বিবিধ

বিপদত্রাতা মদনলাল



দেবাশিস সেনগুপ্ত


১৯৫১-র ২০ মার্চ তারিখে পাঞ্জাবের অমৃতসরে জন্মেছিলেন মদনলাল উধুরাম শর্মা ওরফে 'মাডিপা'। তার অনেক পরে একদিন ১৯৮৫-র 'বেনসন অ্যান্ড হেজেস চ্যাম্পিয়নশিপ'-এর অধিনায়ক সুনীল গাভাসকার যাঁকে নিয়ে বলবেন - "দেশের হয়ে খেলার সময় মদনলালের বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি বেশি চওড়া হয়ে যায়।"

২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৪। ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের কলকাতায় অনুষ্ঠিত ৩য় টেস্টের ১ম ইনিংসে বিশ্বনাথের ৫২, মদনলালের ৪৮, পাতৌদির ৩৬ আর অংশুমানের ৩৬ রানের সৌজন্যে ভারত পৌঁছেছিল ২৩৩ রানে, রবার্টসের বিধ্বংসী ৫০/৫ সত্ত্বেও। ১ম দিনে ৫/১৬৯ অবস্থায় মাঠে নেমে তিনি যখন আউট হন তখন ভারতের রান ছিল ৭/২২৪। ১৭০-২২৪, এই ৫৫ রানের মধ্যে ৪৮ রান ছিল মদনলালের, যার মধ্যে ছিল ১০টি বাউন্ডারি। নিজের জীবনের প্রথম টেস্টে রবার্টস-জলিয়েন-হোল্ডার-গিবসদের বিরুদ্ধে করা ওই ৪৮ ছিল ওই "বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি বেশি চওড়া" হয়ে যাওয়ার প্রমাণ।

তারপরেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১ম ইনিংসে বল হাতে তাঁর অবদান ছিল ১৬.১-৫-২২-৪। তাঁর শিকার ছিলেন ফ্রেডেরিকস, গ্রিনিজ, কালিচরণ আর রবার্টস। "বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি বেশি চওড়া" হয়ে যাওয়া আর কাকে বলে?

সবার অলক্ষ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ব্যাটে ঠিক এমনই ঘটনা আবার ঘটিয়েছিলেন মাডিপা, ১৬ মাস পরে পোর্ট অফ স্পেনের ভারতের জেতা ঐতিহাসিক ৩য় টেস্টের প্রথম ইনিংসে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে ৩৫৯-এর জবাবে ভারত যখন গায়কোয়াড়, গাভাসকার, বিশ্বনাথ, অমরনাথ, সোলকারকে হারিয়ে ৫/১৪৭-এ খাবি খাচ্ছিল, তখন মাঠে নেমে তিনি যখন আউট হন তখন ভারতের রান ছিল ৭/২০৩। ১৪৮-২০৩, এই ৫৬ রানের মধ্যে ৪২ রান ছিল মদনলালের। বিশ্বনাথের ৪১-কে টপকে ওই ইনিংসে মাডিপাই ছিলেন ভারতের হায়েস্ট স্কোরার। আবার সেই "বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি বেশি চওড়া" হয়ে যাওয়ার রূপকথা।

আর ১৯৮৩-র বিশ্বকাপের ফাইনাল তো সবার কাছে আজও টাটকা। ভারতের করা ১৮৩-কে রক্ষা করতে গিয়ে রিচার্ডসের মারে তখন মাডিপা সমেত ভারতের সব বোলারকেই বেসামাল লাগছিল। তাঁকে বোলিং থেকে সরিয়ে যখন সান্ধুকে বল দিচ্ছিলেন অধিনায়ক কপিলদেব, প্রায় জোর করেই আর এক ওভার চেয়ে নেন মাডিপা। তারপর সেই ওভারেই কপিলের সেই অলৌকিক ক্যাচে তিনি ভিভের উইকেট নেন। এর আগে আর পরে নেন আরও দুটি উইকেট, হেনস আর গোমসের (বোলিং হিসেব - ১২-২-৩১-৩)। এর আগে ব্যাটে করেছিলেন ২৭ বলে ১টি ৬ সমেত প্রয়োজনীয় ১৭। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর ভাষায় - "He was one of the heroes of the 1983 World Cup - winning side and earned his name by his spell of three quick wickets that broke the back of the West Indies batting in the final." এর ২ বছর পরে বেনসন অ্যান্ড হেজেস চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেকটাই (১১৬ রানে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট)। "বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি বেশি চওড়া" না হলে এগুলো হতোনা।

১২ বছরে ৩৯ টেস্টে ১০৪২ রান (৫টি ৫০+) ও ৭১ উইকেট (ইনিংস সেরা ৫/২৩, ম্যাচ সেরা ৬/৪৭) আর ১৩ বছরে ৬৭ ওডিআই-তে ৪০১ রান (২টি ৫০+) ও ৭৩ উইকেট (ম্যাচ সেরা ৪/২০) ছাড়াও রণজি ট্রফিতে ৫২৭০ রান ও ৩৫১ উইকেট, পরে জাতীয় নির্বাচক হওয়া, এসবের বাইরে এক নিবেদিতপ্রাণ অলরাউন্ডার হিসেবেই তাঁকে মনে রেখেছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।মনে রেখেছেন বল করার আগের মুহূর্তে তাঁর লাফকেও। আর হ্যাঁ, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বপ্রথম বলটি করেছিলেন তিনিই।

সবসময় ভালো থাকুন "দেশের হয়ে খেলার সময় বুকের ছাতি কয়েক ইঞ্চি বেশি চওড়া" মাডিপা।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।