বিবিধ

কৃষ্ণনগরে কাজী (ষট্‌বিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



ইনাস উদ্দীন


[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]


নজরুল-এর সাথে একান্তে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ।

পর্ব - ২৬

'বাব্বা! কতদিন দেখাই হয়না। কাজীদা সভাসমিতি নিয়ে আমাদের ভুলেই গেছেন' - চৌকাঠ পেরোনোর 
আগে থেকেই হেলেনের কলকল কণ্ঠের উচ্ছ্বাস বাড়ির ভিতর থেকে বাইরে কাঁঠালতলা পর্যন্ত ঢেউয়ের মতো লুটোপুটি খাচ্ছিল।

আকবর উদ্দীন সবার আগে শসব্যস্ত হয়ে সোফা থেকে উঠে নজরুলের হাত জড়িয়ে ধরলেন। 'আসুন! আসুন মাসিমা। ভাবী, আপনাদের জন্য অপেক্ষায় আছি।'

নজরুল বিস্ময় প্রকাশ করে বলে উঠলেন, আরে আপনি এখানে? এ বাড়িতেও যাতায়াত আছে নাকি? দোলন, এই সেই আকবর ভাই। সেই স্টেশন থেকে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর চাঁদসড়কের বাড়িতে। ভাবী খুব সযত্নে খাইয়েছিলেন।'

দোলনের মুখে খুশি খুশি ভাব। জ্বরে কাহিল হওয়া মানুষটাকে অনেক দিন পরে আবার তার প্রিয় চেহারায় যেন দেখা যাচ্ছে। পরিচিত মানুষ আর আড্ডার গন্ধ পেলেই মানুষটি কেমন উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। জ্বরজ্বালা অসুস্থতার কথা তখন তাঁর আর মনে থাকে না। আকবর উদ্দীনের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে দোলনের সহজ প্রতিক্রিয়া, 'আপনার কথা অনেক শুনেছি। ভাবীর শরীর কেমন? তাঁকে নিয়ে আসতে পারতেন।

আকবর উদ্দীন বেশ আশ্চর্য হলেন। 'আপনি এতো খবর জানলেন কী করে? ভাবীর অবস্থা ক'দিন খুবই খারাপ যাচ্ছে।'
 গিরিবালা দেবীই উত্তর দিলেন। 'হাবির মায়ের কাছে সব খবর পাই বাছা। তার কাছে তো পুরা কেশনগরের হাঁড়ির খবর থাকে। তা বাছা মেয়েটাকে ঠিকঠাক ডাক্তার দেখাচ্ছ তো?

- নগেন ডাক্তারই দেখছে মাসিমা। তবে কী বলব, ওষুধপাতিও মনে হয় ঠিকঠাক খায়না, কষ্টের কথা বেশিকিছু বলেও না। আমি তো সারাদিন বাইরে বাইরে থাকি। গত কয়েকটা দিন একেবারেই বিছানায়।

'তা বদরকে নিয়ে আসেন নি কেন? ভারি মিষ্টি আর বুদ্ধিমান আপনার ছেলে। আমার তো বেশ লাগে। এখানে এলে ভালোই লাগত।'

- না, আসলে এখন ও মায়ের কাছে বেশি থাকে। ওর মায়েরও ওকে নিয়ে বেশি চিন্তা।

'ও তুমি বেশি ভেবোনা বাছা। নগেন ডাক্তারের হাত খুব ভালো। পাশ করা ডাক্তার। দেখো বৌমা ঠিক হয়ে যাবে।'

গম্ভীর আর কেজো কথাবার্তাকে তোয়াক্কা না করে হেলেনের দ্বিতীয় বার প্রবেশ। ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন কিরণময়ী। সঙ্গে আরো দুজন মহিলা। নজরুল দ্রুত পদস্পর্শ করতে গেলে কিরণময়ী বাধা দিয়ে ঝাঁকড়া চুল ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন। 'দুমাস হয়ে গেল, আর তোমাদের দেখা নেই। বিজয়কে কতবার বলি, একবার ওদের নিয়ে আয়। তা সে নিজেও টো টো করে ঘুরে বেড়ায়।'

- মা, তুমি না,কিছুই বোঝো না। কাজীদা কত বড়ো বড়ো কাজে ব্যস্ত! হাই লেভেলের সভা-সমিতি, নতুন পার্টি তৈরি করছেন। সে আবার যেমন তেমন নয়, একেবারে কম্যুনিস্ট পার্টি! তোমার বাড়ি এসে আড্ডা দেবার সময় কোথায়?'
হেলেনের কথায় নজরুল মজা পাওয়ার চেয়ে বিস্মিত হলেন বেশি।

'মাসিমা, আপনার এই কন্যাটি বড্ডই পাকা। তা তুই এতো জানলি কী করে?' ছোটো বা সমবয়সীদের অনায়াসে তুমি, তুমি থেকে তুইতে নামিয়ে নিয়ে আসা নজরুলের প্রকৃতিগত অভ্যাস। তুমি থেকে কখন অজান্তে হেলেন যে তুইতে নেমে গেল তা কেউ টেরও পেল না, হয়ত হেলেনও না। সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর, আমি তো ইশতেহারও পড়েছি! বড়দা প্রতিটি লাইন পড়ে পড়ে ব্যাখ্যা করত। বাপরে, কীসব কঠিন কঠিন কথা!

কিরণময়ী একরকম ধমক দিয়ে মেয়েকে থামালেন।

'তুই থাম তো! কাজী নাহয় সভা-সমিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, লেখক মানুষ - তার অনেক কাজ। কিন্তু আমার এই মেয়েটি, সারাদিন মা-মেয়ে একা ঘরে থাকে। খুব মনে হয় একবেলা ঘুরে আসি, গল্প করে আসি, বাড়িতে নিয়ে আসি। আমারও বেরুনো হয়না। ইসস্, মুখটা কেমন শুকনো শুকনো হয়ে গিয়েছে।' চিবুকে স্নেহের স্পর্শ - দোলনের ভালো লাগল।

কথার কলরোলের ফাঁকেই পাশের দুজন মহিলাকে দেখছিলেন নজরুল। একজন সরোজবাসিনী গুপ্তা। বৈধব্যের পোষাক, কিন্তু ঠিক থান কাপড় নয়। সরু পাড় হাল্কা ঘিয়ে রঙের শাড়িতে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিল। চোখেমুখে এক ব্যক্তিত্বময়ী প্রসন্নতা।

'চিনতে পারেন?'

'হয়ত চোখের সামনে দ্যাখেনি, কিন্তু সরোজবাসিনী গুপ্তাকে কলকাতা সুদ্ধ লোকে চেনে। আজ কিন্তু আপনার গান শুনব।' উচ্চকণ্ঠ নজরুলের কথায় সরোজবাসিনী প্রায় আঁতকে উঠলেন।

'আমি? গান? তাও বিদ্রোহী কবির সন্মুখে!'

'না কাজীদা, শুনবেন না! মাসিমা কিন্তু ভালোই গান করে। তুমি অবশ্যই গান শোনাবে।'

এতো মঘার গলা।

নজরুল পিছন ফিরে দেখলেন বিজয়লালের সঙ্গে মঘা এবং আরও দুজন ভদ্রলোক। নজরুল খুশি হলেন বিজয়ের সাথে মঘাকে দেখে। লেবার স্বরাজ দল তৈরি নিয়ে কত কাণ্ড হয়ে গেল, বিজয়কে ধারেকাছে বিশেষ দেখা যায়নি। অথচ সে হেমন্তদার প্রায় ভক্তশিষ্য। তাঁর কাছে একবার কথাটা তুলতে হেমন্তদা বলেছিলেন - বিজয়কে টেনে লাভ নেই, চরকার বাইরের জগতটাকে ও কিছুতেই মানতে পারেনা। গান্ধীর গ্রাস থেকে ওকে বের করা কঠিন।

নজরুলের বিস্ময় জাগে। যে মানুষটা অনন্তহরি মিত্রের মতো আগুনখোর বিপ্লবীকে হাত ধরে নিয়ে আসে, নিজের বাড়িতে স্থান দেয়, লড়াকু চলনে স্বদেশী করতে গিয়ে জেল খাটে। কমিউনিস্ট ভাবের লাঙল পত্রিকা ঝোলায় নিয়ে বিলি করে বেড়ায়, সাম্যবাদীর প্রায় সব কবিতা মুখস্থ, বাড়িতে ভাইবোনেরা মিলে লেবার স্বরাজের ইশতেহার পড়ে - সেই মানুষটা অহিংস গান্ধীগিরির বাইরে পা বাড়াতে নারাজ - কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকে। যে বলশেভিকদের প্রশংসায় রবীন্দ্রনাথ পঞ্চমুখ, অন্ধ রবীন্দ্রভক্ত বিজয়লাল সেই নভেম্বর বিপ্লবকেও বাঁকা চোখে দেখে। একদলীয়তন্ত্র কখনো সার্বিকভাবে মানবসমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারেনা - এটা তার দৃঢ় ভাবনা।

আক্ষরিক অর্থেই সেদিন কিশোরীলালের ফরাস পাতা বাহিরের ঘর হয়ে উঠলো সংগীতমুখর। আসবাবপত্র একদিকে করে তোষকের উপর সাদা চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশস্ত জায়গা। কিন্তু কিশোরীলাল নেই। বিজয়লালের কণ্ঠে 'যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ!' দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান দিয়েই শুরু। বহরমপুর জেলের স্মৃতি উস্কে দিয়ে নজরুলের আবদারে বিজয়লালকে গাইতে হলো 'আমার সকল দুখের প্রদীপ' - জেলে আড্ডা বসলেই বিজয়লালকে এই গানটি গাইতে হতো। উদাত্ত উচ্চারণ মুগ্ধ হবার মতো। হেলেন চুপিচুপি জানালো কিশোরীলাল ক'দিনের জন্য ফরিদপুরে গেছেন। সেইজন্যই বড়দা এতো দিলখোলা। ক'দিন শান্তিনিকেতনে কাটিয়ে ফিরেছে। এখন ঘনঘন শান্তিনিকেতন যায়। ফিরে এসেই কাজীদাকে ডেকে আসর বসানোর তোড়জোড়। বাবা থাকলে কিন্তু বেশ আনন্দ পেতেন। আগে তো মাঝে মাঝেই কাঁঠালতলায় হ্যাজাক জ্বেলে বাবা আসর বসাত। যাত্রাপালার রিহার্সাল হতো। বাবা ফিরলে দেখবেন আপনাকে আবার ধরে আনা হবে।

নজরুল আসরের মধ্যমণি। তাঁর গান শোনার জন্যই উদগ্রীব হয়ে আছে সবাই। যথারীতি নজরুল হারমোনিয়াম টেনে একটানা অনেকগুলি গান গেয়ে গেলেন। 'আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার', 'উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে' 'তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী' - একটা গান শেষ হলে আরেকটা গানের অনুরোধ আসে। দোলন লক্ষ্য করে - হারমোনিয়ামে হাত দিলে নজরুল কেমন অন্য মানুষ হয়ে যায়। নিজের জগতে নিজেই বিভোর। চেনা মানুষটি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

কাজী সাহেবের নিজের গান শুনতে চাই - আকবর উদ্দীন আব্দার করে বসলেন, টাউন হলের সম্মেলনে গাওয়া গানটি শোনাতে হবে। তিনি নিজে দলীয় সম্মেলনে ছিলেন না, কিন্তু লোকমুখে শুনেছেন 'ওরে ধ্বংসপথের যাত্রীদল, ধর হাতুড়ি তোল কাঁধে শাবল'। বললেন, বিজয়ের কাছে যখন শুনি যে সন্ধ্যাবেলা আপনি আসছেন, শুধু এই গানটি আপনার কন্ঠে শোনবার জন্য চলে এসেছি। অবশ্য কিশোরীদার বাড়িতে আসর অনুষ্ঠান হলে আমি ডাক পাই এবং সাধারণ ভাবে আমি কামাই করিনা।

আকবর উদ্দীন কথা কম বলেন, কিন্তু বেশ রসিক মানুষ। 'আকবর কাকা কিন্তু ভালো কবিতা লেখেন' - বিজয়ের কথায় নজরুল কপট রাগ দেখিয়ে বললেন - এটা কিন্তু ভারি অন্যায়। সারাদিন আপনার বাড়িতে কাটালাম, কিন্তু একটাও কবিতা শোনাননি! সংকুচিত বিব্রত আকবর উদ্দীন স্মৃতি থেকে কয়েকলাইন স্বরচিত কবিতা শোনালেন। বললেন, একসময় লেখার একটা নেশা ছিল, এখন নানান ব্যস্ততায় হয়ে ওঠে না। নজরুল উৎসাহ দিয়ে বললেন - আপনার লেখার হাত ভালো, লিখবেন না কেন? অবশ্যই লিখুন।

সরোজবাসিনী কবিতা পাঠের পাশাপাশি গান শোনালেন 'ওগো দুখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাব'। বেশ সুরেলা কন্ঠ। নজরুল চমৎকৃত হয়ে বললেন, এরকম কোকিলকণ্ঠ নিয়ে আপনি গান-হারা হয়ে থাকেন কেন?

'দেখলে তো মাসিমা, কাজীদাও তোমার গানের কতো সুনাম করছে, আমরা বললে শোনো না।' প্রমোদরঞ্জনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, 'বুঝলেন কাজীদা, মাসিমা প্রায়ই বলে, মঘা, কাজী সাহেবকে আমাদের উপাসনার সাহিত্য আসরে একদিন নিয়ে আসিস। গান শুনব।'

বালবিধবা সরোজবাসিনী সাহসিনী মহিলা। নিজের উদ্যোগে বাড়িতে সাহিত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কলকাতা থেকেও উপাসনা পত্রিকা গোষ্ঠীর লেখক কবিরা আসেন। নজরুলও শুনেছেন সে কথা। বললেন, যাব নিশ্চয় যাব।

তবে এদিনের সান্ধ্যবাসরে একটি বিশেষ চমক অপেক্ষা করেছিল। আকবর উদ্দীনের পাশে বসে চুপচাপ বসে থাকা সৌম্যদর্শন ভদ্রলোকের প্রতি বিজয়লাল দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, এখানে প্রায় সকলেই চেনেন, ইনি আমাদের মাস্টার মশাই, কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের অধ্যাপক ভবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিতাপ্রেমী মানুষ। নিজে ভালো আবৃত্তি করেন, বলতে গেলে কৃষ্ণনগরে স্যারই একমাত্র আবৃত্তি শেখানোর আলাদা ক্লাস করেন। কাজীদার কন্ঠে তাঁর নিজের কবিতা শোনার ভীষণ আগ্রহ। বাকিটা স্যার নিজেই বলবেন।

'আপনাকে আমার প্রণাম। কবি অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু সঠিক আবৃত্তিকার পাওয়া মুশকিল। কাগজে লেখা কবিতার ভিতর আপনারাই তো প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। আগে আপনার কবিতা শুনতে চাই'। নজরুলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা হতচকিত ভবেশ বাবু অধ্যাপকসুলভ ভঙ্গিতে একটু গুছিয়ে নিয়েই কথা শুরু করলেন।

- আবৃত্তি হয় কিনা জানিনা, বিশেষত কিছুদিন আগে টাউন হলে আপনার কন্ঠে 'আগমনী' কবিতা শোনার পরে আবৃত্তি সম্পর্কে আমার ধারণা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে।

কথার মাঝখানেই প্রমোদরঞ্জন বলে উঠল, 'স্যার, আপনি টাউন হলে গিয়েছিলেন? সত্যি? তাহলে তো পুলিশের খাতায় আপনার নাম উঠে যাবে!'

ব্যাপারটা কী বোঝার জন্য সবার চোখ ভবেশ বাবুর দিকে। মঘাটা বড্ডই পাকামি করে। এইভাবে সভার মাঝে মানুষকে লজ্জায় ফেলে দিতে ওর বাধে না। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। সপ্রতিভভাবেই উত্তর দিলেন, নারে, সেটা বোধহয় হয়নি। একেবারে পিছনে মুখচোখ চাদরে ঢেকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আসলে কী কাজী সাহেব, আপনি আসা ইস্তক শহরে একটা গুজব আছে - গোয়াড়ি এলাকায় পুলিশের চর ঘুরে বেড়ায়। আপনি কোথায় যান, কার সঙ্গে কথা বলেন, কারা আপনার কাছে আসে সব নাকি লিখে রাখে তারা। সাধারণ ছা-পোষা মানুষ, তা ভয় একটু লাগে বৈকি!

নজরুল হো হো করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লেন - বলেন কী?

হ্যাঁ, সেইজন্য প্রথম প্রথম সাহস হতোনা। সেদিন থাকতে না পেরে চাদর মুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম। সত্যি বলছি - এইভাবে যে কবিতা লেখা যায়, এবং তাকে এইভাবে যে পাঠ করা যায় - আমি তো স্তম্ভিত!

আমার কানের মধ্যে এখনো বাজছে -

একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন –
    ঝন রনরন রন ঝনঝন!
সেকি দমকি দমকি ধমকি ধমকি
দামা-দ্রিমি-দ্রিমি গমকি গমকি
ওঠে চোটে চোটে,
ছোটে লোটে ফোটে
বহ্নি-ফিনিকি চমকি চমকি
ঢাল-তলোয়ারে খনখন!
একি রণ-বাজা বাজে ঘন ঘন
    রণ ঝনঝন ঝন রণরণ!

সত্যি বলতে কি, সব কথার অর্থ বুঝিনি। কিন্তু একটা অদ্ভুত কাব্যময় তেজস্বী অনুরণন ফুটে উঠছিল - সেটা ভাষায় বলতে পারবনা। সকলের অনুমতি হলে আমি আপনার একটা কবিতা শোনাতে চাই। 'হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই!' সমস্বরে স্বাভাবিক রব উঠলো।

ভবেশবাবু ঝোলা থেকে লাঙলের একটা কপি বার করে পাঠ শুরু করলেন -

'ওরে ভয় নাই আর দুলিয়া উঠেছে হিমালয় চাপা-প্রাচী
গৌরীশিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী'!

সদ্যপ্রকাশিত 'সব্যসাচী' কবিতাটি ভবেশবাবু খুব সুন্দর আবৃত্তি করলেন। বিশেষ করে শেষ তিনটি শব্দ - 'একবার মরে বাঁচি' যেভাবে আবেগমথিত কন্ঠে গানে তেহাই দেবার মতো পরপর তিনবার উচ্চারণ করে সমাপ্ত করলেন তাতে সকলেই মুগ্ধ। নজরুল উঠে প্রণামের ভঙ্গিতে ভবেশ বাবুকে সম্মান জানালেন।

আজকের মতো আসর এই পর্যন্তই থাক - কিরণময়ীর ঘোষণায় আসরের সমাপন হতেই হলো। গিরিবালা দেবীকে নিয়ে ইতিমধ্যে ভিতরে গিয়ে খাবার সাজিয়ে ফেলেছেন। সরোজবাসিনী বিদায় নেবার আগে আরেকবার মনে করিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে পরবর্তী আসরের কথা, মাঘীপূর্ণিমার সন্ধ্যায়। আকবর উদ্দীনকেও আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন। বিদায় নেবার আগে আকবর উদ্দীন একটু আড়াল করে বললেন, কাজী সাহেব, মনে আছে, আমাদের মসজিদের ইমামের কথা? ইসমাইল খতিব, আপনার খুব গুণগ্রাহী। তিনি একবার দেখা করতে চান।

দোলন পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে। ভিতরে ধরে না নিয়ে গেলে আড্ডার শেষ হবেনা। সেই জবাব দিল, একদিন নিয়ে আসুন না খতিব সাহেবকে আমাদের বাসায়। আমাদের সাথেও দেখা হবে।

নজরুলকে বাইরে বেশি বেরোতে না দেবার ইচ্ছা, নাকি বাড়িতে মানুষজন এলে একটা ভালো লাগা হৈচৈএর পরিবেশ তৈরি হয় - যে কারণেই হোক, নজরুল সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আসুন না একদিন। সকালের দিকেই ভালো। গুছিয়ে গল্প করা যাবে।

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।