বিবিধ

শত শতাব্দীর জাদুবিদ্যা (ঊনবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



জাদুকর শ্যামল কুমার


আমেরিকায় জাদুবিদ্যা (১৭৩৪-১৮৭৫)

"সম্পূর্ণ সান্ধ্যকালীন প্রদর্শনীর স্বর্ণযুগ"

বিলি রবিনসন (Billy Robinson) যিনি পরে চুং লিং সু (Chung Ling Soo) নামে খ্যাত হন, তিনি নিজেকে বিখ্যাত করার জন্য এক প্রচারমূলক যান্ত্রিক কৌশলের সাহায্য নিয়েছিলেন যেটার জন্য ১৮৯৮ সালে প্রথম হাওয়ার্ড থার্রস্টন (Howard Thurston) বিখ্যাত হন। থার্রস্টন, লিও এবং আদেলেইদ হারমান (Thurston, Leon and Adelaide Hermann) ও তাঁদের দলের সামনে একটি প্রদর্শনীতে তাঁর নতুন 'রাইজিং কার্ডস ট্রিক' দেখান। এটি এমন একটি খেলা ছিল যেখানে পাঁচটি নির্বাচিত তাস ভাসতে ভাসতে উঠে আসবে তাসের গোছা থেকে হাতের আঙুলের ডগায়। লিও দেখে স্বীকার করেছিলেন যে খেলাটি তাঁকে বোকা বানিয়েছিল। এরপর থেকে থার্রস্টনের প্রচারপত্রে তাঁকে বলা হত "The Man who Mystified Hermann".

থার্রস্টন তাঁর প্রথম বড় সাফল্য পান ১৮৯৯ সালে নিউ ইয়র্কের Toni Pastor-এর ১৪তম স্ট্রিটে একটি কার্ড-ম্যানিপুলেশন অ্যাক্ট পরিবেশন করে। সামনে ও পেছনে হাত দিয়ে কার্ড লুকিয়ে তিনি অসাধারণ খেলা দেখাতে পারতেন। তিনি থিয়েটারের যে কোনো সিটে কার্ড পৌঁছে দিতে পারতেন এবং পুরো প্যাকেটই ছড়িয়ে দিতে পারতেন দর্শকদের মধ্যে। বহু আমেরিকার সম্ভ্রান্ত পরিবার তাঁকে লন্ডনে ছাব্বিশ সপ্তাহব্যাপী শো করতে সাহায্য করেছিলেন এবং ইউরোপের রাজপরিবারের সামনে তিনি তাঁর জাদু প্রদর্শন করেছিলেন।

থার্রস্টন পরে হাতের কৌশলের বাইরে গিয়েছিলেন এবং পূর্ণাঙ্গ ইলিউশন শো-তে মনোনিবেশ করেন। যদিও তিনি তখনও কিছু তাসের কলাকৌশল করতেন, কিন্তু তাঁর প্রদর্শনীতে মূলত বিশাল কোম্পানি ও দৃষ্টিনন্দন মঞ্চসজ্জার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো।

১৯২০-র দশকে থার্রস্টনের চারটি শো একসাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গা এবং ইংল্যান্ডে চলছিল। তিনি নিজে একটি শো পরিচালনা করতেন, দান্তে [Harry Jansen (Dante)] হচ্ছেন আরেকজন, থার্রস্টনের ভাই হ্যারি (Harry) তৃতীয় এবং Tampa the magician ছিলেন যুক্তরাষ্টের।

লিও হারমানের পর থার্রস্টন এবং তাঁর প্রচারকরা অনেক অলীক গল্প জনসমাজে ছড়ান, যেমন তিনি হিমালয়ের গুহায় সাধুদের কাছ থেকে জাদু শিখেছেন। থার্রস্টন এমন কল্পনাকে মজার দৃষ্টিতে দেখতেন এবং প্রায়ই সতর্ক করতেন এই বলে যে, "নিজের প্রচারকে কখনও বিশ্বাস কোরো না।"

মন্দার সময়ও হাওয়ার্ড থার্রস্টন প্রধান পারফর্মার হিসেবে থেকে যান। তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ সন্ধ্যার শো হয় ১৯৩১ সালে, এর পরের বছর তিনি রেডিওতেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেন। ১৯৩৪ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (Roosevelt)-এর জন্য হোয়াইট হাউসে একটি চমৎকার শো করেন। সেই বছরই তিনি বিদায় ট্যুরে বের হন, কিন্তু স্ট্রোক হবার পর আর পারলেন না। ১৯৩৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

থার্রস্টনের সঙ্গে একত্রে, এই শতাব্দীর প্রথম চতুর্ভাগে জাদুবিদ্যার জগতে অন্যতম বিশিষ্ট নাম ছিলেন হ্যারি হুডিনি (Harry Houdini)। হুডিনি শুধু সর্বশ্রেষ্ঠই ছিলেন না, পলায়ন শিল্পী (escape artist) হিসেবে তাঁর সান্ধ্যকালীন প্রদর্শনী এক অসাধারন মাপের গুণগত দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

হুডিনি রাব্বি (Rabbi)-র পুত্র ছিলেন এবং তাঁর আসল নাম ছিল এরিক ওয়েস (Ehrich Weiss)। তিনি ১৮৭৪ সালে হাঙ্গেরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোটবেলায় তাঁকে আমেরিকায় নিয়ে আসা হয়। তিনি উইসকনসিনের, অ্যাপলেটনে বড় হয়েছিলেন, যেখানে তাঁর পরিবার কিছুদিন বসবাস করেছিল; পরে তিনি নিউ ইয়র্কে বাস করতেন।

হুডিনি অল্প বয়সেই জাদুবিদ্যার প্রতি আকর্ষিত হন এবং কনির দ্বীপের সার্কাস ও জাদুঘরে কিশোর অবস্থায়ই জাদুকর হিসেবে কাজ শুরু করেন। এ ছিল এক কঠিন জীবন। তরুণ হ্যারি’র কাজের মধ্যে একটি ছিল, জাদুর মাধ্যমে কোনোকিছু দ্বিগুণ করা, যেমন 'Borneo Wild Man'-রা করতো। যদিও হুডিনির উচ্চতা ছিল কম, তবে তার শরীর ছিল শক্তিশালী এবং সফল হওয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছিল। তিনি এমন সব কীর্তি দেখাতে চাইতেন যা সাধারণ জাদুকরের নাগালের বাইরে। তিনি নিজের নাম নিয়েছিলেন ফরাসি জাদুকরদের নামানুসারে - Robert Houdin, যিনি তখন তাঁর আদর্শ পুরুষ ছিলেন।

যুবতী স্ত্রী বেসি (Bessie)-র সঙ্গে ভ্রমণের সময়, হুডিনি লন্ডনে মাত্র কয়েক ডলার নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁর হাতকড়া সম্পর্কে গভীর অধ্যয়নের ফল পাওয়া যায় - তিনি বিখ্যাত স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ব্যবহৃত হাতকড়া থেকে পালাতে সক্ষম হন। এই কীর্তি হুডিনিকে রাতারাতি ইংল্যান্ডের একজন প্রধান আকর্ষণে পরিণত করে। পরে জার্মানিতেও পুলিশ তাঁকে আটকাতে বা থামাতে তেমন সফল হয়নি, যেমন ব্রিটিশ পুলিশও পারেনি।

হুডিনি অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এলে, ইউরোপে তাঁর সুনাম আগেই পৌঁছে গিয়েছিল এবং তিনি দ্রুত বড় মঞ্চে উঠে আসেন। একজন ভডেভিল (vaudeville) পালাবিদ হিসেবে তিনি শীর্ষ পারিশ্রমিক ও প্রচুর অর্থ পেতেন। তিনি প্রচারের এমন এক কৌশল রপ্ত করেছিলেন, যা অন্য কোনো জাদুকর অর্জন করতে পারেনি। তাঁর জনসমক্ষে প্রদর্শনগুলো বিপুল ভিড় আকর্ষণ করত। বারবার তাঁকে শিকল পরানো হতো, শেকল দিয়ে বাঁধা হতো, চেইন দিয়ে আবদ্ধ করে প্যাকিং বাক্সের মধ্যে পুরে পেরেক এঁটে জলের নিচে ফেলা হতো - এবং যথারীতি তিনি সেখান থেকে নিজেকে মুক্ত করতেন। একটি চাইনিজ যন্ত্রণাদায়ক জলপূর্ন সিন্দুকের মধ্যে মাথাটি ডুবানো অবস্থায় তাঁকে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, তিনি এই ব্যবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করে দর্শকদের মুগ্ধ করে দিতেন। এছাড়াও তাঁকে straitjackets-এ বেঁধে প্রকাশ্য রাস্তায় ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, তিনি তখনও নিজেকে মুক্ত করতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিতেন।

(ক্রমশ)