বিবিধ

খাল-বিলের আখ্যান (দ্বিতীয় খণ্ড - দশম পর্ব) [ধারাবাহিক]



মমতা বিশ্বাস


প্রতিবছর লক্ষ্মী পুজোর পরের রবিবারে কুন্তীদের ইউনিভার্সিটির ব্যাচের রিইউনিয়ন হয়। পরের বছর কোথায় হবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে ঘোষক ঘোষনা করে দেয়। এবছর বোটানিক্যালের কাছে হুগলিনদী বক্ষে, লঞ্চে। ব্যবস্থা করেছে ওদের এক বন্ধু। রেলে উচ্চপদে চাকরি করে। নূপুরের এবছর রিইউনিয়নে যোগ দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা। নূপুর প্রথমবার এসেছিল। আর হয়ে ওঠেনি। M.Phil, Ph.D নিয়ে ব্যস্ততা, SSC - প্রিপারেশন। রাতদিন বইয়ে মুখ গুঁজে থেকেছে। থার্ড SSC-তে চাকরিটা হয়ে গেল। খুব দরকার ছিল। বাবা, নবীন হালদার পেরে উঠছিলেন না। চাষিদের বারোমাস হাত টানাটানি। তারা চার ভাইবোনই হিসেবি ও সমঝদার ছিল। স্টাইফেনের একটি টাকাও নিজেদের সখ- আহ্লাদে খরচ করেনি। বই, খাতা,কলম কিনেছে। বাস-ট্রেনের ভাড়া দিয়েছে। বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে গেছে ভাত, রুটি, মুড়ি, গাছের ফলমূল। পোষ্টিং পেয়েছিল উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়িতে। মেঘ-পাহাড়ের সেই স্বপ্নের দেশে। সাদা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে নীলের উঁকি ঝুঁকি - মনটাকে উড়িয়ে নিয়ে বেড়াত কত না দেশ-বিদেশে।

চাকরি পাওয়ার খুশির হাওয়া একটু ম্লান হয়েছি অভিভাবকদের - বাড়ি থেকে মেয়ে অত দূরে একলা থাকবে - একদমই ঠিক নয়। সমীরণের চাকরি পাওয়া পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে চাইলেন ওর বাবা-মা, বিশেষ করে ওর ঠাকুর মা।

'মাইয়া মানুষ অতদূর একলা থাকপ ক্যামন কইরা।'

শোন নিহারা, সমীরণ পুলা হিসাবে ঠিকই আছিল। একহাতে এতবচ্চর পড়চে। ভাব-ভালোবাসা যখন - আর দেরি করণের কাজ নাই। একজন তো কামকাজ পাইচে। জাঁকজমকের দরকার নাই, বিয়াটা দিয়া দে। তাছাড়া ওদেশে থিকা চিনা সব। আসাম থিকা আইস্যা এক গাঁয়ে বাস। খালের ঘাটে গাঙে নাইতে গ্যালে হেই দিন নাই যে ওগো সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয় না।'

রাইমণির কথার উপর আর কথা খাটে না। চাকরির দুইমাসের মাথায় ছোট্টো অনুষ্ঠান করে বিয়েটা হয়ে গেল। সমীরণ তখন ছিল বসন্তের 'সমীরণ'। ছুটি হলেই বেরিয়ে পড়ত দুজনে। কখনো মূর্তির ধারে, কখনো তিস্তার তীরে, কখনো পাহাড়ি কোনো ঝোরার পাড়ে, অথবা নির্জন কোনো পাহাড়ি গাঁয়ে। বিছানা থেকেই কাঞ্চন জঙ্ঘা ধরা দিত কখনো রুপোলী বর্ণে, কখনো রক্তিম বর্ণে, অথবা পাখির স্বর্গরাজ্যে। এখন ওর মনে হয় সেসব ছিল শুধু স্বপ্ন, বাস্তব নয়। প্রেম তো শুধুই শরীরের সুখ নয়, শরীর তো একদিন ফুরিয়ে যায়। প্রেম অমর-অক্ষয়। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে যার অনুভব। কোথাও পড়েছিল, " ইন্দ্রিয়কে প্রশ্রয় দিলে মন মরে যায়।"

সমীরণের মন মরে গেছে। ইন্দ্রিয় সুখের কাঙালপনায় উন্মত্ত না হলে, বিয়ের দশবছর পর কত ডাক্তার দেখিয়ে তাদের সন্তান এল। খুশির উচ্ছ্বাস কখনো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়েনি তার মুখমণ্ডলে। শুধু সেমিনারে যোগ দেওয়ার বাহানায় বেরিয়ে পড়েছে। গবেষণাপত্র লিখিয়ে নেওয়ার জন্য যেটুকু মিষ্টি ব্যবহার; কার্পণ্য ছিল না তাতে। স্বামী যশস্বী হলে স্ত্রীর গৌরব বাড়ে - নূপুর নিজের সব কিছু সামলে রেডি করে দেয়। পেপারটা একহাতে ধরে অন্যহাতে নূপুরকে এক ঝটকায় বুকে টেনে নিয়ে গভীর চুম্বন এঁকে দিত অধরে - যেন কত প্রেম!

নূপুরের মনে কোনো ধন্দ জাগে না।

জলপাইগুড়ি গার্লসে চাকরিটা পেয়ে একটা সুবিধা হয়েছিল, ও পিএইচডি করছিল উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সপ্তাহে একদিন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে যেত। গবেষণার জন্য সব রেফারেন্স বই বাড়িতে আনা যেত না। ওখানে বসেই নোট করত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষ বাসে ফিরত বাসায়। সমীরণ খাটে আধশোয়া হয়ে নূপুর কী বই এনেছে দেখে। তার বলে দেওয়া রেফারেন্স বইয়ের নোট খাতার পাতা খুলে দেখে নেয়। জামা-কাপড় ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে আসা নূপুরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠত, " রাতে সিদ্ধ ভাত করলেই চলবে, তবে তার আগে এককাপ চা হলে বেশ হয়। হাসি মুখের জয় সব জায়গাতেই হয়। নূপুর ছুটত, রান্নাঘরে।

নেট, সেটের প্রিপারেশন চলছিল পুরোদমে, নূপুরের। স্কুলের চাকরির দুবছরের মাথায় সেট কোয়ালিফাই করল। পাশাপাশি সিট পড়ায় সমীরণও উৎরে গেল, তবে SSC - বাঁধাতে পারল না একবারও।

নুপুরের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আসামে পড়াশোনা। ওর ঠাকুরদা পূর্ববঙ্গ থেকে প্রথমে আসামে বাসবাস করতে থাকে। ওদের চার ভাই-বোনের জন্ম আসামের বরাক উপত্যকায়। পঞ্চম শ্রেণি থেকেই লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয় ঠাকুরমার জন্য। ওদের পাড়াতে একটা গ্রন্থাগার ছিল। বাংলা ভাষায় লেখা বই। পত্র-পত্রিকা, দৈনিক সংবাদ পত্র সব বাংলা ভাষায় ছিল। অঞ্চলটা ছিল একচেটিয়া বাঙালিদের বাস। ঠাকুরমার জন্য বই দেওয়া-নেওয়ার করতে গিয়ে বই পড়ার নেশা। বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি আশাপূর্ণাদেবী, মহাশ্বেতাদেবী, সমরেশ মজুমদার পড়াছিল। ঠাকুরমা রবিঠাকুরের ভক্ত। কিছু লেখা নূপুরের মাথার উপর দিয়ে বয়ে যেত। স্কুলের পড়ার ফাঁকে পড়ে নিত সেসমস্ত বই। মাস্টার্সে স্পেশাল পেপার রবিঠাকুরের নাটক। গবেষণা রবীন্দ্র সাহিত্যে নারী। টুকরো টুকরো স্মৃতির কোলাজ ভেসে মনের ক্যানভাসে। সবচাইতে বেশি কষ্টের দিনগুলোর অতীত স্মৃতিরা এসে ভিড় জমায়? নাকি, প্রাপ্তি-বঞ্চনার হিসেব কষে... কার পাল্লা ভারি!

রিইউনিয়নে আগের দিন সকালে কুন্তী, নূপুরকে ফোন করে,"কাল আসছিস - কোন অজুহাত শুনব না"। ফাইনাল লিস্টে তোর নাম পাঠিয়ে দিয়েছি।"

'যাওয়া হবে না' বলার কোনো ফুসরৎ না দিয়েই কুন্তী ফোনটা কেটে দেয়। বনবিবিতলাতে কুন্তীকে কথা দিয়েছিল এবারের রিইউনিয়ন, সে মিস করবে না। গতকালের অশান্তির পর যাওয়ার ইচ্ছেটা কর্পূরের মতো উবে গেছে। মাস খানেক হল অন্য পাড়ায় বাসা বেঁধেছে, সমীরণ। যাওয়ার সময় বলে গেছে,' তোর ঐ কুৎসিত মুখ দেখতে আর কোনো দিন আসব না। তোর লালা, নিঃশ্বাস সব বিষাক্ত।বেঁচে থাকতে তো ডিভোর্স পেপারে সই করবি না। তুই মর। মরে আমাকে রেহায় দে।"

বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময় ছেলে বাবা বাবা করে ডাকলেও পিছন ফিরে তাকাইনি! নূপুরের আক্ষেপ এখানেই। তার জন্য নয়, অন্তত বাবুর কথা ভেবে উচ্ছৃঙ্খল যাপনের রাশ টেনে ধরা - কি উচিত ছিল না? তার উপর 'মৃত্যু কামনা' তার অন্তর আত্মাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।

ঘুম নেই চোখে। সারা রাত অনিদ্রায় কেটে গেছে। রাত গড়িয়ে সকাল হল। গতকাল রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত কিচ্ছুটি পেটে পড়েনি, মানে খায়নি। কাজের মহিলাটি রাতের খাবার, চা, ব্রেকফাস্ট সময় মতো টেবিলে দিয়ে সাধাসাধি করেও কিছুই খাওয়াতে পারেনি। ওয়াশরুম যাওয়া ছাড়া বিছানা আকঁড়ে পড়ে আছে। ছেলেটি ভয়ে মায়ের কাছে ঘেঁসছে না।

খুব ঝামেলা হয়ে গেছে সমীরণের সঙ্গে। বাগযুদ্ধে থামেনি। ধাক্কাধাক্কি হয়ে গেছে। আর ভাষা? কহতব্য নয়। বস্তির ভাষা - চোলাই বা দেশি খাওয়ার পর পেট থেকে ভুরভুর বেরিয়ে আসে যেমন! সমীরণের কিছু পেটে পড়ার দরকার পড়ে না - নূপুরের মুখ দিয়ে দুই একটা বেরিয়ে যে,আসে না - তা নয়। ঝঞ্ঝা থেমে যাবার পর অনুশোচনার অঙ্গারে দগ্ধে মরে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজের কাকিমার জোরাজুরিতে রিইউনিয়নে যাওয়ায় ঠিক করল। ড্রাইভারকে বলল সকাল ছটায় বেরবে। যাওয়ার পথে কল্যাণীতে ছেলে আর কাকিমাকে ভায়ের ফ্ল্যাটে নামিয়ে দেবে। ফেরার পথে একসঙ্গে কৃষ্ণনগরে ফিরবে। ওখানে মাও আছে। দেখা হয়ে যাবে। নামিয়ে দেওয়ার সময় দুজনকে সাবধান করে দিল " বাড়ির অশান্তির কথা একদম বলবে না।"

রবিবার হওয়ায় ফাঁকা রাস্তা। নটার মধ্যে পৌঁছে গেল। মাঝে কুন্তী ফোন করে জেনে নিয়েছে নূপুর কতদূর? ও তখন দমদম। কলকাতা এবং কলকাতার নিকটবর্তী সকলেই চলে এসেছিল ততক্ষণে।

মিতা আর নূপুর প্রায় একসঙ্গে ঢুকল। ব্রেকফাস্ট শুরু হয়ে গেছে। বুফে সিস্টেম। যার যা পছন্দ, প্লেট সাজিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দিতে মুখে পুরে দিচ্ছে গরম পণির চানা জড়ানো কড়াইশুঁটির কচুরি। সঙ্গে দুই পিস করে নলেন গুড়ের সন্দেশ। কুন্তী লক্ষ্য করল নুপুর ছাড় সকলেই প্রাণ খুলে হাসি, গল্পে মেতে উঠেছে।

কনুই-এ ঠেলা দিয়ে বলল, চল আমরা ওই কর্ণারে চেয়ার-টেবিলে বসে খায়। কিছুই তো নিলি না। মাত্র দুটো কচুরি। শরীর ঠিক আছে তো?

আছে।

কোনো সমস্যা? বিমর্ষ লাগছে কেন? বর সঙ্গে নেই বলে মন খারাপ?

বরের জন্য মন খারাপ করবে কেন? ও তো আমাদের ব্যাচমেট ছিল। আসত, আমি আসবো শুনে এলো না। সমীরণ কে চিনিস না?

বোকা বোকা, সেই সমীরণ? তোর বর? ছিনে জোঁকের মতো লেপটে থাকত তোর পিছনে! সে?

হু! সময় বড়ো বালাই। এখন আমার ছায়া মাড়াতে চাইনা।

সেকি রে! এমন ছেড়া সম্পর্ক কতদিন হল?

যবে থেকে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আর্থিক প্রয়োজন। বলতে পারিস কলেজে পার্ট টাইমার হওয়ার পর রমরমিয়ে টিউশনি শুরু হয় যবে থেকে।

সমীরণকে বিয়ে করেছিস জানতাম না। তোদের তো এক গ্রামে বাড়ি ছিল। পলদানদীর ধারে। চার কিলোমিটার সাইকেলে করে এসে বাস, তারপর আবার ট্রেন। কোন ভোরে ইউনিভার্সিটি আসার জন্য বের হতিস। আলাদা একটা টিফিন বক্স ওর জন্য আনতিস। তুই ওর প্রতি খুবই দুর্বল ছিলি, বুঝতে পারতাম - তাই সমীরণ খুব একটা ভালো ছেলে নয়; তোকে বলতে পারিনি।

সাবধান করতেই পাতিস; তাহলে এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হত না। আমি আর পারছি না। জীবন নরক হয়ে গেছে।

নূপুর রুমাল চাপা দেয় চোখের জল লুকাতে।

বলতে পারিস আমি ওর প্রতি অন্ধই ছিলাম, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। ও একটা কলেজে পড়ায়। ওর স্বরূপটা বুঝতে পেরেছি অনেক পরে যখন আর কিছুই করার ছিল না। ও চাইছে ডিভোর্স। এরমধ্যে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। ওর মা,ছেলের এই নষ্টামীকে সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। আমিও বোধহয় সেদিন ওর মাকে মাত্রা ছাড়া ভাবে দোষারোপ করেছিলাম। বলেছিলাম," কেমন মা আপনি? এমন কুলাঙ্গার ছেলের জন্ম দিয়েছেন। লোকসমাজে মুখ দেখাতে লজ্জা করে না?

বিকালে কৃষ্ণনগরে চলে আসি। পরের দিন গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মানুষ হিসাবে খুবই ভালো ওর বাবা-মা। একটা মানুষ বিছানায় বসে গলায় ফাঁস পরিয়ে আত্মহত্যা করল, অবিশ্বাস্য মনে হয়।

আজ ওসব কথা থাক। পরবর্তী সময়ে শুনে নেব। চল এখন। যেমন খুশি বলো, যেমন খুশি গাও - শুরু হচ্ছে। তুই ভালো আবৃত্তি করতিস। একটা শোনাতেই হবে।

(ক্রমশ)