বিবিধ

রবীন্দ্র-কথা




ইংরাজের চরিত্র

এই যে মনোহারিত্বের অভাব, এই যে অনুচর আশ্রিতবর্গের অন্তরঙ্গ হইয়া তাহাদের মন বুঝিবার প্রতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা, এই যে সমস্ত পৃথিবীকে নিজের সংস্কার অনুসারে বিচার করা, ইংরাজের চরিত্রের এই ছিদ্রটি অলক্ষ্মীর একটা প্রবেশ পথ।

কোথায় কোন শত্রু আসিবার সম্ভাবনা আছে ইংরাজ সে ছিদ্র যত্নপূর্বক রোধ করে, যেখানে যত পথঘাট আছে সর্বত্রই পাহারাদার বসাইয়া রাখে এবং আশঙ্কার অঙ্কুরটি পর্যন্ত পদতলে দলন করিয়া ফেলে, কেবল নিজের স্বভাবের মধ্যে যে একটি নৈতিক বিঘ্ন আছে সেইটাকে প্রতিদিন প্রশ্রয় দিয়া দুর্মদ করিয়া তুলিতেছে - কখন সখন অল্পস্বল্প আক্ষেপ করিয়াও থাকে - কিন্তু মমতাবশত তাহার গায়ে কিছুতেই হাত তুলিতে পারে না।

ঠিক যেন একজন লোক বুট পায়ে দিয়া আপনার শষ্যক্ষেত্রময় হই হই করিয়া বেড়াইতেছে, পাছে পাখিতে শষ্যের একটি কণামাত্র খাইয়া যায়। পাখি পলাইতেছে বটে, কিন্তু কঠিন বুটের তলায় অনেকটা ছারখার হইয়া যাইতেছে তাহার কোনো খেয়াল নাই।

ইংরেজের শত্রুতা

আমরা ধৈর্য হারাইয়া, সাধারণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সুবিধা-অসুবিধা বিচারমাত্র না করিয়া, বিলাতি লবন ও কাপড়ের বহিষ্কার-সাধনের কাছে আর কোনো ভালোমন্দকে গণ্য করিতে ইচ্ছাই করিলাম না। ক্রমশ লোকের সম্মতিকে জয় করিয়া লইবার বিলম্ব আমরা সহিতে পারিলাম না, ইংরেজকে হাতে-হাতে তাহার কর্মফল দেখাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িলাম।

এই উপলক্ষ্যে আমরা দেশের নিম্নশ্রেণির প্রজাগণের ইচ্ছা ও সুবিধাকে দলন করিবার আয়োজন করিয়াছিলাম, সে কথা স্বীকার করিতে আমাদের ভালো লাগে না, কিন্তু কথাটাকে মিথ্যা বলিতে পারি না।

তাহার ফল এই হইয়াছে, বাসনার অত্যুগ্রতা দ্বারা আমরা নিজের চেষ্টাতেই দেশের এক দলকে আমাদের বিরুদ্ধেই দাঁড় করাইয়াছি। তাহাদিগকে আমাদের মনের মতো কাপড় পরাইতে কতদূর পারিলাম তাহা জানিনা, কিন্তু তাহাদের মন খোয়াইলাম। ইংরেজের শত্রুতা সাধনে কতটুকু কৃতকার্য হইয়াছি বলিতে পারিনা, দেশের মধ্যে শত্রুতাকে জাগ্রত করিয়া তুলিয়াছি তাহাতে সন্দেহমাত্র নাই।

ইংরেজের শাসনকার্য

ভারতবর্ষে ইংরেজ রাজ্যের বিপুল শাসনকার্য একেবারে আনন্দহীন, সৌন্দর্যহীন - তাহার সমস্ত পথই আপিস-আদালতের দিকে - জনসমাজের হৃদয়ের দিকে নহে।

ইংরেজ ও হিন্দু-মুসলমান

সকলেই জানেন, অনেক অসভ্যদের মধ্যে আর কোনো প্রকার চিকিৎসা নাই, কেবল ভূত-ঝারানো আছে। তাহারা গর্জন করিয়া, নৃত্য করিয়া, রোগীকে মারিয়া ধরিয়া প্রলয়কান্ড বাধাইয়া দেয়। ইংরেজ হিন্দু-মুসলমান বিরোধ ব্যাধির যদি সেইরূপ আদিম প্রণালী মতে চিকিৎসা শুরু করেন তাহাতে রোগীর মৃত্যু হইতে পারে, কিন্তু ব্যাধির উপসম না হইবার সম্ভাবনা। এবং ওঝা ভূত ঝাড়িতে গিয়া যে ভূত নামাইয়া আনেন তাহাকে শান্ত করা দুঃসাধ্য হইয়া উঠে।

সৌজন্যেঃ অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।