ভ্রমণ ও দেশ-বিদেশ

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক, মর্নিংগ্লোরি পুল ও ওল্ড ফেইথফুল গিজার



শম্পা গুহ মজুমদার


আজকাল অনেকেই আমেরিকাতে বেড়াতে যান। আমেরিকা খুবই বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। বৈচিত্র্যময় এই দেশে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। আর আমেরিকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক। এটি নানা ধরনের বন্যপ্রাণী ও বিভিন্ন প্রকার ভূতাপমাত্রাগত বৈশিষ্ট্যের জন্য প্রসিদ্ধ। এই পার্ক প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইয়োমিং (Wyoming) রাজ্যে অবস্থিত হলেও মন্টানা (Montana), ইডাহো (Idaho) অঞ্চলে বিস্তারিত। আমরা মে মাসের শুরুতে লস এঞ্জেলেস থেকে বাস ট্রিপ নিয়েছিলাম। আট রাত ও নয় দিনের ট্রিপটা খুবই হেকটিক ছিল। কিন্তু হারিকেন ট্রিপ না করলে এতগুলো জায়গা দেখা সম্ভব নয়। লস এঞ্জেলেস থেকে লাস ভেগাস, সল্টলেক সিটি হয়ে আমরা ইয়েলোস্টোন সিটিতে এসে পৌঁছলাম। এখানেই দুই রাত থাকবো। সাজানো গোছানো খুব ছোট্ট শহর। আধ ঘন্টা হাঁটলেই পুরো শহরটা দেখা হয়ে যায়।

ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের সবথেকে আকর্ষনীয় ফোয়ারাটির নাম হল ওল্ড ফেইথফুল গিজার (Old Faithful Geyser Basin)। এখানে প্রতি এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর পরই মাটির অভ্যন্তর থেকে ৩২ হাজার লিটার ফুটন্ত জল নির্গত হতে দেখা যায়, যা ১৮৫ ফুট পর্যন্ত উপরে ওঠে। ওই ফুটন্ত জলস্তম্ভের স্থায়িত্ব ৫ মিনিট পর্যন্ত চলতে থাকে। ৩০০ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে পর্যটকরা ধৈর্য সহকারে এই জলস্তম্ভ দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন। মাটির অন্তঃস্থল থেকে অদ্ভুত এক হিস হিস আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। যেন এক বিশাল হাঁড়িতে কিছু ফোটানো হচ্ছে। হাজার হাজার প্রেশার কুকারের সিটির সঙ্গে জলন্তম্ভের আকারে ভূগর্ভস্থ বাষ্প ২০-৩০ তলা বাড়ির সমান উচ্চতায় আছড়ে পড়লো। এই অপার্থিব দৃশ্য কোনওভাবেই ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এখানের ভিজিটর সেন্টারটিও ঘুরে দেখার মতন। ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক আসলে সালফার জাতীয় রাসায়নিক গন্ধ-যুক্ত বিশাল আগ্নেয়গিরির বা বিশাল জ্বালামুখের উপরিভাগ।

ওল্ড ফেইথফুল গিজার দেখেই রওনা দিলাম মর্নিংগ্লোরি পুলের দিকে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ, চারদিকে অল্পবিস্তর বরফ পড়ে আছে। পাহাড়ে ঘেরা এক অদ্ভুত সাদা ও ধূসর এবড়ো-খেবড়ো প্রান্তর, মাটির অভ্যন্তর থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া বের হচ্ছে। সঙ্গে ঝাঁঝালো রাসায়নিক গন্ধ। এ যেন এক অন্য গ্রহে এসে পড়েছি। এই ধোঁয়াটে জমির মধ্যে দিয়ে কাঠের পাটাতন ও কাঠের রেলিং দেওয়া রাস্তা। কাঠের পাটাতনের রাস্তা বা ট্রেইল ধরে এগোচ্ছি। ভাবতেই পারছি না যে আমরা এক সক্রিয় আগ্নেয়গিরির উপর দিয়ে হাঁটছি। চারিদিকে সাবধান বাণী লেখা আছে। জলে হাত দেওয়া বা কোনোকিছু ফেলা একেবরেই নিষিদ্ধ। বোর্ডে নানান সাবধান বাণী লেখা। রেলিং অমান্য করে এদিক ওদিক অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে অনেক মানুষ এখানে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রায় নয় হাজার বর্গ কিলোমিটার পরিধি ব্যাপ্ত এই উপত্যকাতে অসংখ্য উষ্ণ প্রস্রবণ, নদী ও বন্যপ্রাণীর প্রাচুর্য উদ্যানটিকে পৃথিবীর অন্যতম উদ্যান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এখানে বিভিন্ন বৈচিত্রময় বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে, যার মধ্যে রয়েছে বাইসন। এরা দল বেঁধে থাকে এবং পার্কের চারপাশে অবাধে ভ্রমণ করে। এছাড়াও রয়েছে ভালুক, অ্যান্টিলোপ, বিশেষ ধরনের নেকড়ে, শিংওয়ালা ভেড়া, লাল শিয়াল ও নানা ধরনের পাখি।

পার্কে আসা পর্যটকদের বার বার সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যেন তারা সেখানকার বাইসনের সাথে সেলফি তেলার চেষ্টা না করেন। মর্নিংগ্লোরি পুলে যাওয়ার পথে এই রকম এক বাইসনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। যে ছবিতে এক দল বাইসনকে দেখা যাচ্ছে, সেটা বাসের ভেতর থেকে তুলেছি। সব স্পটেই টাইম বেঁধে দেওয়া আছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না। নানান রঙের জলপ্রবাহের প্রধান কারণ হল জলে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার অবস্থান। এদের রক্ষা করাও একটি অতি প্রয়োজনীয় কর্তব্য। যতটা পারলাম প্রকৃতির এই রূপ-রসকে ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। আবারও উপলব্ধি করলাম অথর এবং এনভায়রনমেন্টাল ফিলোসফার Kohn Muir-এর লেখা, "In every walk with nature one receives far than he seek."

এবার পৌঁছে গেছি মর্নিংগ্লোরির সামনে। প্রকৃতির এমন বর্ণময় সৌন্দর্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। এমন স্বর্গীয় ও অনিন্দ্য সুন্দর রূপ শুধু চোখই জুড়ায় না, মনকেও তৃপ্তিতে ভরিয়ে দেয়। ১৮৮৩ সালে সহকারী পার্ক সুপারের স্ত্রী মিসেস ই. এন. ম্যাকগাউন (E. N. McGowan) 'Convolutus' ফুলের নামে এর নাম দেন, যার অর্থ মনিংগ্লোরি। সেই থেকে এই প্রস্রবণ মনিংগ্লোরি নামেই পরিচিতি পায়। এক সময় এর রঙ ছিল ঘন নীল। এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার জন্য জলের এই অসাধারণ রঙ। পর্যটকদের ছুঁড়ে দেওয়া পয়সা ও অন্য নানা জিনিস জমে প্রস্রবনের মুখগহ্বর হ্রাস পেয়েছে। যার কারণে ব্যাক্টেরিয়ার কর্মকান্ডও উদ্বেগজনক ভাবে কমছে। তাই জলের রঙও পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবে বর্তমানের হলুদ ও সবুজের সমাহার আমাদের চোখে অপরূপ। মনে হচ্ছে আকাশের রামধনু পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে। ঘন্টার পর ঘন্টা মনে হচ্ছিল দাঁড়িয়ে থাকি। সবুজ গহ্বরের এক প্রবল সম্মোহন শক্তি মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

আলোকচিত্রঃ লেখিকার কাছ থেকে প্রাপ্ত।