আজকের সূর্যটা বোধহয় একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছে। সেজন্যই হয়তো রোদটা বেশ হাতেগরম। শহরের প্রান্তে ছোট্ট একটি বাড়ির জানালার পাশে বসে রুদ্র মন খারাপ করে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে। বসন্তের উষ্ণ রোদের মিষ্টি উষ্ণতা সত্ত্বেও তার মুখে এক ধরনের অভিমান, চোখে ক্ষোভ, আর হালকা একটা ক্লান্তি।
এই নিয়ে আজ তার ২৯তম বছরে ৩০তম ইন্টারভিউ। তার সিভিতে MBA, IELTS স্কোর ৮.৫, ইউনিভার্সিটিতে গৌরবময় ফলাফল, বহু সেমিনারে অংশগ্রহণ... সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আজও সে "পরবর্তী সময়ে আমরা আপনাকে জানাবো," এই চিরচেনা বাক্যটা শুনে আসছে।
মা বারবার বলছে, "তুই কি বিদেশে যেতে পারিস না? কত ছেলেমেয়ে তো ভালো চাকরি, সুযোগের জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। তোর রেজাল্টও অনেক ভালো..."
রুদ্র মাথা নেড়ে বলে, "মা, আমি যদি সবার মতো নিজের স্বার্থের কথা ভেবে, নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাই, তাহলে তো দেশের সঙ্গে বেইমানি করা হয়! ভারত আমার দেশ। আমি ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত মা। চাকরি তো একটা বাহানা মাত্র। চাকরির সূত্র ধরেই আমি আমার আদর্শকে কাজে রূপদান করতে চাই। এবং সেটা নিজের দেশে থেকেই। কিন্তু ঢোকার দরজা না পেলে নিজেকে প্রমাণ করব কিভাবে। তাই শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি..."
ছেলের আদর্শের সামনে মা চুপ করে যায়। অথচ তার চোখের ভিতরটা জলে ভরে ওঠে। এই তো বছর দুই আগে রুদ্রর বাবা মারা গেলেন, ব্রেন স্ট্রোকে। সরকারি হাসপাতালে ঠিকমতো ওষুধ নেই, বেড নেই। টাকাও ছিল না ভালো কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়ার মতো। বাবা সবসময় চাইতেন, ছেলে 'সরকারি কিছু করুক'। 'চাকরি মানে সম্মান' - এই ছিল বাবার কথা।
রুদ্র চেষ্টা করেছিল। দু-বার WBCS দিল। প্রতিবার লিখিত পরীক্ষায় টিকে থেকেও ভাইভাতে বাদ। প্রথম বার বাদ পড়েছিল 'কমিউনিকেশন স্কিল' খারাপ বলে। দ্বিতীয় বার 'ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অস্পষ্ট', আর তৃতীয়বার?
তৃতীয়বার সে মুখোমুখি হয়েছিল এমন এক বোর্ডের, যেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল,
"আপনার তো ছাত্র-রাজনীতির কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বপ্ন দেখেন কিভাবে?"
সে বলেছিল, "রাজনীতি না করেও সৎ থেকে রাষ্ট্রকে ভালোভাবে সেবা করা যায়, স্যার।"
বোর্ড মৃদু হেসেছিল, যেন মূর্খ একটি ছেলের আদর্শবাদী কথা শুনে মজা পাচ্ছে।
তবে রুদ্র হাল ছাড়েনি। বাবার ইচ্ছের কথা মাথায় রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিল, চাকরি তাকে পেতেই হবে। বাবার কথা স্মরণ করে মনটাকে আরও দৃঢ় করল। বারবার বিফল হতে হতে সে যেন আরও আরও কঠোর ও একগুঁয়ে হয়ে পড়ল - কিছুতেই হাল ছাড়বে না। সে সারাদিনের রুটিনটা অনেকটা পরিবর্তন করে নিল - সকালে ব্রেকফাস্ট করে ঘণ্টা দুই পড়া, তারপর নেট ব্রাউজ করে নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দেখা, সিভি পাঠানো, ইন্টারভিউ দেওয়া, ফেরত আসা, আবার প্রস্তুতি...
বন্ধুরা প্রায় সবাই কোথাও না কোথাও ঢুকে গেছে - কেউ মন্ত্রী-আমলার সুপারিশে, কেউ ঘুষ দিয়ে, কেউ বিদেশে পড়তে গিয়ে থেকে গেছে। আর রুদ্র?
রুদ্র চোখের সামনে বন্ধুদের বাঁকা পথে যেতে দেখেও প্রতিবাদ করেনি। একবার এক বন্ধু তাকে বলেছিল, "তোর মতন ছেলে যদি নিজের ভাগ্যটা সুপারিশ দিয়ে ঠিক না করতে পারে, তাহলে দেশ ঠিক করবে কিভাবে?" এমন ঠেস মারা কথাতেও সে চুপ থেকেছে। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি, পাছে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়! যার যা খুশি বলুক...!
দিন যায়। চাকরির বিজ্ঞাপনগুলো এখন যেন তার কাছে প্রতারণা। ত্রিশ বছরের বেশি বয়স মানেই বেশিরভাগ চাকরিতে - 'না'।
উপযুক্ত রেজাল্ট থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো ইন্টারভিউ বোর্ড কৌশলে বাদ দেওয়ার অজুহাতে বলে দিল - 'আমাদের কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা চাই'। অথচ বেতন-কাঠামো বাঁচার জন্য যথেষ্ট নয়।
বেসরকারি কোম্পানিগুলোতে নিয়ম নেই, ছুটি নেই, সিকিউরিটি নেই।
পাশাপাশি সরকারি চাকরি? সে এক অলৌকিক দুর্গ, সে দুর্গের দরজা খুলতে গেলে দরকার 'চেনা মানুষ'।
৩০তম ইন্টারভিউ দেওয়ার মুহূর্তে রুদ্রর বয়স ঊনত্রিশ পার করে ত্রিশ ছুঁই ছুঁই। দু-মাস বাদে ত্রিশ হবে। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। কেননা অনেক সরকারি চাকরির জন্য এটা শেষ সুযোগ। বুকের ভেতরে হাহাকার।
একদিন সকালে একটা চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। একটা স্বনামধন্য বেসরকারি ব্যাংকে। রুদ্র গিয়ে বসেছে একপাশে। পাশে একটা ছেলে ফোনে বলছে,
"স্যার, আপনি জাস্ট ভাইভার আগে একটা ফোন করে দেবেন, বাকিটা আমি সামলে নেব। ধন্যবাদ স্যার। বুঝতেই পারছেন, এতদূর এসে খালি হাতে ফিরে যাব..."
রুদ্র সেই কথায় অবাক হয়নি। এখন এসব স্বাভাবিক।
কিছুক্ষণ পর ওকে বোর্ডে ডাকা হল।
বোর্ডের চারজনের একজন হেসে বলল, "আপনি তো অনেক ওভার কোয়ালিফায়েড। আমাদের জন্য একটু বেশিই... আপনি ভবিষ্যতে অনেক বেটার সুযোগ পেতে পারেন..."
রুদ্র শান্তভাবে বলল, "আমি তো শুধু একটা সুযোগ চাইছি। আপনি কাজ দিতে চান না, সেটা সরাসরি বলুন। 'ওভার কোয়ালিফায়েড' বলে বাদ দেওয়া তো হাস্যকর।"
একজন বোর্ড মেম্বার বলল, "অতি যোগ্য লোকের চাকরি নেই, সেটা জানেন না?"
রুদ্র উঠে চলে এল। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, শহরের প্রতিটি সাইনবোর্ড তার মুখে কষে থাপ্পড় মারছে - "তোমার জায়গা নেই এখানে।"
রাতে সে চুপচাপ। মা পাশে এসে বসে, "তুই কি কোথাও গিয়েছিলি আজকে?"
রুদ্র বলে, "হ্যাঁ মা...।"
"কী বলল?"
"দেশে আমার চাকরি হবে না। বলল, তাদের প্রয়োজনের থেকে আমি বেশি যোগ্য। এই অজুহাতে আমি বাদ... সবকিছু কেমন হাস্যকর লাগে, মা!"
মা চুপ। হঠাৎ রুদ্র বলে উঠল, "মা, আমি বিদেশ যাব। অনেক চেষ্টা করলাম, আর পারছি না। হয়তো দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্নটা ভুল ছিল। আমি শুধু টিকে থাকতে চাই এখন।"
মা চোখ মুছে বলল, "তোদের মতো ছেলেমেয়েরা যদি হার মেনে নেয়, তাহলে সত্যিই এই দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।"
রুদ্র কিছু বলে না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শহরের ধূসর বাতাসের মাঝে রুদ্রর স্বপ্নগুলো যেন বৃষ্টির ফোঁটার মুখে পড়ে ফুটপাত ধরে নর্দমার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে।
