গল্প ও অণুগল্প

স্পর্শ (প্রথম পর্ব)



অচিন্ত্য সাহা


শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে একটু অবাক হয়ে যায় নন্দিনী। আজও সিমরান অনুপস্থিত। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আর মাত্র তিন মাস বাকি। সামনেই নির্বাচনী পরীক্ষা। এই সময় পরপর কয়েক দিন স্কুলে আসছে না সিমরান। লক্ষ্মণ ভালো ঠেকছে না। ক'দিন আগেই বলেছিল - আমি ভালো নেই ম্যাম। এমন একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেটা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।

- কেন রে, আবার কী সমস্যা? ইমরান...

- ইমরান তো আছেই, তার থেকেও এককাঠি উপরে আমার বাবা।

- বাবাকে ভালো করে বুঝিয়ে বল। সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা।

- আমি আর পারছি না ম্যাম। হয়ত আমাকে...

কথা শেষ না করে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল সিমরান। অনেক চেষ্টা করেও ওর মুখ থেকে একটা কথাও বের করতে পারেননি তিনি।

বিগত দশ বছর আগে মদন মোহন তর্কালঙ্কার উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কাজে যোগদান করে নন্দিনী। কো-এডুকেশন স্কুলে কাজ করার অভিজ্ঞতা নন্দিনীর খুব একটা ভালো নয়। তাই সে প্রথম থেকেই বেশ সতর্ক ছিল। তবুও মাঝে মাঝেই নানারকম অপ্রাসঙ্গিক ঘটনা ঘটে যাতে সে খুব বিব্রত বোধ করে। সবসময় এগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক এত ভালো সাদাসিধে প্রকৃতির মানুষ যে খুব জোরে কথা বলতে গেলেও তাঁর বুক কাঁপে এবং তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। তবুও সবার মধ্যে একটা অদৃশ্য বাঁধন রয়েছে। যার ফলে অফিসিয়াল কাজকর্মে খুব একটা সমস্যা হয় না।

সিমরান এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আর কিছুদিন পরেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। স্কুলের 'কন্যাশ্রী ক্লাব'-এর সম্পাদিকা হিসেবে এর আগে ওদের গ্রামের বেশ কয়েকটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ওর বাবা জোর করে ওর মাসতুতো ভাই ইমরানের সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়ে দেয়। তখন সিমরান অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। বিয়ের আগে প্রায় দুই সপ্তাহ ওকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। ছোটো বোন নাসিমাকে দিয়ে গোপনে সে নন্দিনী ম্যামকে খবর পাঠিয়েছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নন্দিনী পকসো আইন প্রয়োগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সিমরান তাতে সাড়া দেয়নি। কেননা ও জানতো নন্দিনী ম্যাম কোনোভাবে ব্যাপারটার সাথে জড়িয়ে পড়লে এখানকার মানুষ ছেড়ে কথা বলবেন না। ওঁনার কোনোরকম ক্ষতি হোক সেটা সিমরান চায়নি। শুধু এইটুকুই বলতে চেয়েছিল - ম্যাম যেন ইমরানকে বুঝিয়ে বলেন যে, সে পড়াশোনা করতে চায় সেই সুযোগটা যেন ওকে দেওয়া হয়।

ম্যাম এসে ইমরানের সাথে একান্তে প্রায় ঘন্টা দেড়েক কথা বলেছিলেন। ম্যামের সামনে সে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল যে - "সিমরানের লেখাপড়ার ব্যাপারে আমি কখনও বিরোধিতা করব না। বরং সহযোগিতা করব"।

নন্দিনী ম্যাম ইমরানকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি। কেননা ওর মুখের কথা এবং চোখের ভাষার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। সেই কারণে তিনি সিমরানের বাড়ি গিয়ে ওর বাবা-মা'র সাথে সরাসরি কথা বলেন। মা কিছুটা উদার নমনীয় হলেও বাবা ভীষণ গোঁড়া। তিনি তাঁর যুক্তি থেকে বিন্দুমাত্র সরতে রাজি নন। তাঁর মতে তিনি সঠিক কাজই করেছেন। বর্তমানে লেখাপড়ার কোনো মূল্য নেই। কেননা লেখাপড়া শিখে চাকরি পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অকারণে অর্থ ব্যয় করাটাকে তিনি পছন্দ করেন না।

ম্যাম বলেছিলেন - "বিদ্যা শিক্ষার সঙ্গে চাকরির বিষয়টাকে গুলিয়ে ফেলবেন না। হয়তো এখন সময় প্রতিকূল, এমন একটা সময় আসতে পারে যখন পাশার দান উল্টে যেতেও পারে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। তাছাড়া পড়াশোনা অন্তরের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যের আলোকে উদ্ভাসিত হয় সমগ্র বিশ্ব"।

সিমরানের বাবা কতটুকু বুঝেছিলেন তা বলা শক্ত। কিন্তু ওর মা নন্দিনী ম্যামকে পুরোপুরি সমর্থন করেছিলেন। সিমরানের মা পড়াশোনার মর্যাদা দিতে জানেন। তিনি ম্যামকে বললেন - "ম্যাম, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি সিমরানকে ফিরিয়ে এনে ওর পড়াশোনার ব্যবস্থা করবো"।

তার প্রায় মাসখানেক পরে সিমরান স্কুলে আসে এবং মনটাকে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা শুরু করে। প্রতি বছর ক্লাসের পরীক্ষায় ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে স্কুলের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির শপথ নেয়। মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম কুড়ি জনের তালিকায় ওর নাম দেখে সমস্ত গ্রাম উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। নন্দিনীর হার না মানা মনোভাবকে সবাই কুর্নিশ জানান।

সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। সিমরানের বোন নাসিমা এখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। ওকে একবার ডেকে জিজ্ঞেস করলে সিমরানের খবর পাওয়া যেতে পারে। নাসিমাকে ডেকে পাঠান নন্দিনী। সিমরানের বোন নাসিমা চঞ্চল প্রকৃতির এবং সাহসীও বটে! নন্দিনী স্টাফ রুমে বসে পড়াশোনা এবং নিজের লেখালেখি নিয়ে সময় কাটান। রাজনৈতিক বিতর্কে সাধারণত নীরব থাকেন কিন্তু মানবতা বা মানবাধিকারের প্রশ্নে নন্দিনী চুপ থাকতে পারেন না। নাসিমা অন্যান্য স্যার বা ম্যামদের সাথে যেমন সহজেই মিশে যেতে পারে নন্দিনী ম্যামের সাথে সেভাবে পারে না, একটু ভয় ভয় লাগে। স্টাফ রুমের সামনে তখন কীসের একটা জটলা দেখে ও থমকে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে ইলেভেনের ছেলে-মেয়েরা একটু বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 'কন্যাশ্রী ক্লাব'-এর সম্পাদিকা হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে তাই নিয়ে বচসা। নন্দিনী ম্যাম এসে বললেন - "যাও, তোমরা তোমাদের ক্লাসে যাও। তোমরা ক্রমাগত যেসব ঘটনা ঘটিয়ে চলেছ তাতে তোমাদের পানিশমেন্ট হওয়া উচিত। এখানে এসেছ তোমার ছোটো ভাই-বোনদের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে? আগামীকাল আমার ক্লাস আছে তখন আমি দেখছি তোমাদের কতটা বাড় বেড়েছে"।

নন্দিনী ম্যামের হুঙ্কার শুনে মুহূর্তের মধ্যেই সব ফাঁকা হয়ে গেল। নাসিমা ভাবতে লাগলো - এখন কি ম্যামের সামনে যাওয়া ঠিক হবে?

- "নাসিমা এদিকে আয়। আমি তোকে ডেকেছি"।

গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে নাসিমা। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। নন্দিনী ম্যাম কী বলবেন কে জানে? নন্দিনী তখন তাঁর ডায়েরিটা বন্ধ করে ব্যাগে ভরে নাসিমাকে বলেন - "চল, একটু বাইরে যাই। এখানে সব কথা বলা যাবে না"।

স্কুলের সামনে প্রকাণ্ড খেলার মাঠ। বছর দু'য়েক আগে প্রাচীর দিয়ে সীমানা ঘিরে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীরের ধার বরাবর বেশ কিছু গাছও লাগানো হয়েছে। কয়েকটি গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কাঞ্চন, পাতাবাহার, বটলব্রাশের সবুজ কচিকচি পাতাগুলো সূর্যের কিরণে ঝলমল করছে। মাঠের উত্তর প্রান্তে অশ্বত্থ গাছের ডালগুলো ছেঁটে দেওয়া হয়েছে, চটকা গাছের তলাটা বেশ পরিষ্কার, সেগুন, মেহগনি, শিশু আর লম্বু গাছগুলো উত্তর দিকের আকাশটাকে ঢেকে দিয়েছে। ওদিকে সিমেন্টের তৈরী একটি বাঁধানো বেঞ্চে গাছের ছায়ায় গিয়ে নন্দিনী নাসিমাকে নিয়ে বসেন। নাসিমা একটু ইতস্তত বোধ করে। ম্যাম জিজ্ঞেস করেন - "হ্যাঁ রে সিমরানের খবর বলতে পারিস? ও এখন আছে কোথায়? কী করছে"?

- "ম্যাম, কয়েক দিন আগে ইমরান ভাইজান এসে ওকে নিয়ে গেছে। বলেছে আর পড়াশোনা করতে হবে না। এখন বাড়ি চলো, মা খুব অসুস্থ আমি একা একা সবকিছু সামাল দিতে পারছি না। দিদি যেতে রাজি হয়নি বলেছিল - ক'দিন পরেই আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হলেই আমি যাবো। আর তো ক'টা দিন একটু কষ্ট করে চালিয়ে নাও। আমি ঠিক যাবো। কিন্তু ওর কথার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে গেছে"।

- "মা-বাবা কেউ প্রতিবাদ করেননি"?

- "মা অনেক করে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাবা বললেন - বিয়ের পর স্বামীর ঘরই মেয়েদের আসল ঠিকানা। এতে তোমার বা আমার কিছু করার নেই। মা বললেন ওকে অন্তত ওর পরীক্ষাটা শেষ করতে দাও। তারপর যাহোক একটা সিদ্ধান্ত নিও, আমি আপত্তি করবো না। কিন্তু বাবা এবং ইমরান ভাইজানের একগুঁয়ে আচরণের কাছে মা এবং দিদি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে"।

সবটা শোনার পর নন্দিনী নাসিমাকে ক্লাসে যেতে বললেন। নাসিমা চলে যাবার পর নন্দিনী কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ্দুর ওঁর মুখের ওপর এসে পড়ল। পতিত সূর্য কিরণ ওঁকে সচকিত করে তুলল। সিমরানের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে নন্দিনী ফিরে গেল তাঁর স্কুল জীবনে। দমদম স্টেশনের কাছে একটা কো-এড স্কুলের ছাত্রী ছিল নন্দিনী। অত্যন্ত মেধাবী, সঙ্গীতপ্রিয়, চিত্রাঙ্কন, ক্যারাটেতে ব্ল্যাকবেল্ট প্রাপ্ত এবং গদ্য পদ্য রচনায় পারদর্শী একটি ফুটফুটে জ্যোৎস্নার মতো মেয়ে নন্দিনী। এসবের বাইরে কোনো জীবন তাঁর পছন্দ নয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করার পর ইংরেজি সাহিত্যে সাম্মানিক নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।

নন্দিনীর বাবা নীহারবাবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজির ওপর গবেষণা করছিলেন। ক'দিন ধরে তাঁকে কেমন আনমনা, উদাসীন দেখাচ্ছিল। নন্দিনীর মা বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছিলেন কিন্তু কোনো স্পষ্ট উত্তর পাননি। তিনি ভেবেছিলেন কোনো জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণার জন্য হয়ত এমন চুপচাপ আছেন। তাই তিনি খুব একটা জোরাজোরি করেননি। নন্দিনী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে ঘটনাটা শুনতে পায়। মায়ের কাছে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। তাতে বলা হয় - "আপনার স্বামী নীহারবাবু আমাদের হেফাজতে আছেন। ওনাকে জীবিত ফিরে পেতে চাইলে আপনার মেয়ে নন্দিনীকে এক ঘন্টার মধ্যে আমাদের কাছে পাঠান। ঠিক একঘন্টা পরে আমার একজন লোক গিয়ে আপনাদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়বে, ওর সাথেই আপনার মেয়েকে পাঠাবেন। কোনোরকম চালাকি করলে নীহারবাবুকে জীবন্ত ফেরত পাবেন না। কথাটা মনে রাখবেন"।

ফোনটা কেটে যায়। নন্দিনী অনেক চেষ্টা করেও কোথা থেকে কে ফোন করেছে তা উদ্ধার করতে পারে না। যতবারই ডায়াল করে ততবারই নট রিচেবল ভয়েস শুনতে পায়। এদিকে সময় যত এগিয়ে আসে মায়ের চিন্তা বাড়তে থাকে। নন্দিনী মাথা নীচু করে শুকনো মুখে বসে থাকে। একঘন্টা হতে আর মিনিট দশেকের মতো বাকি আছে। হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে উঠল। নন্দিনী সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে রিসিভারটা তুলে নিয়ে বলে - "হ্যালো কে বলছেন"?

ও প্রান্তের গম্ভীর ও বাজখাঁই গলার স্বরে নন্দিনীর কান ফেটে যাবার মতো অবস্থা হলো - "শোনো মেয়ে তোমার সাথে খোশগল্প করার জন্য ফোন করিনি। হাতে সময় বেশি নেই। বাবাকে বাঁচাতে চাইলে এক্ষুনি গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের তিন নম্বর গেটে চলে এসো। ওখানে একটা ব্ল্যাক জাগুয়ার থাকবে। ওই গাড়িতে উঠে চুপচাপ চলে আসবে। আর হ্যাঁ, কোনোরকম চালাকি করলে..." - ফোনটা কেটে গেল।

নন্দিনী বারকয়েক হ্যালো-হ্যালো করে হতাশ হয়ে বসে পড়ল। মা বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করলেন - "কে? কী ব্যাপার? আমাকে কিছু বল, ভয়ে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে"।

নন্দিনী মা'কে সান্ত্বনা দিয়ে বলল - "কিছু চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আসছি। তুমি লালবাজারে ছোড়দাকে ফোন করে জানাও গিরিশ পার্ক স্টেশনের তিন নম্বর গেটে গিয়ে আমাকে ফলো করতে, বলবে সাধারণ পোশাকে আসতে। বাবার বিষয়টিও জানিও। হ্যাঁ, মোবাইল থেকে ফোন করবে"।

নন্দিনী ওর হাতব্যাগের মধ্যে মোবাইল, নিউ মার্কেট থেকে কেনা ফরাসি পারফিউম আর কোমরে নান-চাকুটা বেঁধে নিয়ে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে যায়। মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে গিরিশ পার্কের টিকিট কেটে উঠে বসে। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ক্যারাটের বিভিন্ন মারপ্যাঁচগুলো, ময়দানে গিয়ে ওর প্রশিক্ষক কেশব দত্তগুপ্তের কাছ থেকে শিখেছিল। ছোড়দা প্রলয় ওর থেকে বছর দশেকের বড়ো। দুই ভাই বোনে বেশ মন দিয়েই ক্যারাটে শিখেছিল। আরও একটা বিষয় শিখেছিল যেটার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে অনুশীলন করতে হয়েছিল। টানা পনেরো মিনিট নিঃশ্বাস বন্ধ করে জলে ডুবে থাকা। কেশববাবু বলেছিলেন - "শিখে রাখ নন্দিনী, কখন কোন কাজে লাগে বলা যায় না"।

তিন নম্বর গেট থেকে বেরিয়েই ব্ল্যাক জাগুয়ারটাকে দেখতে পেল। গাড়িটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই পিছনের গেটটা হঠাৎ করে খুলে যায় এবং ভেতর থেকে কে যেন বলে - "কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে বসুন"।

কিছুটা দূরে রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে প্রলয় সব লক্ষ্য করছিলেন। নন্দিনী হাতের ঈশারায় বুঝিয়ে দিল এটাকেই ফলো করতে। গাড়ির সিটে বসামাত্র সিটে বসে থাকা একটা বলিষ্ঠ হাত নন্দিনীর নাকে সুগন্ধি রুমাল চেপে ধরল। নন্দিনী আগেই বুঝতে পেরেছিল এমন একটা কিছু হবে। সঙ্গে সঙ্গে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ঘাপটি মেরে বসে রইল। ভাবখানা এমন যেন ওর চেতনা লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সবটাই লক্ষ্য করতে লাগল। ইচ্ছে করলে এদেরকে খুব সহজেই কাবু করতে পারত কিন্তু বাবার কথা মনে করে চুপ করে পড়ে রইল। পিছনে ছোড়দার বাইকের শব্দ কানে আসছে। চোখ বন্ধ করে বুঝতে পারে সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে কিছুটা এগিয়ে জাগুয়ার বাঁ দিকে বি. বি. গাঙ্গুলি স্ট্রিট ধরে বিধান সরণি হয়ে শ্যামবাজারের দিকে এগিয়ে চলেছে। ছোড়দা ওর মোবাইলের লোকেশান ট্র্যাক করে নিল। যদি কোনো কারণে জাগুয়ার থেকে পিছিয়ে পড়ে তাই এই ব্যবস্থা। মিনিট দশেকের মধ্যে গাড়িটা একটা ছোট্ট গলির মধ্যে ঢুকে থেমে গেল। আবছা অন্ধকারে চারপাশ ঢেকে গেছে। দু'জন ষণ্ডামার্কা ছেলে এসে নন্দিনীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ধরাধরি করে অন্ধকার একটা ঘরে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেয়। নন্দিনী অনুমান করে বাগবাজারের আশেপাশেই কোনো একটা জায়গা হবে।

- "ওরে নরপিশাচের দল আমার ফুটফুটে মেয়েটাকেও ছাড়লি না? খুব ভুল করেছিস তোরা। জানিস না কাকে নিয়ে এসেছিস। একটু পরেই টের পাবি"।

বাবার গলা শুনে নন্দিনী কিছুটা আশ্বস্ত হয়। বাবা সুস্থ আছেন। ছোড়দা কতদূর কে জানে? হঠাৎ কেউ ওর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেয়। নন্দিনী সচকিত হয়ে জ্ঞান ফেরার ভান করে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে দেখতে পায় বাবা ওর সামনেই একটা চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আছেন। নন্দিনীর দু'পাশে দুটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। মূল দরজার পাশে দু'জন এবং ঘরের মাঝখানে দলের পাণ্ডা বসে আছে। নন্দিনীর সমস্ত শরীর জুড়ে তখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ। মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললো - "তোমরা কে? কী চাও আমাদের কাছে"?

- "দেখ নন্দিনী, আমরা তোমাকেই চাই। তোমার বাবাকে আমাদের দরকার নেই"।

দরজার পাশে থাকা একটা ছেলেকে ডেকে বললো - "এই ছোকরা, ওই বুড়ো লোকটার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দে। আর ওঁর চোখ বেঁধে বাইরে নিয়ে গঙ্গার পাড়ে কোনো একটা জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আয়। তারপর মেয়েটার ব্যবস্থা করছি"।

নন্দিনী দেখতে পায় যে-দুটো ছেলে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল তার মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বাবার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়। আর একজন হাতে একটা মোটা কালো কাপড় দিয়ে নীহারবাবুর চোখ বাঁধার জন্য এগিয়ে যায়। দলের পাণ্ডা বসে বসে নির্দেশ দিচ্ছে। নির্দেশ অনুযায়ী ওরা কাজ করছে। অল্প আলোয় বোঝা গেল ওঁর হাতে একটা আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।

নন্দিনী একটু জোরে শ্বাস নিয়ে বললো - "আমার বাবার গায়ে যে হাত দেবে আমি আগে তার হাতদুটো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবো"।

- "কী বললি হতচ্ছাড়ি? তোর এতবড় সাহস আমার সামনে আমার ছেলেদের ধমকাচ্ছিস"?

পাণ্ডা এগিয়ে এসে নন্দিনীকে স্পর্শ করতেই নন্দিনী ডান হাঁটু দিয়ে সজোরে পাণ্ডার গোপনাঙ্গে আঘাত করতেই সে মাটিতে শুয়ে কাতরাতে লাগল। বাকিরা কাছাকাছি আসতেই কোমর থেকে নান-চাকুটা বের করে সজোরে চালিয়ে দিল নন্দিনী। আচমকা আঘাতে সবাই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

(শেষাংশ পরের পর্বে)