কবিতা

মহা সময়ের ক্যানভাস ও রক্তকরবী



চিরঞ্জীব হালদার


ফাগুলাল তিনি এক খোদাইকর। বোধহয় সোনাটোনা খোদাই করেন। তার কাছে রোববার বলে আলাদা কোন বার নেই। অথবা রবিবার কোন একটা বার সেটা হয়তো তিনি ভুলে গেছেন। দিন- মাস সর্বোপরি সময় তার কাছে যেন থমকে আছে, শুধু থমকায়নি নিজস্ব নেশা। আমরা জানতে পারি কারাগারের ভেতর যে আর এক কারাগার থাকতে পারে। যদিও যক্ষপুরীতে রোববার আসে সময়ের নিয়মে। প্রত্যেকের কাছে কোনো না কোনো কারাগার দৃশ্যত বা অদৃশ্যত থেকে যায়। আমাদের সংসার সমাজ কিছু নিয়ম নিগড়ে বাঁধা থাকে। আর কারাগার বাঁধা থাকে তার নিজস্ব নিয়মে। যক্ষপুরী এক মহাকারাগার। এর থেকে পালানোর কোন পথ নেই। পরিত্রাণও নেই। তবুও আমাদের ইচ্ছে, সোহাগ, মমতার বাঁধন সব বিদ্যমান থাকে প্রত্যেকের মনের ভিতর। নিজেদের মতো করে। তবু সব রাস্তা বন্ধ। বাসনা, ফুর্তি, ভোগ কামুকতা যদিও সব কারাগারের বাঁধন আলগা হলেই বা সুযোগ পেলেই ফুরুত হতে চায়। মুক্ত মনের কাছে আট ঘন্টার নামমাত্র বাঁধন এক মহা কারাগার। যদি কোনক্রমে মুক্ত হও অতিসংসার নামক এক কারাগার থেকে তুমি আর এক কারাগারে বদ্ধ থাকবেই এটা নিশ্চিত ভবিতব্য। কারাগার তার নিজস্ব নিয়মে অটল থাকে। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে কৈফিয়ৎ।

খাওয়া দেরি হলে কৈফিয়ৎ। জল ত্যাগ করতে করতে তুমি হয়তো কারো মৈথুন মত্ততার ও রসের ছবি কল্পনায় আনছো তাই দেরি। প্রতি পদে পদে তোমার কৈফিয়ত পিছনে যেন লাঠি ধরে পাহারা দিচ্ছে। একেবারে অতন্দ্র। ফাগুলাল যেই কারাগারের থেকে, কাজ থেকে একটু ফুরসুৎ পেল অমনি তার বউ তার চারপাশে আর এক নজরদারি কারাগার তৈরি করল। আজ রোববার একটু মদ খাওয়ার দিন। একটু মজা করার দিন। একটু আত্মবেলেল্লাপনার হিসেবী মহড়া দেওয়ার দিন। তোমার কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়ের বাইরে একটু ছাড়া পেলেই আর এক কারাগার থেকে তীব্র গতিবেগে ছুটে আসবে এতক্ষণ কোথায় ছিলে। কেন দেরি হল। কার জন্য দেরী হলো। এই সরল প্রশ্নে যথাযথ উত্তর না মিললে কর অবধারিত।

এমন আপাত নিরীহ মৌলিক প্রশ্নগুলো আমাদের বিবেকের কাছে ১০০ বছর আগে এই প্রশ্নগুলো নির্ধারিত করে রেখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামক এক মহা দার্শনিকের মগজ থেকে। এযেন জলের সমোচ্চশীলতা নীতি। একটু এদিক-ওদিক হবার জো নেই। ফাগুলাল খোদাই কর আর তার বউ এই প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্র ও তার প্রশ্ন চিহ্ন। ফাগুলালের ভাষায় বনের মধ্যে পাখি ছুটি পেলে উড়তে চায় খাঁচার মধ্যে তাকে ছুটি দিলে মাথা ঠুকে মরে। যক্ষপুরীতে কাজের চেয়ে ছুটি বিষম বালাই। তবে আমাদের সব থেকে উপশম বিশু পাগলের সাক্ষাৎ।

আমাদের জীবনের প্রতিটা বাঁকে বাঁকে প্রশ্নগুলো, অতি প্রশ্নগুলো, নির্ধারিত প্রশ্নগুলো বারবার রক্তকরবীর চরিত্ররা আমাদের মগজে পেরেক ঢুকাতে ঢুকাতে একটা মহা কফিনের রূপ নেয়। কফিন বলাই ভালো কারণ এই কফিন জ্যান্ত মানুষের কফিন। মৃত নয়। সোনার যক্ষপুরীতে সবাই জ্যান্ত। কিন্তু অতি নিয়ম নিগড়ে বাধা। আর এক মহা সংসার। আপনার বাড়ির উলটো দিকে যে অষ্টাদশী বিকেলের বিষন্ন আলোয় চুল আচড়াচ্ছে আর আপনি এক হা করা যুবকের মত তার দিকে তাকিয়ে আছেন সেটা কোন না কোন ভাবে আপনার অর্ধাঙ্গিনী টের পেয়ে যাবে। আর টের পাওয়া মাত্র আর এক মহাশাসকের শাস্তির খাড়া আপনার উপর নেমে আসবে। চারপাশে এক নিষেধের বাঁধন। তবু এক অলিখিত শাস্ত্রী আপনার ভিতর থেকে নিয়ম ভাঙ্গার জন্য যেমন খল বল করে উঠবে আর বাইরে কোথাও পত্নী কোথাও অফিসের বস কোথাও পঞ্চায়েতের প্রধান কোথাও নাম না জানা নেতা ও তার দলবল আপনার উপর যক্ষপুরীর নিয়ম চাপিয়ে দেবে। রক্তকরবীর প্রতিটা লাইনের ভিতর প্রতিটা মাত্রার ভেতর যে প্রশ্ন চিহ্নগুলো ওই মহাদার্শনিক রেখে গেছেন আজ ১০০ বছর পরও তা পূর্ণ দমে বিরাজমান। আপনার আলু থালু ভাবের প্রতি আপনার হাত পা ছাড়ানো কিঞ্চিৎ চরিত্রহীনতার আবেগে ভেসে যাওয়ার প্রবণতার উপর কোন এক হিংসুটনি চন্দ্রা বলে উঠবে"... তরী একদিন ডোবাবে বলে দিলুম তোমার সেই সাধের নন্দিনী।... তবে মরন রসের নে পেয়ালা ভরে"

আজকের সমাজমাধ্যমগুলো যেন এক অন্য যক্ষপুরী। নিস্তারহীন। নিয়ন্ত্রিত। অনিয়ন্ত্রিত। আর একেক জনা হরেক চরিত্র। হরেক মহিমা। হরেক তার প্যা পো। হরেক আমাদের ছড়াছড়ি। মদন বানে আকাশ ঝলসে যাচ্ছে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এর কোন ব্যত্যয় নেই । আমাদের সত্যি প্রাণের রস যখন শুকিয়ে খটখটে আমরা মরণ রসের দিকে ঝাঁপ দিই। ঠান্ডা দাসত্বের থেকে নিবিড় ছুটি যেন অন্য এক দাসত্বের জায়গায় বিস্তার লাভ করছে।

...তোমাদের ফুল শুকিয়ে গেছে এখন সোনা সোনা করে প্রাণটা খাবি খাচ্ছে।"

আমাদের দশা সেই ফাগু হতভাগার মতন। আটের জায়গায় বারো ঘন্টা পাথর ভাঙছো। প্রশ্নহীন।

কেন কেন এত সময় ধরে ওভারটাইম করছে সে নিজেও জানে না। এই প্রশ্নগুলো অসীম সময়ের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে। জীবনের বিভিন্ন আঙ্গিকে।

"আমাদের দশা সেই আফিম খোর পাখিটার মত ছাড়া পেলেও এক অমোঘ টানে আমরা ফের খাঁচার দিকেই ফিরে আসি"

অনেক প্রশ্নের তো উত্তর পাওয়া যায় না। রক্তকরবী তেমন উত্তর না পাওয়া একটি সময়ের বিশাল ক্যানভাস।