[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ২৫
রাত থেকে ধুম জ্বর। সঙ্গে মাথা-কপাল কামড়ানি। প্রায় কিছু না খেয়ে যন্ত্রণা-কাতর নজরুল বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছেন। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আর মাথার যন্ত্রণা নতুন কিছু নয়, নজরুল একপ্রকার অভ্যস্তই হয়ে গিয়েছেন। তবু প্রায় মাস দুয়েক এতোটা বাড়াবাড়ি ছিল না। নগেন ডাক্তারের ওষুধের ভূমিকাও বিস্তর, বলতে গেলে অনেকটা চাঙ্গা হয়েই উঠেছিলেন। দুর্বলতা থাকলেও এতোটা হঠাৎ করে বিপাকে ফেলেনি। পাশে বসে সারারাত দোলন মাথায় জলপট্টি দিয়েছে, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লে কখনো বা পাখার বাতাস। খিদের বালাই নাই। 'যতই সম্মেলন আর সভা-সমিতি করো বাপু, নিজের শরীরটাকে তো দেখতে হবে!' শাশুড়ির গজগজ কানে না গেলেও বাধ্য ছেলের মতো তবু দুই গ্রাস ভাত মুখে দিতে হয়েছে।
সম্মেলনের ঘোরে শরীরের বিরূপতা তেমন টের পাননি, বলা ভালো পাত্তা দেননি। পরের দুই দিন বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় কাটিয়ে এসেছেন। লাঙলের কাজ, সংগঠনের কাজ - বিশ্রাম হয়নি একটুকুও। অসুস্থ শরীর তা সইবে কেন? স্টেশন থেকে চোখমুখ লাল করে মাতালের মতো টলতে টলতে এসে সেই যে শয্যা নিয়েছেন - আর হুঁশ নেই। শিবেনকে দিয়ে খবর দিলে নগেন ডাক্তার রাত্রে এসে দেখে গিয়েছেন, তিনরকম শিশিতে মিক্সচার করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঘন্টায় ঘন্টায় দাগ মেপে মেপে খাওয়ানো - শেষরাতের দিকে নজরুল একটু শান্ত হলে পাশেই আধশোয়া হয়ে দোলন ঘুমিয়ে পড়েছে। নজরুল উঠে বসলেন।
মাথাটা ভারি হয়ে থাকলেও সেই কষ্টটা একেবারেই নেই। জ্বর নেই। ভোরের দিকে বেশ ঠান্ডা ভাব। দোলনের শরীর আধেকটা লেপের তলায় ঢাকা। হয়ত ঘুমিয়ে পড়ার সময় ততটা ঠান্ডা ছিলানা। কিংবা স্বামীর সেবায় নিমগ্ন ক্লান্তির ভিতর ঠান্ডার কথা মনেই আসে নি। কখন অজান্তে ঢলে পড়েছে। লেপটা টেনে দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। শরীর জুড়ে ব্যথা, যেন সারারাত লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে কেউ। ভোরের আভায় এলিয়ে পড়া চুলের ফাঁকে দোলনকে দেখে অদ্ভুত এক মায়াময় সৌন্দর্যের ভিতর যেন ডুবে যেতে থাকলেন নজরুল। তিনি যে একজন কবি, সুন্দরের পিয়াসী, সেকথা যেন নিজেই ভুলে গিয়েছিলেন, শয্যাপাশে নিজের স্ত্রীকে দেখে নতুন করে মনে পড়ল। সারা শরীর জুড়ে অসহ কষ্ট, মাথায় দশ মণ পাথরের বোঝা, তার ভিতরে কী করে সৌন্দর্যের পিয়াসী কবিসত্বা জেগে ওঠে নিজেই বুঝতে পারেন না। দোলনের এলোমেলো চুলের ফাঁকে শ্রান্ত মুখের প্রতিটি বিন্দুতে, কাৎ হয়ে থাকা এলিয়ে পড়া শরীরের ভাঁজে ভাঁজে চার বছর আগের এক প্রেম-বিহ্বলা ভীরু অথচ চঞ্চল কিশোরীকে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। মুগ্ধ চাহনিতে ঘায়েল করা সেই কিশোরীই আজ পূর্ণযৌবনা নববধূ - প্রিয় পুরুষটির রতি প্রতীক্ষায় ক্লান্ত হয়ে তন্দ্রায় ঢলে পড়েছে। সর্ব অঙ্গে যেন রাত জাগা অভিমান অথচ রতি বাসনার আকুলতা পরিস্ফুট। নজরুলের ভিতরে সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে যৌবনতৃষ্ণাকাতর এক নব্যপ্রেমে পাগল কবি এসে ভর করল। শরীরে মনে কষ্ট যখন বাড়ে, যন্ত্রণা অসহ হয়ে ওঠে, তাঁর ভিতরে কবিসত্ত্বা তখনই যেন বেশি করে জেগে ওঠে। মনে পড়ে আগের বছরে হুগলিতে সেই ঝড়ের সন্ধ্যার কথা। নানা সমস্যায় জর্জরিত বিষণ্ণ এক মন খারাপের সন্ধ্যা - যেই আকাশ কাঁপিয়ে ঝড় উঠল, বাগদেবী যেন নিজের খেয়ালে কবিতার শব্দগুলি ছন্দে সাজিয়ে সামনে তুলে ধরছেন। নজরুলের মনে হলো - কতদিন প্রেমের কবিতা লেখা হয়নি! আদতে তো প্রেমই জীবনের সম্বল, প্রেমই তাঁর কাঙালপনা, প্রেমের কাছে নাম-যশ-টাকাপয়সা সবই তার কাছে তুচ্ছ! অথচ কতদিন প্রেমের কবিতা লেখা হয়নি। সুন্দরের পুজারী তুমি! সুন্দরের পায়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া প্রেমিক কবি, দেশ সমাজ রাজনীতির আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে শেষে তুমি আমাকেই ভুলে গেলে? ভিতরের প্রেমিক কবি যেন ব্যঙ্গ করে উঠল। দোলনকে সামনে রেখে এক মদালসা রতিপ্রার্থিনী উর্বশীর কল্পনায় ডুবে যেতে থাকলেন। হাতের কাছে কাগজ পেন্সিল থাকলে এখনই লিখে ফেলতেন। হুড়মুড় করে এসে কবিতার শব্দগুলি দোলনের মুখের কাছে এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। কিন্তু শরীরে নড়বার শক্তি নেই। আরাধ্যা দেবীর সন্মুখে ধেয়ানী তপস্বীর মতো বসে রইলেন।
- তুমি উঠে পড়েছ? কিরকম লাগছে?
দোলন আচমকা জেগে শুয়ে শুয়েই নজরুলের গলায় বুকে দ্রুত হাত বুলিয়ে দেখতে লাগল জ্বর আছে কিনা। নজরুলের মনে হলো বিধাতা নারীকে একটা বাড়তি ইন্দ্রিয় দিয়েছেন - কথাটি খুবই সত্য। তাকে সামনে রেখে প্রিয় মানুষটি যে এতোক্ষণ কোনো এক উর্বশীর কল্পনায় মগ্ন ছিল দোলন ঠিক তা টের পেয়েছে।
হেমন্তদা কলকাতায়। দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আলাদা পার্টি গঠন হয়েছে। তার সাংগঠনিক অনেক ব্যাপার স্যাপার আছে। নিজে সম্পাদক, অনেক দায়দায়িত্ব আছে। অনেক টাকাপয়সার দরকার। এলবার্ট হলে পার্টির ফান্ডের জন্য একটা সাহায্য রজনীর ভাবনা চলছে। হঠাৎ করে জ্বরের খবর চাউর হতে একে একে তারকদাস, প্রমোদ এবং অনেকদিন পরে বিজয়লাল এসে গল্প করে গিয়েছে। কৃষ্ণনগরে হেমন্তদার নেতৃত্ব নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন চোখে পড়েনি। চরমপন্থী নরমপন্থী সবাই মিলেমিশেই স্বদেশীর কাজ করে। তবু প্রজা সম্মেলনের আশেপাশে বিজয়লালকে দেখতে পাওয়া যায়নি। অথচ কৃষকপ্রজার জাগরণের পক্ষে তার বিপুল উৎসাহ। সম্মেলনের কাজকর্মকে যথেষ্ট প্রশংসাই করে গেল। নগেন ডাক্তারের কাছ থেকে শিবেন মারফৎ নতুন নতুন তেতো ওষুধের শিশি এসেই চলেছে। যেমন হুড়মুড় করে ঝড়ের মতো জ্বর এসে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তেমনই দুদিনের মধ্যে একেবারে উধাও। শরীর চাঙ্গা লাগেনা ঠিকই, কিন্তু মন শুধু বাইরে যাবার জন্য ছটপট করে। কলকাতা হুগলিতে গানের আড্ডা কোথাও না কোথাও লেগে থাকত। কৃষ্ণনগরে এখনো সেরকম হৈচৈ করা মজলিস জোটেনি বলেও হয়ত মনের চাঙ্গা ভাবটি আসছে না। মাত্রই তো মাস দেড়েক হয়েছে। এর মধ্যে ঘূর্ণি, গুপ্তনিবাস সহ একাধিক জায়গায় গান গাইতে হয়েছে বটে, কিন্তু সে সবই বেশ পরিপাটি ভদ্রসভ্য সম্মানজনক অনুষ্ঠান। পানের সাথে গানের দেদার হুল্লোড় না হলে নজরুলের ঠিক তৃপ্তি আসেনা। এটাও যেন নতুন করে নিজে উপলব্ধি করলেন যখন বিজয়লাল তাঁদের বাড়িতে গানের সান্ধ্য আসরের জন্য নজরুলকে নিমন্ত্রণ জানালেন।
- হেলেন কবে থেকে বলেই চলেছে, বড়দা, কাজীদাকে একদিন নিয়ে আয়! সেই যে প্রথমদিন আমাদের বাড়ি এলো, তারপর আর দেখাসাক্ষাৎ নেই। একদিন গান-বাজনা হোক!

নজরুলের ভিতর থেকে যেন একটা আনন্দ উত্তেজনার ঢেউ বয়ে গেল। সভা-সমিতি, গরম সম্পাদকীয়, সিরিয়াস লেখালেখি নিয়ে যতই উত্তেজনা থাক, গানের আড্ডার মতো আনন্দময় তৃপ্তি আর কোথাও পান না।
গোলাপট্টি থেকে হেঁটেই যাওয়া যায়। কিন্তু কাশেম গাড়ি নিয়ে সন্ধ্যাবেলা হাজির। সেই প্রথমদিন, অচেনা শহরে পা দিয়েই এই বাড়িটি বড়ো আপন হয়ে উঠেছিল গিরিবালা দেবীর কাছে। সেই দিনটি ফিরে পেয়ে গিরিবালা দেবী ও দোলন উভয়েই খুব উচ্ছ্বসিত। আগের মতো নজরুলের হঠাৎ করে জ্বর চলে আসায় খুব উৎকণ্ঠা বেড়ে গিয়েছিল। হেলেনের হৈচৈ আর তার মায়ের জড়িয়ে ধরে আপন করে নেওয়াতে মুহুর্তের মধ্যে পুরো পরিবারে একটা খুশির আমেজ।
বসার ঘরে ঢুকতেই নজরুল বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করলেন - সোফায় বসে আছেন আকবরউদ্দীন।
(ক্রমশ)
