ভ্রমণ ও দেশ-বিদেশ

আমার তাওয়াং ভ্রমণ (প্রথম পর্ব)



হিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী


পূর্ব দিক আর উত্তর দিক যে স্থানে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়, সেই ঈশান দিগন্তে নাকি দেবতার আবাস। এরকমই তো শুনে এসেছি শৈশব থেকে। আমাদের দেশের সেই দেবভূমে যে রাজ্যটি তার নাম 'অরুণাচল'। অরুণ সেখানে অচল কি না তা জানি না, তবে ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই অরুণোদয় হয় সবার আগে। বন-জঙ্গল-পাহাড়-ঝর্ণার অপরূপ সজ্জায় ভূষিত এখানকার এক অংশেই এবার পূজা-অবকাশে ছিল আমাদের দেবার্চ্চনা।

আত্মীয় এক পরিবারের সাথে এবারের ভ্রমণে বাড়তি পাওনা ছিল সস্ত্রীক সকন্যা পরিবারসহ বন্ধুবর তাপসের অমূল্য সান্নিধ্য।

যাওয়া হবে কি হবে না ভেবে ভেবে শেষে/ যাওয়া তো হল যে অবশেষে... না, শুধু তাপস নয়, আমরাও ভাবছিলাম অরুণাচলের এই ট্যুরটা হবে তো শেষ পর্যন্ত।

সৌজন্যে, মহান 'গীতাঞ্জলি ট্যুরস'! অক্টোবরের সাতাশ আর আঠাশ এই দু'দিন মিলে চারখানা ট্রেনের টিকিট কেটে আমাদের যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে শেষে দুটো আলাদা সময়ের আলাদা ইস্টিশনের টিকিটে যাওয়ায় চূড়ান্ত ব্যবস্থা হলেও শেষের আগের দিন সকাল অবধি তাপসদের কপালে 'ওয়েটিং লিস্ট'-এর খাঁড়াটা ঝুলছিল। শেষে কোম্পানি তৎকাল সার্ভিসের টিকিটের সুরাহা করায় ওরা তিনজন যেতে পারলো, তাও অন্য ট্রেনে; যেটায় করে আমাদের সবার যাত্রাসূচী (ট্যুর ব্রোচার - Tour Brochure) জানা ছিল চার মাস আগে।

পরদিন, অর্থাৎ আঠাশ তারিখে ঘন্টা তিনেকের ব্যবধানে আমরা গুয়াহাটির হোটেলে পৌঁছেছি। তাপসের মেয়ে-জামাই, তাদের দুই পুত্র কন্যা আমাদের সাথে আগের ট্রেনে।

এইভাবে শুরু হয়েছিল আমাদের অরুণাচলমুখী যাত্রা।

গুয়াহাটির সময়টা খুব বিরক্তির সাথেই অতিবাহিত হয়েছিল। প্রায় চার ঘন্টা স-পুত্রপরিবার স-লাগেজ হোটেলের লাউঞ্জে বসে থাকার পর হোটেলের ঘর মিললো (সৌজন্যে চেক আউট টাইম, যা পার হ'ওয়ার অন্ততঃ একঘন্টা পরে আগের রাতের অতিথিদের সাধারণতঃ হোটেল ছেড়ে বেরোতে দেখা যায়)। তারপর পুঞ্জীভূত ব্যাগ-স্যুটকেস হোটেল বা ট্যুর কোম্পানির রান্নাবান্নার লোকদেরকে দেখিয়ে সবাইকার 'মাল' সবার ঘরে ঘরে পৌঁছনোর দিকে নজর রাখা। অতঃপর এক এক করে পরিবারের সদস্যদের বাথরুমে গতায়ত অন্তে অন্তহীন অপেক্ষা চা-জলখাবার-লাঞ্চ-এর দেখা পাওয়ার আশায়। কিন্তু ওই যে, সেই "তোমার দেখা নাই রে/ তোমার দেখা নাই..."।

তো এইভাবে অপরাহ্নের প্রাক্কালে তাপস-বেলা-ঋতু আর আমাকে ছেড়ে আমাদের বাকিরা বেড়িয়ে গেল গুয়াহাটিতে বসবাসকারী আমার মিসেসের দিদির বাড়ি। আমরা চারজন শেষ বিকেলে একটু ঘুরে এলাম বালাজি মন্দির আর ব্রহ্মপুত্র দেখতে। নদটি দেখা হল না ওয়্যার মেশ দিয়ে ঘিরে রাখার কারণে। নদ পেরিয়ে অপর পারে টিলার উপরে উমানন্দ মন্দিরও তেমনি রয়ে গেল 'কাব্যের উপেক্ষিতা' হয়ে। অরুণাচল থেকে ফেরার পথে অবশ্য শহরের একপ্রান্তে ঝর্ণাঘেরা বশিষ্ঠের মন্দিরটি দেখা হয়েছিল।

হাঁড়ি, ডেকচি, গামলা, সসপ্যান, কড়াই, বালতি, থালা, বাটি, গ্লাস, চামচ, চায়ের কাপ-প্লেট, চাল - ডাল - সবজি - মাছ - মাংস - দুধের প্যাকেট বহন করার বিশালাকার বাক্স, নানারকম মশলার নানান আকৃতির পাত্র, তেলের একাধিক টিন, গ্যাস সিলিন্ডার ইত্যাদি। ...এরাও আমাদের সঙ্গেই বাহিত হতে থাকে। কারো জায়গা হয় ছাদের উপরে, কোনো কোনোটার গাড়ির ভিতরে ডিকিতে, যাত্রী-আসনের মাঝের প্যাসেজে। দিনের বেলাটা যেহেতু গাড়ি মূলতঃ চলমান থাকে, তাই এইসবের মধ্যে দুপুরের খাবারগুলো রান্না করা অবস্থায় খাঁচাবদ্ধ হয়ে সিটের নীচের আসনে বাঁধা থাকে।

আর গোলমালটা পাকে এখানেই। দুটো গাড়ি লাগে ট্যুর সমাপন করতে; খাওয়ার সময় গলা অবধি খেলেও চলার সময় সুবাসিত গাড়িটা সবার অপছন্দের। অনেক সময় নির্বাক ওইসব খাবারের ব্যবস্থা করতে, যাত্রীদের স্থান সংকুলান হয়। বিস্তর চেঁচামেচির পর কখনো বাড়তি গাড়ির বন্দোবস্ত হয়, যাত্রা শুরুর সময় ততক্ষণে এক দু' ঘন্টা পিছিয়ে যায়।

প্রথম থেকেই গাড়ি বিভাজনের কারণে যাত্রীদের মধ্যেও দুটো প্রাথমিক দল তৈরী হয়ে যায়। পরে যত দিন যায়, ওই দুই দলের মধ্যেও নানা উপদল জন্মায়। কেউ ভাবে না, ট্যুর শেষে ফিরে যাওয়ার পর অনেকের সাথে অনেকের হয়তো আর কখনও দেখাই হবে না।

এই চলচ্ছবির অংশীদার হয়েই আমাদের প্রথমদিনের যাত্রা শুরু হল গুয়াহাটি থেকে বোমডিলার পথে।

একটা কুমির। জলে ডুবে ডুবে এসে এখন ডাঙায় ওঠার তাল করছে। ওর পেছনের পা'দুটো নেই বা জলের তলায় অদৃশ্য। বুকের তলা থেকে সামনের পা'দুটো নামিয়ে দিয়েছে পারের কাদামাটির মধ্যে। ঠিক যেন একটা গাছের মোটাসোটা শাখা নেমেছে। বুক থেকে মাথাটা কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। পশ্চিম থেকে পূর্বমুখী গমন কুমিরটার।

এভাবেই মনে হল আসাম রাজ্যটাকে কল্পনার মানচিত্রে আঁকি। পশ্চিমে কোঁকরাঝাড়ের কাছাকাছি থেকে সোজা পুবে ন'ওগাঁ হয়ে মাথা তুলেছে পূর্বোত্তরে শিবসাগর, যোরহাট, ডিব্রুগড়, ডিগবয়, লখিমপুর-এর দিকে। এর একটু উত্তরে তেজপুর থেকে আমরা ঢুকে যাবো আরও একটু উত্তরে অরুণাচলের বুকে "...দাঁড়াও দৃপ্ত মুখে" গানটি গাইবার অবকাশ খুঁজতে।

ন'ওগাঁ থেকে কুমিরের যে গোদা পা'দুটো একসাথে হয়ে নীচের দিকে, অর্থাৎ, দক্ষিণে নেমেছে, সেখানে রয়ে গেলঃ দিফু, হাফলং, শিলচর, হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ, কার্বি আংলং - এই জায়গাগুলো।

কুমিরের এই পদভূমির পুবে নাগাল্যান্ড, তার নীচে মণিপুর। দক্ষিণে পায়ের পাতাকে বুকে ধরে রেখেছে পাশাপাশি মিজোরাম (ডানে) আর ত্রিপুরা (বাঁয়ে)। পশ্চিমে উপরে মেঘালয়, নীচে বাংলাদেশ।

এই সব অঞ্চল এবারে তো হল না আমরা তো যাব ভিন্ন পথে, পৃথক গন্তব্যে।

সারাদিন ধরে চলমান থেকে রাত প্রায় ন'টা নাগাদ আট হাজারি উচ্চতার বমডিলায় যখন পৌঁছলাম, শীত তখন আক্রমনোদ্যত। অথচ, নাই নাই সময় যে নাই। নিশি অবসানে ফের পথ চলা শুরু হবে। ইচ্ছা করলেই একদিন কোথাও থেমে যাওয়ার উপায় নাই।

রাতের বমডিলার আগে দিনভর পথচলা আসামের সমতলভূমে। জাতীয় সড়ক ২৭। গুজরাটের পোরবন্দর থেকে শুরু হয়ে এই দীর্ঘ রাজপথ সাতটি রাজ্যের ভিতর দিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে শেষ হয়েছে শিলচরে এসে। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারে এপথের কিয়দংশ থাকলেও আমরা এযাত্রা এপথের যাত্রী হয়েছি গুয়াহাটি থেকে পূবে ন'ওগাঁ অবধি।

ন'ওগাঁ থেকে রাজপথ নেমে গেছে দক্ষিণে শিলচরের দিকে। আমরা উত্তরমুখি হয়ে তেজপুরের দিকে।

তেজপুর। শোণিতপুর জেলার এই শহরটি ছাড়াতেই প্রশস্ত ব্রহ্মপুত্র। আরেকটি নদী জিয়াভরলী - স্মরণ করিয়ে দেয় ওই নামের এক বাংলা উপন্যাসের কথা।

ব্রহ্মপুত্র আমার মধ্যে কিঞ্চিৎ বেদনার জন্ম দেয় প্রধানতঃ দুটি কারণে। প্রথম এর উৎসমুখে, মানস সরোবরে, যাওয়া আর এ জীবনে হল না (গঙ্গার উৎস, গৌমুখ, দেখেছি; ব্রহ্মপুত্রের উৎস বাদ থেকে গেল)। দ্বিতীয় কারণ ভূ-রাজনৈতিক। এই বিপুল জলরাশি একদিন শুকিয়ে যাবে তিব্বতের নীচের অববাহিকায় বিদেশী দেশের বাঁধ নির্মাণের উগ্রতায়।

ব্রিজ পেরিয়ে এগোচ্ছি অরুণাচলের সীমান্ত শহর ভালুকপঙ-এর দিকে। পথে অতিক্রম করলাম 'নামেরি জাতীয় উদ্যান'। উন্মুক্ত পরিসরের আসামের পথের শেষ দিকটায় এসে বনের নির্জন নিবিড় গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে চলতি পথের অংশটুকু মনে দাগ কেটে রাখে।

...ভালুকপঙে ঢুকলাম। এখানে ইনার-লাইন ব্যাপারট্যাপারগুলো ভ্রমণ সংস্থাই সামলালো। আবার শুরু ক্রম-ঊর্ধ্বগতি হয়ে। একটু দূরের পাহাড়গুলো কাছে সরে আসতে আসতে একসময় পথের দু'পাশে চলে এল।

আমরা চলেছি সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্য দিয়ে পাক খেতে খেতে উঁচুতে আরও উঁচুতে।...

আমরা চলি সামনে। পাহাড় সরে যায় পিছনে। সন্ধ্যা গিয়ে আগমন হয় রাতের। গাঢ় কালো রঙের পাহাড়ের মাথার উঁচুনিচু দাগের উপরে ছাই রঙা আকাশের মাঝে থাকা তারারা মুখ লুকোয় কুয়াশার আড়ালে। পথের দু'পাশে সাদা রঙের সতর্ক-রেখা কালো রাস্তার সাথে সাথেই সমান্তরাল হয়ে সর্পিল বাঁক নেয়। বাস চলার গোঙানি পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ভিতরের যাত্রীদের চোখে তন্দ্রার আবেশ আনে। ...হঠাৎ কখনো অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়ানো ইতস্ততঃ আলো দেখে মনে হয়, আকাশ বুঝি নীচে নেমে এল। ভুল ভাঙে কাছে এলে; পাহাড়ি এক গাঁও। মানুষজন নেই; সবাই ঘরে ঢুকে রয়েছে 'একটু উষ্ণতার জন্য'।

আরও উঁচুতে উঠি। শীত বাড়ে, সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ঝিমুনি।

...হঠাৎ ঝাঁকুনি লাগলো। বাস থেমে গেল। বমডিলা এসে গেছে। ঢোকার মুখে এক পেট্রোল পাম্পের দেওয়ালে ধাক্কা দিয়ে সেটির অনেকটা ভেঙে দিয়ে বাস দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিস্তর বিতন্ডার শেষে বাস আবার চললো হোটেলের উদ্দেশ্যে।

অতঃপর তো ঘর বরাদ্দ হ'ওয়া। তারপর কাজের মধ্যে দুই/ খাই আর শুই... কাল যাব তাওয়াং।

গতকাল তিনশো পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার বাসযাত্রার পর, আজ সবাই একটু কাহিল। তবু যেতে তো হবেই। দেরী হলেও তাই একসময় বমাল বাসে উঠে পড়তেই হল। আজ আমাদের বরাতে জুটেছে বড় গাড়ি যেটায় মানুষ, আনাজ-মশলা আর রান্না করা খাবার একসাথে যাবে। যাত্রী আর যাত্রীদের মালপত্র যে এক'ই গাড়িতে যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। স্তুপীকৃত মালপত্র ট্যুর কোম্পানির কর্মীদের ব্যবস্থাপনায় যে কোনো গাড়িতেই বাহিত হতে পারে। শুধু সঙ্গে এক (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একাধিক) একেকটা ব্যাগ যাত্রী-সমভিব্যাহারে থাকে।

ব্যাজার মুখে আমরা ওই দ্বিতীয় গাড়িতে চেপে র'ওয়ানা হলাম।

ভিতরে সুগন্ধি খাবার, বাইরে সুদৃশ্য প্রকৃতি।

নির্জন গম্ভীর সর্বংসহা পাহাড়ের গহিনে ডুব দেবার আগে একটু ভ্রম-সংশোধনীর অবকাশ আছে এই বর্ণনাকারের তরফেঃ গতকাল আমার এই ধারাবিবরণীতে যে পেট্রল পাম্পের পাঁচিল ভেঙেছিলাম, সেটা ঘটবে আজ, তাওয়াং এ প্রবেশের মুখে।

সে ভাঙন যেখানেই সংগঠিত হোক, পাহাড়ের জীবন থেকে যায় এক'ই বর্ণোজ্জ্বল প্রাত্যহিকতায়, পাহাড়িয়া মানুষের মননে। ওরা, ওই গাছ-নদী-ঝরণা-মানুষ - মনে রাখে না ওইসব ক্ষুদ্র ক্ষয়ক্ষতি। স্তব্ধতার তপোভঙ্গ করে নিজেদের নীরব, কখনো সরব সঙ্গীতে যে ওরা মাতোয়ারা থাকে আপন আপন শৈলীতে।

বাস চলছে কখনো সোজা কখনো পাক খেয়ে খেয়ে। চারদিকের পাহাড় উচ্চাবচ গিরি-শিরা দিয়ে সমতলের দিগন্তকে অনেক উঁচুতে তুলে দিয়েছে। সবুজের সমারোহ পর্বত-গাত্রের শুষ্ক শিলাময় নগ্নতাকে আবৃত করে রেখেছে। প্রায় একশো আশি কিলোমিটার দূরের তাওয়াং যেতে সন্ধ্যে গড়িয়ে যাবে। উঠতেও হবে আরও পাঁচ হাজার ফুটের মতো। বড় গাছ, আদ্যন্ত সবুজ এই বর্ণসজ্জা হারিয়ে যাবে। সাক্ষী থাকবে সবুজ-হলুদ-খয়েরি-মেরুন রঙের গুল্ম, ঝোপঝাড়।

অনেক উঁচু থেকে পাহাড়ের সবুজ ঢাল নেমে আসে বাসরাস্তার একপাশে। রাস্তাটুকু ছেড়ে উল্টোদিকে সেই ঢাল নেমে যায় কোন অতলে। কখনো থামে কোনো স্রোতস্বিনী পাহাড়ি ঝর্ণা জলধারায়।


পাহাড়ের ধ্বস যখন গাড়ির গতি রোধ করে, তখনও এই পাহাড়ি-নদী "আপন বেগে পাগল-পারা"।

বমডিলা থেকে তাওয়াং যাওয়ার পথে এই পথরোধ-এর মুলে আমাদের গাড়ির সামনে পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি গাড়ি। সেটিকেও দোষ দেবার নেই তার'ও সামনে যে আরেক গাড়ি... এরকম গাড়ির সারি সামনে যতদূর দৃষ্টিগোচর হয়। নিশ্চল সেসব গাড়ির শেষে একটা বাঁকের শুরুতেই ধ্বস নেমেছে।

উৎসাহীরা গাড়ি থেকে নেমে পতিত ও পতনশীল ধ্বস দেখতে গেল। অনুৎসাহী পুরুষরাও নামল প্রধানতঃ পাহাড়-জঙ্গলের ফাঁকেফোঁকড়ে 'ছোট বাইরে'র স্থান নির্বাচন করতে। পাহাড়ে চলতে চলতে কতবার যে এই নির্বাচনে আমাদের সামিল হতে হয়!

ইন্দো-টিবেটান পুলিশ আর বর্ডার রোড অর্গানাইজেশন খুবই করিৎকর্মা; যাত্রীরা মুষড়ে পরার আগেই ওদের মিলিত প্রয়াস গাড়ি চলার পথ উপযুক্ত করে দিল।

আবার শুরু পথ চলা। দুপুর নাগাদ থামলো আর একটি বাঁকের মুখে না, ধ্বস নয় এবারে লাঞ্চ-অভিলাষী। লাঞ্চ-এর বিরতি মানেই মহিলাদের দ্বিগুণ সুখ; টয়লেট পাওয়া যাবে যে।

লাঞ্চশেষের যাত্রাপথ যাত্রীদের অনেকেই বিশেষ দেখতে পায় না; চোখ যে তখন তন্দ্রার আবেশে বুজে আসে। ঘুমন্ত, আধঘুমন্ত, জেগে থাকা যাত্রীদের নিয়ে সজাগ গাড়িচালক চালিয়ে নিয়ে চলে গাড়ি; মঞ্জিল-এ তাকে তো পৌঁছিয়ে দিতে হবে সবাইকে।

তাওয়াং-এর এখনো দেরী। কাছাকাছি এসেছি যে পাহাড়ি শহরটির, তার নাম দিরাং। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে দিরাং নদী। দূর থেকে নদী-শহর-পাহাড়ের-প্যানোরামিক চিত্রটি খুব নয়নাভিরাম। এখানে ফিরতি পথে একরাত থাকা হবে। শহরের ভিতর দিয়ে চলার রাস্তা বাড়ি, দোকান, সরকারি দপ্তর, লোকজন, ষাঁড় ইত্যাদি সহ সুপরিচিত।

দিরাং ছাড়িয়ে একটু চলার পরেই আলো কমে আসতে লাগলো। সূয্যিমামা এ অঞ্চলে আগে আসে, আগেভাগেই আবার চলেও যায়। একটা বাঁকের মুখে গাড়ি থামলো। ডানদিকে পিরামিড-আকারের একটা টিলার উপর নাগ মন্দির। ভক্তের দল সিঁড়িভাঙা অঙ্ক কষে নাগিনীর কৃপাদৃষ্টি অর্জন করার উদ্যোগ নিল। বাকিরা টিলার পাদদেশে বিচরণ করাকেই শ্রেয় মনে করলো।

আবার চলা। একটা টানেল পেরোনো হল।

যখন একটু একটু ভাবছে সবাই "আর কতদূর রে বাবা", ঠিক তখনই, সন্ধ্যা পূর্ববর্তী আবছায়া প্রকৃতির মাঝে, আমরা এসে দাঁড়ালাম 'সে-লা'র উন্মুক্ত প্রান্তরে। ১৭,০০০ ফুট প্লাস উচ্চতার এই পাস'এ তখন হাড়-হিম করা ঠান্ডা...

সে লা'র বেশ কিছু আগে থেকেই প্রবল ঠান্ডা আর চারদিকের প্রকৃতি জানান দিচ্ছিল অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছি। পাহাড়ি উপত্যকার মায়াময় সবুজের আস্তরণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। শক্ত পাথর, রুক্ষ কাঁকড়-সম্পৃক্ত মাটির বুক থেকে বেড়োনো ছোট ছোট গুল্মের ঝাড় উদাসী করে রেখেছে সমগ্র উপত্যকা। যেন এক সর্বত্যাগী যোগিপুরুষের বিচরণ-ভূমি।

খানকতক ঘরবাড়ির শেষে একটা ছোট মনাস্টেরী; তারপরেই দোলায়মান ভূমির শেষে লম্বা ও সর্পিল এক হ্রদ, হাতছানি দিয়ে নীচে তার সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে পর্যটকদের। হলে কি হবে; হাড়-হিম শীত, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, চারদিক ঘেরা পাহাড়ের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া হাওয়ার মিলিত আক্রমণের মুখে বেশিরভাগ যাত্রী'ই উপরে চা-কফি-ম্যাগির দোকানে অবস্থানকেই শ্রেয় মনে করলো। ছাতা মাথায় কয়েকজন নীচে নামতে শুরু করলো হ্রদের পারে যাওয়ার জন্য।


নিঝুম সন্ধ্যায় অত্যুচ্চ 'সে-লা'র এই হ্রদ পর্যটককে বিষন্ন করে কখনও কখনও।

সব মিলিয়ে ঘন্টাখানেক। আবার গাড়িতে। তাওয়াং-এর আগে আর কিছু দেখার নেই। সন্ধ্যা এক্ষণে ছাইরঙা আবরণ ছেড়ে নিকষ কালো পোষাকে পাহাড়কে ঢেকে দিয়েছে।

মেঘে ঢাকা আকাশ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। উচ্চতাজনিত শীতের প্রাবল্য। গাড়িতে যাত্রীদের চোখে তন্দ্রার ঘোর নেমে আসার পক্ষে এই পরিবেশ যথোপযুক্ত।... আমি ঘুমোতে পারি না পাহাড়ের পথে চলার সময়; মনে হয় চোখ বুঝলেই কি যেন হারিয়ে যাবে, পাহাড়ের মহামহিম উপস্থিতি আড়ালে থেকে যাবে। আমি তো ওই মহামহিমের সান্নিধ্যেই থাকতে চাই সর্বক্ষণ।

(ক্রমশ)