বিবিধ

খাল-বিলের আখ্যান (দ্বিতীয় খণ্ড - পঞ্চম পর্ব) [ধারাবাহিক]



মমতা বিশ্বাস


নির্ঝরিনীর মন ভালো নেই। মানুষটা চোখ অপারেশন করিয়ে এসে একেবারে চুপ। রাগঝাল কিছু নেই। ৫৪ বছরের অভ্যাস। বকুনি না খাওয়ার জন্য যে এত মন খারাপ হয়, আগে কখনও বোঝেননি, তিনি। এমন চলছে মাস খানেক। ফোনে মেয়েদের বলেছেন সেকথা। মেয়েরা বলেছে,

“বাবা সারাক্ষণ রাগ করে বলে অভিযোগ কর। বেশি কথা বললে চোখের ক্ষতি হবে না?

তাই বলে একেবারে চুপ করে থাকবে মানুষটা? বিজ্ঞ মাস্টারমশাই, তার উপর চৌদ্দ বছরের বড়ো। ভয়ে - ভক্তিতে কেটে গেল জীবনটা। এত রাগ, নির্ঝরিনীদেবী ইদানিং আর সহ্য করতেও পারেন না। উত্তর দিয়ে দেন। চন্দ্রনাথবাবু আরও রেগে যান। এত রাগ ঠিক কার উপর তাও ঠিক করে বুঝে উঠতে পারেন না। সবটাই কি তার দোষ? সামান্য ভুলত্রুটিতে এত বকুনি? পরিবারের সকলের সামনে? অভিমান জমতে থাকে। নির্ঝরিনীদেবী এটুকু বুঝতে পারেন যে, তিনি সবকিছু দ্রুত পাল্টে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। নিজেকে গোটাতে গোটাতে চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছেন। কী অপূর্ব গানের গলা। এখন আর করেন না। শুনতে চাইলেও না। কত গুণীমানুষ! কত নাম - ডাক ছিল! শেষের দিকে অপযশের বোঝা মাথায় নিয়ে গ্রাম ছাড়তে হয়েছে। শহরের কেই বা চেনে? কেই বা মানে! যে মানুষটাকে বিশ গাঁয়ের মানুষ মান্যি করত। বৈঠকখানায় রাতদিন লোকজনের আনাগোনা। সকাল সন্ধ্যায় চন্দ্রনাথ হাঁক পেড়েছেন, “কে আছো রান্নাঘরে, বৈঠকখানায় চা-মুড়ি দিয়ে যাও।” গামলা ভর্তি মুড়ি মাখা, কেটলি ভরা চা বড় দুই জা নির্ঝরিনীকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। পার্টির হোলটাইমার দুই/চারজনের ভাত তিন বেলাতেই রান্না হয়েছে। ভোটের সময় বাড়তি দশ- বিশজনের রান্না করতে হয়েছে মাস দুয়েক। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, আর ভাবেন সেকাল আর একাল, পৃথিবীর দুই মেরু। কিছুতেই মেলে না। ফিরে যান অতীতে।

নির্ঝরিনীদেবী দাদার কর্মক্ষেত্রে থেকে পড়াশোনা করতেন, তাই এক পাড়াতে বাড়ি হলেও পরস্পর পরস্পরকে জানার, বোঝার সুযোগ ঘটেনি। তাছাড়া রাশভারী মাস্টার মশাই। তাগড়ায় চেহারা। ভয়ে যতদূরে থাকা যায় তাই থেকেছেন। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, বাড়ন্ত শরীর -স্বাস্থ্য, দাদা- বউদি কোয়ার্টারে রাখতে সাহস পেলেন না। সপ্তমশ্রেণিতে গ্রামের ম্যাচপোঁতা স্কুলে ভর্তি করে দেন। একদিন ইংরেজি স্যার, সাবির আলির মুখে মানুষটির গুণকীর্তন শুনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,এই গায়ের আলু কে বলত?

আলু কে? আলু কে? সবাই মুখ চাওয়া- চাওয়ি করছে। স্যার হেসে বলে উঠলেন, পারলি না তো? শিবপুর স্কুলের চন্দ্রনাথ স্যার। আলু সব তরকারিতে থাকে, উনিও তেমনি সবকিছুতে। সব বিষয় ছাত্রদের পড়াতে পারেন। অঙ্কের মাস্টার হয়েও সংস্কৃত পড়ান। সংস্কৃত পণ্ডিতদের মতো উচ্চারণ। স্কুলের লাইব্রেরির দায়িত্ব তাঁর উপর। এ তল্লাটে তাঁর মতো খেলাধুলোয় তুখোড় কি কেউ আছে? স্কুলে, চণ্ডীমণ্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রিহার্শল করানো থেকে শুরু করে গায়ক, বাদক, সঞ্চালকের সব দায়িত্ব সামলান। গণেশ জননী পুজো ও নৌকা বাইচের উদ্যোগে, তিনিই সর্বেসর্বা।’

সেই মানুষটির ঘরণী হলেন নির্ঝরিণীদেবী। কর্মষ্ঠ ও উদ্যোমী মানুষটি গ্রাম্য রাজনীতির সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে গেলেন। এই জড়িয়ে পড়ার একটি ইতিহাস আছে। ভিতটা গড়ে ওঠে কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজে পড়তে এসে; কমিউনিস্ট পার্টির দাদাদের সংস্পর্শ। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিস্ময় ফল। গুটিকয়েক মানুষ ফুলে ফেঁপে উঠছে, অপর দিকে অধিকাংশ মানুষ রিক্ত- নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। দিনমজুর সারাদিন কাজ করে এক সের যবের আটা পারিশ্রমিক হিসেবে পায়। পরিবারের পাঁচ - ছয়জনের কতটুকু খিদে মিটতে পারে তাতে? জল দিয়ে গুলে খেয়ে খিদে মিটিয়েছে। স্বাধীন ভারতবর্ষে -মোড়লী প্রথা, কেন্দ্রের কালাআইনের প্রয়োগে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। চুপ করে বসে থাকার পাত্র তিনি নন। খাদ্য আন্দোলনের সময় জেল খাটলেন।

১৯৫২ এবং ১৯৫৭ সালে পঞ্চায়েত ভোটে নির্দিষ্ট কোন প্রতীক ছিল না। জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থিত প্রার্থীরা ভোটে দাঁড়াতো। অবশ্যই সাচ্চা লোক হতে হত। বিনয় হালদারকে ৫২ ও ৫৭ সালের ভোটে প্রার্থী করেছিল গ্রামবাসিরা। কমিউনিস্ট পার্টির উত্থানে চন্দ্রনাথবাবু প্রার্থী হলেন। মেম্বার থেকে অঞ্চল প্রধানের পদ সামলেছেন। বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসার দশবছর হতে না হতেই পার্টিতে বেনোজল ঢুকতে শুরু করে। লাগাম ছাড়া স্বজন পোষণ, দ্বিচারিতা, প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ না করা এবং আরও নানাবিধ কারণে পার্টির অভ্যন্তরীণ গোলোযোগ জমাট বাঁধতে শুরু করে। জনসমর্থন কমতে থাকে। উপর থেকে খুব একটা বোঝা যায় না যে, সবাই গুছিয়ে নেওয়ার ধান্ধায় মশগুল। ন্যায়- সততায় যারা দলকে গড়ে পিটে তুলেছিল ; তাদের ব্রাত্য করে তোলার কৌশল তলে তলে শুরু হয়ে গেছে। আত্মসম্মান বাঁচাতে একনিষ্ঠ অনেক পার্টিকর্মী নিজেদেরকে গুটিয়ে নিতে আরম্ভ করে।

নির্ঝরিনীদেবীর বিদ্যা- বুদ্ধি কম থাকলেও বুঝতে পারতেন চন্দ্রনাথবাবু নিজেকে গোটানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না। ছেলেমেয়েরা উপযুক্ত হলেও পার্টির সুপারিশ ছাড়া স্কুলমাস্টারি অথবা অন্যকোনো সরকারি চাকরি হবে বলে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। টানাপোড়েন শুরু হয়। মনে পড়ে মেজদাকে। তিনি যা বলেছিলেন সব মিলে যাচ্ছে। যে যুক্তি-তর্কে ভর দিয়ে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন; আজ যেন সব ভ্রমে পর্যবসিত হয়েছে। জীবন সায়াহ্নে এসে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। মুখে হাসি নেই, নাতিদের নিয়ে মশকরা নেই, মজলিসি আড্ডায় উৎসাহ নেই।

সেই মানুষটিই একসময় বৈঠকখানায় বসে ভাই-বোন, বউ-বউদি, ভাইপো-ভাইঝিদের নিয়ে গানের লড়াই করেছেন, রঙ্গ-রসিকতা করতে ছাড়েননি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের গল্প করা, রাজনীতির আলোচনা - কত অনায়াসেই না করে গেছেন আর এখন সেই মানুষটি একেবারে চুপ করে থাকবেন। নির্ঝরিনী জায়েদের কাছে শুনেছেন, পরিবারের সকলকে জমিয়ে রাখতেন। বিয়ের কথা বললে বলতেন, “এই তো বেশ আছি।”

গণেশজননী পুজোতে দুই দিদি এসে ভাইকে জোর জবরদস্তি করতে থাকে বিয়ের জন্য এবং এও বলেন,”তোর যদি কাউকে পছন্দ থাকে তো আমাদের বল। এবার আমরা বিয়ে দিয়ে তবেই যাব।”

অনেক বলার পর উনি রাজি হন এবং বলেন বেশি দূরে মেয়ে দেখতে যেতে হবে না। বাড়ির কাছেই তো রয়েছে।”

একসঙ্গে দিদি-বউদি বলে ওঠেন,”কে, কার কথা বলছো?”

“বঙ্কিমের ছোটো বোন? যদি বিয়ে করি তবে ওই মেয়েকেই বিয়ে করবো।”

মাত্র ১৩ বছর বয়স, সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। গণেশ জননী পূজোর দুদিন পর স্কুল থেকে বাড়ি আসার পর জানতে পারেন এ পাড়ারই গম্ভীর রাশভারী মাস্টারের সঙ্গে তার বিয়ের কথা উঠেছে। দ্বিগুণ বয়সী মানুষের সঙ্গে বিয়ে; ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে; তাছাড়া বিয়ের সে বোঝেই বা কী!

(ক্রমশ)