প্রবন্ধ

গোলাপ ফুল সুন্দর হয় কি করে! ভ্রান্তিবিলাস (তৃতীয় পর্ব)



সুভাষ রবিদাস


।। ৩ ।।

রবীন্দ্রনাথের ভাবনাটা নিজস্ব। তিনি ব্রহ্মাণ্ড ও মানবিক সত্তাকে এক করে দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু ব্রহ্মাণ্ড কি করে মানুষের অনন্ত ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিধৃত হতে পারে! বলা যেতে পারে, জীবসত্তার মধ্যে বিধৃত। ধর্মীয় চৈতন্য যে কোন ভাবে ব্যক্তি চৈতন্য হতে পারে না। ব্যক্তি চৈতন্য পারস্পরিক বিরোধিতা সৃষ্টি করে যদিও কোন কোন বিষয়ে সহমত হওয়া যায় কিন্তু ধর্মীয় চৈতন্য হল সমষ্টি চৈতন্য যা পারস্পরিক মতামতকে সহযোগিতা করতে থাকে। ব্রহ্মাণ্ডের উপর তাঁর মানবীয় তত্ত্ব আরোপ করা আমার কাছে যুক্তি সঙ্গত মনে হচ্ছে না। ব্রহ্মাণ্ড একটি সতন্ত্র প্রকাশ এবং তার থেকে অনন্ত সত্তার বিকাশ। আধ্যাত্মিক জগতে একটা কথা প্রচলিত আছে। যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে দেহ ভাণ্ডে। দিব্যসত্তা বলে কিছু হয় না এই বিশ্বাস থেকে প্রশ্নটি উঠেছিল। তবে কবি যদি বলতেন, দৈব্য চেতনা মনুষ্যের ব্যক্তিত্বে বিধৃত, তবে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যেত। কেননা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন দেবতারা কোন জগতে বাস করে তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। দেবতা তথা দিব্যতা কিন্তু মানুষের মনকেন্দ্রিক। শরীর কেন্দ্রিক নহে। অপরক্ষেত্রে মহাবিশ্বের অংশ বিশেষ যত পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে, মানুষের জীবদেহে তার অস্তিত্ব কিছু না কিছু মিলবেই। তাই জীবদেহ মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয় কিন্তু দিব্যসত্তা অবশ্যই বিচ্ছিন্ন ভাবনা।

অর্থাৎ একটি পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে থাকে ইলেকট্রন প্রোটন ফোটনের মত কণা। এগুলো পরস্পর সম্পৃক্ত কিন্তু সংযুক্ত নয়। তাতেই প্রশ্ন আসে- সত্য কী? সত্য ব্যক্তি নিরপেক্ষ না চৈতন্য নিরপেক্ষ? এর উত্তর দিয়েছেন আইনস্টাইন।

- সত্য' এমন যাকে মানব নিরপেক্ষ ভাবেই গ্রাহ্য করতে হবে। এই কথাটা আমি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারব না, কিন্তু এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। যেমন ধরুন আমি মনে করি, জ্যামিতির পিথাগোরাস উপপাদ্য এমন একটা কিছু জানায় যা মোটের উপর সত্য। মানুষের অস্তিত্ব নিরপেক্ষ ভাবেই সত্য। তাছাড়া এটা তো ঠিক যে মানব নিরপেক্ষ বাস্তবতা যদি থাকে, তাহলে সেই বাস্তবতার সাপেক্ষে একটা সত্য অবশ্যই থাকতে হবে। আর ঠিক একই ভাবে প্রথমটি নাকচ হয়ে গেলে পরেরটির অস্তিত্বও নাকচ হয়ে যাবে।'

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা না গেলেও বিশ্বাস নামক যে কথাটি বিজ্ঞানী ব্যবহার করলেন এই বিশ্বাস = সম্ভাব্য সত্য। এ থেকেই বিজ্ঞানীর অনুসন্ধান পর্বের সূচনা।

রবীন্দ্রনাথঃ সত্য, যা কিনা বিশ্ব সত্তার সঙ্গে অভিন্ন। তাকে অবশ্যই মূলগত ভাবে মানবীয় হতে হবে; তা না হলে আমরা, ব্যক্তি মানুষেরা যা কিছুকে সত্য বলে উপলব্ধি করব তার কোনও কিছুকেই সত্য বলা যাবে না - অন্ততপক্ষে সেই সত্য যাকে বৈজ্ঞানিক বলে বর্ণনা করা যেতে পারে, যাকে যুক্তিশাস্ত্রসম্মত পথেই আয়ত্ত করা সম্ভব, অর্থাৎ কিনা এমন এক চিন্তা - অঙ্গের মারফত যা মানবীয়। ভারতীয় দর্শন বলে ব্রাহ্মণ হল সেই পরম সত্য, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিমন যাকে ধারণা করতে পারে না।'

এই অসমাপ্ত বক্তব্যের শেষে তিনি সত্যকে মায়া বলে উল্লেখ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি পরিচয় শুধু কবি লেখক নয়, তিনি কুশারী ব্রাহ্মণ। তিনি ইউনিভার্স কসমসকে ব্রহ্মাণ্ড ব্রহ্ম না বলে বিশেষণে বলে যে আত্মগৌরব প্রকাশ করেছেন, যেটা ভারতীয় দৃষ্টিকোণে মাননীয় রূপে সত্য। যেভাবে ঈশ্বরচন্দ্র লিখতে পারেন বর্ণ শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণভেদ থেকে দূরে সরে গিয়ে মূল ডি এন এ'গত আর্য হওয়া সত্ত্বেও আইনস্টাইন এই বিসংবাদ থেকে মুক্ত বিজ্ঞান চিন্তক।

আইনস্টাইনঃ তার মানে আপনার ধারণানুযায়ী যা হয়তো ভারতীয় ধারণা, এই বিভ্রম কেবল ব্যক্তি মানুষের নয়, সমগ্র মানব জাতির।'

এখানেই পরাজিত ভাব দর্শন। সত্য যে মানবীয় ধারণা এটা ভাবা যায় না। যা কিছু সত্য তার অস্তিত্ব প্রকৃতি নির্ভর। প্রকৃতির অস্তিত্ব আবার ব্রহ্মাণ্ড নির্ভর। ব্রহ্মাণ্ড কিন্তু মহাজাগতিক নিয়ম মেনে চলে যা পদার্থ নির্ভর তাই পাশ্চাত্য দর্শন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। কেননা পাশ্চাত্য দর্শনে লজিক্যাল মতবাদ সত্য। এই ধারণায় দুটি বিপরীতমুখী ঘটনা একই সাথে সত্য হতে পারে না। একটি সত্য হলে অপরটি মিথ্যা হতে হবে।

আরও সহজে বলা যায়, ধরা যাক, বিচারকের সামনে দুই জন ব্যক্তি একটি শিশুর পিতৃত্ব দাবী করল। আমরা মাতৃত্ব দাবীর কথা শুনেছি কিন্তু এবার ঘটনা আলাদা। বিচারক কি রায় দেবে? এটা শুধু শিশুর মা বলতে পারে কিন্তু তার বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণ করা কঠিন। যদি এক নারী একই দিনে দুটি আলাদা আলাদা পুরুষের সঙ্গ লাভ করে তবে সঠিক উত্তর শিশুর মা কিভাবে দিতে পারে! বিচারকের কাছে উত্তর হল A সত্য হলে B মিথ্যা। কিংবা B সত্য হলে A মিথ্যা। এই থিওরি মেনেই ডিজিটাল যুগের সূচনা। ভারতীয় দর্শন তার উল্টো। ভারতীয় দর্শন তার উল্টো কিন্তু কি করে এত বড়ো কবি ও লেখক ব্রাহ্মণ আর ব্রহ্মাণ্ডকে এক করে দিলেন? ব্রাহ্মণ শব্দটি মনুসংহিতা থেকে আমদানি করা। এটি বর্ণপ্রথার সমর্থনে লেখা। বিদ্যাসাগর মশাই সেটাকে আরও শক্ত পোক্ত করে তুলেছেন। আসলে অহম ব্রহ্মস্মি মানসিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া খুব শক্ত। সত্য কখনই মায়া হতে পারে না। সত্য অমোঘ। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড বিলুপ্ত হলেও সত্য রয়ে যাবে।

আদি শঙ্করাচার্যের উক্তি - ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। বাকি সব মায়া। অহম ব্রহ্মস্মী। বিভ্রম বা ভুল সমগ্র মানব জাতির মধ্যেই আছে। তাই ধর্ম ও ঈশ্বর দুই মিথ্যা। থাকল শুধু বিশ্বাস, যেটা সম্ভাব্য সত্য। এবার বিজ্ঞানী মহাবিশ্বের মূল, কেন্দ্র ও প্রান্ত সন্ধানে তল্লাশি করতে পারে। সম্ভাবনার নিরিখে।

আমরা উক্ত মহাপুরুষদ্বয়ের সাথে আরেকটু চলি।

আইনস্টাইনঃ যদি কোনও মানুষের অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে বেলভিয়ারের অ্যাপোলো আর সুন্দর থাকবে না?

রবীন্দ্রনাথঃ না।

আইনস্টাইনঃ সুন্দর সমন্ধে এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত। কিন্তু সত্য সম্পর্কে নয়।'

একথা আমিও বিশ্বাস করি। যখন কোনও বিষয়কে সত্য বলা হবে তখন তার পক্ষে একটি প্রমাণ থাকতে হবে, সেই প্রমাণ হবে সত্য। সেই প্রমাণকে সমর্থন করতে আরও একটি সত্য চাই। এভাবে সত্যের পক্ষে সত্যকে এসে দাঁড়াতে হবে। মানে সত্য হল সম্ভাবনাময়।

এভাবে বিশ্ব যে নিয়মে প্রকাশিত হয়েছে সে নিয়মে সংকুচিত হবে।

কিছুক্ষণ আগে একটি গল্পের অংশ বিশেষে Replacement কথাটা ব্যবহার করেছি। কুবাই শারদীয়া সংখ্যা ১৪১৯ এ একটি নিবন্ধে দেখিয়েছিলাম বেলুনের গায়ে কটি বিন্দু এঁকে। এখানে সেটাই ভিন্ন ভাবে বলার চেষ্টা করছি।

আইনস্টাইন বিগক্রাঞ্চ সমন্ধে আশঙ্কিত ছিলেন। অর্থাৎ বিগক্রাঞ্চ যদি ঘটে, তাহলে যে মায়া প্রকট করে বিশ্বজগৎ প্রতিভাত হচ্ছে সেই মায়াকে পুনরায় আকর্ষণ করে সমস্ত ব্রহ্মাণ্ডকে গ্রাস করবে। বিন্দু থেকে যেটা সৃষ্টি হয়ে বৃত্ত হয়েছে সেটা আবার বিন্দুতে বিলীন হয়ে যাবে।

ভাবলেই মাথা ঘুরে যায়, এই মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায়?

হ্যাঁ, অবস্থান।

আমরা এখানে সদা ভাসমান। আমার পূর্ব পুরুষ ও পরপুরুষ সদা ভাসমান ছিল ও থাকবে। এমন কোন ঠোস সলিড বস্তু নেই যার উপর ভর করে মহাবিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে। গ্রহ নক্ষত্র নীহারিকা ব্ল্যাকহোল এন্টি মেটার, এরা আছে কোথায়? এই শূন্যতা সীমাহীন। এর আদি কোথায়? অন্ত কোথায়? কতদূর জুড়ে তার বিস্তৃতি!

ধরা যাক একটা বেলুনের ভিতর আমাদের পরিচিত ইউনিভার্স অবস্থান করছে। এমন বেলুন আরও থাকা সম্ভব আর তাদের উভয়ের মাঝে বৃহৎ শূন্যতা বিরাজ করবেই। এই শূন্যতা কোথায় অবস্থিত! আর আমরাই বা কোথায়? কিংবা ধরে নিই, মহাবিশ্ব একক একটি বেলুন রূপে অবস্থিত। তাই যদি হয় তবে সেই বেলুনের চতুর্পাশে শুধুই শূন্যতা। এই শুন্যতা আবার কাকে আধার করে অবস্থান করছে? মহাবিশ্বে এই শূন্যতার শেষ কোথায়? বিগব্যাংগ এর একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে যে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হল, সৃষ্টির পূর্বে মহাবিশ্ব বলে তো কিছু ছিল না। তবে শূন্যতা কি রূপে ছিল? সত্য এখানে নিজের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

(ক্রমশ)