বিবিধ

খাল-বিলের আখ্যান (দ্বিতীয় খণ্ড - নবম পর্ব) [ধারাবাহিক]



মমতা বিশ্বাস


একটা ফোন এসেছিল। আননোন নাম্বার। কল ব্যাক করায় বাবলা ধরল।

দি, বাবার সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে। NRS-এ নিয়ে আসছি। মা খুব ভেঙে পড়েছে। তুই আয়।

এখন কোথায় তোরা?

বারাসাতে গাড়ি ঢুকছে।

ঠিক আছে। এখনই রেডি হয়ে বেরুচ্ছি। তোদের আগেই পৌঁছে যাব। এমার্জেন্সির সামনে থাকব।

কুন্তী ফোন, এটিএম কার্ড, জলের বোতল ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এই সময় দমদম থেকে ট্রেনে ওঠা অসম্ভব। ক্যাব বুক করে ওভার ব্রিজের নীচে এসে দাঁড়াল। মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হল। মিছিল থাকায় অসম্ভব যানজট। কতক্ষণে পৌঁছাতে পারবে তার ঠিক নেই। পিসির জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে। দোলের সময় তিন দিনের ছুটিতে রিনিপিসির কাছে কুন্তী কাটিয়ে আসে। সেইসময়ে কত বিষয় যে আলোচনা হয়েছে তার ইয়ত্বা নেই। পিসেমশায়ের ভালোমন্দ একটা কিছু হয়ে গেলে, রিনিপিসি খুব ভেঙে পড়বে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কতটা দুর্বল পিসেমশায়ের প্রতি। সবকিছুতে খুঁত ধরা পিসেমশায়ের হ্যাবিট হয়ে গেছিল। পিসি গুরুত্ব দিত না। আসলে বুঝে গেছিল প্রতিবাদ করলে শুধুই ঝগড়া হবে। সংসারে শান্তি বজাই রাখতে হলে, নীরবতায় শ্রেয়। রাগ দুঃখ অভিমান - সবই হয়েছে, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেছে। সেবা-যত্নের খামতি কখনো হয়নি। কুন্তী পিসিকে জিজ্ঞাসা করেছিল,

তুমি, পিসেমশাইকে ভীষণ ভালোবাসো বলেই এত সহ্য কর - তাই না?

ভালোবাসা কী পরিমাপ যোগ্য? বলতে পারিস দায়িত্ব বোধের সঙ্গে ভালোবাসা থাকলে এমনটা করা যায়। তারপর অভ্যাসও হয়ে যায় কিছুটা। আচ্ছা তুই কখনো কাউকে ভালোবাসিস নি?

বেসেছি তো?

আমাকে বলিসনি কেন খুকি? শক্ত করে গাঁটছড়া বেঁধে দিতাম। যাযাবরীর মতো ঘুরে বেড়াতিস না!

ওমা! তুমি জানো না কাকে আমি খুব ভালোবাসি? বলে পিসির গলা ধরে বলে, 'তোমাকে'।

ধ্যাৎ! কী যে করিস না তুই! প্রেমে পড়িসনি কারো?

ভেবে বলতে হবে। তবে এটা ঠিক, আমার প্রেমে অনেকে পড়েছে। ধরে নাও পাঁচ-ছয় জন তো হবেই। আমি তোমার মতো পারতাম না বলেই ওদিকটা মাড়াইনি। একটা জিনিস আমার মনে হয় পুরো অধিকারের আগে পুরুষের এক মূর্তি। পরে সেটা পালটে যায়। মেয়েরা বেশি ভাবে নিরাপত্তা নিয়ে। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের হিসেব সম্পূর্ণ আলাদা। একচুলও সহ্য করবে না।

এই যে সহ্য করছে না বলেই অনু পরিবার পরমাণুতে গিয়ে ঠেকছে। একাকী! নিঃসঙ্গ! তারপর মানসিক অসুস্থতা। কী লাভ তাতে? তার থেকে এই ভালো নয় কী? ছেলে সম্পর্কে একটা কথায় বলেছিল, "ঠাকুর গড়তে চেয়েছিলাম, হয়ে গেছে বানর। সন্তান তো! ফেলে দেওয়ার নয়।"

পিসি বনবিবিতলা ঘুরিয়ে নিয়ে এসেছিল। সেদিনের উজ্বল স্মৃতি চোখ বন্ধ করলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। গাটরা গ্রামের মাঠের মধ্যে পলদার ধারে বনবিবিতলা। বটবৃক্ষের আচ্ছাদন ভেদ করে সূর্যালোক প্রবেশ করতে পারে না। কত বয়স, স্থানীয় মানুষদের অজানা। মূল গাছ মরে গেছে। ঝুর নামিয়ে বিস্তার ঘটিয়েছে অনেকটা এরিয়া জুড়ে। পাঁচ/ছয় বিঘে তো হবেই। লকডাউন পর্বে বনবিবিতলার পরিচিতি ঘটেছে। বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেমন পরিকল্পিতভাবে বটবৃক্ষের বিস্তার ঘটানো হয়; আর এখানে প্রাকৃতিক ভাবে বিস্তার ঘটেছে। পিকনিক স্পট হিসেবে বিস্তর নাম করেছে। পলদা এখানে খালের মতো বয়ে যাচ্ছে। ওপারে কুলতলা। পলদা বিল/খালের মালিকানা ব্রিটিশ আমল থেকে হাত বদল হয়েছে বারবার। বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে (১৯২৮ খ্রিঃ) জমিদার চেৎলাঙ্গিয়ারা ডাঙনার গোলাম হোসেন ও গাটরার আশুতোষ তরফদারকে দশ আনা ছয় আনা ভাগে জলকর আদায়ের জন্য লিজ দেন। এখন রাজনৈতিক ক্ষমতাবানেরা অধীর। হাতের পিছের মতো চওড়া খয়রা আর পাওয়া যায় না। তখন বান-বর্ষায় এত মাছ হত - খাওয়ার মানুষ কোথায়! এখন সার, ওষুধ দিয়ে চাষ করেও চাহিদা মতো মাছ জোগান দিতে পারছে না। পলদার তীরে বনবিবিতলায় শীতে তিনদিনের বাউলমেলা হয়। কুয়াশা জড়ানো হলুদ সর্ষেক্ষেত উত্তুরে হিমেল হাওয়ায় মাথা দুলিয়ে স্বাগত জানায়। এতকথা বলেছিলেন নূপুরের বাবা। বনবিবি তলা থেকে নূপুরদের গ্রামের বাড়ি ময়দানপুর কালীবাড়ি হয়ে ফিরেছিল, তারা।

উবের হাসপাতালের গেটে থামতেই কুন্তীর ভাবনায় ছেদ পড়ে। অনলাইন পেমেন্ট করে বাবলাকে ফোন করে।

কতদূর তোরা? আমি এমার্জেন্সির সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

আমরা এসে গেছি।

ভর্তি পর্ব শেষ হতেই জুনিয়র ডাক্তারদের টিম তৎপর হয়ে ওঠে। স্যালাইন লাগিয়ে ইনজেকশন দেওয়া হল। বেডে দেওয়ার আগে MRCP, ব্লাড টেস্ট, মাথার ছবি - একের পর এক করানোর জন্য হাসপাতালের এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং - এ ছোটাছুটি করতে হল। পেশেন্টের অবস্থা স্থিতিশীল। ২৪ ঘণ্টা না কাটলে ডাক্তারবাবুরা খুব একটা আশা দিতে পারলেন না। কুন্তী পিসিকে নিয়ে দমদমে ফিরে এল। ভোররাতে বাবলা জানালো, "বাবার অবস্থা খুব খারাপ, মাকে নিয়ে চলে আয়"।

ওরা পৌঁছানোর আগেই লালবাবু ইহজগতের সব হিসাব চুকিয়ে পাড়ি জমিয়েছে পরলোকের পথে। রিনিদিদিমণি খুব একটা কান্নাকাটি করল তা নয়; তবে চুপ হয়ে গেল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি কথাও বলছেন না। অনেকটা যান্ত্রিক ভাবে সমস্ত কাজকর্ম মিটে গেল।

দোলের মধ্যে দেখা বাবলার সঙ্গে এই বাবলার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছে না, কুন্তী। পিসেমশাই চলে যাবার পর রিনিপিসির দায়িত্বশীল অভিভাবকের ভূমিকায় বাবলাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। ড্রাগ নিয়ে চুর হয়ে থাকা সেই বাবলা! আঠারো-কুড়ি ঘণ্টা ঘুম। MBA করে বাড়িতে বসে আছে পাঁচ বছর। এমন ছেলে, অসুস্থ পিসেমশাই। দুশ্চিন্তার ছাপ ললাটে ভাজ ফেলতো না কখনো। হাসিমুখে মরুপথ পেরোনোর ব্রতচারিণী যেন।

রিনিদিদিমণি গ্রাম ছেড়ে বেথুয়াতে আসেন স্বামীর পীড়াপীড়িতে। উনি চাননি তাদের একমাত্র সন্তান গাঁইয়া ভূত হয়ে থাকুক। চেষ্টার ত্রুটি থাকলেও কাট-বেকার হয়ে থাকার যন্ত্রনা নিশ্চয় ছিল। তাইতো, এত জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, 'গ্রাম ছাড়তেই হবে'।

রিনিপিসির যুক্তি ছিল নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সবাই গ্রাম ছেড়ে গেলে; পিছিয়ে পড়া মানুষদের আলো দেখাবে কারা? এগিয়ে নিয়ে যাবে কারা? মুসলিমদের মধ্যে একটা জিনিস দেখা যায় চাকরিসূত্রেই হোক আর রুটি-রোজের জন্যই হোক গ্রাম কেউ ছাড়ে না। কর্মের প্রয়োজনে বাইরে যায় ঠিকই, শেষে গ্রামে ফিরে আসে। হোস্টেলে, মেসে রেখে ছেলে-মেয়ে পড়ায়। মেয়েরা পড়াশোনায় অনেক এগিয়ে গিয়েছে। শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে গ্রামে ফেরার টান কম। এরা মনে করে আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতিগুষ্টি ছেড়ে শহরমুখি হলেই যেন স্বর্গের সুখ।

শিশুকাল থেকে লেপটে থাকা পিসির সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়নি কোনোদিন। পিসি হুট করে এক কাঠ বেকার কে বিয়ে করে নেওয়ায় খুব অভিমান হয়েছিল, বেশিদিন টেকেনি। আসলে, রিনিপিসি হল কুন্তীর আইডল।

বড়ো হয়ে কী হবে প্রশ্ন করলে কুন্তী জবাব দিত, "মানুষ গড়ার কারিগর হব; মানে স্কুল শিক্ষিকা হব। পিসির মতো দিদিমণি হব।"

যদি বলা হত কলেজ শিক্ষিকা নয় কেন? আরো সম্মানের; মাস-মাহিনাও অনেক।"

ছোটোবেলায় সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত না অজ্ঞতার জন্য। চুপ করে থাকত। সাতের দশকের বাম রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কুন্তীর বেড়ে ওঠা।

ছোটোঠাকুরদা হয়ে উঠেছিল বাবা, কাকা, পিসিদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। সাম্যবাদী, শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের বাতাবরণে পরিবারটির মেধা সম্পন্ন ছেলেমেয়েরা শিক্ষা শেষে শিক্ষকতা করার সংকল্প নেয়।

কুন্তীকে ছোটোবেলায় যদি কেউ প্রশ্ন করত কাকে বেশি ভালোবাসিস? মাকে, না - পিসি কে? পিসিকে জড়িয়ে ধরে সটান উত্তর - পিসিকে। তার বয়স বছর না ঘুরতেই ভাই হল। পিসি বি.এ. পাশ করে বেসিক ট্রেনিং নিয়ে চাকরির চেষ্টা করছে। গায়ের রঙ কালো হওয়ায় পাত্রপক্ষ পণের টাকা যা দাবি করছে; কুন্তীর ঠাকুরদার দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। তার স্বাধীনচেতা পিসি বিয়ের পরীক্ষায় বেশ কয়েকবার ফেল করে বেঁকে বসে; পাত্রপক্ষের সামনে আর বসতে পারবে না। তাঁর বিয়ের চেষ্টা যেন না করা হয়। মায়ের কোল ভায়ের দখলে চলে যাওয়ায়, কুন্তী রিনি পিসিকে আঁকড়ে ধরে। তিনি ও পরম মমতায় গড়ে-পিটে মানুষ করে তুলতে থাকেন। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় স্কুল শিক্ষকতার চাকরিটি পায়। কুন্তী সে'বছর অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। স্বামীকে হারিয়ে রিনিদিদিমণি কাকে জড়িয়ে ধরবে - সন্তানকে? নাকি খুকিকে? বুঝে উঠতে পারছে না।

(ক্রমশ)