বিবিধ

শুভ গুরু পূর্ণিমা



সমীরণ ভৌমিক


আষাঢ় মাসের পূর্ণিমাকে 'গুরু পূর্ণিমা' বলা হয়। জীবনে গুরুই হলেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। তিনিই আমাদের সৃষ্টি, স্থিতি, লয়ের পরম ব্রহ্মজ্ঞান দান করেন। 'গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ; গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ'। ব্যাস দেবায় নমঃ। গুরু সাক্ষাত পরম ব্রহ্মা। এই গুরু পূর্ণিমা যা ব্যাস পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এটি হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। হিন্দু ধর্মানুসারে এই দিনে মহর্ষি বেদব্যাস জন্মগ্রহণ করেন, যিনি মহাভারত এবং চারটি বেদের সংকলক ছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মানুসারে এই দিনে ভগবান গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম শিষ্যদের ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। জৈন ধর্মানুসারে এই দিনে ভগবান মহাবীর এবং তাঁর প্রধান শিষ্য গৌতম স্বামী গুরু-শিষ্য পরম্পরা শুরু করেছিলেন। সুতরাং, এই গুরু পূর্ণিমা একটি নিছক মামুলী গুরু পূর্ণিমা নয়। এটি একটি সমন্বিত উৎসব যেখানে গুরু এবং সমাজের শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

গুরুপূর্ণিমার দিন, বৃহস্পতিবার আমরা দুই বন্ধু অর্থাৎ আমি এবং আমার আর এক প্রিয় বন্ধু, বিশিষ্ট সমাজসেবী, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের বালিচকের বাসিন্দা আশিষ খাঁড়া, যিনি বালিচক বিবেকানন্দ ক্লাবের এবং জেলার প্রাক্তন বিশিষ্ট ফুটবল খেলোয়াড় উপস্থিত হয়েছিলাম শুভ প্রত্যুষে বাগবাজার 'মায়ের বাড়ি' ও সকাল দশটায় 'বাবার বাড়ি' অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অন্তিম লীলাস্থল 'কাশীপুর উদ্যানবাটি'। প্রথমে উদ্যানবাটিতে প্রবেশদ্বারে ভক্তদের পাদুকা জমা করছেন তৎপর এনসিসি কর্মীরা। তারপরে ভক্তদের উদ্দেশ্য উদ্যানবাটির দোতালার সেই ঘর, যে ঘরটিতে ঠাকুর থাকতেন - সেখানে কলির ঠাকুর, আমাদের প্রাণের ঠাকুর, কল্পতরু ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শ্রীমুখ দর্শন ও ভূমিষ্ঠ প্রণাম। প্রার্থনা, "আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার পরে"।

তারপরে আমাদের দীক্ষাগুরু শ্রীমৎ স্বামী দিব্যানন্দজী মহারাজের দর্শন, প্রণাম ও আশীর্বাদ গ্রহণ। আজকে 'গুরু পূর্ণিমাতে' উপস্থিত সম্মিলিত প্রতিটি ভক্তদের প্রতিটা ক্ষণ, প্রতিটা পল, প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা হৃদয়তন্ত্রীতে এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক আনন্দানুভূতি মনকে কানায় কানায় ভরে দিয়েছিল। গুরুদেবকে প্রণাম তারপর সারিবদ্ধভাবে নিয়মমাফিক প্রসাদ গ্রহণ (সুন্দর মিষ্টির প্যাকেট)। দুপুর ১১টার পরে সারিবদ্ধ ভক্তদের লাইন করে সুন্দর পরিবেশিত মহাপ্রসাদ গ্রহণ। উপাদেয় সেই মহাপ্রসাদ। প্রত্যেকের হাতে মহাপ্রসাদের থালি। সেই থালিতে ছিল পোলাও, আলুর দম, আমের আচার, সুস্বাদু গাঢ় ডাল, একটি গোলাপ জাম মিষ্টি। প্রসাদ বিতরণে অংশগ্রহণ করেছেন মিশনের মহারাজ, ব্রহ্মচর্য মহারাজ ও গুণী ভক্তরা।

'গুরু মিলে লাখ লাখ, চেলা না মিলে এক'

আমরা উদ্যানবাটির 'কল্পতর বৃক্ষ'-র তলায় ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করলাম। মনে মনে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে বললাম, "আমার তনু-মন তুমি আত্মসাৎ করে নাও ঠাকুর"। 'কথামৃত'-এ তোমার মুখনিঃসৃত অমৃত কথা "যাকে জাত সাপে ধরেছে তার নিস্তার নেই। আমাদের বিনম্র আকুতি ও মিনতি ঠাকুর তোমারও নিস্তার নেই"। আমাদের প্রতিটা ক্ষণ, প্রতিটা পল, প্রতিটা মুহূর্ত এবং প্রতিটা হার্টবিটে তোমার উপস্থিতি যেন অনুভব করি। কাশীপুর উদ্যান বাটিতে সেই দিনের সেই নরেন্দ্রনাথকে (ঠাকুরের লরেন) ঠাকুর তুমি বলেছিলে - "এখনও সন্দেহ! যে রাম, যে কৃষ্ণ, এই শরীরে সে-ই রামকৃষ্ণ"। সেইদিনই বিশ্বমহামানব স্বামী বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব হলেন অবতার বরিষ্ঠ, ভগবানের অংশ।

ইংরেজি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ঠাকুর তুমি দোতলার ঘর থেকে ভক্তদের উদ্দেশ্যে নিচে নেমে এলে ও গিরিশকে জিজ্ঞাসা করলে - "গিরিশ তুমি চারিদিকে বলে বেড়াও আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে। তুমি আমার সম্বন্ধে কি জেনেছো?" সেই শুভদিনের, শুভক্ষণে ভক্ত ভৈরব, নটসম্রাট গিরিশচন্দ্র নতমস্তকে, নতজানু হয়ে ভক্তি গদগদ কন্ঠে বললেন - "ব্যাস বাল্মিকী যার ইয়ত্তা পায়নি - আমি কি করে বলবো আপনার সম্বন্ধে?" সেই দিনে, সেই শুভক্ষণে বৃক্ষের তলায় আমাদের প্রাণের ঠাকুর, প্রেমের ঠাকুর, 'কল্পতরু' হয়ে উপস্থিত গৃহী ভক্তদের উদ্দেশ্যে বললেন - "আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হোক।" কল্পতরুরূপে, জগৎগুরু, ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব। এই মুহূর্তে আমাদের স্মরণ ও মনন হচ্ছে বিশ্বপ্রশবিনী, জগৎ জননী মা সারদাকে স্বামীজী বলেছিলেন - "মাগো, যে জ্ঞানে গুরু পাদপদ্ম উড়িয়ে দেয়, সে তো অজ্ঞান। গুরু পাদপদ্ম উড়িয়ে দিলে - জ্ঞান দাঁড়ায় কোথায়?" তাই আজকের এই শুভ দিনটি 'গুরু পূর্ণিমা'য় আমরা সংসারবদ্ধ জীব ঠাকুরের গৃহীসন্ন্যাসী আমাদের নিমজ্জিত তনু-মন ঠাকুর ও মায়ের শ্রীচরণে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে উঠুক গুরু মন্ত্রে ভরসা রেখে সাধন ভজন করে - সত্ত্ব গুণের ঘটবে প্রকাশ, তমো যাবে সরে। "নামের মালা ঘুরবে যত, ঘুচবে মনের কালি; গুরু কৃপায় স্পষ্ট হবে সচ্চিদানন্দ খালি।"

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল ও লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।