গল্প ও অণুগল্প

গর্ভধারিনী



পম্পা সেনশর্মা


"মা'র ট্রেন ক'টায় স্টেশনে পৌঁছচ্ছে গো?"

"ন'টা দশ।"

"কেন আনতে যাবে?"

"যাব না? তোমার কি মনে হয়? শৌণক অবাক হয়ে বলে।"

শ্রেয়সী স্বাভাবিকভাবে বলে, "বলতে পারলাম না। না গেলে টোটো নিয়ে আসতে বলতাম।"

"না, না। আমি গাড়ি বার করতে বলেছি। শোনো একটা দরকারী কথা আছে।"

"এখন সময় নেই। বাবা চা চেয়েছেন।" শ্রেয়সী তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে যায়। স্বামী-স্ত্রীর কেজো আলাপ বন্ধ হয়।

"বৌমা চা-টা হল?" শাশুড়ি অমলার চিৎকার শোনা যায়।

"হ্যাঁ মা, এই যে দিচ্ছি।"

"যখন চাই তখনই দাও না কেন? কি যে করো বুঝি না। যাই হোক, তোমার মা আসছেন তো?"

"হ্যাঁ..." শ্রেয়সী আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়ে।

"কোন ঘরে থাকবেন উনি?" অমলা চিবিয়ে চিবিয়ে প্রশ্ন করেন।

"আপনাদের পাশের ঘরটায়।" শ্রেয়সী মুখ নিচু করে উত্তর দেয়।

"বোনের বাড়ি আর ভালো লাগলো না বুঝি? রাজুটাকে অফিস যাওয়ার আগে আবার স্টেশনে যেতে হবে। আচ্ছা বৌমা, তোমার মা'র তো আর আমার মতন অত হাড়ে ব্যথা নেই। রাজুকে যেতে হবে কেন?" অমলা মনের ঝাল উগরে দেন।

"সেটা ওকেই জিজ্ঞাসা করে নিন না মা, আমি তো যেতে বলিনি।" কথা ক'টা বলে শ্রেয়সী করুণ মুখে ঘর থেকে বেরোতে অমলার চাপা গলার স্বর শোনা যায়, "বলনি আবার? না হলে এমনি এমনি যাচ্ছে!" শ্বশুর উপেনের মুখে কুলুপ, হাতে চায়ের কাপ। মেয়েটার জন্য তাঁর মন কাঁদে, তবু তিনি সংসারের ঝামেলা এড়াতে চুপ করে থাকার অস্ত্রটাই বেশি প্রয়োগ করেন। তাও শুনতে হয়, 'তুমি কি কিছুই দেখ? না না শোনো না?' কমলা উপেনকে হাতের কাছে পেয়ে তার উপরে বাক্যবাণ প্রয়োগ করেন।

'হ্যাঁ গো শুনছি। দেখছিও।' উপেন যে দেওয়াল নন, মানুষ তার প্রমাণ দেন। এই এক লোক, খালি উল্টোপাল্টা কথা। অমলা উপেনের উত্তরে অখুশি হয়ে কপাল চাপড়ান। তারপর রান্নাঘরে খোঁজখবর নিতে যান। রান্নাবান্না সব হয়েছে তো? শ্রেয়সীকে দেখতে না পেয়ে মালতির কাছে খোঁজ করেন।

"এই তো উচ্ছে, মাছের ঝাল, চাটনি বৌদি সব করে গেছে। ভাতও এই নামলো বলে।"

"তোর বৌদি কোথায় রে?"

"দাদার জামা প্যান্ট বার করে দিতে আর টিফিন দিতে ওপরে গেল। যেমন রোজ করে গো।"

"টিফিন দিতে গেল না কানে মন্ত্র দিতে গেল, জানি না বাবা।"

মালতি এক নিমেষ অমলার দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। এখনি বকা খেতে হবে বাবা, দরকার নেই। পরের ঝামালি। তার চেয়ে ডানিং টেবিলটা মুছে টুছে থালা গেলাসটা ধুয়ে দিই বাবা।

শৌণক খেতে বসে। অমলা সামনে বসে ছেলেকে সাবধান করেন - "সাবধানে যাবি। ট্রেন যদি এসে যায়, তাড়াহুড়ো করবি না মোটে। তোর অফিসে দেরি হবে না তোরে রাজু?"

"না, না ট্রেন টাইমে এলে কোনো অসুবিধা নেই। আর ট্রেন লেট হলে হারানদাকে বলে দিয়েছি, নিয়ে আসতে। আমি ক্যাব নিয়ে চলে যাব।" খেতে খেতে মা'কে জানায় শৌণক।

"ও সব প্ল্যান করা আছে।" অমলা টিপ্পনী কাটেন।

শৌণক চুপচাপ খেয়ে চলে। অমলা ভাবেন বাবার ধারাটা ভালোই পেয়েছে ছেলে।

শৌণক বেরিয়ে গেলে শ্রেয়সী ফাঁকা ঘরটাতে বিছানায় চাদর পাতে, বালিশের ওয়ার পাল্টায়। মুখে হাসি নেই। আসলে নিজের দুঃখ তবু মেনে নেওয়া যায়, মা'কে ব্যথা দিতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু ওই যে উনি, ওনার তো সকলকে হার্ট না করলে দিনই কাটে না। নাহ্, ভেবে লাভ নেই। শ্বশুর-শাশুড়িকেকে জলখাবার দিতে যায় শ্রেয়সী। ভাবে, মা এলে ও আর মা একসঙ্গে খাবে। মালতি তো সকাল ছ'টা থেকে পরিশ্রম করছে। শ্রেয়সীকে কেউ একটু ফেভার করলেই অমলার সমস্যা। মালতিকে এই একটা কারণে উনি একদম দেখতে পারেন না।

প্রায় আধঘন্টা পর ওপরের বারান্দায় উঠতে যাবে শ্রেয়সী, এমন সময় গাড়ির চেনা হর্ণ। ও ভাবে, যাক - তবু একদিক সামলে গেছে। ট্রেন ঠিক সময়ে এসেছে। অনুপমা এসেই আগে শ্রেয়সীর শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরের সামনে যান।

"কেমন আছেন দিদি? দাদা?"

শাশুড়ির মুখে জটিলতা আঁকা। শ্বশুরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই শ্রেয়সীর। উনি হেসে বলেন, "আসুন, বেয়ান বসুন। বৌমা চেয়ারটা এগিয়ে দাও। শরীর ভালো তো?"

অনুপমা কমলার হাতে মিষ্টির বাক্সটা দেন। যাক বাবা, মা কিছু বুঝতে পারেনি। মনে মনে ও শ্বশুরকে ধন্যবাদ দেয়। শাশুড়িও যে মা'র প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় কাত করেছেন এটাই অনেক। কি আর বলবে ও?

মায়ের মুখ-হাত ধোওয়া হলে ও ফাঁকা ঘরটাতে মা'কে নিয়ে যায়। জলখাবার খায় দুজনে। বোনের খবর নেয়। শ্রেয়সীর অভিনয় দেখে মা'র মনে ওর জন্য দুশ্চিন্তা বুঝি দূর হয়। এক ফাঁকে মালতি আসে। অনুপমাকে 'বড়মা' বলে ডাকে ও।

বলে, "বড়মা, তুমি ভালো আছো? এবারে কিন্তু আগের বারের চেয়েও বেশি দিন থাকবে। তুমি থাকলে আমার খুব ভালো লাগে।" অনুপমাও কুশল বিনিময় করেন। মেয়েটা সত্যি তাঁকে খুব ভালোবাসে।

শ্রেয়সীকে জিজ্ঞাসা করেন, "হ্যাঁ রে শৌণক আগের মতন আটটার মধ্যেই ফেরে?"

"হ্যাঁ মা।" উত্তর দেয় শ্রেয়সী।

দুপুরবেলা শ্রেয়সী শ্বশুর, শাশুড়ি আর মা'কে খেতে দেয়। অনুপমা ওর সঙ্গে খাবার মৃদু বায়না করলেও আভাসে হয়তো কিছু বোঝেন। তাই আর জোর করেন না। শাশুড়ির মুখে একটাও কথা নেই, যেন কত মন দিয়ে খেয়ে চলেছেন। মুখে গর্বের ভাবটি আঁকা ষোল আনা। শ্রেয়সী চুপচাপ লক্ষ্য করে। কাউকে অপছন্দ, সে কথা না বলেও যে বোঝানো যায় - তা অমলাকে দেখে যে কেউ বলে দেবে। এর ফাঁকে অবশ্য মা'কে জিজ্ঞাসা করা হয়ে গেছে, "ছোট মেয়ে ক'দিনের জন্য ছাড়লো দিদি?" শ্বশুর যারপরনাই মিষ্টি হাসি দিয়ে ম্যানেজ দিচ্ছেন।

শ্রেয়সী সবার খাবার পরে এসে অনুপমাকে স্তোকবাক্য দেয়। বলে, "মা, সবার খাওয়া ঠিকঠাক হলো কিনা দেখে তারপরে আমি খাই। তুমি কিছু মনে করো না।"

অনুপমা হাসেন, বলেন - "আমি বুঝেছি রে। ভালোই তো।" তারপর মেয়ের সঙ্গে নানা কথার পর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন। শ্রেয়সী ভাবে, এতটা ট্রেন জার্নি করে মা ক্লান্ত। ও-ও ঘুমিয়ে পড়ে।

অনুপমা কিন্তু জেগে থাকেন। ঘুম আসে না। মনে মনে ভাবেন, মেয়ের কাছে ওনার ঘুমের অভিনয় নিশ্চয় ধরা পড়েনি। ওনার শ্রেয়সীকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, তোর গান, তোর কবিতা লেখার খাতা? বলতে ইচ্ছা করে, তোকে যে আমি খুঁজে পাচ্ছি না রে শ্রেয়সী। তোর অভিনয়কে সার্থক করার জন্য আজ আমাকে যে অনেক অভিনয় করতে হলো রে। তোর মুখের করুণ হাসি, চোখের কালি, সবার মন জুগিয়ে চলার অসম্ভব প্রচেষ্টা আর আমার মনে শান্তি দেবার ব্যর্থ প্রয়াস - আমার কাছে লুকোনো থাকেনি রে। তোর সংসারে আমার ইন্টারফেয়ার করার দরকার নেই। কিন্তু স্বাভাবিক আবেগকে চেপে রাখি কি করে বলতো মা? অনুপমার অসময়ে চলে যাওয়া স্বামী সুহাসের বড় আদরের বড় মেয়েকে বুকে চেপে ধরতে ইচ্ছা করে, ছোটবেলার মতন বলতে ইচ্ছা করে, আমি আছি তো রে বুড়ি। চোখের জলে সব ঝাপসা হয়ে যায়। এবার সত্যি সত্যিই ট্রেনের ক্লান্তি, মনের কষ্ট সব মিলিয়ে অনুপমা ঘুমিয়ে পড়েন। আর স্বপ্নে দেখতে থাকেন, তাঁদের দু'পাশে তাঁদের হাসিখুশি দুই মেয়ে শ্রেয়সী আর আত্রেয়ী। অলীক - তবুও শান্তির ঘুম ঘুমোন অনুপমা।