গল্প ও অণুগল্প

স্পর্শ (দ্বিতীয় ও অন্তিম পর্ব)



অচিন্ত্য সাহা


ঘটনাটা এইভাবে ঘটে যাবে সেটা নন্দিনী কল্পনাও করতে পারেনি। নীহারবাবুও বিস্মিত হয়ে যান। নন্দিনী বাবাকে নিয়ে দরজার দিকে এগোতেই পেছন থেকে একটা গুলির শব্দ শোনা যায়। নীহারবাবুর পিঠে থোরাসিক স্পাইনের ঠিক মাঝখানে গুলিটা ঢুকে যায়। নীহারবাবু আর্তনাদ করে বসে পড়েন। ক্রিম কালারের সার্টটা রক্তে ভিজে যায়। নন্দিনী বাবার এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যায়। ঠিক তখনই প্রলয় এসে যায়।

- ছোড়দা তুই এসেছিস? দেখ বাবার...

- তুই কাকুকে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে যা। ভয় পাস না, মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ কর। আমি এদের ব্যবস্থা করছি।

এস.এস.কে.এম.-এ পৌঁছতে অনেকটা সময় লেগে গেল। কাছাকাছি আর. জি. কর হাসপাতালে যাওয়া যেত কিন্তু নন্দিনী এই হাসপাতালকে ঠিক ভরসা করতে পারে না। ডাঃ রাধাগোবিন্দ কর কত চেষ্টা করে হাসপাতালটিকে খাড়া করেছিলেন আজ এর কঙ্কালসার চেহারা দেখলে মনে হয় তাঁর পরিশ্রম পুরোটাই পণ্ডশ্রম হয়ে গেছে।

পি. জি. হাসপাতালের উডবার্ন ওয়ার্ডে ও.টি.-র সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিনী সাতপাঁচ ভাবতে থাকে। এক একটা মুহূর্ত যেন এক ঘন্টার চেয়েও বেশি মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছোড়দা মা'কে নিয়ে ওর কাছে পৌঁছে যায়,

- কী খবর রে ননি, বাবা কেমন আছে?

- জানি না মা, ও.টি. চলছে। প্রায় দু'ঘন্টা ধরে বাবা ভেতরে আছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও খবর পাইনি।

- শুনলাম মেরুদণ্ডে গুলি লেগেছে। কিছু হবে না তো?

- ডাক্তারবাবু যতক্ষণ না বেরোচ্ছেন ততক্ষণ কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না।

ডাক্তারবাবু প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা পরে বিধ্বস্ত অবস্থায় বেরোলেন। তাঁর চোখ মুখের বিষন্নতা এবং শরীরের অবসন্নতা দেখে নন্দিনীর খুব একটা ভালো বোধ হলো না। তিনি অত্যন্ত করুণ এবং আর্তস্বরে বললেন,

- আপনারা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। গুলিটা যেখানে লেগেছে সেটা অত্যন্ত খারাপ এবং বিপজ্জনক জায়গা। এই অবস্থায় মানুষের - যা কিছু হয়ে যেতে পারে।

- ডাক্তারবাবু বাবাকে কি তাহলে বাঁচানো যাবে না?

- দেখুন কী যে বলবো... আমি... মানে...

ডাক্তারবাবু আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। কিছুক্ষণ আনত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখের জল মুছে করিডোরের দিকে এগিয়ে গেলেন। মা নন্দিনীর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

- ননি, ডাক্তারবাবু কী বললেন?

বাবার অবস্থা বিশেষ ভালো নয় এটা নন্দিনী বেশ বুঝতে পারে। কিন্তু মা'কে বলা যাবে না। কেননা মায়ের নার্ভ খুব দুর্বল হঠাৎ করে কিছু ঘটে যেতে পারে। নন্দিনী বলল,

- অপারেশন হয়েছে। একটু সময় লাগবে। এখনো জ্ঞান ফেরেনি। আসলে প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে তো, আটচল্লিশ ঘন্টা না কাটলে কিছু বলা যাচ্ছে না।

- আমার খুব ভয় করছে রে ননি। তোর বাবার সাথে কি এখন দেখা করা যাবে?

- না মা, বাবা ভেন্টিলেশনে আছেন। ওখানে যাওয়ার অধিকার আমাদের নেই। বাবা একটু সুস্থ হলেই দেখা করা যাবে। একটু ধৈর্য ধরো।

মা বিড়বিড় করে আপনমনে কী যেন বলতে থাকেন। সম্ভবত কোনো অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশ্যে প্রণাম করেই তাঁর এই মানসিক অভিব্যক্তি। নন্দিনীদের বাড়িতে কোনো ঠাকুর দেবতার ছবি বা মূর্তি নেই। কোনো পুজো-আচ্চার বালাই নেই। বাবা নাস্তিক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। যেভাবে যে পরিবেশে নন্দিনী বড়ো হয়েছে সেখানে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নেই। সব মানুষকে সমান চোখে দেখে এসেছে। আজ মা'কে হঠাৎ করে প্রণাম করতে দেখে ওর চোখে জল এসে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে মা'কে সান্ত্বনা দেয়,

- দেখ মা, নিজেকে এত দুর্বল ভেবো না। মনটাকে শক্ত করো।

কথাগুলো যত সহজে নন্দিনী বলে ব্যাপারটা তত সহজ নয়। একজন মানুষের হঠাৎ করে চলে যাওয়া যে কতখানি শূন্যতা তা একমাত্র ভুক্তভোগীই জানেন।

টানা ছ'দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানলেন নীহারবাবু। নন্দিনীর সামনে প্রতিবন্ধকতার জগদ্দল পাথর এসে তার চলার পথটিকে রুখে দিল। মা একেবারে নীরব নিথর বিহ্বল বাকরূদ্ধ হয়ে গেলেন। নন্দিনীর চোখের জল শুকিয়ে যায়। ওর ভেতরটা কুরে কুরে খায় - বাবার মৃত্যুর কারণ সে-ই। কিন্তু কেন? ওদের উদ্দেশ্যটা কী তা পরিষ্কার বোঝা গেল না। থানায় নিয়ে গিয়ে ইন্টারোগেশন করা হয়েছে। সবটা পরিষ্কার জানা যায়নি। ছোড়দার সঙ্গে কথা বললে বোঝা যাবে।

বাবার চলে যাওয়ার পর মা সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে পারেননি। নন্দিনীকে তাঁর মনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেন। মাঝে মাঝেই তার দিকে তাকান এবং মনের ভেতর জমে থাকা আক্রোশ প্রকাশ করেন। নন্দিনী প্রায়ই মায়ের কাছে বসে মা'কে সান্ত্বনা দেয়। নন্দিনীর কথা খুব একটা মনোযোগ সহকারে তিনি শোনেন না বরং ওকে এড়িয়ে চলতে চান। কিন্তু নন্দিনী অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে মায়ের মনের অবস্থা ফেরানোর চেষ্টা করে। দেখতে দেখতে মাস ছয়েক অতিক্রান্ত হয়ে যায় তবু মায়ের মনোভাবের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না, নন্দিনী সব বুঝতে পারে কিন্তু কিছু বলে না। বরং নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তার অন্তরাত্মার গুমরে ওঠা কান্নাটাকে চেপে রেখে মনটাকে শক্ত বাঁধনে বেঁধে নেয়।

বাবার গচ্ছিত টাকাপয়সা যা ছিল সেটা মায়ের নামে এম.আই.এস. করে দেয়। ফ্যামিলি পেনশনের টাকায় সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা হয়, আর এম.আই.এস.-এর টাকার কিছুটা অংশ মায়ের ওষুধ এবং ডাক্তারের ফিস দিতে খরচ হয়। বাকিটা নন্দিনীর পড়াশোনার খরচ চালাবার জন্য লাগে। ছোড়দা মাঝে মধ্যে এসে দেখে যায়। নীহারবাবুর হত্যা ও নন্দিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী প্রত্যেকেই ধরা পড়েছে এবং তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে।

পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর নন্দিনী ওদের বাড়ির কাছেই একটি প্রাইভেট স্কুলে পার্ট টাইম শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। বেতন খুবই সামান্য, তাতে ওর কোনো আপত্তি নেই। একটা অভিজ্ঞতা তো হবে। সেটাকে সম্বল করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। এখানে এসে কো-এড স্কুল সম্পর্কে ওর ধারণা অনেকটাই বদলে যায়। এত অল্প বয়সে ওদের জ্যাঠামি নন্দিনীকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। কাজের মধ্যে থাকলে ও বেশ ভালো থাকে। কিন্তু এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো সভ্যতা ভব্যতা চোখে পড়ে না, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বসে আছে। এইরকম জীবন নন্দিনীও বেছে নিতে পারতো কিন্তু সে তা করেনি। বরং নিজেকে বেশ করে গুছিয়ে নিয়ে ওর অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। স্কুলে নন্দিনীর মার্জিত পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা এবং সুমিষ্ট ব্যবহার ওকে বিশিষ্টতা দান করেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই নন্দিনী অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রাইভেট স্কুলগুলোতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ব্যবধান থাকে নন্দিনী আসার পরে সেই ব্যবধান অনেকটাই লঘু হয়ে যায়। নন্দিনীর আন্তরিক স্পর্শে ছেলেমেয়েদের মধ্যে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার ক্লাস নেয় নন্দিনী। মাঝে মাঝে ক্লাসরুমের বাইরে গিয়ে প্রকৃতির পাঠশালায় যে বৈচিত্র্যময় জগৎ আছে সেখানে প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্যের মধ্যে অপরিসীম আনন্দের সন্ধান দেয়।

এখানে বছর পাঁচেক অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এই পাঁচ বছরে নন্দিনীর স্পর্শে কলকাতা সাউথ সেন্ট্রাল স্কুল অল ইন্ডিয়া বোর্ড এবং কাউন্সিলের পরীক্ষায় ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে। প্রথম দশের মধ্যে পাঁচজনই এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী। পরপর পাঁচবারই ইংরেজিতে কুড়ি জনের ওপর একশো শতাংশ নম্বর নিয়ে অল ইন্ডিয়ায় রেকর্ড করে। ইতিমধ্যে এস.এস.সি.-র লিখিত পরীক্ষায় নন্দিনী প্রথম দশের মধ্যে জায়গা করে নেয়। ইন্টারভিউ-এর পর কাজে যোগদান করে। প্রথমে সাউথ সেন্ট্রাল স্কুল নন্দিনীকে ছাড়তে রাজি হয়নি। তারপর ওর আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে স্কুল কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দিতে রাজি হন। বিদায় সম্বর্ধনা প্রদানকালে স্কুলের প্রিন্সিপাল পর্যন্ত চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। তিনি আবেগমথিত কণ্ঠে বলেন,

- নন্দিনী আমাদের সোনার মেয়ে। বাংলায় পরশপাথর নামে একটি কথা প্রচলিত আছে। যার স্পর্শে সবকিছু সোনা হয়ে যায়। আমরা সেই পরশপাথর কোনওদিন দেখিনি। নন্দিনী আমাদের সেই পরশপাথর যার স্পর্শে সাউথ সেন্ট্রাল স্কুল সত্যি সত্যি সোনায় পরিণত হয়েছিল। ওর অভাব আমরা প্রতি পদে অনুভব করব।

সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মী এবং উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই নন্দিনী ম্যাম সম্পর্কে তাঁদের ইতিবাচক ভাবনার কথা ব্যক্ত করেন। নানারকম উপহারে সজ্জিত করে দেয় নন্দিনী ম্যামকে। স্কুল থেকে বেরোনোর সময় নন্দিনী চোখের জল ধরে রাখতে পারে না। জীবনের প্রথম কর্মক্ষেত্রের সুখস্মৃতি নন্দিনীকে প্রেরণা জোগায়।

স্কুল মাঠের চতুর্দিকে প্রাচীরের ধার বরাবর নানারকম ফুলের গাছ লাগানো। ডিসেম্বরের শেষে যখন প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে উঠতে শুরু করে তখন বেশ লাগে। এই সময় প্রোগ্রেস রিপোর্ট তৈরির জন্য সবাই খুব ব্যস্ত থাকেন। একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণির স্পেশাল ক্লাস থাকে। ক্লাসের পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে একটা গ্রুপ এবং প্রথম সারির ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে আর একটা গ্রুপ করা হয়। পালা করে ক্লাস নেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ। আজ নন্দিনীর ক্লাস নেই। প্রধান শিক্ষক মশাইকে বলে নন্দিনী একটু আগে বেরিয়ে পড়ে। স্কুলের কাছেই সিমরানদের বাড়ি। স্কুল থেকে বেরিয়েই সোজা ওদের বাড়ি পৌঁছে যায়। বাড়িতে সিমরানের বাবা ছিলেন না। তিনি সম্ভবত কৃষ্ণনগরে কোনো কাজে গিয়েছেন। সিমরানের মা নন্দিনীকে দেখে রান্না ফেলে ছুটে আসেন

- ম্যাম, আপনি এসেছেন? আমি ভাবছিলাম আপনার সাথে দেখা করব। ভালোই হয়েছে, ওর বাবা বাড়ি নেই আপনার সাথে মন খুলে কথা বলা যাবে।

- সে হবে। কিন্তু সিমরান কোথায় বলুন তো? ওর পরীক্ষা। এত ব্রিলিয়ান্ট একটা মেয়ে এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে?

- ম্যাম, আপনাকে কী আর বলি। যত নষ্টের গোড়া ওর বাবা। গ্রামের কর্তাব্যক্তিদের কথাও গ্রাহ্য করেননি। দিলেন সিমরানকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে। আমি বারণ করেছিলাম কিন্তু আমার দিকেও তেড়ে এলেন। মেয়ে আমার খুব ভালো ম্যাম। যাবার সময় বলেছিল - "আব্বু আমাকে পরীক্ষাটা দিতে দাও।" কিন্তু তাঁর এক গোঁ, "আমার কথার অবাধ্য হলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবো তোকে।" সিমরান কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল - "বাপজান ঠিক করলে না। দু'দিন পরে তোমার কথাই ঠিক হবে। ইমরান যদি আমার কথা না শুনে আমাকে স্পর্শ করে তাহলে সেটাই হবে আমার শেষ রাত।"

নন্দিনীর সারা শরীর কেঁপে ওঠে,

- সে কী কথা? তাহলে তো এখনই ওর বাড়ি যাওয়া দরকার। মেয়েটি কখন কী করে বসে তার ঠিক নেই।

- ম্যাম, আপনি সেখানে যাবেন না। ওরা আপনাকে অপমান করবে। এমনকি...

সিমরানের মায়ের কথা শেষ হবার আগেই নন্দিনী বেরিয়ে পড়ে। নাসিমাকে ডেকে নিয়ে ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে ইমরানের বাড়িতে পৌঁছে যায়। অনেক ডাকাডাকির পরে ইমরান ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পরনের লুঙ্গিটা ঠিক করতে করতে হঠাৎ চোখ চলে যায় নন্দিনী ম্যামের দিকে। অনেকটা ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে,

- ম্যাম আপনি?

- হ্যাঁ আমি। সিমরান কোথায়? ওকে ডাকো।

- ডাকছি ম্যাম। আপনি আসুন, বসুন। নাসিমা ম্যামকে নিয়ে বসিয়ে দে। আমি আসছি।

ইমরান ভেতরে চলে যায়। নন্দিনী ম্যাম চারপাশে তাকিয়ে দেখতে থাকে। চারদিক থেকে একটা বোঁটকা গন্ধ ভেসে আসছে। এখানে দশ-বারোটা ঘর একটার সাথে আর একটা লাগানো। মনে হচ্ছে এরা সবাই একই মায়ের পেটের ভাইবোন। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। কোনো বাড়ির মধ্যে সীমানা, প্রাচীর বা দেওয়াল নেই। নাসিমা উঠোনের এককোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। নন্দিনীর বয়স এখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর ওর বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল। নন্দিনী বলেছিল,

- এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য হল নিজের পায়ে দাঁড়ানো। তাছাড়া আমি চলে গেলে মা বড্ড একা হয়ে যাবেন। এই মুহূর্তে আমার কেরিয়ার এবং মা'কে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়।

তখন বিয়ে হলে এতদিনে সিমরানের বয়সী একটা সন্তান হয়ে যেতে পারত। মাঝে মধ্যে ওর শূন্য হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। আজ সিমরানের মাঝে নিজের সন্তানকে খুঁজে নিতে চায়।

সিমরান ততক্ষণে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় নন্দিনী

- কী রে, এ কী চেহারা হয়েছে তোর? চোখের নীচে কালি পড়েছে, মুখটা শুকিয়ে ছোটো হয়ে গেছে, গায়ের চামড়া পুড়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। এ আমি কাকে দেখছি?

পাশ থেকে ইমরান বলে,

- ওর বাপের বাড়ি থেকে আসা ইস্তক কিছুই মুখে তোলেনি ম্যাম?

- কেন রে, তোরা এত দুর্বল কেন? একটুতেই ভেঙে পড়িস। সামনে পরীক্ষা। প্রস্তুতি নিয়েছিস?

- আমার পরীক্ষা দেওয়া হবে না ম্যাম।

- কেন?

- না, এরা কেউ চায় না যে আমি পরীক্ষা দিই। তাই আমিও সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরীক্ষা দেবো না।

- তুই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার আমার কথা ভাবলি না? আমি তো আমার জীবনের সব কথা তোকে বলেছি। তার পরেও...? তুই এটা, যাকগে ইমরান তুমি কী সত্যি চাও সিমরান পরীক্ষা না দিক?

ইমরান তার মতামত জানাতে ইতস্তত বোধ করে। তারপর আমতা আমতা করে বলে,

- আমি তো কথা দিয়েছিলাম ওর পড়াশোনার জন্য সবরকমের সহযোগিতা করব। কিন্তু আমার আম্মু...

- ডাকো তোমার আম্মুকে। আমি তাঁর সাথে একবার কথা বলতে চাই।

ইমরানের আম্মু এলে নন্দিনী তাঁর সাথে খোলামেলা আলোচনা করে। সেখানে ভারতের বিভিন্ন মহীয়সীর কথা উঠে আসে। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের অবদানের কথা, সংগ্রামী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কথা, সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য একজন মায়ের ভূমিকা এবং আত্মত্যাগের কথা। নন্দিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তিটি তুলে ধরে - 'শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ'। সবশেষে বেগম রোকেয়ার সংগ্রামী জীবন গঠনের জন্য তাঁর স্বামী সেখ সাখাওয়াত হোসেনের অবদানের কথা বলে। স্বামীর মৃত্যুর পর বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার বিস্তারে তাঁর স্বামীর স্মৃতিতে গড়ে তোলেন - 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বালিকা বিদ্যালয়'। কলকাতার বুকে এক অনন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর আজও আপনারা সেই মধ্যযুগের ভাবনা নিয়ে পড়ে আছেন?

- আপনি ঠিকই বলেছেন ম্যাম। আমাদের বড্ড ভুল হয়ে গেছে। সিমরান পরীক্ষা দেবে। আমি ওর আশা পূরণ করব। আমি ওর সত্যিকারের মা হয়ে উঠব। হাতে হাত রেখে কথা দিলাম।

- আমি খুব খুশি হলাম। আজ তাহলে আসি?

- আমার বাড়িতে এসে শুধু মুখে চলে যাবেন?

- আসব। যেদিন সিমরান আমার, আপনার, সবার মুখ উজ্জ্বল করবে সেদিন আপনার বাড়ি এসে পাত পেড়ে খেয়ে যাবো। চল রে নাসিমা আমরা যাই। আমাকে আবার বাড়ি ফিরতে হবে।

সিমরান দৌড়ে এসে নন্দিনী ম্যামকে প্রণাম করে। নন্দিনী ওকে বুকে টেনে নেয়

- আমি আশীর্বাদ করি তুই অনেক বড়ো হ, একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা কর।

নাসিমাকে সঙ্গে নিয়ে নন্দিনী যখন বেরিয়ে এলো তখন পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী সূর্য তুলিতে গোলাপি রঙ ছুপিয়ে নতুন একটা আলপনা এঁকে নন্দিনীকে উপহার দেয়। সেই আলপনা শরীরে জড়িয়ে নিয়ে ওর মনটা এক অপার্থিব আনন্দে ভরে ওঠে।

(সমাপ্ত)