ভ্রমণ ও দেশ-বিদেশ

চলো বর্ষায় ফুটিয়ারি



সজল কুমার পোদ্দার


ফুটিয়ারির কথা মনে পড়লেই কেমন যেন শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যায় মুঠো মুঠো মুক্ত বাতাস। শত কর্মক্লান্ত মনের সমস্ত আবিলতা মলিনতাকে ধুয়ে প্রশান্ত করে। তাইতো বারবার ছুটে যাই মালভূমির বন্য সোহাগী কন্যা ফুটিয়ারির কাছে। উপলব্ধি করি তার ষড়ঋতুর কোমল মধুর্যতা, চোখ ধুয়ে নিই তার বারো মাসে তেরো পার্বণের প্রস্তুতির সমারোহ দেখে। প্রতিটা ঋতুতেই গিয়েছি ফুটিয়ারিতে। তবে, এই প্রথম বর্ষায় সেখানে যাওয়া। আর ওখানে যাওয়া মানেই সুবিশাল ফুটিয়ারি জলাশয়ের আঁচল তলে দিব্যেন্দুদার 'ফুটিয়ারি রিট্রিট' (Futiyari Retreat)-এ। মাতৃগর্ভের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে প্রকৃতির মাঝে মনের মানুষকে খোঁজা। এ যেন মায়ের কোলে বসে তাল তমাল পলাশ বনে ফাগুন বউয়ের দেখা।

কৃষ্ণনগর থেকে ফুটিয়ারির দূরত্ব কমবেশি ২৮০ কিলোমিটার। লং রেসের ঘোড়ার মতো ছুটে চলল আমাদের স্করপিও ফুটিয়ারির উদ্দেশ্যে। প্রথমে নবদ্বীপ হয়ে বর্ধমান তারপর খরস্রোতা গাড়ির নদী দুর্গাপুর এক্সপ্রেস হয়ে ধেয়ে চলল তীরের খোলার মতো প্রায় ঘন্টাখানেক। পানাগড় হয়ে দুর্গাপুর থেকে বাঁদিকে টার্ন নিয়ে এন. এইচ. নাইন ধরে এগিয়ে চললাম বাঁকুড়া শহরের দিকে। কিছুটা এগিয়েই ডিভিসির বাঁধ। দামোদর নদীর বাঁধ পেরিয়ে আমাদের গাড়ি থমকে দাঁড়াল। থমকে দাঁড়ানো শব্দের মধ্যে প্রকাশ পেল ১৫০ কি.মি. রাস্তা অতিক্রান্তের ক্ষীণ ক্লান্তি। গাড়ির মধ্য থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা পাঁচজন অভিযাত্রী তন্দ্রাচ্ছন্ন অলসতাকে দূর করার জন্য শারীরিক কসরত করতে করতে। তখন চলছে দামোদর নদীর বেলাভূমিতে বিদায়ী সূর্যের খুনসুটি। এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখার লোভ কেউই সামলাতে পারলাম না, চায়ের কথা ভুলে নেমে গেলাম দামোদর নদীর তটভূমিতে। দেখলাম গোধূলির গুলালী আসমান তখন দামোদরের নীল জলে। দক্ষিণী সমীরণ ও কনককান্তি সূর্যালোকে তনুমন ভিজিয়ে নব উদ্যমে আবার শুরু হলো গন্তব্যের অভিমুখে যাত্রা।

বাঁকুড়া শহরকে ডাইনে রেখে বাইপাস ধরে এক এক করে গন্ধেশ্বরী, দারকেশ্বর নদী পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ধলডাঙ্গা। সেখানে গিয়ে রাস্তাটা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। যেন মহেশ্বরের ত্রিশূল। ডান দিক হয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল রাঁচি রোড (এন. এইচ. 60A) ধরে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের শুরু। আকাশে স্বমহিমায় চাঁদ বিরাজমান। ডাইনে বাঁয়ে মানুষ জঙ্গলের সহবাস। মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাজার। যতই এগিয়ে চলেছি ততই আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে জনশূন্যতা আর অরণ্যের নিবিড়তা। মাঝে মাঝে চাঁদের আলো হারিয়ে গেছে বনের গভীরতায়। আমাদের গাড়ির হেডলাইটের আলো দুরন্ত ষন্ডের হিংস্র শিং-এর মতো আস্ফালন করতে করতে আঁধারের বুক চিরে পৌঁছে গেল লাধুর্কা (Ladhurka)।

রাঁচি রোড ছেড়ে প্রথমে ডাইনে পরে বাঁয়ে সরু রাস্তা ধরে গাড়ি চলল মন্দা গতিতে। জনশূন্য প্রান্তর। বাঁদিকে লাল মাটির সিঁড়ি ভূমি, ডান দিকে টেবিল ল্যান্ডে ব্যাসল্ট আচ্ছাদন। এমনি করে কিলোমিটার খানেক গিয়ে বড় একটা শব্দ করে গাড়িটি থেমে গেল 'ফুটিয়ারি রিট্রিট'-এর পার্কিংয়ে, সেই শব্দের মধ্যে প্রকাশ পেল আজকের মত যাত্রা পরিসমাপ্তির নির্ঘণ্ট। মাথা যতটা নিচু করে গাড়ি থেকে নেমেছিলাম ঠিক ততটাই ওপরে তুলে দেখলাম, সামনে সুউচ্চ সুবিশাল ও সুপ্রশস্থ তোরণদ্বার। অদূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম তোরণদ্বারের খোলা ছাদ, বাঁ দিক দিয়ে এঁকেবেঁকে সিঁড়ি পৌঁছে গেছে তার ওপরে। যেন স্বর্গগামী অজগর বুক পেতে আছে।

পরিমলদার আতিথেয়তায় চটজলদি সেরে নিলাম রাতের ডিনার। সবাই যখন নিদ্রামগ্ন আমি তখন নিঃশব্দে পৌঁছে গেলাম সিঁড়ি বেয়ে তোরণদ্বারের খোলা ছাদে। অবাক হয়ে দেখলাম আর উপলব্ধি করলাম বর্ষা রাতের ফুটিয়ারির মোহিনী রূপ। বর্ষার ভারী বর্ষণ পালা কেটে গেছে দিনের শেষভাগেই। এখন দিগন্তব্যাপী নির্মল আকাশে বসেছে রংবেরঙের ভাঙা মেঘেদের মেলা। চতুর্দশীর চাঁদ তখন মধ্য গগনের থেকে কিছুটা পুবে হেলে। বিন্দুমাত্র কৃপণতা নেই, তার হৃদয় নিংড়ানো সমস্ত জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছে রাতের দ্বি-প্রহরে ফুটিয়ারির বুকে। দূর পূবের ঘন বন ঘুমে নিমগ্ন, দক্ষিনে আলপথ জুড়ে জ্যোৎস্নায় স্নানরত সারি সারি তাল আর এলোমেলো পলাশেরা ঠায় দাঁড়িয়ে নীরবে। দক্ষিণী সমীরণ যেন বনরাজির সিক্ত কেশরাশির হিমেল পরশ এনে আমাকে ভিজিয়ে চলে যাচ্ছে উত্তরের ফুটিয়ারির দিঘিতে। যেখানে চন্দ্রতপার সঙ্গে চাঁদও নেমে এসেছে অবাধ অভিসারে। পশ্চিমে দূর দিগন্তে লোকালয়ের অস্তিত্ব বহন করে চলেছে মিটমিট করা কয়েকটি আলোর শিখা। মাঝেমধ্যে সেখান থেকে দু-একটা ছায়ার পাখি সশব্দে উড়ে যায় দিঘির আকাশ পেরিয়ে রিসোর্ট-এর মাথার ওপর দিয়ে। সেই পাখির আর্তনাদ বাড়িয়ে দেয় রাতের গভীরতাকে। গা ছমছম করে ওঠে। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে দূরের কটেজগুলোর বিজলি বাতি। চোখ নেমে আসে রিসোর্ট ভূমিতে। মালভূমির ধাপে ধাপে সারি সারি কটেজগুলো যেন মেরুন রঙের কাশ্মীরি শাল মুড়ি দিয়ে নিদ্রায় নিমগ্ন। বাঁদিকের অদূরে নিঃসঙ্গ একটা কুঠি যেন সাধনারত বাল্মিকী। সবকিছু মিলে রাতের ফুটিয়ারিকে মনে হল ইন্দ্রপুরীর প্রগোলভা মোহময়ী ঊর্বশী, দৃষ্টি নিবন্ধে আবদ্ধ দিগন্ত জোড়া কুহেলি প্রহেলিকার হাতছানি। তারই কাছে নিজেকে সমর্পণ করে স্বপ্নমেদুর রাতটাকে কাটিয়ে দিলাম সাত সমুদ্র তের নদী পারে পরীর দেশের রাজপুত্রের মতো। তবু অবচেতন মন জেগেছিল প্রভাত অরুণাচলের স্পর্শে রাজকন্যার ঘুম ভাঙার দৃশ্য দেখার জন্য।

সূর্যোদয়ের আগে ঘুমের আলস্যতা দূর হল পাখিদের কলকাকলিতে। রুম থেকে বেরিয়ে এলাম অলিন্দে, চোখ কচলে কাটিয়ে তুললাম দৃষ্টির প্রতিবন্ধকতাকে। চারিদিকে দেখলাম 'ফুটিয়ারি রিট্রিট-এর বৈদিক আভিজাত্যকে। সবুজের সোহাগী সমারোহে প্রকাশ পেল রিসোর্ট-মালিক দিব্যেন্দুদার প্রকৃতি প্রেমের গভীরতা। মালভূমির নিজস্ব সত্তায় বেড়ে ওঠা অবিন্যস্ত সবুজের সাথে পা মিলিয়েছে ভিনদেশী রংবেরঙের বিন্যস্ত উদ্ভিদেরা। সেখানকার শাল পলাশ তাল তমালের সোহাগে আদরে আহ্লাদী হয়েছে পাহাড়ি রেইন লিলি, ম্যানগ্রোভের কেওড়া গরান, সমতলের রংবাহারি জবা চাঁপা বেলি টগর কেতকী। আরও কত কি! এছাড়া আছে, ভ্রমণার্থীদের ভোজ্য সবুজ সব্জির প্রাচুর্যতা। চোখের সবুজের ঘোর কাটে রন্ধনশালার ওপার থেকে ভেসে আসা মোরগের কুক্কুট স্বরে। এক অভিনব ও শ্রেষ্ঠ পাওনা। এ যেন সূর্যোদয়ের আহ্বান, এ যেন ফুল পাখি আর দর্শনার্থীদের ঘুম ভাঙানোর জয়ধ্বনি। বাল্মিকী কুঠিরে ঝোলানো পাখিদের বাসা থেকে উঁকি দেয় লাল নীল হলুদ ঠোঁটের ছোট বড় পাখিগুলি।

ওদের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিছনে ফিরে পলক তুললাম পূর্ব দিকে। দিগন্ত জোড়া সোনার কেল্লা! বুঝে নিলাম এবার সূর্যোদয়ের পালা। পায়ে মেঠো খরগোশের দ্রুততা নিয়ে এগিয়ে চললাম দীঘির দিকে। রিসোর্টের সীমানা স্পর্শ করেছে উত্তর দিক জোড়া দিঘির চুলকে। লাল মাটির সিঁড়ি ধরে নেমে চললাম এক পেয়ে আলপথে। পা যেন আর চলতে চায় না। দু'দিকে প্রকৃতি আপন খেয়ালে মেতে উঠেছে নতুন বর্ষার জলে। গায়ে সোহাগ ভরে ঢলে পড়ছে পোয়াতি কাশফুল ঘাসেরা। বাঁদিকের ভূমির ঢালে ঢালে পলাশ গাছগুলোর দেহে যুবতী সম্বর হরিণীর লাবণ্যতা। ডানদিকের দোদুল্যমান স্থল কলমীর গাঢ় সবুজ পত্রে আগমনীর আমন্ত্রণ বার্তা। তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে চোখ ফেলেছি একটু দূরে। মনে হল বক সারসের দেশ। চোখের দেখা আর মনের ভাবনা ভ্রম হল। ওটা আসলে প্রস্ফুটিত ও অপ্রস্ফুটিত শ্বেতপদ্ম বন। পায়ের কচ্ছপ গতিটুকুও অথর্ব হল একটু সামনে ডান হাতের শ্বেতপদ্ম দীঘির শ্বাদ্বল ভূমিতে গিয়ে। স্নিগ্ধতায় ভরা কমল বিভুষিতা মায়ের আঁচল, তার উপরেই আছড়ে পড়েছে সূর্যালোক। প্রতিটা পদ্মপত্রে সঞ্চিত শিশির বিন্দুতে নেমে এসেছে সূর্য। তারই বিচ্ছুরণে হাই তুলছে পদ্মকলি। শুরু হয়েছে মধুমক্ষীদের আনাগোনা।

অবর্ণনীয় এই হরিত-শুভ্র পদ্মদীঘির রূপমধুর্যতার ঘোর কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম ফুটিয়ারির বড় জলাশয়ের কাছে। দিঘির তটভূমি থেকে মাটির মোটা পাড় কিছুটা অংশ এগিয়ে দিঘির জলে মাথা ডুবিয়েছে। দূর থেকে মনে হয় শীতে কাতর প্রকাণ্ড কুমির জলে লেজ ডুবিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। আমি তার পিঠের উপর দিয়ে হেঁটে গেলাম তিন দিকে জল বেষ্টিত লেজ দেশে। ডাইনে বাঁয়ে সামনে শাপলা পত্র আচ্ছাদিত জলদেশ। মৃদুমন্দ জলতরঙ্গে দুলছে বেগুনি ও গোলাপী রংয়ের চোখ ধাঁধানো অসংখ্য শাপলার ফুল। কলেবরে তারা যেন পদ্মসম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম শাপলা পত্রের উপরে ডাহুক পাখিদের আধিপত্য বিস্তারের নবাবী চালচলন, স্ফটিক জলে পানডুবি পাখিদের শিকারের কেরামতি, জলগুল্মে পানকৌড়ির সিক্ত ডানা শুষ্ক করার পালতোলা ভঙ্গিমা, হাঁটু জলে দুধে বক আর শামুক খোলের নিরব নিঃশব্দে চুনোপুঁটি খুঁজে চলা, আকাশ হতে ক্ষুধার্ত মাছরাঙ্গার তারাখসার মতো জলের বুকে আছড়ে পড়া, সুগভীর দিঘির উর্মিমালায় ঝাঁকে ঝাঁকে পোষা আর বুনোহাঁসের ভেসে চলা। মাঝে মাঝে পলাশ বন থেকে দলে বেদলে তালচড়ুই গাংশালিক আর চাতক পাখিরা উড়ে যায় ফুটিয়ারি ড্যামের দিকে। দক্ষিণ থেকে উত্তরে সুউচ্চ পিচ প্রস্তর বাঁধ বুক পেতে শুয়ে আছে অঘাত জলরাশির দায়ভার নিয়ে। ফুটিয়ারির রূপলাবণ্যে মোহিত হয়ে ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের গায়ে মাথা তুলে সভ্যতার আদিম তিলাবনী (Tilabani) ও সিঁন্দুরপুর (Sindurpur) পাহাড়। বর্ষার আকাশে মাঝে মাঝে শরতের সমারোহ। ভাঙা ভাঙা পেঁজাতুলো মেঘগুলো পাহাড়ের সাথে করে কানাকানি। মেঘ পাহাড় আর সুনীল আকাশের প্রতিবিম্ব জলধির অতল তলে। দূরে গাঁ ঘেঁষা কালো জলে ঘুরপাক খাচ্ছে জেলেদের তালডিঙিগুলো। ফুটিয়ারির এমনই মায়াবী সৌন্দর্যে কখন যে হারিয়ে গিয়েছিলাম! সম্বিত ফিরল সহসা ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর শব্দে। পিছনে ফিরে চেয়ে দেখি দিঘির পূর্ব পাড়ে সারি সারি তাল গাছ; তারই ঝুলন্ত মৃত পত্রে দমকা হাওয়ায় এমনই আঁৎকে ওঠা শব্দ। গাছে ঝুলে আছে কাঁদি কাঁদি মিসকালো ইহা বড় বড় তাল! গা ছমছম করে উঠল ঠাকুরমার কাছে শোনা তালদিঘির মেছোভূতের গল্পকথা মনে পড়ে। সেস্থান তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করে চলে এলাম আবার আমাদের রিসর্টে।


ফুটিয়ারি বাঁধ, আদ্রা, পুরুলিয়া।

ব্রেকফাস্ট করে অনতি বিলম্বে আবার বেরিয়ে পড়লাম ফুটিয়ারির ডুংরির পথে। তবে এবার আর একা নয়। গাড়ির চালকের আসনে রিসর্ট-এর মালিক দিব্যেন্দু ঘোষ যিনি আমার দাদা কাম বন্ধু। সঙ্গে আমরা পাঁচজন। ফুটিয়ারি ড্যামের উপর দিয়ে চললাম লক্ষ্যের দিকে। ডানদিক দিয়ে অধোগতিতে পাকদন্ডী হারিয়ে গেল সবুজের মাঝে। বাঁদিকে ড্যামের কাঁধ ছুঁইছুঁই নীল জলরাশি, ডানদিকে অনেক নিচে ঘন সবুজ বনরাজি। মাঝখান দিয়ে আমাদের গাড়ি পৌঁছল ফুটিয়ারির ডুংরি পাহাড়ের পাদদেশে।

সেখানে গাড়ি রেখে পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের চূড়ায়। উঠতে তেমন কষ্ট হয়নি। কারণ, পাহাড়ের ঢাল যেমন ছিল মসৃণ তেমনি পাহাড়ের গলদেশ পর্যন্ত ছিল সবুজ ঘাসে ঢাকা। ফুটিয়ারির ডুংরি পাহাড়ের অভিনব এবং বিরল রূপ চাক্ষুষ করলাম। দূর থেকে মনে হয় সবুজ চাদর গায়ে উন্মুক্ত শিরে ধ্যানমগ্ন কোনো যোগীপুরুষ। ওপর থেকে নিচের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের চূড়াদেশে, বুঝতেই পারিনি। ফুটিয়ারির ডুংরি পাহাড়ের মাথায় পা রেখে দেখলাম সমগ্র জঙ্গলমহল। মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ, যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। সবুজ ছাড়িয়ে দূর আকাশে মাথা তুলে আছে যেন মেঘের পাহাড়। দিব্যেন্দুদা এক এক করে পরিচয় করিয়ে দিল শুশুনিয়া, অযোধ্যা, গড়পঞ্চকোট, বিহারীনাথ, জয়চন্ডী সহ আরও অনেকের সাথে, হাতের কাছে তিলাবনী, সিঁন্দুরপুর পাহাড় তো আছেই। লাল সবুজের ফাঁকে ফাঁকে ছোট বড় জলাশয়। রোদ ঝলমল আকাশের উড়ন্ত ভাঙা মেঘেরা হারিয়ে যাচ্ছে দূর পাতাল দিগন্তে। ডুংরি থেকে পৃথিবী দেখা, এ যেন স্বর্গ দর্শন! কল্পনাতীত স্বপ্নের দেশ! পূর্ব দিকের অপেক্ষাকৃত নিচু বনভূমিতে গরুর পাল দেখে মনে হয় কানহাইয়ার গোচারণ ভূমি। উত্তর দিক জুড়ে রয়েছে মহেশ্বরের কৈলাস ক্ষেত্র। পশ্চিম দিকে জঙ্গলের মাঝে ছোট্ট গ্রাম দেখে মনে পড়ে, বৃন্দাবনের সেই স্বতসিদ্ধ মুনিদের ভান্ডি বনের বৈদিক গাঁয়ের কথা। দক্ষিণ দিকে ফুটিয়ারির বিস্তীর্ণ নীল জলাশয় যেন মহাভারতের আদি পর্বের চৈত্ররথ সরোবর।

সত্যি কথা বলতে কি ফুটিয়ারির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। তাই প্রখ্যাত লেখক পূর্ণেন্দু পত্রীর হিমালয় দর্শনের মতো বলতে হয় - পুরুলিয়ার রানী ফুটিয়ারির রূপমাধুর্য সকলকে বোঝাতে গেলে, হয় গোটা ফুটিয়ারিকে তুলে সকলের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে অথবা সকলকে ফুটিয়ারিতে নিয়ে যেতে হবে। যার কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই মানুষের কাছে ফুটিয়ারিকে জীবন্ত করে তোলার জন্য তার সম্পর্কে দুই কলম আওড়ালাম মাত্র।