।। ২ ।।
হিগস বোসন (Highs Boson) কণার ধারণাটি যত সহজ ছিল, তাকে খুঁজে পাওয়া ছিল তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কঠিন কাজ। বড় জটিল যন্ত্র বিজ্ঞানের সাহায্যে তার অস্তিত্ব জানা গিয়েছে। মহাজাগতিক রশ্মির কণামাত্র অংশ পথ পরিক্রমা করে আমাদের পৃথিবীকে স্পর্শ করে যায়। অথবা তার পাশ দিয়ে চলে যায় অনন্ত পথের দিকে। এই সমস্ত আলো এবং তরঙ্গ ধরতে পেরে বেশ কয়েক জাতের কণা সম্বন্ধে ধারণা হয়েছে অনুসন্ধানীদের। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অনেক প্রকার আলোক কণা যাদের নাম উল্লেখ নেই রসায়ন শাস্ত্রে। তাদের মধ্যে হিগস বোসন কণাকে হিরো বলে মনে করা হয়েছে। যে কিনা মহাবিশ্বকে একটি ছন্দে আটকে রেখেছে। তাহলে ঋষিবর আইনস্টাইন, তোমার কি হবে! m = mc/sq যে বড় বড় বাঁধ নির্মাণ করেছে, তার কি হবে! সেটি ধ্বসে পড়বে?
একি কথা?
ধ্বসে পড়বে মানে? এমনি এমনি ধ্বসে পড়বে?
হ্যাঁ, ঠিক তাই। এমনি এমনি ধ্বসে পড়বে। ওই হলিউডের '2012' সিনেমাটির মতো। কিন্তু কেন? সমস্যাটি বেধেছে তার অনেক আগে।
২০১০ সালে খুঁজে পাওয়া গেছে 'ফিনিক্স' নামের একটি গ্যালাক্সি। পৃথিবী থেকে সাতশো আলোকবর্ষ দূরে। এই বিষম দূরত্ব অতিক্রম করার প্রযুক্তি বোধহয় পৃথিবীবাসী আগামী সাতশো কোটি বছরে আবিষ্কার ও ব্যবহার করতে পারবে না। গ্যালাক্সিটি আয়তনে অনেক গুণ বড় এবং আশ্চর্য এই যে মহাশয়া প্রত্যহ গড়ে দু'শোটি করে নক্ষত্রের জন্ম দিচ্ছেন ও তার চারপাশে গ্রহ, গ্রহাণু, উপগ্রহ ছাইভস্ম সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ কোয়ান্টাম অফ রিলেটিভিটি এবং রিলেটিভিটি অফ প্রবাবিলিটি অনুসারে চলছে তার গঠন পুনর্গঠনের কাজ।
পূর্ববর্তী প্রবন্ধ 'দেহ-মন-বুদ্ধি' (কুবাই/শারদীয়া/১৪১৯ বং/সুভাষ রবিদাস) অনুসরণ করে বলা যায় - পরমাণুর গঠনগত বৈচিত্রে নিউক্লিয়ারকে কেন্দ্র করে ঘুরছে অন্যান্য অনু কণাগুলি। প্রতিটি অনু কণার মাঝে রয়েছে বিস্তর ফাঁক বা ফারাক। এই সমস্ত কণা দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে স্থূল জগৎ। পদার্থ, বস্তু। তাহলে কোনও বস্তুকে নিরেট বলে মেনে নেবার উপায় নেই। প্রেম যে কখনোই খাঁটি হয় না সেটা তো আমরা সবাই জানি। সমস্ত প্রেমে একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন থাকতে হবে। যেখানে মহাবিশ্বে বিস্তর ফাঁক, অনু পরমাণুতে ফাঁক যা দিয়ে পদার্থ জীব জগৎ নির্মিত তবে মনের বিক্ষেপ উৎপন্ন হবে না কেন? সবকিছু এক সূত্রে গ্রথিত।
যদি বলি লোহা নিরেট, সেটা হল ভুল। রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ এই একই কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে সমর্থন করেন আইনস্টাইন। সেই দৃষ্টিতে আকাশগঙ্গা ও ফিনিক্স এর মধ্যে সাতশো আলোকবর্ষ ফাঁক। অর্থাৎ এই ব্রহ্ম জগৎ নিরেট নয়। কিন্তু পুরো ব্রহ্মাণ্ড সদা চৈতন্যময়। একথা বলতে পারি এজন্য যে, সমগ্র ব্রহ্ম জগৎ কম্পন নামক প্রাণসত্তা দ্বারা অনুভূত। কম্পন তরঙ্গ সৃষ্টি করে এবং তরঙ্গ সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডকে ছন্দে ছন্দে বেঁধে রেখেছে। স্যাটেলাইট চ্যানেল থেকে ব্রেকিং নিউজ, সবেতেই এই তরঙ্গের খেলা। আলো সেই তরঙ্গ বেয়ে চলে। এই যে আলো, এই আলো কিন্তু সরলরৈখিক নয়। আলোর চেতনা আছে। কেননা আলোক তরঙ্গ মানে কম্পন অনিবার্য। অনন্ত মহাবিশ্বের কেন্দ্র আর প্রান্ত নির্ণয় করা সম্ভবপর নয়। পুরাণ সাহিত্য বলছে, ব্রহ্ম অবক্ত। অবর্ননীয়। আমি আরও বলি - অনুপম সুন্দর, অবান্তর নয়। শ্রীকৃষ্ণ যখন অর্জুনকে তাঁর বিশ্ব সত্তার রূপ দর্শন করান তখন তিনি বলেন, হাজার বছর তপস্যা করলেও দেবতারা এই রূপ দর্শন করতে সমর্থ হয় না।
- "মশাই আপনি কি! আপনার না আদি আছে, না অন্ত! আর মধ্যই বা কই?" অর্জুনের কথা শুনে কৃষ্ণ বললেন - "ভায়া, আমি পুরুষও না, প্রকৃতিও নই, ক্লীবও নই, জড়ও নই, অজড়ও নই, আমি সর্বব্যাপী চৈতন্য।" হ্যাঁ, এই চৈতন্যের কথাই বলছিলাম এতক্ষণ ধরে।
এখানে পুরূষ হল স্থূল আর প্রকৃতি হল গতি। শক্তিকেই পদার্থবিজ্ঞানে এনার্জি বলা হয়েছে। শুক্র গ্রহ স্থূল গতি হল তার অস্তিত্ব। কণাও তাই।
শঙ্খের ভিতর ফুঁ দিলে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাতে কয়েক প্রকার তরঙ্গ থাকে। এই তরঙ্গ কিছু অণুজীব সহ্য করতে সক্ষম নয়। এই তরঙ্গই চৈতন্য।
বস্তু যে সলিড বা নিরেট নয় সে কথা আগেই বলেছি। লোহা হোক বা সোনা কিংবা কোনও প্রাণশক্তিযুক্ত জীব। এ বিষয়ে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথ উভয়ে মিলে আলোচনা করেছেন।
আইনস্টাইন বলছেন - "আপনি কি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন দিব্যসত্তায় বিশ্বাস করেন?" তিনি যেটি বলতে চান, ঈশ্বর বা দেবতার অস্তিত্বে কবিগুরু বিশ্বাস করেন কিনা।
রবীন্দ্রনাথ - "ঠিক বিচ্ছিন্ন নয়, ব্রহ্মাণ্ড মানুষের অনন্ত ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিধৃত। এমন কোনও কিছুই থাকতে পারে না যা কি না মানব-ব্যক্তিত্বের অধীন নয়, আর তা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, ব্রহ্মাণ্ডের সত্যও মানবীয় সত্য-ই।"
এখানে রবীন্দ্রনাথ এও বলছেন, কিভাবে ইলেকট্রন, প্রোটন জড় পদার্থ গঠন করে তবু তাদের মধ্যে থাকে নিরন্তর ফাঁক। তাঁর কথায়, "ঠিক একইভাবে, ব্যক্তি হিসেবে আমরা গোটা ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, এই ব্রহ্মাণ্ড এক মানবীয় ব্রহ্মাণ্ড। শিল্প, সাহিত্য এবং মানুষের ধর্মীয় চৈতন্যের মধ্যে আমি এই ভাবনাকেই অনুধাবন করেছি।"
(ক্রমশ)
