রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধদেবকে জেনেছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রূপে। করুণার প্রতিমূর্তি রূপে। কোনও সংসার উদাসীন, বিবিক্ত সন্ন্যাসী হিসেবে নয়। বুদ্ধদেব মানবকে বড় করেছিলেন। জাতপাত, যাগযজ্ঞ, আচার নিয়ম এসবের বেড়াজাল থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়েছিলেন। মানুষকে আত্মবলে বলীয়ান হতে আহ্বান করেছিলেন। বলেছিলেন, আত্মদীপো ভব। মানুষের অন্তরে নিহিত আত্মশক্তি জাগ্রত করার কথা বলেছিলেন। দেবলোক থেকে নয়, মানুষের অন্তর থেকে দয়া এবং কল্যাণ আহ্বান করেছিলেন।
"মানুষ যে দীন দৈবাধীন হীন পদার্থ নহে, তাহা তিনি ঘোষণা করিলেন"।
কপিলাবস্তুর রাজপুত্র মানুষের দুঃখে উদ্বেলিত হয়ে গৃহত্যাগ করে এক আশ্চর্য তপস্যায় মগ্ন হলেন। সে তপস্যা কোনও ব্যক্তিগত, আত্মিক, বা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য নয়, এমনকি ঈশ্বরলাভের জন্যও নয়। সে শুধু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য। কেন মানুষের এত দুঃখ? কেন এত বন্ধন, বিকার, বিনাশ? কেন এই ব্যাধি, জরা, মৃত্যু? আর এই দুঃখের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায়ই বা কি? তারপর একদিন তিনি তাঁর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন মানুষের যে আত্মিক স্বরূপ, তাকে বেষ্টন করেছে নানান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বন্ধন, হিংসা, লোভ, আসক্তি ইত্যাদি। এই বন্ধন মানুষের স্বরূপ প্রকাশের মূল বাধা। এই বাধাই তার দুঃখ, তার পাপ। তাই তিনি বললেন এইসব বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের কথা। বললেন, হিংসা কোরোনা, অক্রোধের দ্বারা ক্রোধকে জয় কর, লোভ কোরোনা, আসক্তি থেকে মুক্ত হও। নির্বাণ লাভের অর্থ হল সমস্তরকম তনহা বা তৃয়া থেকে মুক্তি। সে তৃষ্ণা হতে পারে সামান্য বিষয় বা ধনাসক্তি থেকে ঈশ্বরলাভের আকাঙ্খা পর্যন্ত। রূপ এবং অরূপ দু'ধরণের তৃষ্ণা থেকে মুক্তি হল নির্বাণ। নির্বাণে সব আকাঙ্খার অবসান, সব দুঃখ থেকে মুক্তি।
যখন দুঃখের অবসান হবে তখন মানুষের আত্মস্বরূপ উন্মোচিত হবে। সেই স্বরূপটি কি? রবীন্দ্রনাথ বলছেন, "শূন্যতা নয়, নৈষ্কর্ম নয়। সে হচ্ছে মৈত্রী, করুণা, নিখিলের প্রতি প্রেম। বুদ্ধ কেবল বাসনা ত্যাগ করতে বলেননি, তিনি প্রেমকে বিস্তার করতে বলেছেন। কারণ, এই প্রেম কে বিস্তারের দ্বারাই আত্মা আপনার স্বরূপকে পায়। সূর্য যেমন আলোককে বিকীর্ণ করার দ্বারাই আপনার স্বভাবকে পায়"। করুণা ও মৈত্রীর প্রতীক, নিখিল প্রেমিক বুদ্ধদেব রবীন্দ্রনাথের অন্তরে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।
বস্তুত, উনিশ শতকের নতুন চেতনার আলোকে আলোকিত মনীষা প্রবলভাবে বুদ্ধচর্চা শুরু করে। এই নতুন যুগে যে বৌদ্ধ ঐতিহ্য বাঙালিকে প্রেরণা দিয়েছে, সাহিত্যসৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, তা বৌদ্ধধর্মের আচার বা সংস্কার নয়, নয় বৈরাগ্য, দুঃখবাদ বা অনিত্যবাদ, তা হল বৌদ্ধধর্মের ত্যাগ, প্রেম, সেবা, করুণা, মৈত্রী, আত্মদানের আদর্শ। ফলে সৃষ্ট হয় কাব্য, নাটক, প্রবন্ধাদির বিপুল সম্ভার-যার আদিতে, মধ্যে, অন্তে, মানবপ্রেমিক, মানুষ বুদ্ধদেব। না কোনও ভগবান তথাগত নন, করুণাময়, মৈত্রী ও অহিংসার প্রতীক গৌতম বুদ্ধ।
আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথের মতো বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন অবলম্বনে এত বিচিত্র সাহিত্যপ্রকাশ বিরল। ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্য এবং উনিশ শতকের আবহাওয়ায় বুদ্ধবরণের যে বীজ সুপ্ত ছিল রবীন্দ্রনাথ তাকে ফুলে ফলে বিকশিত করলেন। বৌদ্ধ সাহিত্যের নিবিড় চর্চা, বিশ্বভারতীতে পালি এবং বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক পাঠক্রম চালু করা, শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের সিংহল পাঠানো, পুত্র রথীন্দ্রনাথকে দিয়ে অশ্বঘোষের 'বুদ্ধচরিত' অনুবাদ করানো, বিধুশেখর শাস্ত্রীকে পালি ব্যাকরণগ্রন্থ রচনা করার নির্দেশদান প্রভৃতি কর্মকান্ডের পাশাপাশি বৌদ্ধ কাহিনী অবলম্বনে একের পর এক কবিতা ও নাটকের সৃষ্টি এবং বৌদ্ধধর্মের বিশ্লেষণে মহামূল্যবান প্রবন্ধসমূহ রচনা, এসবের পেছনে কাজ করেছে বৌদ্ধদর্শনের প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস।
বৌদ্ধধর্মের হীনযান, মহাযান বিভাগের প্রতি কবির কোনো অনুরাগ ছিলনা। তাঁর মতে, "বৌদ্ধধর্ম যে কী, তাহা নির্ণয় করিবার বেলায় তার সচলতার প্রতি লক্ষ্য রাখিতে হইবে"। বৌদ্ধধর্মের যে শাশ্বত অমর সত্য, কবির লক্ষ্য ছিল সেইদিকে। তাই নির্বিচারে গ্রহণের পরিবর্তে বুদ্ধকাহিনীর অলৌকিক মাহাত্ম্য, জন্মান্তরবাদ, স্বর্গলাভ ইত্যাদি ভুয়ো জিনিস পরিত্যাগ করে তিনি ছেঁকে নিলেন ক্ষীরটুকু - বৌদ্ধধর্মের করুণা, অহিংসা ও মৈত্রীর বাণী এবং বুদ্ধদেবের সত্যাগ্রহ, নিষ্ঠা ও ত্যাগের আদর্শ।
রাজেন্দ্রলাল মিত্রের যুগান্তকারী গবেষণা গ্রন্থ, 'Sanskrit Buddhist Literature of Nepal' পাঠ রবীন্দ্রনাথের সত্ত্বার গভীরে তুলেছিল এক প্রবল আলোড়ন, "একসময় আমি যখন বৌদ্ধকাহিনী এবং ঐতিহাসিক কাহিনীগুলি জানলুম, তখন তারা স্পষ্ট ছবি গ্রহণ করে আমার মধ্যে সৃষ্টির প্রেরণা নিয়ে এল"।
ফলে সৃষ্টি হল 'মালিনী' নাটকের, যার উৎস মহাবস্তুাবদানের মালিনী কাহিনী। কিন্তু কবির হাতে মূলকাহিনী পরিবর্তিত হয়ে যায়, বাদ যায় অলৌকিক অংশগুলি, সংযোজিত হয় সুপ্রিয় ও মালিনীর প্রেমোপাখ্যান, প্রকাশিত হয় মৈত্রীর আদর্শ।
এভাবেই বারবার তাঁর কবিতায়, নাটকে, গানে বৌদ্ধকাহিনীর পরিবর্তিত, মননরসে জারিত এক শিল্পময় রূপ আমরা পেয়ে যাই। 'কথা' গ্রন্থের 'শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা', 'পূজারিণী' ও 'মূল্যপ্রাপ্তি' কবিতা তিনটির উৎস যথাক্রমে অবদান শতকের 'বস্ত্রাবদান', 'শ্রীমতি অবদান' ও 'পদ্মাবদান'। 'পূজারিণী' কবিতার মূলের শ্রীমতীর দেববিভা লুপ্ত হয়ে জন্ম নেয় নিষ্ঠা ও সত্যরক্ষার জন্য যেকোনও দুঃখবরণের তেজ। জালিয়ানওয়ালাবাগের পর, ১৯২৬ সালে 'পূজারিণী' বদলে যায় 'নটীর পূজায়'। যার মূল থীম আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ। 'মূল্য প্রাপ্তি' কবিতায় মূলের অলৌকিক গল্পটি পরিত্যক্ত; সেখানে নির্লোভ, নিঃস্বার্থ ভক্তির প্রকাশ।
'মহাবস্তু' গ্রন্থের শ্যামা বুদ্ধদেবের হয়ে একরকমের সাফাই। কেন তিনি কি পরিস্থিতিতে যশোধরাকে পরিত্যাগ করেছিলেন, তার কাহিনী। রবীন্দ্রনাথ সেইসব যুক্তির ধারকাছ দিয়ে না গিয়ে সেই কাহিনী অবলম্বনে সৃষ্টি করলেন এক অপরূপ প্রেমের আখ্যান।
বুদ্ধকাহিনীর কিছুটা ম্যাড়ম্যাড়ে গল্প বা গল্পাংশ বারবার রবীন্দ্রনাথের হাতে সৃজনরসে সমৃদ্ধ হয়। যেমন 'অভিসার' কবিতায়। এ কবিতার কাহিনীর উৎস 'বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা'। সেখানে গণিকা বাসবদত্তা ধনের আকাঙ্খায় হত্যা করে। তার আগে সে বণিকপুত্র উপগুপ্তের অনুরাগিনী হয়ে তাকে আহ্বান করে। কিন্তু উপগুপ্ত বলে যখন সময় হবে তখন সে যাবে। যাইহোক হত্যার অপরাধে রাজার আদেশে বাসবদত্তার মৃত্যুদন্ড হয়। তখন উপগুপ্ত বধ্যভূমিতে গিয়ে তাকে বুদ্ধের নির্বাণ ধর্ম সম্পর্কে উপদেশ দেন। রবীন্দ্রনাথ এই কাহিনীকে কেমন মারীগুটিকায় আক্রান্ত গণিকার প্রতি সন্ন্যাসীর প্রেমের আখ্যানে পরিবর্তিত করেন।
কুশ জাতকের কাহিনী সঙ্কেতময় 'রাজা' নাটকের রূপ পায়। রাজা ও সুদর্শনা কোনও চরিত্রমাত্র নয়। তারা প্রতীক, প্রতীক দুই সত্ত্বার। রাজা হলেন সেই প্রভু, 'যে প্রভু কোনও বিশেষরূপে, বিশেষ দ্রব্যে নাই, যে প্রভু সকল দেশে, সকল কালে, আপন অন্তরের রসে তাকে উপলব্ধি করা যায়'। আর সুদর্শনা রূপচেতনায় অস্থির জীবসত্ত্বা। সে রাজাকে দেখতে চায় বিশেষরূপে, সুন্দরের মধ্যে। তাই সে নির্বিশেষকে পায়না। অবশেষে নিদারুণ আঘাতের মধ্য দিয়ে আত্মদর্শন, আত্মসমর্পণ।
'শার্দুল কর্ণাবদান'-এর মূল কাহিনীতে আছে যাদুমন্ত্রের ওপর শুদ্ধমন্ত্রের জয়। রবীন্দ্রনাথ তা পরিত্যাগ করেছেন। 'চন্ডালিকা'য় মুখ্য হয়েছে উদার মনের স্পর্শে অস্পৃশ্যার জাগরণ ও তার দুরন্ত কুলছাপানো প্রেম।
প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধধর্মকে নিবৃত্তির ধর্ম, সংসার বিরাগের ধর্ম, সন্ন্যাসী ভিক্ষুর ধর্ম হিসাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বৌদ্ধধর্মে দেখেছেন অপরিমেয় প্রেমের প্রকাশ, 'যে প্রেম স্বতই আনন্দ, স্বতই পূর্ণতা'। রবীন্দ্রনাথের বৌদ্ধধর্মের উপলব্ধির নিহিতার্থ এখানেই প্রেম, মৈত্রী, অহিংসা, করুণা, দুঃখের তপস্যা ও জ্ঞান।
দীর্ঘজীবনে কবি দেখেছেন অনেক, অনুভব করেছেন আরও অনেক বেশি। দু'দুটো বিশ্বযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদের বর্বর লোভ, পরাধীনতার অপমান ও গ্লানি, জালিয়ানওয়ালাবাগ। বারবার মানুষের অপমান, যন্ত্রণা রক্ত ঝরানোর আয়োজনে ছিন্নভিন্ন হতে হতে কবির অন্তর থেকে উৎসারিত হয়েছে ক্রন্দনধ্বনি - 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি'। তাও তো তিনি দেখে যাননি হিরোশিমা, দেশভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ। শুনে যাননি কলুষিত রাজনীতি, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার জয়গান। পরমাণুবোমা বিদীর্ণ করে মূর্খের আস্ফালন। কবি সেই বুদ্ধের শরণ কামনা করেছেন যাঁর অন্তরের একান্ত কামনা - সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্ডু - সকল প্রাণী সুখী হোক।
ঋণঃ
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর - বিবিধ রচনা।
২. ড. আশা দাশ - বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি।
