শিউলি। নামের মতোই একসময় ছিল নির্মল, সাদা-কমলা রঙের হাসি আর প্রাণ। ছোটোবেলায় তার মুখে ছিল সারাক্ষণ ঝলমলে আলো - পাড়ার সবাই তাকে আদর করত, কোলে তুলে খেলত, আর বলত -
"এই মেয়ে, একদিন বড় হয়ে অনেক বড় কিছু হবে!"
কিন্তু সেই আলোর আড়ালেই শিউলির জীবন ছিল অন্ধকারের ঘন কারাগার। অল্প বয়সেই সে শিখে ফেলেছিল সব আদর মধুর হয় না, সব স্পর্শ স্নেহের হয় না। তার জীবনের দুইজন খুব কাছের মানুষ, যাদের কাছে সে নিরাপত্তা খুঁজত, তারাই নীরবে তার শৈশবকে ভেঙে টুকরো টুকরো করেছিল।
প্রথম প্রথম শিউলি বুঝত না - এটাকে আসলে কী বলা হয়। শুধু জানত এতে তার ব্যথা হয়, শরীরে আর মনে এক অদ্ভুত অস্বস্তি জমে যায়। স্নেহের ছদ্মবেশে এই অত্যাচার চলত গোপনে, এতটাই গোপনে যে কেউ সন্দেহও করত না।
একদিন সাহস করে সে খালাম্মাকে বলেছিল, কাঁপা কণ্ঠে -
"খালা, আমি ভয় পাই, তারা আমায় কষ্ট দেয়।"
খালাম্মা তখন গম্ভীর হয়ে তাকিয়েছিলেন, তারপর হালকা বিরক্তির স্বরে বলেছিলেন -
"এসব বাচ্চাদের বানানো গল্প! কারও নামে বদনাম করিস না।"
সেই মুহূর্তে শিউলির ভেতরটা যেন ভেঙে গেল। সে বুঝে গেল তার পক্ষে কেউ নেই।
বছরের পর বছর এভাবেই কেটে যায়। বাবা-মা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকেই খালার বাড়িই তার আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয়ই হয়ে উঠেছিল নরক। রক্ষকই যেন ভক্ষক হয়ে উঠেছিল। প্রতিদিন রাতে শিউলি মনে মনে প্রার্থনা করত -
"তারা যেন খুব তাড়াতাড়ি একদিন মরে যায়, যেন আমি বেঁচে যাই।"
শিউলির একসময়ের চঞ্চল স্বভাব হারিয়ে যায়। সে হয়ে ওঠে নীরব, নিশ্চুপ, যেন নিজের ভেতরে গুটিয়ে যাওয়া এক ছায়ামূর্তি। তবুও বয়সের সাথে সাথে তার শরীরে শক্তি আসে। এতটাই শক্তি যে একদিন সে জানে - এবার সে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। কৌশলে, নানা বাহানায় সে নিজেকে তাদের থেকে রক্ষা করে চলতে থাকে।
সময় গড়িয়ে শিউলি বড় হয়, পড়াশোনা শেষ করে নার্সিং প্রশিক্ষণ নেয়। সরকারি হাসপাতালে চাকরি পেয়ে সে নিজের মতো করে নতুন জীবন গড়ে নেয়। কিন্তু পুরুষ জাতির প্রতি তার ঘৃণা রয়ে যায় সমুদ্রের মতো গভীর। সে কাউকে বিশ্বাস করে না, কাউকে কাছে টানতে চায় না।
একদিন ডিউটিরত অবস্থায় ওয়ার্ডে ঢুকে শিউলি দেখল একজন নতুন রোগী এসেছে। মেডিক্যাল ফাইল দেখে সে থমকে গেল। এ তো সেই মানুষ যে একসময় তার শৈশব চুরি করেছিল।
রোগী এখন দুরারোগ্য রোগে ভুগছে, বুকে শ্বাসকষ্ট, চোখে ভয় আর অনুনয়ের ছাপ। শিউলি পেশাদার ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে তার হাতে ইনজেকশনের জন্য ক্যানুলা লাগাচ্ছিল। হঠাৎ রোগী দুর্বল কণ্ঠে বলল -
"শিউলি… আমি…!"
শিউলির হাত চেপে ধরল সে, কণ্ঠ কেঁপে উঠল -
"ক্ষমা কর আমাকে… বাঁচাতে পারিস?"
শিউলির মনে হল - এই মানুষটার মুখে থুতু ছুঁড়ে মারে। কিন্তু খালাম্মা ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে। সে কিছু না বলে হাত ছাড়িয়ে নিল, নিজের দায়িত্ব শেষ করে সোজা রুমে চলে এল। জানালার পাশে এলোকেশী বসে সে ভাবতে লাগল -
"একদিন আমিও তার কাছে আকুতি করেছিলাম, তার খারাপ স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু সেদিন সে তো আমাকে ছাড়েনি। আজ কেন আমি ছেড়ে দিলাম? কেন? কেন?"
চোখের কোণে জমে থাকা বহু বছরের কষ্ট গলে গলে গাল বেয়ে নেমে এল যেন বৃষ্টি হয়ে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফোন তুলতেই ওপাশে খালাম্মার গলা -
"মা, খুব কষ্ট হচ্ছে তোর খালুর, মনে হচ্ছে এই বুঝি জানটা বের হয়ে যাবে। বারবার তোর কথা বলছে। তোর কাছে ক্ষমা চাইছে, তুই আয় মা! প্রস্রাবের থলি রক্তে ভরে গেছে!"
শিউলি ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি টেনে বলল -
"ঠিক আছে, আসছি।"
ফোন রেখে সে নিজেই মৃদু স্বরে মনে মনে বলে উঠলো -
"মানুষ হয়তো ছেড়ে দেয়, কিন্তু প্রকৃতি কখনো ছাড় দেয় না।"
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল শিউলি। জানালার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো শিউলি ফুল ভেসে এল, মেঝেতে পড়ে থাকল। শিউলি তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল, দীর্ঘদিনের নীরব প্রতিশোধের সাক্ষাৎ নিতে।
