রাত প্রায় দুটো। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে শিশির। বুকে অসম্ভব যন্ত্রণা। নিঃশ্বাস নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। শিশিরের শ্বাসকষ্টের সমস্যা আজ নতুন নয়। সাত বছর বয়সে ওর মা মারা যাবার পর অযত্ন আর অবহেলায় মানুষ হওয়া বাড়ির ছোটো ছেলে শিশির এই রোগের শিকার হয়। শিশিরের বাবা সারাক্ষণ যাত্রা থিয়েটার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বেশির ভাগ সময়ই তিনি বাড়ির বাইরে কাটাতেন। হিসাব বহির্ভূত কাঁচা পয়সা রোজগার এবং অস্থির মতি তাঁকে দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে দেয়নি। তাই সংসারের সমস্ত কাজকর্মকে তিনি উপেক্ষা করে গেছেন। বছরে দু' তিনবার বাড়ি আসতেন কিছু টাকা পয়সা স্ত্রীর হাতে গুঁজে দিয়ে আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। ঘর-সংসার সামলাতে সামলাতে শিশিরের মা প্রতিভা দেবী নিজের দিকে নজর দিতে পারেননি। ছয় ছয়টি সন্তানের জননী প্রতিবারই সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার সময় অসুস্থ হয়েছেন। তাঁকে দেখাশোনা সেবাযত্ন করার মতো কেউ ছিল না। তাঁর স্বামীর অস্থিরতা এবং লোভের আগুনে ক্রমশ দগ্ধ হতে হতে তিনি নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়িয়েই ছিলেন। শিশিরের জন্মের পর তিনি আর উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। ইতিমধ্যে তাঁর দুই ছেলের বিয়ে হয়েছে, একমাত্র মেয়েকেও পাত্রস্থ করেছেন। বৌমারা আসার পর তাঁর কষ্ট, যন্ত্রণা এবং দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। বেশী চিন্তা হতো ছোটো ছেলে শিশিরের জন্য। তাঁর অবর্তমানে কে শিশিরকে দেখবে? অবশেষে দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা, অনাহার এবং অপুষ্টিতে ক্ষয় রোগের শিকার হয়ে অকালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তিনি চলে যান।
প্রতিভা দেবীর মৃত্যুর পর শিশিরও একই পরিণতির শিকার হয়। কাশির দমকে তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো। দাদারা এসব আমল দিতেন না। বৌদিরা 'উটকো ঝামেলা' বলে দায় এড়িয়ে যেত। পাড়ার বাসিন্দারা এসব দেখে সহ্য করতে না পেরে একদিন বলেই ফেলেন - ছেলেটাকে একটু যত্ন-আত্তি কর নাহলে...
- যা হয় হবে। বাঁচলে বাঁচবে নাহলে... যা হয় হবে। আমাদের অত সময় নেই।
প্রতিবেশী হিতাকাঙ্ক্ষীদের মুখ এভাবেই বন্ধ করে দাদারা নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতেন। কিন্তু একজন মানুষ ছিলেন যিনি নিশ্চিন্ত হতে পারতেন না। তিনি হলেন শিশিরের সঙ্গীত শিক্ষক দিলীপবাবু। তিনি জানতেন শিশিরের মধ্যে যে প্রতিভা আছে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে বাংলার সঙ্গীত জগতে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। তিনি নিজের দায়িত্বে শিশিরের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেন এবং কৃষ্ণনগরের নিকটবর্তী একটি সরকার পোষিত আবাসিক স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলে নির্দিষ্ট নিয়ম করে লেখাপড়া এবং খাবার দাবার পেয়ে শিশির ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠে। বছরে তিন চারবার বাড়িতে আসতো। গ্রীষ্মের ছুটি, পুজোর ছুটি এবং শীতের ছুটিতে বাড়ি ফেরা ছাড়া তার অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। বাড়িতে এলেই তার রোগের প্রকোপ বেড়ে যেত। গানের মাস্টারমশাই বলতেন - খোকা, তুই এখানে আর আসিস না। এখানে অযত্ন আর উপেক্ষার ফলে একদিন অকালে ঝরে যাবি। তার চেয়ে বরং বাড়ি না ফিরে নিজে নিজে মানুষ হওয়ার চেষ্টা কর। আমার বিশ্বাস, তুই একদিন অনেক বড়ো হবি। সেদিন আমি গর্ব করে সবাইকে বলবো... দেখো আমার শিশির আজ কত বড়ো হয়ে গেছে।
শিশির সবই বুঝতে পারতো কিন্তু শেকড়ের টানকে সে অস্বীকার করতে পারতো না। তারই টানে সে বাড়ি আসতো। মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবার পর আবাসিক স্কুলের দরজা ওর জন্য বন্ধ হয়ে গেল। এবার ওর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কী করবে, কোথায় যাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। কৃষ্ণনগর শহরে কেউ একটা অবিবাহিত ছেলেকে বাড়িতে থাকতে দিতে চাননা। বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবে তারও কোনো উপায় নেই। ভাড়া এবং খোরাকি বাবদ অর্থ সে কোথায় পাবে? দিনেরবেলা শহরের এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে আর রাতটা স্টেশনে কাটিয়ে দেয়। খিদে পেলে শুকনো পাউরুটি আর কলের জলই ভরসা। এভাবে কয়েকদিন কাটানোর পর স্টেশনের বাইরের একটা হোটেলে সারাদিন কাজের বিনিময়ে থাকা এবং খাবারের ব্যবস্থা করে নেয়। হোটেলের কাজ শেষ হলে গভীর রাতে একা একা বসে গুনগুন করে গান গাইতো। ওর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গভীর রাতের একজন যাত্রী সুবলবাবু একদিন ওর সাথে দেখা করেন। তাঁর ছেলে তিতিরকে গান শেখানোর দায়িত্ব নিয়ে শিশির সুবলবাবুর বাড়িতে এলে তাঁর স্ত্রী তপতী দেবীও গান শেখার বাসনা ব্যক্ত করেন। শিশির হোটেলের কাজ ছেড়ে দেয় এবং সুবলবাবুর অনুরোধে তাঁর বাড়ির পিছনের একটা ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নেয়। ঘর ভাড়ার জন্য টাকা নিতেন না সুবলবাবু। তপতী দেবী সকালের টিফিন এবং রাতের খাবার সময় শিশিরকেও ডেকে নিতেন। তারপর ঘটনাক্রমে কৃষ্ণনগর সরকারী মহাবিদ্যালয়ে কলা বিভাগে সে ভর্তি হয়।
কয়েক মাসের অনিয়মের ফলে শিশিরের শ্বাসকষ্ট আবার বেড়ে যায়। সহপাঠী নয়ন ওকে ডাক্তার দেখিয়ে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। সুস্থ হলে আরও কয়েকটি গানের টিউশনির ব্যবস্থা করে দেয়। কলেজে নবীন বরণের দিন শবনমের সাথে ওর পরিচয় হয়। সেই পরিচয় ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করে এবং একসময় ওদের মধ্যে অন্তহীন প্রেমের প্রবাহ চলতে থাকে। এই সময় গান এবং শবনমের ভালোবাসা শিশিরের অন্তরে নতুন প্রাণের জোয়ার এনে দেয়। জীবনে সত্যিকারের বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায় শিশির। ওর মনে হয় পৃথিবীর সব সুখ এসে ওকে ধরা দিয়েছে। অফ পিরিয়ডে শ্রেণিকক্ষের অভ্যন্তরে প্রায় প্রতিদিনই গানের অন্তাক্ষরী চলত। দেয়ালে দেয়ালে অনুরণিত হতো সেই সুরমাধুরী। কৃষ্ণনগর সরকারী মহাবিদ্যালয়ের বৃহদাকার শ্রেণিকক্ষে কান পাতলে আজও ওদের সুমধুর কলতান শুনতে পাওয়া যায়।
নদীর বুকে লাফিয়ে ওঠা ঢেউ, সমুদ্রের তরঙ্গ হিল্লোল, বজ্রপাতের তীব্র আলোর ঝলকানি, ধ্বনি গাম্ভীর্য, প্রভাত পাখির গান, বাতাসের বুক চিরে ভেসে আসা শঙ্খ ঘন্টাধ্বনি যেমন জল, স্থল, অন্তরীক্ষ ভেদ করে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে তেমনই শবনম শিশিরের ভালোবাসার সৌরভ কলেজের গণ্ডী পেরিয়ে শবনমের মায়ের কাছে পৌঁছে যায়। মা শবনমের ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে ওদের মাঝখানে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। চাপান-উতোর চলতে চলতে শবনমের মায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ফলে শিশিরের ভালোবাসার সৌরভ শবনম ওর জীবন থেকে হারিয়ে যায়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর শবনম আর শিশিরকে একসাথে দেখা যায়নি। শিশিরের বুক থেকে শবনম সরে যাওয়ার পূর্বে মায়ের সিদ্ধান্তের কথা শিশিরকে জানিয়ে দেয়। মনে হয় একটা দমকা হাওয়া এসে সজোরে ওকে ধাক্কা দেয় এবং টাল সামলাতে না পেরে শিশির ঘুরপাক খেতে খেতে ক্রমশ গভীর খাদে পড়ে যায়। দুটি করুণ চোখের শূন্যদৃষ্টি ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। নয়ন যেদিন ওর ঘরে যায় সেদিন শিশিরের একটা কঙ্কাল দেখতে পায়। তড়িঘড়ি সহপাঠী মহাদেবকে ডেকে নিয়ে দুজনে ধরাধরি করে আবার হাসপাতালে ভর্তি করে। মাস দুয়েক যমে-মানুষে টানাটানির পর মানুষের নিষ্ঠা ও ভালোবাসার কাছে যমরাজ পরাজয় স্বীকার করে নিজ লোকে ফিরে যান। নয়ন এবং মহাদেব পালা করে ওর সেবা-শুশ্রূষা করে। মাস তিনেক পর একদিন ভাঙা গলায় গেয়ে ওঠে - 'সেই তানপুরা আছে, ছিঁড়ে গেছে তার'।
কোথায় সেই সুমধুর স্বর, কোথায় সেই মনোহরণকারী সুর, এ কোন শিশির? এ তো আমাদের সেই শিশির নয়। বড্ড অচেনা লাগছে আজ ওকে।
- শবনম শব্দের অর্থ কী তা তোরা জানিস? শবনম মানে শিশির, শিশির মানে শবনম... একে অপরের পরিপূরক। একজন না থাকলে অপরের থাকার কোনো মানে হয় না।
নয়ন বলে - কী সব যা-তা বলছিস? জোয়ার-ভাটা নিয়ে যেমন নদীর চলাচল, মেঘবৃষ্টি নিয়ে যেমন আকাশ তেমনই উত্থান-পতন নিয়েই তো মানুষের জীবন। সবকিছু মন থেকে মুছে দিয়ে আবার নতুনভাবে জীবন শুরু কর।
শিশির কেবলই মাথা নাড়ে আর একমনে গানের সুর ভাজতে থাকে। ওর দু-চোখে জলের ধারা। গান গাইতে গাইতে ওর গলা ধরে আসে। আসে প্রচণ্ড কাশির দমক। নয়ন ওকে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
পরদিন ওর ঘরে গিয়ে আর ওকে দেখতে পাওয়া গেল না। তিতির বললো - কাল রাতে মায়ের কাছে ঘরের চাবি দিয়ে মাস্টারমশাই বললেন - "চললাম বৌদি, আর কোনোদিন হয়তো দেখা হবে না"। তোমাকেও কী একটা লিখে দিয়েছেন। দেখো।
একটা দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজ। নয়ন কাগজটা সোজা করে দেখলো কয়েকটি মাত্র কথা লেখা - তোদের মনের কথা আমি বুঝি, কিন্তু আমার কিছু করার নেই। 'দুঃখে যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কীসের?'
* * * *
তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শিশির একবার করুণ স্বরে ডাকলো - মনি একবার কাছে এসো। তোমাকে ক'টি কথা না বললে আমি মরেও শান্তি পাবো না।
মনি ওরফে মণিদীপা শিশিরের স্ত্রী। কৃষ্ণনগর ছেড়ে যাওয়ার সময় ব্যান্ডেল স্টেশনে ওদের সাথে দেখা হয়। বাবা-মায়ের সাথে তারাপীঠ যাচ্ছিল পুজো দিতে। ব্যান্ডেলেই ওদের বাড়ি। মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার মার্কস পেয়ে পাশ করে মণিদীপা। পুজো দেওয়ার উদ্দেশ্য সেটাই।
গভীর রাতে স্টেশনে পৌঁছে প্ল্যাটফর্মের এককোণে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে ছিল শিশির। বিগত মাস তিন চার ধরে তার শরীর ও মনের ওপর যা ধকল গেছে তার ওপর রাত্রি জাগরণ এবং অনাহার। উঠে দাঁড়াবার শক্তিই ছিল না। দমকে দমকে কাশি এবং শ্বাসকষ্ট - এতক্ষণ যে কোন অদৃশ্য শক্তি ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। ওইরকম একটা মানুষকে দেখে মণিদীপা ওর বাবা-মাকে কিছু একটা করতে বলে। বাবা রাজি হলেও মা প্রথমে মেয়েকে একটু ধমক দিয়ে বলেন - মনি, তোর যত বাড়াবাড়ি। আমরা একটা শুভকাজে যাচ্ছি এর মধ্যে এসব উটকো ঝামেলা ভালো লাগে না। চল আমাদের ট্রেন এসে গেছে।
মনি বলে - মা, তুমি তো একজন সত্যিকারের মা। একবার ভেবে দেখো তো আমরা জ্যান্ত মানুষকে উপেক্ষা করে যাচ্ছি পাথরের মূর্তির আরাধনা করতে। এতে কী দেবতা সন্তুষ্ট হবেন? বাবা, তুমি একটু মা-কে বুঝিয়ে বলো না।
একমাত্র মেয়ের যুক্তির কাছে ওদেরকে হার মানতে হয়। তারাপীঠ যাওয়া স্থগিত রেখে বিনয়বাবু একটা গাড়ি ডেকে স্টেশনের দু'জন মানুষের সাহায্যে শিশিরকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। ডাক্তারবাবু এসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালেন - ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস। মারাত্মক রকমের ইনফেকশন হয়ে গেছে। কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভালোমন্দ পথ্য পড়লে খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। কোনো চিন্তা নেই।
বিনয়বাবুর ইমারতি কারবার। টাকা পয়সার চেয়ে একজন মানুষের প্রাণের মূল্য তাঁর কাছে অনেক বেশি। মেয়ের জন্মদিনে প্রায় দুই শতাধিক অনাথ শিশুদের পেট পুরে খাওয়ান এবং ভালো ভালো পোশাক পরিচ্ছদ দান করেন। এছাড়া পয়লা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, বড়দিন ও নানা অনুষ্ঠানে দানধ্যান করেন। টাকার অভাবে কোনো মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না কিংবা কারও শীতবস্ত্র নেই, কারও ঘর সারাবার টাকা নেই, ডাক্তার দেখানো কিংবা ওষুধ কেনার টাকা নেই। তাদের জন্য বিনয়বাবু আছেন।
শিশির আগের থেকে অনেক ভালো আছে। মাঝে মধ্যে চার্চে যায়। কখনও কখনও গঙ্গার পাড়ে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। পুরোনো গানের সুরগুলো স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। যেগুলো মনের গোপন কুঠুরিতে সুপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। সুমিষ্ট স্বর হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইলেও সেগুলো ভেতরেই চাপা থাকে। শবনমের ভালোবাসার সাথে সাথে ওর গানও চলে গেল! সেটাই তো স্বাভাবিক। সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র সে নয় তাকে এই যুদ্ধে জিততেই হবে।
মাস তিনেক পরে একদিন বিকেলে বিনয়বাবু, তার স্ত্রী এবং কন্যাকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে সাংসারিক আলোচনায় ব্যস্ত আছেন এমন সময় রবীন্দ্র সঙ্গীতের একটা কলি ভেসে এলো - "আজি বিজন ঘরে, নিশীথ রাতে, আসবে যদি শূন্য হাতে, আমি তাইতে কী ভয় মানি জানি জানি বন্ধু জানি, আছে তো হাতখানি... আজি..."
- আহা! কী সুমিষ্ট স্বর। কে গাইছে গো? দেখো তো বাইরে বেরিয়ে...
হ্যাঁ। শিশিরের কণ্ঠে সেই ভুবনমোহিনী স্বর। শেষের দুটি লাইন বড়ো চমৎকার - "জীবন দোলায় দুলে দুলে আপনারে ছিলেম ভুলে, এখন জীবন মরণ দু'দিক দিয়ে নেবে আমায় টানি জানি... আজি..."
ঘরের একটা কোণে বসে শিশির চোখ বন্ধ করে গান গাইছে আর দু'গাল বেয়ে অশ্রুধারা নেমে আসছে। সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। এ তো বিরল প্রতিভার অধিকারী।
- হ্যাঁ রে বিনয়। বিরল প্রতিভাই বটে!
- দিলীপদা তুমি?
- হ্যাঁ, আমাকেই আসতে হলো। কেন জানিস? ওই যে, ওই হতভাগা আমারই ছাত্র। ওর খোঁজে...
বিনয়বাবুর ঘোর কাটতে বেশ খানিকটা সময় লাগলো। দিলীপবাবু বিনয়বাবুর পিসতুতো দাদা। বোলপুরে থাকেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতের দিকপাল বললেও কম বলা হয়। তাঁর মুখ থেকে শিশিরের জীবনের কাহিনি শুনে ওরা হতবাক হয়ে যায়। এইটুকু বুকে এত কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছে ছেলেটা?
মণিদীপা গান শুনতে ভীষণ ভালোবাসে। শিশিরের গান শোনার জন্য সন্ধ্যার পর পর-ই ওর ডাক পড়ে। বিনয়বাবুও দোকান বন্ধ করে চলে আসেন। কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়িতে একটা ডবল রিডের ক্লাসিকাল হারমোনিয়াম এসে যায়। সেবার ওদের পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপনের দিন শিশিরই প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। সাড়ম্বরে রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপিত হয়। শিশিরের গান উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীকে মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ করে দেয়। ব্যান্ডেলের একটা ক্ষুদ্র পল্লী থেকে শিশির আকাশবাণীতে পৌঁছে যায়।
দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে যায়। মণিদীপা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, শিশির বিভিন্ন জায়গায় গান গেয়ে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে। হঠাৎ একদিন মণিদীপা বিনয়বাবুকে বলে - বাবা আমি শিশিরকে আমার কাছে রাখতে চাই।
- হ্যাঁ, ও তো আমাদের কাছেই আছে।
- জানি বাবা। আমি কী বলতে চাইছি তুমি ঠিক বুঝতে পারোনি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।
হঠাৎ মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেলেন।
- শিশির সুস্থ নয় মা। তুমি জানো ওর শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কথা। তবুও...
- শারীরিক সমস্যা কার নেই বাবা? তাছাড়া ওর মতো একটা গুণী মানুষ দীর্ঘদিন আমাদের বাড়িতে আছে। আমরা ওকে খুব কাছ থেকে দেখছি এর পরেও তুমি চিন্তা করছ বাবা? তোমার মতো একজন মানুষ...
- ঠিক আছে মা। আমি একটু ভেবে দেখি। তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলি, তাঁর মতামতও নেওয়া প্রয়োজন।
তারপর দীর্ঘ বাইশ বছরের সাংসারিক জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে - মা-বাবার চলে যাওয়া, দু-দুটি সন্তানের আগমন, ব্যবসা, শিশিরের জাতীয় পুরস্কার, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, সর্বোপরি শিশিরের অসুখের বাড়াবাড়ি - সবটাই নিজের হাতে সামলেছে মণিদীপা। শিশির যে তাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে না সেটা সে জানে। কিন্তু কখনও অসম্মান করেনি।
- কোথায় কষ্ট হচ্ছে, বলো।
- কষ্ট আমার সারা শরীর এবং মনে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি আর বেশিক্ষণ বাঁচবো না মনি।
মনি শিশিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। শিশির বলতে থাকে - গত মাসে দিল্লির অনুষ্ঠানটা আমি শেষ করতে পারিনি। কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়ে। আয়োজক সংস্থার ছেলেগুলো আমাকে এইমস-এ নিয়ে যায়। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে জানান - ফুসফুসের ক্যান্সার... লাস্ট স্টেজ। চিকিৎসা করে কোনো লাভ নেই। আমাকে ক্ষমা কোরো, মনি। আমি বড়ো স্বার্থপর। নিজের স্বার্থের জন্য তোমাকেও উপেক্ষা করেছি। শুধু একবার ওই গানটা শোনাবে?
- কোনটা?
- "সেই তানপুরা আছে..."
শিশিরের অনুরোধে কান্নাভেজা গলায় গান ধরে মণিদীপা। গান শেষ হবার আগেই শিশিরের নিথর দেহখানি একপাশে ঢলে পড়ে। ওর মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে মনি।
গানের কলিটা তখন বাড়ির দেওয়াল ভেদ করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে - হয়তো বা শবনমের বুকে করুণ আর্তনাদ হয়ে...
