কোথায়?

- ওদের কথা শুনতে হলে এই অল্প সময়ে শেষ করা যাবে না। তাহলে রাতে এখানে থাকুন। সব ঘটনা বলবো।

উপস্থিত গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্যে সুধাকান্ত বললো - তোমরা এখন যে যার কাজে যাও বুঝলে, ইনি আমাদের অতি প্রিয়জন। আমরা এখন নিজেদের সুখ-দুঃখের দিনগুলোর কথা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করবো।

সবাই চলে যেতেই সুধা বললো - জয় দাদা আমাকে 'আপনি আজ্ঞা' করে বলবেন না। আপনি শিউলির দাদা, তার উপর আপনি একজন লেখাপড়া জানা মানুষ। আমরা গাঁ-গঞ্জের মানুষ। আমাদের অত সম্মান দিয়ে কথা বললে বড্ড লজ্জা করে।

দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। বাড়ি ফেরার কথা ভুলে গেলাম। অনেকদিন পর শিউলিকে কাছে পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে। পরদিন আমার ছুটি নেই কিন্তু মনে হলো ছুটি তো নেওয়াই হয় না। একটা ছুটি নিলে খুব একটা অসুবিধে হবে না। সুলতা মাসিমা বারবার অনুরোধ করলেন - থেকে যা বাবা, সবাই যখন বলছে তখন না করিস না। তুই আজ এখানে থাকলে আমারও মনে হবে অনেকদিন পর আমার সুমিত আমার কাছে আছে।

মনের মধ্যে একটা শীতল বাতাস বয়ে গেল। বুঝতে পারলাম মাতৃহৃদয়ের টান কত গভীর। বুকের মাঝখানটায় একটা অজানা ব্যথা চিনচিন করে উঠলো। আমার নিজের মা না হলে কী হবে। প্রদীপের অস্পষ্ট আলোয় মনে হলো আমার সামনে আমার মা বসে আছেন। আর আমি তাঁর স্নেহার্দ্র হৃদয়ের কোমল পরশ অনুভব করতে পারছি। কতবার মাকে অনুরোধ করেছি - বিগত দিনে যা ঘটে গেছে তা ভুলে যাও। আমি তোমার হতভাগ্য সন্তান।

(ক্রমশ)