রিনি, স্বল্পভাষী বাবার আদর্শে নিজেকে গড়ে-পিটে নিয়েছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অমর হালদার মেয়েকে কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজে ভর্তি করে দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বলেছিলেন,
"আমি আর আসবো না। একলা চলতে শিখতে হবে। আর একটা কথা খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন - রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে বেশি জড়াবে না, অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ ও করবে না। চোখ-কান খুলে চলাফেরা করবে।"
১৯৫৯ সালে খাদ্য আন্দোলন হয়ে গেছে। নকশাল আন্দোলনের ভয়াবহ পরিস্থিতির আঁচ একেবারে মিইয়ে যায়নি, তখনও। রাজ্যে একটু একটু করে শান্তি ফিরে আসছে। অমর হালদারের নকশাল আন্দোলনের উদ্দেশ্যের প্রতি নৈতিক সমর্থন ছিল; কিন্তু পথের প্রতি নয়। এই আন্দোলনে ছাত্র যুব শ্রেণি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল অন্ধের মতো। শুধু নির্দেশ পালন। কার নির্দেশ? উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শ মঙ্গলজনক? নির্দেশ পালনে সত্যিই শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে? জানার ইচ্ছা দানা বাঁধলেও প্রশ্ন করার অধিকার ছিল না। একটু এদিক ওদিক হলেই জীবনের ইতি টেনে দিয়েছে দলের অন্য সদস্যরা। অন্তর্দ্বন্দ্বে বলি হয়েছে কত তরতাজা প্রাণ। অন্ধভাবে শুধু উপরের স্তরের নির্দেশ পালন করে যাও। শাসকও কড়া হাতে আন্দোলন দমনে ধড়পাকড় ও নির্মম পুলিশী নির্যাতন চালিয়েছে। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিগণ বুঝেছিলেন ভুল পথের এই আন্দোলন ব্যর্থ হবেই। হলোও তাই। চোরাগোপ্তা পথে আন্দোলন চলতে থাকে। সন্তানদের জন্য পরিবারের মানুষের চোখের ঘুম ছুটে যায়। অভিজ্ঞ অমর হালদার মেয়েকে সেই বিষয়ে সতর্ক করেন।
তিনি সন্তানদের প্রকৃত মানুষ হওয়ার, স্বনির্ভর হওয়ার বীজমন্ত্র ছোটোবেলাতেই রোপন করেছিলেন। আদর্শ ও নীতি থেকে একফোঁটাও বিচ্যুত হননি কখনও; চরম অভাব-অনটনের দিনে, প্রয়োজনে দিনে। এমন আদর্শবাদী মানুষকে কিনা - ডাকাতির কেসে জেল খাটতে হয়েছিল! জোতদার-মহাজনেরা গরীবের রক্ত চুষে ফুলে ফেঁপে উঠছে। দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে। অমর হালদার বেশ কয়েকজনের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে ঠিক করেন, মহাজনের বাড়ি ডাকাতি করে জমির দলিল, বাসনপত্র, সোনাদানা ফিরিয়ে দেবেন দরিদ্র গ্রামবাসীদের। মহাজনের গুদামঘর আক্রমণের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে ছিলেন ওঁর বড়ো দাদা বিনয় হালদার। তিনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। ঘটনায় জড়িত সকলকে পরের দিন পুলিশে নিয়ে গেল। স্ত্রী কনকবালাদেবী বিয়েতে তাঁর বাবার দেওয়া গয়না বিক্রি করে স্বামীকে জামিন করেন। হাজত থেকে ফিরে আসার পর কোনো গ্লানি বা অপরাধ বোধের ছাপ পড়েনি মুখে, বরং দীন-দুঃখিদের মুখে হাসি ফোটানোর প্রশান্তির উজ্জ্বল আলো ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছিল অসম্ভব রকমের বোঝাপড়া। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কোনদিন উচ্চবাচ্য করেননি। যাপনের প্রতিটি দিন ঘড়ির কাঁটা ধরে চলত; তাতে যান্ত্রিকতার লেশ মাত্র ছিল না; অদ্ভুত একটা ছন্দ ছিল। তিন ছেলে বেকার, মেয়েরা অবিবাহিত বেকার। পেনশনের মাত্র তিন হাজার টাকা, মাঠে সামান্য কিছু চাষের জমি; তবুও দুশ্চিন্তার ছায়া বাইরে প্রকাশ হয়নি। তিনি দুঃখ-কষ্টকে জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ হিসেবে নিয়েছিলেন। ছোটো ভায়ের বয়স মাত্র দুই বছর, সেই সময় মা মারা যান। ছোটোবেলা থেকেই মাঠের কাজ, কলমা বিলে মাছ ধরা, রান্না করা, মশলা বাটা, বাসনমাজা সব করতে হত। নিজ হাতেই তুলে নিয়েছিলেন সকল দায়িত্ব। সবাইকে ভালো রাখতে হবে; এটায় যেন ব্রত। বৃষ্টিতে ছাতাটা মেয়েদের মাথায় ধরে নিজের ভিজেছেন।
তখন বোকাবাক্স গ্রামের অন্দরে প্রবেশ করে নাই। জেলেরা, চাষিরা সারাদিন কাজকর্মের পর চণ্ডীমণ্ডবে জমায়েত হত। ধর্মালোচনা হত। বসত শালিসি সভা। গ্রামবাসীরা এখানে ভাগ করে নিত পরস্পরের সুখ-দুঃখ। বর্ণ হিন্দুদের রক্তচক্ষু স্বাভাবিক হয়ে উঠল। আহা! এমন ধর্ম আলোচনা, ব্যাখ্যা শুনে ভক্তজনের দুই নয়ানে বান ডেকে যায়। ধনঞ্জয় হালদারের ধর্মীয় গ্রন্থপাঠ ও পাঠের ব্যাখ্যা শোনাবার জন্য ধাপাড়িয়ার জমিদার বাড়িতে ডাক পড়ে। কথকতা করতে করতে তিনি হয়ে উঠতেন অতিমানব। তাঁর নাম কলমা বয়ে নিয়ে যায় জলঙ্গিতে। ম্যাচপোতার চণ্ডীমণ্ডবের দ্বার উন্মুক্ত হয় সকলের জন্য। সেই পিতার পুত্র অমর হালদার, বিনয় হালদার। ধনঞ্জয় হালদারের তিন পুত্র মানুষ গড়ার কারিগরের কর্মে ব্রতী হয়েছিলেন। হালদার বা তথাকথিত নিন্মবর্ণের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো প্রবেশ করিয়ে সচেতন করে তুলছেন তারা। উচ্চবর্ণীয় মানুষের দম্ভ ও আস্ফালন ধীরে ধীরে কমে আসছে। চণ্ডীমণ্ডবের সকল দায়িত্বে হালদাররা। সব বর্ণ মুছে একটায় বর্ণ; সবমানুষ চাতালে পাশাপাশি বসে পাঠ শোনে, ধনঞ্জয় হালদার পাঠ থামিয়ে ভাবেন, তাঁর বড়ো খোকা স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল যেদিন, তিনি ঈশ্বরের কাছে একটায় প্রার্থনা করেছিলেন, তিনি যেন মৃত্যুর আগে মহাপ্রভুর মানবতাবাদ এই গ্রামে প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেন। বড়ো খোকার সেদিনের কথাগুলো, তিনি কখনও ভোলেননি।
"বাবা, আমি আর স্কুলে যাব না। শ্রেণিকক্ষে, দে বোস, ব্যানার্জি বাড়ির ছেলেরা পাশে বসতে দেয় না। কলে জল খেতে গেলে শাসায় খবরদার, কলে যেন ছোঁয়া না পড়ে। আজকে খুব তেষ্টা পেয়েছিল কচুপাতায় জল নিতে গিয়ে কলে ছোঁয়া লেগে যায়, ওরা দল বেঁধে এসে ঠেলা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। ছোটো জাত বলে কত অপমান করল। চেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে বললেও আর কল থেকে জল নিতে দেয়নি। আরও বলেছে আমাদের কাজ হল খাল-বিলে মাছ ধরা। ওটায় নাকি আমাদের পেশা; পড়াশোনা আমাদের জন্য নয়। 'পড়াশোনা শিখে বাবু হওয়ার শখ হয়েছে' - বলে সবাই কেমন বিশ্রী ভাবে হাসলো। কিন্তু, বাবা আমি তো ফাস্ট হই। আর পড়তে পারব না?"
তিনি ছেলের সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। শান্ত স্বরে বলেছিলেন, "ওরা যা বলেছে একটি কথাও ঠিক নয়। ওদের বুঝিয়ে দিতে হবে সেকথা। আজ সরকার বাড়িতে পাঠ আছে। বড়ো সরকার কলকাতা থেকে এসেছেন। তিনি বড়ো ভালো মানুষ। নিশ্চয় একটা সুরাহা হবে।"
পাঠ করলেন "শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত" - সর্বধর্ম সমন্বয় - মানবতার জয়গান। পাঠ শেষে বড়ো সরকার ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণাম করলেন ধনঞ্জয় হালদারকে। আলোচনা সভাতে ঘোষনা করেছিলেন, "আজ থেকে চণ্ডীমণ্ডবের দ্বার সকল গ্রামবাসীদের জন্য উন্মুক্ত।"
শরতের নীল-সাদা আকাশের নীচে কলমা ছাপানো জলে ভাসতে থাকে তার তীরবর্তী এলাকা; গ্রামবাসীরা এমন দুঃখের দিনে মায়ের আরাধনা করবে কীভাবে? অপেক্ষা করতে হয় মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী তিথির পরের দিন গণেশজননীর আবাহনে। বছরের অর্ধেক সময় চাষের জমি জলের তলায়, কাজকর্ম নেই; গ্রামবাসীরা কোমর বেঁধে লেগে পড়ে নাটক, যাত্রা, পালাগানের রিহার্শাল করতে। যাত্রাপালায় মেয়ের রোল অবিনাশ করে। একবার ধনঞ্জয় হালদারের ছোটোবোন বায়না ধরে দাদাদের মতো সেও নাটক করবে। যুক্তি দেখায় রেডিও অনুষ্ঠানে মেয়েদের রোল মেয়েরা করে। অকাট্য যুক্তি; খণ্ডন করবে কে? জল পানির টাকায় ছোটো হালদার একটা রেডিও কেনে।
গ্রামে দে বাড়িতে আর একটা রেডিও ছিল। তাদের অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার অন্য বর্ণের মানুষের ছিল না। হালদার বাড়ির দ্বার সবসময় সকলের জন্য উন্মুক্ত। মহালয়া, নাটক, যাত্রাপালা শোনার জন্য পাড়ার মেয়ে-বউরা জড়ো হয় রবিবার বুধবার শুক্রবার শনিবার। সমীক্ষা আর রেডিও সংবাদ শোনার শ্রোতার সংখ্যাও কম নয়। ফুটবলের ধারাভাষ্য শোনার শ্রোতারা সব কিশোর যুবক। ফুটবল খেলতে গেলে দম লাগে; হালদার নমঃশুদ্রদের কম ছিল না। তাদের ভরসাতেই মফঃস্বলে খেলতে আসা। ফিরেছে শীল্ড, কাপ নিয়ে। বর্ণবৈষম্যের দাগ মুছে যাচ্ছে একটু একটু করে।
অমর হালদারদের দল এতবড়ো একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন সুদখোর মহাজনকে শায়েস্তা করার জন্য; যেটা আইনি পথে সম্ভব ছিল না। বান-বন্যায় ভেসে থাকা প্রান্তিক চাষিদের অভাবের সুযোগে কাঁসা পিতলের বাসনকোসন মহাজনের গুদামজাত হয়ে যায়; ফেরত আসে না আর। যৎসামান্য সোনা-গয়নাও। মাটির হাঁড়ি-পাতিল-কলসিতে চলে ঘরগৃহস্থলী। তাদের দিন গুজরান হত কচুপাতা পদ্মপাতা শালুক পাতায় নুন দিয়ে ঘোটা ভাত আর জল দিয়ে সিদ্ধ মাছে - মহাজন চলে সিল্কের পাঞ্জাবি পরে গটগটিয়ে। দশ টাকা-পাঁচ টাকায় বন্দক দেওয়া জিনিস শ' টাকা দিয়ে ফিরিয়ে আনার সঙ্গতি কোনো দিনই হত না। দরিদ্র চাষিরা শেষ সম্বলের মায়াও ত্যাগ করতে পারত না। ক্ষোভের বারুদ জমতে থাকে। ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে ওঠা মানুষের কাছে অসহায় দুঃখি মানুষ যেমন ছুটে যায়, তেমনি ছুটে আসত অমর হালদারের মতো মানুষের কাছে। তারা এসব গাঁ-গ্রামে সামাজিক, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক অসাম্য দূর করার জন্য ভাবত।
হেমন্তের শেষে কলমা নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করত। ফেলে যেতে পলির মোটা সর। চাষিরা আড়ায় ঝোলানো শিকেয় রাখা বীজ ছড়িয়ে দিত জমিতে। শীতের হিমেল হাওয়ায় মাথা দুলিয়ে দ্রুত বেড়ে উঠত। রাসায়নিক সার, কীটনাশক ওষুধের দরকার পড়ত না। আমন ধান সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে। কামার রাতদিন হাপর টেনে চলে কাস্তে, লাঙলের ফালে, বিদের দাঁতে শান দিতে। মা-জননীর পুজো সামনে কাজ গুছিয়ে নিতে হবে!
(ক্রমশ)
