গল্প ও অণুগল্প

বিনয়বাবুর ভ্রান্তিবিলাস (অণুগল্প)



শর্বানি ঘোষ


ডিনারের পর উচ্চ রক্তচাপ-এর ওষুধ খেতে গিয়ে বিনয়বাবু খেয়াল করলেন জলের বোতলটি খালি। আদরের বৌমাকে জল ভরে দিতে বলার জন্য ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ালেন।

ঠিক সেই সময় ছেলের ঘর থেকে সুন্দরী শিক্ষিতা পুত্রবধূ লিপিকার চাপা কণ্ঠস্বর কানে এলো,

- বাবাকে একটু শাসন কোরো, যখন তখন বেরিয়ে যাচ্ছে, বন্ধুদের সাথে রাস্তায় ভুলভাল খাবার নিজের পকেট থেকে পয়সা দিয়ে নিজে খাচ্ছে, আবার বন্ধুদেরও গেলাচ্ছে। শরীর খারাপ করলে কি হবে ভেবে দেখেছ? ঘোষাল জেঠুর মতো হঠাৎ করে ঘাটে গেলে মাসে কতগুলো করে টাকা হাতছাড়া হয়ে যাবে ভাবতে পারছ! মোটা টাকা পেনশন পাওয়ার চক্করে এমন স্কিম করেছেন যে, মরে গেলে আমরা একটা পয়সাও পাব না। সংসারের যাবতীয় খরচ তো ওই পেনশনের টাকাতেই চলছে। নাহলে তোমার ব্যবসার যা আয় হয়, ও দিয়ে মাসের অর্ধেকও চলবে না। বুড়োকে যেভাবে হোক বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিছানায় পড়ে থাকলে অসুবিধে নেই, কিন্তু মরতে দেওয়া চলবে না।

বিনয়বাবু ওখানেই চেয়ারের ওপর ধপাস্ করে বসে পড়লেন। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ রিটায়ার্ড অফিসার বিনয়বাবুর ভারী অহংকার ছিল। পার্কের বাকি সব বয়স্ক লোকেদের তুলনায় বাড়িতে তাঁর অনেক বেশি প্রতিপত্তি, হ্যাঁ হতে পারে তাঁর মোটা অংকের পেনশনের কারণে। তবু তাঁর ধারণা ছিল তাঁর পুত্রবধূটি তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে ভালবাসে। চাকুরী জীবনে অফিসে, পরবর্তীতে বাড়িতে তিনি একজন সফল মানুষ।

আজ মনে হচ্ছে বাড়িতে কাজের মেয়ে সন্ধ্যার শ্বশুরের কাছেও তিনি এক্কেবারে হেরে গেছেন। সন্ধ্যা শুধুমাত্র তার বৃদ্ধ শ্বশুরমশাইয়ের চিকিৎসার জন্য দু'বাড়ি অতিরিক্ত কাজ নিয়েছে। সবটাই তার ভালবাসা। আর তাঁর পুত্রবধূ লিপিকার সব ভালোমানুষীই কেবল লোক দেখানো, পুরোটাই আসলে স্বার্থ।

বিনয়বাবু বুঝতে পারেন তিনি মিথ্যেই দম্ভ করতেন, আসলে নিজের সংসারেই তিনি গোহারান হেরে বসে আছেন।