[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ৩১
- দিনাজপুরের সম্মেলন কেমন হলো দাদা? আমার তো আর যাওয়া হয়ে উঠল না। নজরুলের কণ্ঠে খানিক কুণ্ঠার স্বর।
- কলকাতা গেলে তোমার যে ফেরা মুশকিল তা তখনই আমি খানিকটা অনুমান করেছিলাম। সে যাইহোক, দিনাজপুরে না গিয়ে ভালোই করেছ। কলকাতার অনুষ্ঠানে তোমার উপস্থিতিটাও খুব দরকার ছিল। জার্নিটাও বেশি। তোমার শরীরে চাপ পড়ত।এখন জেলেদের নিয়ে একটা ভালো করে গান রেডি করো। দিনাজপুরের চেয়ে মাদারিপুরের এই সম্মেলন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কালকেই আবার রওনা দিতে হবে।
উদ্বোধনী সঙ্গীত রচনার ফরমায়েশ দিয়ে হেমন্ত সরকার নজরুলকে মাদারিপুর মৎস্য সম্মেলনের গুরুত্ব বোঝাতে লাগলেন। নজরুলের খানিক কুণ্ঠা ছিল - কথা দিয়েও দিনাজপুরে হেমন্তদার সঙ্গী হতে পারেনি। কিন্তু হেমন্তদা তেমন কিছু বলেন নি। কাজীর খামখেয়ালি স্বভাবের কথা তাঁর অজানা নয়। তাছাড়া এলবার্ট হলের অনুষ্ঠান বেশ ভালো হয়েছে। রাম ভট্টাচার্যের জার্মান নৃত্যশিল্পী স্ত্রী ভালো পারফর্ম করেছেন। কাজীও গরম গরম গান করেছে। জনতার দাবিতে কারার ওই লৌহকপাট ছাড়াও জেলের ভিতরে গাওয়া 'তুমি ধন্য ধন্য হে' গেয়ে শোনাতে হয়েছে। পাঁচশো টাকার মতো ফান্ড তৈরি হয়েছে।
বিশ্বযুদ্ধে নজরুল নিজে সৈনিক ছিল। সরাসরি সমরাঙ্গণে না হলেও করাচির রেজিমেন্টে থেকে যুদ্ধের হাল-হকিকত স্বচক্ষেই দেখে এসেছে। হেমন্ত সরকার মনে করিয়ে দিলেন যুদ্ধের পরে লীগ অফ নেশন গঠন হবার কথা। সেটা রাজনীতির ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের আখড়া হলেও আইএলও, অর্থাৎ ইনটারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন গঠন হওয়াটা একটা বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। রাশিয়ায় সোভিয়েত গঠন হয়েছে। দুনিয়া জুড়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার এটা একটা বড়ো সুযোগ। আমরা অবশ্যই এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। কিন্তু আমাদের শ্রমিক সংগঠনগুলিকে আইএলও'র তালিকায় তুলতে পারলে তার গুরুত্ব অনেক। আসাম আর বঙ্গদেশ মিলে অন্তত সাতলক্ষ জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ আছে, বলা যেতে পারে মাছধরা শ্রমিক। কৃষিশ্রমিকদের আলাদা করা খুব মুশকিল। কারণ ভূমিহীন বিশুদ্ধ শ্রমিক যেমন আছে, ভূমির মালিক ছোটোখাটো গৃহস্থরাও সবাই শ্রমিক। পরিবারের সবাই মিলে নিজের জমিতে নিজেরাই খাটে। কিন্তু এতো বড়ো মৎস্যজীবী শ্রমিক সংঘ বিশ্বেই কম পাওয়া যাবে। এটা আমাদের ওয়ারকার্স এন্ড পীজ্যান্ট পার্টির দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে।
হেমন্তদা কত গভীরভাবে ভাবেন! আন্তর্জাতিক শ্রমিক ঐক্যের এটাও একটা উত্তরণের পথ - নজরুলের নতুন করে একটা শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হলো। নিজে মনেপ্রাণে সাম্যবাদী মানুষ, বঞ্চিত শোষিত শ্রমিকদের নিয়ে বিপুল আবেগ। কিন্তু পরিকল্পিত ভাবে শ্রমিকদের সংগঠন গড়ে তাকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সামিল করার মতো বিষয় নিয়ে ভাবনা আসেনি। সেই আবেগকে উস্কে দিয়ে রাতেই লিখে ফেললেন সম্মেলনের জন্য জেলেদের গান -
আমরা নীচে পড়ে রইব না আর
শোনরে ও ভাই জেলে,
এবার উঠব রে সব ঠেলে!
ওই বিশ্ব-সভায় উঠল সবাই রে
ওই মুটে মজুর হেলে।
এবার উঠব রে সব ঠেলে।।
গান তো নয়, সুরের সুতোয় গাঁথা দীর্ঘ কবিতা। ধ্রুপদের পরে আটখানা অন্তরা, সেও একেকটা আট লাইনের। মহাভারতের মৎস্যগন্ধার রেশ ধরে মল্লভূমির মল্ল-বীর বলে সাত লক্ষ ধীবরকে অত্যাচারী শোষক জমাদারের বিরুদ্ধে রুখে ওঠার আহ্বান জানিয়ে শেষ করলেন গানটি। কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য গান লিখেছেন, ছাত্রদের জন্য আলদা মার্চসঙ্গীত লিখেছেন। কিন্তু ধীবরদের জন্য গানটি লিখে নজরুলের ভিতরে একটা অন্যরকম তৃপ্তি নেমে এলো।
পরদিন ভোরবেলা কাশেমের পঙ্খীরাজে বগুলা। সেখান থেকে ইস্টবেঙ্গল এক্সপ্রেস। দর্শনা-কুষ্টিয়া হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পৌঁছাতেই বিকেল হয়ে এলো। নদী তো নয়, মেঘনা যেন সমুদ্রের মোহানা। এপার ওপার দেখা যায় না। তারি বুক জুড়ে নৌকা আর স্টিমারের ছড়াছড়ি। শ'য়ে শ'য়ে লোক। আসাম-ত্রিপুরা থেকে রাজধানী কলকাতা যাওয়ার প্রধান, বলা ভালো একমাত্র পথ এই গোয়ালন্দ ঘাট। দূর-দূরান্ত থেকে যাত্রী আর পণ্যবাহী স্টিমার এসে ভিড়ছে। কুলি আর শ্রমিকদের ছোটাছুটি, চীৎকার, চেঁচামেচি, - একটা অদ্ভুত ব্যস্ততাময় জগত। নজরুল গোয়ালন্দ ঘাটে আগেও অনেকবার এসেছেন, কিন্তু মাদারিপুরের স্টিমারযাত্রা এই প্রথম। পাশাপাশি মনের ভিতর একটা বাড়তি আগ্রহের আকর্ষণ নজরুল অনুভব করছেন - হেমপ্রভা মজুমদারও তাঁর স্বামী বসন্ত কুমার মজুমদারের সঙ্গে একই স্টিমারে মাদারিপুর যাবেন - তাঁদের সঙ্গে দেখা হবে। রেলগাড়িতে আসার পথেই হেমন্তদা সেকথা জানিয়েছেন। কুমিল্লা নিবাসী অগ্নিকন্যা হেমপ্রভার নাম অনেকবার অনেকভাবে শুনেছেন, কিন্তু কখনো সাক্ষাৎ হয়নি। এই গোয়ালন্দ থেকেই নাকি তাঁর উত্থান - হেমন্তদা বলছিলেন। স্টিমারে উঠতেই যুগলমূর্তি যেন স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছেন।
- স্বাগতম! স্বাগতম! আসুন, আপনাদের অপেক্ষাতেই আছি। বিশেষ করে অগ্নিবীণার কবিকে দেখব বলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।
হেমপ্রভা শুধু নামে নয়, চেহারাতেও হেমের ব্যক্তিত্বময়ী প্রভা বিচ্ছুরিত। প্রথম দর্শনেই নজরুল মুগ্ধ। বললেন - আমি তো গোয়ালন্দ স্টেশন থেকেই শিহরিত হয়ে আছি, কখন অগ্নিকন্যা হেমপ্রভার সঙ্গে দেখা হবে!
স্টিমারটি দোতলা। একটু বিশেষ ধরণের, সাধারণ স্টিমার থেকে আলাদা। দুইপাশে বড়ো বড়ো পাখনা ঘুরছে। অন্যগুলোতে পিছনে তলার দিকে থাকে। বসন্ত মজুমদার বললেন, প্যাডেল স্টিমার। দোতলার ডেকে কয়েকটা চেয়ার পেতে গোল হয়ে বসেছেন সবাই মিলে। পড়ন্ত বিকেলের রোদ আড়িয়াল খাঁ নদের জলে সহস্র সোনার কুচি ছড়িয়ে চলেছে। স্টিমারের কথা উঠতে বসন্ত মজুমদার এই জল-পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে নানান কথা তুলে ধরলেন। শুরু থেকেই মাত্র দুটি ব্রিটিশ কোম্পানির একচেটিয়া স্টিমার ব্যবসা। দেশীয় দু'একটা কোম্পানি স্টিমার কিনে ব্যবসা খোলার চেষ্টা করেও পারেনি। সবকিছুতেই ওরা এখন স্বদেশীর গন্ধ পায়, ভয় পায়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও একবার চেষ্টা করেছিলেন, পেরে ওঠেন নি। তাঁদের জমিদারিটা অনেকটা উত্তরে, কুষ্টিয়া-রাজশাহীতে সীমাবদ্ধ। যশোরের পরগণা ঠাকুরবাড়ির হাতে থাকলে দেবেন ঠাকুর হয়ত সাহস করে নেমে পড়তেন।
- গোয়ালন্দ চাঁদপুর বসন্তদার হাতের তালুর মতো। শ্রমিকদের নিয়ে আমরা নানান বড়ো বড়ো কথা বলছি বটে, কিন্তু এই স্টিমারঘাট এলাকার কর্মী আর শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং তাদের ন্যায্য পাওনার দাবি নিয়ে সংগঠিত যে আন্দোলন বসন্তদা গড়ে তুলেছিলেন তা একটা ইতিহাস। হেমন্ত সরকার নজরুলকে লক্ষ্য করে বললেন।
বসন্ত মজুমদার একটু জোরে হেসে মজার ছলে বললেন, শ্রমিকদের নিয়ে এতো হৈচৈ আর আন্দোলন করলাম আমি, কিন্তু নাম হলো হেমপ্রভার! গোয়ালন্দ, চাঁদপুর, কুমিল্লা এমনকি আসামের চা-বাগানগুলিতেও শ্রমিকদের সমস্যা আর ঝুট-ঝামেলা হলে তারা হেমপ্রভার কাছে যায়, আমাকে আর কেউ কিছু জিগ্যেস করে না!
মজার ছলে কথা হলেও সাধারণ ভাবে যে কোনো স্ত্রী কপট রাগ দেখায়, মজা করে প্রত্যুত্তরে পালটা কিছু বলেন। কিন্তু হেমপ্রভার প্রতিক্রিয়া অন্যরকম। সরস ভঙ্গিতেই বললেন, 'আসলে কি ভাই, পতির পূণ্যে সতীর পূণ্য! নাহলে নোয়াখাইল্যা সাধারণ মাইয়া, রাজনীতি করা স্বামীর ঘরে সাধারণ সংসারী গৃহবধূ - অল্পস্বল্প মিটিং সভা-সমিতিতে যাই বটে, কিন্তু নিজে এরকম পাগলের মতো একা পথে বেরিয়ে পড়ব তা স্বপ্নেও ভাবিনি।
- শুধু কি তাই? পথে নামার পরে ঘরের কথা, ঘরে যে একটা মানুষ আছে সেসব কথা তিনি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন! বসন্তবাবু মজা করলেন। নজরুল আগ্রহ সহকারে উপভোগ করছেন। অনুত্তেজিত হেমপ্রভার একই কণ্ঠস্বরে প্রতিক্রিয়া, বরং একটু সিরিয়াস - কথাটা কিন্তু খুব একটা মিথ্যা নয়। রক্তের স্রোতে কালচিটে হয়ে যাওয়া গোয়ালন্দ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, লাইনের পাথরে চাপ চাপ রক্তের দাগ, রাতের মধ্যে পাচার হয়ে যাওয়ার পরেও পড়ে থাকা লাশ, গুলিতে আহত ও অসুস্থ কুলি-শ্রমিকদের হাহাকার - সব মিলিয়ে আমি বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। এতো অত্যাচার! এতো হত্যা!
- শুনেছিলাম শ'য়ে শ'য়ে ঘুমন্ত শ্রমিকদের উপর পুলিশ এসে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল। নজরুল বললেন।
- শ'য়ে শ'য়ে কী? হাজার পার হয়ে দু'হাজারও হতে পারে! পরবর্তীতে সিলেট ও আসামের চা-বাগান গুলিতে গিয়ে শুনেছি বাড়ির পর বাড়ি খাঁ খঁ করছে। আমি নিশ্চিত যে তারা সপরিবার সেই রাতেই হারিয়ে গিয়েছে।
- আপনার নারী বাহিনী গড়ে তোলা, চা-বাগানে শ্রমিকদের নিয়ে কাজকর্মের কথা সেসময় কাগজে পড়তাম, কিন্তু বিস্তারিত বিবরণ ততটা বোঝা যেতো না।
- সেই সময় কলকাতার কাগজগুলিতে যেসব খবর বের হতো তা সবই আংশিক। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ঘুমন্ত নিরীহ শ্রমিকদের হত্যা করা জঘন্যতম কাজ, সেসব খবরই ছাপা হয়েছে। কিন্তু কেন এই হত্যাকাণ্ড, তার পিছনে কারা দায়ী, সেই শক্তির বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন তৈরি হলো না - অথচ অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে দেশ উত্তাল। সংবাদপত্রে তাই নিয়েই নানান খবর। ভাবুন তো, সেটাই তো ছিল এই শোষণ আর অপশক্তির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার উপযুক্ত সময়!
হেমপ্রভা দেবী শোনালেন সেই মর্মন্তুদ পিছনের কাহিনী। আসাম প্রদেশে জঙ্গল কেটে কেটে চা-বাগান তৈরি হচ্ছে। প্রচুর শ্রমিক দরকার। বিহার, মানভূম এলাকার দিকে সাহেবেরা প্রচুর আড়কাঠি ছড়িয়ে দিলেন - দরিদ্র আদিবাসীদের আকর্ষণীয় কাজের লোভ দেখিয়ে ধরে আনা হতো আসামে। সপরিবার থাকার জায়গা, নিশ্চিত কাজ, রেশন - ওদের কাছে তো লোভনীয় জীবনের হাতছানি। কিন্তু চা বাগানের ভিতরে তাদের সর্বরকম ভাবে আবদ্ধ করে দেবার ব্যবস্থা হতো। টাকার বদলে টোকেন দেওয়া হতো যাতে তারা নিকটবর্তী শহর-বাজারে না যেতে পারে। বাগানের ভিতরের দোকান থেকেই কেনাকাটা করতে হতো। জঙ্গল সাফ করে চা-গাছ রোপণ, চা-পাতা তোলা আর যৎসামান্য মজুরি - এর চেয়ে ঝাড়খন্ডের জঙ্গলে ইঁদুর শজারু শিকার করা জীবন-যাপন বেশি সুখের, বেশি স্বস্তির। গোয়ালন্দ ঘাটে তো আলাদা একটা অফিসই ছিল, এখনো আছে - শ্রমিকদের তদারকি আর বাগানে পাঠানোর ব্যবস্থার জন্য। জঙ্গলে মশা আর সাপের কামড়ে মারা যাওয়া লোকের সংখ্যা কত হাজার হবে - তার হিসেব কোনো দিন পাওয়া যাবে না, কারণ বাগানের ভিতরের খবর বাইরে যাতে না আসে তার সবরকম কড়াকড়ি। একসময় অতিষ্ঠ হয়ে শ্রমিকেরা দেশে ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো। অসহযোগের হাওয়া নিশ্চয় সেখানেও কাজ করেছে। প্রথম প্রথম গোয়ালন্দ হয়ে কিছু কিছু শ্রমিক ফিরে আসব বলে একপ্রকার পালিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু চা-বাগান ত্যাগ করার হিড়িক দেখে সাহেবরা বেপরোয়া হয়ে নানাভাবে তাদের আটকাতে লাগল। রেল কোম্পানি যাতে ওদের টিকিট না দেয় তার ব্যবস্থা করল। ওরা প্রত্যন্ত আসাম ও সিলেট থেকে পায়ে হেঁটে দলে দলে এসে গোয়ালন্দ স্টেশনে ভিড় করল। এখানেও রেলে উঠতে দেওয়া হয়না। প্ল্যাটফর্মে বৌ-বাচ্চা পরিবার নিয়ে গাদাগাদি করে শুয়ে থাকে। লাঠিসোটা দিয়ে কাজ না হওয়ায় গভীর রাতে গোর্খা সেপাইদের ডেকে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট। কী নৃশংস! কী নৃশংস!! চোর-ডাকাত নয়, বিদ্রোহী-বিপ্লবী নয়, ক্ষমতাশালী কোনো শত্রুপক্ষ নয় - হাড় জিরজিরে ঘরে ফিরতে চাওয়া কিছু নিরীহ মানুষ, তাও পথশ্রান্ত অভুক্ত, প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় - তাদের উপর কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ গুলি চালাতে পারে? এককালে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে জাহাজ ভর্তি করে দাস পাঠানো হতো শুনি। এই বিংশ শতাব্দীতে আমাদের চোখের সামনে আমাদেরই দেশের মানুষকে দাসেরও অধম অবস্থায় এরকম নৃশংসভাবে কুকুর-বিড়ালের মতো মেরে ফেলা চলছে - ভাবা যায়!
ডেকে সবাই স্তব্ধ হয়ে হেমপ্রভার বিবরণ শুনছিলেন। এই গোয়ালন্দ ঘাটেই এরকম। জঘন্য নিধনকাণ্ড ঘটে গিয়েছে, অথচ দেশ সেভাবে আলোড়িত হয় নি! নজরুল বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, অবিশ্বাস্য রকম৷ নৃশংসতা তো বটেই! কিন্তু তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হচ্ছি - ১৯২১ সালে জনজাগরণের সেই উত্তাল সময়েও এরকম ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক জগতে বড়ো রকমের হৈচৈ হলোনা! নবযুগে সাংবাদিকতার কাজ না থাকলেও আমি সেসময় সংবাদ জগতের খবরাখবর রাখতাম। কলকাতার কোনো কগজে গোয়ালন্দের ঘটনা নিয়ে বড়ো রকমের কোনো প্রতিবেদন চোখে পড়েনি - সেটা আরও বেশি বিস্ময়ের ব্যাপার।
'কিচ্ছু বিস্ময় নয়', হেমপ্রভা যেন তিক্ততার স্বরে ব্যঙ্গ প্রকাশ করলেন, 'ওরা তো সাঁওতাল, আদিবাসী, অসভ্য, বনে-জঙ্গলে থাকা নিচুজাতের লোক! ওরা তো আর ভদ্রসমাজের লোক নয়, আপনাদের কলকাতার ভদ্রসমাজ ওদের ব্যাপারে ভাববে কেন, লিখবে কেন?
হেমপ্রভা যেন রীতিমতো উত্তেজিত। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা মিলে তাঁর মুখ যেন রক্তবর্ণ। নজরুল নীরবে এই তেজস্বিনীর প্রকাশ দেখে শ্রদ্ধায় মুগ্ধ হলেন। স্তব্ধতা ভেঙে বসন্ত মজুমদার, সম্ভবত গম্ভীর হয়ে যাওয়া পরিবেশটিকে একটু সহজ করে আনার জন্যই, বললেন - হেমন্তবাবু, এই প্রসঙ্গ নিয়ে আমাকে কতবার যে গালাগালি শুনতে হয়েছে! তোমাদের কংগ্রেস তো সব ব্রাহ্মণ-কায়স্থের দল, বড়োলোক জমিদার আর পুঁজিপতি ব্যবসাদারদের দল, মুসলমান হলে আশরাফ নবাবদের দল - তোমাদের এইসব সাঁওতাল আদিবাসীদের কথা ভাবার সময় কোথায়?
- কথা তো ভুল নয় দাদা! স্বরাজ স্বরাজ বলে আমাদের এই যে এতো আন্দোলন, এতো বোমা-বন্দুক, এতো মিছিল, এতো জেলখাটা, সেখানে সাধারণ মানুষের কথা, কৃষক-শ্রমিক মুটে-মজুরের কথা কই? ব্রিটিশরা চলে গেলে যারা শাসক হবেন, সেইসব নেতারা এখনো জমিতে চাষিকে লাঙলের অধিকারটুকু দিতে অনিচ্ছুক। এই যে মৎস্যজীবীরা ক'বছর ধরে আন্দোলন করছে, নদীতে জাল ফেলতে গেলে তাদের খাজনা দিতে হয়। কেন? নদী তো প্রকৃতির দান। সেখানেও জলকর! আর সেসব জলকরের মালিকানা কার? বেশিরভাগ কংগ্রেসের নেতা। এই যে মাদারিপুরের আড়িয়াল খাঁ নদ - তার জলকরের মালিক আমাদের কাউন্সিলের সদস্য। কাকে আর কী বলবেন? দিদি তো ঠিকই বলেছেন।
সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। মাথার উপর চাঁদ, বোধহয় অষ্টমী, স্টিমারের ঢেউয়ের সাথে যেন অজস্র রুপালি ইলিশ নাচতে নাচতে সঙ্গে চলেছে। নজরুল সব মিলিয়ে যেন একটা ঘোরের মধ্যে বিভোর হয়ে গিয়েছেন।
'আরে ওসব কথা রাখো তো! কিংবদন্তী বিদ্রোহী কবি আছেন সঙ্গে, এই নদীবক্ষে কোথায় তাঁর গান শুনব - তা নয়ত যত গম্ভীর গম্ভীর আলোচনা! বলতে বলতে দ্যাখো আড়িয়াল খাঁ মাদারিপুরে চলে এসেছে।'
একসঙ্গে অনেক আলো - বোঝা যাচ্ছে মাদারিপুরের স্টিমারঘাটে ভিড়তে বেশি দেরি নেই। নজরুল আচমকাই নিজের জগতে ফিরে এলেন।
- গান তো শোনানোর অনেক সময় পাব। কিন্তু আপনার এই অভিজ্ঞতার কথা, অনুভবের কথা শোনা আমার গান শোনানোর চেয়ে বেশি দামি।
আপনার লড়াইয়ের কথা শুনেছি, নারী বাহিনী গড়ে তুলেছেন - বাংলার বুকে সবচেয়ে জরুরী কাজ এই নারীজাতির ভিতর জাগরণ সৃষ্টি করা। আপনি সেই অসাধারণ অভিযানের সারথি।মাদারিপুরে তো থাকছি দুদিন, সেখানেই আপনাকে গান শোনাব, অবশ্যই শোনাব। কিন্তু তার আগে বলুন তো - আড়িয়াল খাঁ তো মানুষের নাম? সেই নামে নদী? সেকথা শুনে চারিপাশে একটা হাসির রোল শোনা গেল।
স্টীমারের অনেক সহযাত্রীই মাদারিপুরে সম্মেলনের অংশগ্রহণকারী। দিনাজপুর রঙপুর নাটোর থেকেও অনেকে এসেছেন। বেশ ক'জন হেমন্তদার চেনা মানুষ। তাঁরাও আশেপাশে ঘিরে আছেন বিশিষ্ট নেতা এবং তারকা কবির আকর্ষণে। দিনাজপুরের সম্মেলনে যোগ দেওয়া কিছু মানুষ, সেখানে নজরুলকে দেখতে না পাওয়ার অভাব ভরপুর মিটিয়ে নিচ্ছেন। বসন্ত মজুমদারই ব্যাখ্যা দিলেন - সত্যিই এটি মানুষের নাম। আর নদীটাও ঠিক নদী ছিল না, ছিল ভুবনেশ্বর নদের একটা খাল। বর্ষায় পদ্মার সাথে যোগ হতো। পদ্মায় তখন ঠগী জলদস্যুদের খুব অত্যাচার। যখন তখন লুঠপাট হতো। আড়িয়াল খাঁ নামের জমাদার খালটাকে বড়ো করে কেটে যুক্ত করেন। শেষমেশ পুরো নদীটাই আড়িয়াল খাঁ হয়ে গিয়েছে।
আড়িয়াল খাঁয়ে অষ্টমীর চাঁদের খেলা দেখতে দেখতে নজরুলে চোখের সামনে মাদারিপুরের পূর্ণচাঁদের মুখ উঁকি দিল। হেমন্তদার মুখে পূর্ণচন্দ্রের কথা একবারও শোনা যায়নি। অথচ মাদারিপুর মানেই নজরুলের কাছে একটাই নাম - পূর্ণচন্দ্র দাস। সেই বহরমপুর জেল, কত হৈচৈ! কী প্রাণশক্তি! অদ্ভুত মনের জোর। দুর্জয় সাহস, 'মাদারিপুরের মর্দ্দবীর' বলে তাঁর জন্য কবিতা লেখা - সে লেখা হারিয়ে যাওয়া, আবার ফিরে পাওয়া নিয়ে নানান গল্প - পূর্ণচন্দ্র কি সম্মেলনে আছে? দেখা হবে? কি জানি, হয়ত আবার জেলে গিয়েছে! সেই চোদ্দ বছর বয়স থেকে সে তো অধিকাংশ সময় জেলেই কাটিয়েছে।
ইঞ্জিনের ধকধক আওয়াজ থেমে স্টিমার একসময় জেটিতে এসে ভিড়ল।
(ক্রমশ)
