
একলব্য দ্রোণের একটি মাটির ভাস্কর্যের সামনে ধনুর্বিদ্যা অনুশীলন করছেন। শিল্পীঃ নন্দলাল বসু।
মহাভারতের সমাজ ব্যবস্থায় চতুর্বর্ণের পাশাপাশি পঞ্চজন সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। নানা যুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুমান করা হয় যে এই পঞ্চজন হল ভারতের এক অতি প্রাচীন নিষাদ জনজাতি। শৌর্যে বীর্যে তারা ক্ষত্রিয়দের থেকে কোনও অংশেই কম ছিল না। ভারতের বিভিন্ন স্থানে এরা স্বাধীনভাবে নিজেদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি বজায় রাখত। আর্যরাও এদের উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা দেখায়নি। মহাভারতের আমলে অর্থাৎ হস্তিনাপুর যখন প্রবল পরাক্রমী সেই সময়ে হস্তিনাপুর রাজ্যের কাছাকাছি একলব্যের পিতা হিরণ্যধনুর আধিপত্য ছিল। কাজেই একলব্য নিজেও গোষ্ঠীপতির সন্তান। সমাজে তাঁর মর্যাদাও কিছু কম নয়। কিন্তু একলব্যের সূচনা পর্বে দেখা যায় তিনি বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়ে পড়লেন। অথচ মহাভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার পরিকাঠামোতে একলব্যের প্রতি এই উপেক্ষা কাম্য ছিল না।
একলব্যকে প্রথম দেখা যায় শিক্ষাগুরু দ্রোণাচার্যের শিক্ষার আসরে। দ্রোণাচার্য কৌরব ও পাণ্ডবদের শিক্ষাগুরু মনোনীত হয়েছেন। দেশ-বিদেশ থেকে ছাত্ররা এসে তাঁর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করে। নিষাদ গোষ্ঠীর রাজা হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য এই ভরসাতেই দ্রোণাচার্যের কাছে উপস্থিত হন অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষার জন্য। দ্রোণাচার্য কিন্তু একলব্যকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করলেন না। জাতি বিদ্বেষ বা তিনি বর্ণাশ্রমে বিশ্বাসী তা ঠিক নয়, কোথায় যেন এই পৃথক নিষাদ জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তাঁর ভাবনাচিন্তায় অনুদারতা বা সীমাবদ্ধতা ছিল।
দ্রোণাচার্য ব্রাহ্মণ ছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণদের চিরাচরিত যাগযজ্ঞ থেকে সরে এসে তিনি অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেছেন এবং অস্ত্রশিক্ষা দেওয়াই তাঁর জীবিকা। ভীষ্ম তাঁকে কৌরব ও পাণ্ডবদের অস্ত্রগুরুর পদ দিয়েছেন। কাজেই তিনি হস্তিনাপুর রাজবংশের বেতনভুক কর্মচারী। এমতাবস্থায় একজন নিষাদ পুত্রকে অস্ত্রশিক্ষা দেওয়াটা তাঁর উচিত হবে কিনা এই নিয়ে তাঁর দ্বিধা ছিল। রাজপুত্ররা তাদের অহমিকায় নিষাদপুত্রকে সতীর্থ হিসাবে গ্রহণ নাও করতে পারে। কাজেই দ্রোণাচার্য একলব্যকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করতে অসম্মত হন।
একলব্য দ্রোণাচার্যকে দ্বিতীয়বার অনুরোধ করেন নি। গুরুকে প্রণাম করে তিনি চলে আসেন তাঁর অরণ্য কুটিরে। সেখানে তিনি দ্রোণাচার্যের এক মৃন্ময় মূর্তি গড়ে তোলেন। নিভৃত সেই স্থানে তিনি গুরুর মূর্তির সামনে একাগ্র চিত্তে অস্ত্রশিক্ষার সাধনায় ব্যাপৃত হন। একলব্যকে দ্রোণাচার্য শিষ্যপদে গ্রহণ করেন নি কিন্তু একলব্য সর্বান্তঃকরণে দ্রোণাচার্যকেই গুরু হিসাবে বরণ করেছিলেন। একলব্যদের রাজ্যটি ছিল হস্তিনাপুরের কাছে। দীর্ঘদিন ধরে অন্তরালে থেকে একলব্য তাই দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষার কৌশল মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করার সুযোগ পেয়েছেন। শ্রদ্ধা, একাগ্রতা, ও নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে নিভৃতে তিনি অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার সাধনায় নিজেকে নিমগ্ন রাখেন।
ব্যাসদেব এরপর কাহিনীতে একটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন। তিনি ঋষি বটে কিন্তু কানীন সন্তান। কুমারী মায়ের গর্ভে তাঁর জন্ম। সমাজের অবহেলিত বা উপেক্ষিতদের প্রতি তাঁর একটি কোমল অনুভূতি ছিল। কাজেই দ্রোণাচার্যের একলব্যের প্রতি উপেক্ষা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল। ক্ষত্রিয় রাজপুত্রদের অহংবোধ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এদেরকেও তিনি শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। তারাই যে সর্বশ্রেষ্ঠ এটা ভাবা ভুল। বিশেষ করে অর্জুন, যিনি নিজেকে তুখোড় ধনুর্ধর বলে ভাবেন।
ব্যাসদেবের লেখনীতে ফুটে উঠেছে একটি মর্মস্পর্শী চিত্র। দ্রোণাচার্যের অনুমতি নিয়ে পাণ্ডব এবং কৌরবরা রথে করে মৃগয়া করতে বেরিয়েছেন। সঙ্গে মৃগয়ার নানাবিধ উপকরণের সাথে ছিল শিকারী কুকুর। এটাই তখনকার মৃগয়ার রীতি। রাজপুত্ররা শিকারের সন্ধানে ব্যস্ত রইলেন এবং শিকারী কুকুরটি এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে একলব্যের এলাকায় এসে হাজির হল। নির্জন বনে নিকষ কালো একটি মানুষ, সারা গায়ে ধুলো মাটি মাখা, রুক্ষ চুল, পরণে এক টুকরো মৃগচর্ম, হাতে ধনুকবাণ। কুকুরটি একলব্যকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল। শব্দ শোনামাত্রই একলব্য বিরক্ত হলেন কারণ তাঁর একাগ্র সাধনায় বিঘ্ন ঘটেছে। পরপর সাতটি বাণ ছুঁড়ে কুকুরটির মুখ তিনি বন্ধ করে দিলেন। এই তীরবিদ্ধ মুখ নিয়ে শিকারী কুকুরটি পাণ্ডব ভাইদের খুঁজে বের করে তাদের সামনে উপস্থিত হল। পঞ্চপাণ্ডব বুঝতে পারলেন যে এমন কোনও অসাধারণ ধনুর্বীর এই অরণ্যে আছেন যাঁর ক্ষিপ্রতা অসাধারণ এবং দূর থেকে শুধুমাত্র শব্দ শুনেই তিনি লক্ষ্যভেদ করতে পারদর্শী। অহমিকা এবং ঈর্ষা দুটোতেই তীব্রভাবে জর্জরিত হলেন অর্জুন। কারণ এই অসাধারণ ব্যুৎপত্তি তাঁর নেই। পাণ্ডবরা একলব্যকে খুঁজে বের করে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলেন। একলব্য সংক্ষিপ্তভাবে জানালেন তিনি নিষাদ গোষ্ঠীর অধিপতি হিরণ্যধনুর পুত্র এবং দ্রোণাচার্যকে তিনি অস্ত্রগুরু রূপে মান্য করেন।
অর্জুন দ্রোণাচার্যকে অভিযোগ জানালেন যে তিনি অর্জুনকে বলেছিলেন যে তাঁর অধীত সকল বিদ্যা একমাত্র তাকেই তিনি দান করবেন। তাহলে নিষাদপুত্র একলব্য এই আশ্চর্য দু'টি বিদ্যা কীভাবে লাভ করল এবং সে বলেছে দ্রোণাচার্যই তার অস্ত্রগুরু। দ্রোণ আশ্চর্য হলেন। এরকম কোনও অস্ত্রশিক্ষা তিনি কোনও নিষাদকে দেন নি। তিনি একলব্যের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। অনুভব করলেন একলব্যের যে নৈপুণ্য যা সে একাগ্র সাধনায় নিজ যোগ্যতায় অর্জন করেছে তার ধারেকাছে যাওয়ার ক্ষমতা অর্জুনের নেই। একলব্য গুরুকে দেখে প্রণাম করলেন। বিনিময়ে দ্রোণাচার্য একটি নিন্দিত কাজ করলেন। গুরুদক্ষিণা হিসাবে তিনি একলব্যের ডান হাতের বুড়ো আঙুল চাইলেন। অর্থাৎ তিনি চাইলেন একলব্যের দারুণ ক্ষতি যাতে সে ধনুর্বিদ্যায় আর নিপুণ না থাকে। একলব্য বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে দ্রোণাচার্যকে গুরুদক্ষিণা দিলেন।
মহাভারতে ধর্মের নামে যে প্রহসনগুলি বার বার উঠে এসেছে সেখানে দেখা যায় যে যেনতেন প্রকারেণ পাণ্ডবদের সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অশনি সংকেত তখনও নেই, কিন্তু তার ভূমি ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে। অর্জুন যাতে অপরাজেয় বীর হতে পারে তার জন্য প্রথমেই একলব্যকে হীনশক্তি করে দেওয়া হল। ব্যাসদেব নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘটনাটি বিবৃত করেছেন। উপলব্ধির দায়িত্ব আমজনতার।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
