- জালে আটক পড়েছে, আট দশ সের ওজনের কাতলা, হ্যাঁ, তা হবে - জালে যা টান পড়েছে - আনন্দে সুখীর চোখদুটো চকচক করে উঠলো।
- কী বলিস বাপ! আট দশ সের! ক'টা রে সুখী?
- পাঁচ ছ'টা হবে।
- তাই নাকি? তাইলে তো -
- কী? তাইলে কী? সোজা কতাটা সোজা কইরি কও তো দেখি।
- তোর মনে নেই বাপ? গেল বছর খুপ ঠাণ্ডা পড়িছেল তাতেই তো তোর মা-ডা -
- হ্যাঁ। তা আমি কী কইরবো বলো?
- তোর মা-ডার সাধ ছেল সে মইরি গেলে ছেরাদ্দ শান্তিডা ঝেন ভালো কইরে করি।
- সি তো গেল বছর হয়েলো। ইবার আবার কী!
- একবছর তো হয়ি গেল। সামনে ছেরাদ্দবার্ষিকী। গেল বছর তো সক্কলেরে বলতি পারিনি তাই বোলছেলাম ইবারটা যদি -
- না বাপ। ইবারটা হবেনে। তুমি জানো নে আমাগের ঘর সারাতি হবে। অনেক টেকা লাগবে। তাই -
- তাই বলি কি তোর মার কাজডা হবেনি?
- সবই তো জানো বাপ। একদিকি ঘর সারাতি হবি, আর এদিকি বউয়ের বাচ্চা হবে - কী করি সামলাই বলো দিকিনি? না না মা-ডার বছরকি ওই নবদ্বীপ গিয়ি সেরি আইসপো। কিছু মনে করুনি বাপ।
মায়ের বছরকি-টা সামনের সপ্তাহে। সুখী ভেবেছিল এবার নবদ্বীপ ঘাটে গিয়ে নমো নমো করে সারবে। সব মিলিয়ে শ'তিনেক মতো খরচ হবে। কিন্তু ওর বুড়ো বাপ জানিয়েছে গত বছর টাকার অভাবে ঠিকঠাক অনুষ্ঠান হয়নি। এবারে একটু বড়ো করে করতে হবে। সুখী ভাবে - ওরা যখন মথুরাপুরে ছিলো ওদের অবস্থা তখন ভালো ছিলো। মথুরাপুরের বাড়িতে গ্রামের কত মানুষ উৎসব অনুষ্ঠানে খাওয়া দাওয়া করেছে। আর আজ?
কলিঙ্গর জল শুকিয়ে গেছে। ভরা বর্ষায় সামান্য জল থাকে। তা থেকে বড়ো মাছ খুব একটা ওঠে না। বছর ত্রিশ আগে বাপের সাথে সুখী মাঝ রাত্তিরে কলিঙ্গতে মাছ ধরতে যেত। তখন বেশ ভালো লাগতো। নদীতে জল ছিল, জালে নানারকম মাছ ধরা পড়তো। সেই মাছ বিক্রির জন্য চাপড়া, দৈয়ের বাজার, হালদার পাড়া থেকে তেহট্ট বাজারে চলে যেত। সুখীর বাপ নরেন খুড়োর তখন কত নাম! আজ তার কিছুই অবশিষ্ট নেই।
জলাঙ্গীর একটি শাখানদী কলিঙ্গ। চাপড়া থেকে কিছুটা এগিয়ে হুদোর কাছে উৎপন্ন হয়ে ফুলকলমি মধুপুর মহাখোলা মহেশপুরের পাশ দিয়ে সামান্য বাঁক নিয়ে ইছাপুরে প্রবেশ করেছে। সেখানে আর একটা বাঁক নিয়ে মথুরাপর এবং মাধবপুরের মাঝ বরাবর প্রবাহিত হয়ে চলে গেছে কুলগাছি আসাননগর থেকে মধুপুর। ওখানে গিয়ে চূর্ণী নদীর সাথে মিশেছে। ইংরেজ আমলে চৌগাছা, আসাননগর অঞ্চলে নীলচাষ হতো। সেই নীল আসাননগরে বড়সড় উনুনে জ্বাল দেওয়া হতো। ব্যবহার উপযোগী হলে সেটাকে প্যাকিং করা হতো। তারপর জাহাজী নৌকায় চাপিয়ে কলিঙ্গের বুকের ওপর দিয়ে চলে যেত জলাঙ্গী হয়ে গঙ্গানদীতে। সে এক যুগ ছিল বটে! কত জুলুম, অত্যাচার, অবিচার, রক্তপাত, কিষাণ কিষাণীর চোখের জলের সাক্ষী হয়ে আছে কলিঙ্গ, তার ইয়ত্তা নেই। নদিয়ারই চৌগাছা গ্রামের বিষ্ণুচরণ এবং দিগম্বর বিশ্বাস নীল বিদ্রোহের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
মহেশপুর জ'ঘাটা হয়ে যে সীমানা নির্ধারক রাস্তা নির্মাণের জন্য নদীর ওপর বাঁধ দেওয়া হয়। তারপর ব্রিজ নির্মাণ করার সময় কলিঙ্গ পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। এই নদীর বুকে মাছ ধরে যাঁরা জীবন ধারণ করতেন তাঁদের অনেকেই বেকার হয়ে পড়েন। কেউ কেউ বিকল্প জীবিকার সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেয়। মথুরাপুর, মাধবপুর, ইছাপুর গ্রামের জেলে মাঝিরা বেশির ভাগই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। গ্রামগুলোতে মানুষ নেই - কেরালা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্র সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আঠারো বছর বয়সের পর থেকে মানুষের দাম এখন হাজার-বারোশো টাকা। দাম পেতে গেলে কিছু শর্ত পূরণ করা লাগে। হাজার-বারোশোতে তো আর পেট চলে না। এক কিলো খাসির মাংস কিনতে গেলে হাজার টাকা লাগে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। বাজারে শাকসবজির দামও বেশ চড়া। সবটাই যে চাষিরা পায় তা নয়। ফড়ে, আড়তদারের পকেটে কৃষকের পরিশ্রমের একটা বড়ো অংশ চলে যায়।
সুখচাঁদ এবং তার পরিবার করোনাকালের ঠিক পরেই মথুরাপুর ছেড়ে রাজাপুর গ্রামে চলে আসে। ওরা এখন গঙ্গার বুকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। রাজাপুর গ্রামের মানুষগুলো খুব একটা খারাপ নয়। সামান্য টাকার বিনিময়ে গঙ্গার পাড়ে জমি নিয়ে অল্প টাকা খরচ করে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে নিয়েছিল। গেল বছর ঘরটা সারাই করবে ভেবেছিল। কিন্তু মা মারা যাওয়ায় সামান্য ক'টা জমানো টাকার সবটাই নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে ঘর সারানো সম্ভব হয়নি। মনে মনে গঙ্গা মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছে--এট্টু দয়া কর মা, এট্টু দয়া কর। আমার বউয়ের গব্বে বাচ্চা এয়িছে। অনেক ট্যাকার দরকার মা। কিচ্ছু চাই না পতিদিন অন্তত তিন চাট্টে করে আট দশ সের ওজনের কাতলা দিস মা। তাতেই আমার কাজ হয়ি যাবে।
- আজ মা গঙ্গা ডাক শুনেচে। তাই তো তার গব্বের সন্তানগুলোকে আমার কাচে পেইটেচে।
গঙ্গা নদীর উদ্দেশ্যে প্রণাম করে সুখী। গঙ্গার জ্যান্ত কাতলার এখন বেশ দাম। আনন্দে ওর দু-চোখ চকচক করে উঠলো।
আড়তদার কুচো ঘোষের কাছে মাছ বিক্রি করে নগদ টাকা নিয়ে বাড়ি ফেরে সুখী। বাবার কথাটা ওর মনের ভেতর আলোড়ন তোলে - "তোর মা-ডার সাধ ছেল বাপ -"
- কী ভাবিস বাপ? মা-ডার কথা এট্টু মাথায় রাখিস। দরকার হলি আমাগের গাই-ডারে বেচি দিস।
সুখী বাপের ওপর রেগে যায়। একটু চড়া সুরে বলে ওঠে - এডা কি কতার মতো কতা হ'লো বাপ? তুমি ঝানো না ওই গাই একনো দুধ দেয়। তুমার নাতিডা সেই দুধ খেয়ি বেঁচি আচে। এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে আমাগের দুধ কিনার পয়সা আচে? মা-ডা চলি গেচে, গেচে। তাই বলি গাইডা বেচি -! ছি, বাপ। ছি!
সুখীর বাপ নরেন খুড়ো লজ্জায় মাথা নীচু করে বলে - বুড়ো হোয়চি, সি কতা মনে থাকে না বাপ, কি বলতি গিয়ি কি বলি ফেলি বুজবার পারি না। আমায় খেমা করিস বাপ।
নরেন খুড়োর চোখে জল। উষ্ণ নোনাজল দু'গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। আধময়লা ধুতিটার খুঁটে চোখ মুছে নেয়। বুকের ভেতরটা পুড়ে যায়। সময় কাল সব বদলে গেছে। আজকালের মানুষগুলো যেন কেমন হয়ে গেছে। তারা কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, শ্রদ্ধা করে না, ভালোবাসে না, সংশয়, সন্দেহ, অবিশ্বাস, স্বার্থপরতা নিয়ে পথ হাঁটে। সবসময় মনে হয় - আজকের দিনে বেঁচে থাকাটা আশ্চর্যজনক এবং অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
নৌকার গলুইয়ে বসে নরেন খুড়ো ঢুলতে থাকে। ভাঁটার টানে তরতর করে এগিয়ে চলেছে নৌকা। গঙ্গার বুকে এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ঢেউ হয়ে নামে। নদীর বুকে তা ছবি এঁকে দেয়। ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা বাতাস মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশের বুকে ঢেউ তুলে নরেন খুড়োর কানে কানে বলে গেল - বৃথা শোক করিস নরেন, মাত্র দু’দিনের এই পৃথিবী। এর মাঝে লুকিয়ে আছে সুখ দুঃখ হাসি-কান্না। মানুষের জীবন হলো আলো-আঁধারের প্রান্তসীমায় থাকা একটি ছায়াবৃত্ত। তুই তো তার ব্যতিক্রম কেউ না, তুইও এই সমাজেরই একজন।
বাতাসের হালকা দোলায় নৌকার নাচন শুরু হয়। সুখী লগি ঠেলে ঠেলে নৌকা এগিয়ে নিয়ে যায়। নরেন খুড়ো নৌকার হাল ধরে বসে থাকে। সাতের কোঠায় বয়স তার, তাই শরীরে আগের মতো তাগত নেই, চামড়া কুঁচকে গেছে, চোখ ঘোলাটে হয়েছে, একটা দুর্বল কাঠামোর উপর চামড়ার ছাউনি দেওয়া আছে। তবুও পাকা মাঝির মতো হাল ধরে বসে থাকে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অভ্যাস সহজে ভাঙা যায়? মাঝে মাঝে বৈঠা হাতে তুলে নিয়ে সজোরে জলের মধ্যে চালিয়ে দেয়। সেই ধাক্কায় নৌকার গতি আরও বেড়ে যায়। তার স্ত্রী গত হবার পর থেকে একটু মনমরা হয়ে গেছে। বাড়ি থাকলে মাঝে মাঝে এদিক সেদিক ঘুরে কী যেন খোঁজে, আর না পাওয়ার যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত হয়ে যায়। কেউ জিজ্ঞাসা করলে কোনো জবাব দেয় না কেবল হাসে। আজও মাঝ নদীতে নৌকার গলুইয়ে বসে সাত-পাঁচ ভাবছিল নরেন খুড়ো। ভাবতে ভাবতে কখন যেন হাতটা শিথিল হয়ে বৈঠেটা ছিটকে নদীর জলে পড়ে গিয়েছিল - টের পায়নি। তখনই দমকা হাওয়ায় নৌকা দুলে ওঠে। সুখী কোনোমতে জলের মধ্যে লগি ফেলে সামলে নিয়েছিল কিন্তু নরেন খুড়ো টাল সামলাতে না পেরে জলের মধ্যে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সুখী চিৎকার করে ওঠে - হেই বাপ, ইডা কি করলে তুমি?
প্রবল জলস্রোতের সাথে খুড়ো কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধস্তি করলো - কিন্তু -
কোনোমতে লগি পুঁতে নৌকা লাগিয়ে সুখী বাবাকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দিল। কিন্তু ততক্ষণে স্রোতের টানে নরেন খুড়ো অনেকটা দূরে এগিয়ে গেছে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও সুখী নদীর স্রোতকে পরাস্ত করতে পারলো না। অনেক দূরে তাকিয়ে দেখতে পেল, দুটি শীর্ণকায় হাত জলের ভেতর থেকে সুখীকে ডেকে কী যেন বলছে -
নৌকার গলুইয়ে বসে দু'হাতে মাথা চেপে ধরে উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়লো সুখী। ওর কান্নার সমব্যথী আজ আর কেউ নেই। জনমনুষ্যহীন নদীর বুকে সুখীর কান্নার শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ওকেই যেন বিদ্রুপ করতে লাগলো -।
