গল্প ও অণুগল্প

সম্প্রীতি (অণুগল্প)



তারকনাথ সাহা


এবছর ভাল বৃষ্টি হয়েছে, পালংশাকের ফলনটাও খুব বেশী। চাষীর ঐ এক জ্বালা ফলন কম মানেই ডাহা লোকসান, আর বেশী হলে পাইকারে দর দেয় না। সারাটা জীবন রোদে পুড়ে, জলে ভিজে খাটুনিই সার। সঞ্চয়ের জন্য দুটো পয়সার মুখ দেখতে হলো না। তার উপর হয় বন্যা নয়তো খরা লেগেই আছে। কেষ্টাদার চায়ের দোকানে বসে হারু আর আসলামের মধ্যে কথা হচ্ছিল বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে। হারু বলল, "মকবুলটা আববু মারা যাওয়ার পর, সব জমি জিরাত বেচে ধূলাগোড়ে চলে গিয়ে ভাড়া বাড়িতে থেকে পাইকারি হাটে আনাজ কেনাবেচার কাজ শুরু করেছিল। এখন সে ফ্লাট বাড়ি কিনে রইস্ হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ে দুটো ভাল স্কুলে পড়ে। সামনে সুন্দর ভবিষ্যৎ। আসলাম বলে, "সবাই যদি জমি বেচে শহরে যায়, চাষ আবাদ করবে কে? ফসল না হলে মনিষ্যিরা কি খেয়ে বেঁচে থাকবে!" পাশ থেকে বিনয় খবরের কাগজের পাতা উল্টে বলল, "উত্তর প্রদেশে দশ জন চাষী আত্মহত্যা করে মারা গেছে।" কেষ্টা চায়ের গেলাসে চামচ দিয়ে চিনি গোলাতে গোলাতে বলল,"আমাদের দেশটা যে এত বছর আগে স্বাধীন হলো, তাতেও চাষীদের এত দুর্দশা কেন?"

এমন সময় পল্টু সাইকেল মিস্ত্রী এসে খবর দিল, রুইদাস পাড়ায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধেছে। সবাই দাঙ্গা থামাতে হৈ হৈ করে ছুটলো। গিয়ে দেখলো ব্যাপারটা সেরকম কিছু নয়, কালু সেখের বাগান থেকে রাজু আর ইমন চারটে আনারস তুলে নিয়ে পালাচ্ছিল কালুর ছেলে রউপ সেটা দেখতে পেয়ে কেড়ে নেবার চেষ্টা করতেই যত বিপত্তি। একটু চিৎকার চেঁচামেচি, কথাকাটাকাটি ধস্তাধস্তি এই সব আর কি। কালু মিঁয়া এসে ইমনের থেকে যখন জানলেন যে, বল খেলার মাঠে ছেলেরা একটু আনারস কেটে খেয়ে আনন্দ করবে, তখন আরও দুটো গাছপাকা আনারস তুলে রাজুর হাতে দিয়ে বলল "এদুটোও নিয়ে যা বাবা, সবাই মজা করে খাস আর রউপকেও সঙ্গে নিয়ে যা। সমবয়সীদের মধ্যে একটু আধটু ঝগড়াঝাঁটি আমাদের সময়েও হতো। সবাই মিলে মিশে থাকবি বাপ। তোরাই তো এ দেশের আগামী ভবিষ্যৎ।" বাজারে ফিরে এসে সবাই পল্টু সাইকেল মিস্ত্রীকে ধরলো। ঠিক ঠাক না জেনে এরকম গুজব ছড়ানোর জন্য তাকে দুচার কথা শোনালো। পঞ্চায়েত সদস্য রাজা দত্ত পল্টুকে বোঝালো, "গুজব খবরে দেশে অনেক লোকক্ষয় হয়েছে, ঘর বাড়ি পুড়েছে। তাই সবাইকে এবিষয়ে সচেতন থাকতেই হবে।" সবাই কেষ্টার দোকানে এক প্রস্থ করে চায়ের অর্ডার দিল।