পিসিমা আমার জীবনের সমস্ত ঘটনার কথা জানতেন। তিনি আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন - যত যা-ই হোক না কেন তুই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মাকে দেখিস, মাকে নিজের কাছে রেখে আদর যত্ন করিস বাবা।
- পিসি সবাই তো আর তোমার মতো নয়। এই যে দেখ - তুমি আমাকে তোমার নিজের সন্তানের মতো দেখ, কত আদরযত্ন স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে নিজের ছেলের মতো করে মানুষ করতে চাও। আর আমার মা! নিজের সন্তানকে এককথায় পর করে দিল। আমি কোথায় থাকি, কী খাই, কীভাবে আমার দিন কাটে তার কোনো খোঁজখবর নেওয়া তো দূরের কথা বরং ভাবে আমার মতো আপদ পৃথিবীর মাটি থেকে বিদায় নিয়েছে কী না সে সম্পর্কে জানার জন্য উৎসুক হয়ে আছে।
- দূর পাগল! এটা তোর ভুল ধারণা। মায়ের মন তুই কী করে বুঝবি। তুই যখন ওই জায়গায় যাবি তখন বুঝতে পারবি। এখন তোকে হাজার বার বলেও আমি বোঝাতে পারবো না।
মনশ্চক্ষে ভেসে ওঠে মায়ের করুণ মুখচ্ছবি। বাবার শেষ যাত্রায় আমি তাঁর সঙ্গে থাকতে পারিনি। কিন্তু কান পাতলে এখনো শুনতে পাই, বাবা আমাকে বলছেন - খোকা, এখনো তুই তোর অভিমান নিয়ে থাকবি, তোর মা যে আশ্রয়হীন হয়ে পথে পথে ঘুরছে। এরপর তো সবাই তোকেই দোষ দেবে, গাল-মন্দ করবে। আমি জানি তোর মায়ের শেষ আশ্রয় তুইই। হ্যাঁ বাবা, তুই ছাড়া তোর মাকে কেউ দেখবে না। আমি আজ থেকে কয়েক বছর আগে তোর মাকে ঠিক এই কথাটাই বলেছিলাম। আমি সেই দিনটি দেখার জন্যই এখনো অপেক্ষা করে আছি।
মনটাকে বড়ো বিধ্বস্ত লাগছে, বিষণ্ণতার আগ্রাসী রূপ দেখতে পাচ্ছি। ওরা যেন আমার মনোজগতের অন্তর্লোকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে একজন সহায়সম্বলহীন মায়ের করুণ মুখচ্ছবি। কিছু সময়ের জন্য সবকিছু একান্তে ভাবার জন্য একটি নির্জন কোথাও যাওয়ার জন্য মনটা বড়ো উতলা হয়ে উঠলো। আমি জানি দুই একটা দিন বাইরে কাটালে মনটা শান্ত হয়ে উঠবে। না, তীর্থস্থানের কোলাহল আমার পছন্দের নয়, সমুদ্রের গর্জনে আমার বুকের রক্ত ছলকে ওঠে, ঐতিহাসিক স্থান মনটাকে বিষন্নতায় ভরিয়ে দেয়, ওর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস আমাকে শিহরিত করে। তরাই বা ডুয়ার্সের চা-বাগানের শান্ত স্নিগ্ধ শীতলতা মনে মায়াবী অনুভূতি এনে দেয়। তাহলে ওদিকে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পাহাড়, ঝর্ণা, সবুজ বন আর তার প্রেমময়ী মোহ আমার মনের ক্লান্তির উপশম ঘটাতে পারবে না। তার চেয়ে বরং ছুটে যাই বাংলার শান্ত নিবিড় ছায়াঢাকা গ্রামের পথে। আজ রবিবার তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ নেই। সন্ধেবেলা রবীন্দ্র ভবনে একটা নাটকের অনুষ্ঠান আছে। তার আগে বাড়ি ফিরে যাবো। সকালে একটু সেদ্ধ ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়বো।
দ্বিচক্রযানটিকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লাম। জানিনা কোথায় যাবো। মনে হলো কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত মুড়াগাছা গ্রামে যাই। ওখানে দেওয়ান বাড়ি দেখে ওই গ্রামের মানুষের সাথে একটু কথা বলা যাবে। ভাবতে ভাবতেই ঠিক করে ফেললাম ‘মন চলো নিজ নিকেতনে।’ দেখলাম ভাত রেঁধে খেতে খেতে অনেক দেরী হয়ে যাবে। তাই ওসব পাট চুকিয়ে কিছু শুকনো খাবার খেয়ে কিছুটা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মনে পড়ে গেল আমার সাথে কৃষ্ণনগর কলেজে পড়তো সুমিতের কথা। ওদের বাড়ি মুড়াগাছা গ্রামের পাশেই বেজপাড়া গ্রামে। জয় বাংলার কিছুদিন আগেই ওর মা-বাবা যশোর জেলার কালীগঞ্জ থেকে ভাগ্যের অন্বেষণে এখানে এসে হাজির হয়। ওদের ওপার বাংলা থেকে আরও বেশ কয়েকটি পরিবার এখানে আগে থেকেই এসে বসতি গড়ে তুলেছিল। ফলে ওঁরাও একটা জায়গা পেয়ে গেলেন। সেখানেই সুমিতের মা-বাবা গড়ে তোলেন একটা সোনার সংসার। কিছু জমিজমাও করেন সুমিতের বাবা। নকশাল আন্দোলনের সময় একটু টালমাটাল অবস্থা হলেও ওঁদের কোনো অসুবিধে হয়নি। বরং সুখে-শান্তিতে বসবাস করছিলেন। সেই সোনার সংসারে পরিপূর্ণ আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে ছোট্ট সোনার টুকরো সুমিত। সুমিতের পাঁচ বছরের জন্মদিন খুব জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। বেজপাড়ার আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ আমন্ত্রিত হয়ে ওদের বাড়িতে আসেন। সেই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে প্রায় হাজার তিনেক মানুষের খাওয়াদাওয়ার আয়োজন সহজ কথা নয়। তবু সুমিতের বাবা অনুষ্ঠানে কোনো ত্রুটি রাখেননি। অতিথি অভ্যাগতগণ চলে যাবার পরদিন হঠাৎ করেই সুমিতের বাবা কী এক অজানা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু ডাক্তার বাবুদের সমস্ত চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি ইহলোক ত্যাগ করে চলে যান। একদিকে সুমিতের জন্মদিনের খরচ অপরদিকে সুমিতের বাবার চিকিৎসার বিপুল ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে সুমিতের মা কপর্দকহীন হয়ে পড়েন। আর্থিক ও মানসিক সমস্যায় জর্জরিত সুমিতের মা দিশাহারা হয়ে পড়েন। আত্মীয় স্বজনরা সব ওদের সংস্রব ত্যাগ করে। জঠরজ্বালা মেটাতে গিয়ে সুমিতের মায়ের গয়নাগাটিও বিক্রি করে দিতে হয়। গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে সুমিতের মা একটা কাজের জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু সেই সময় শহরের দুই একটা সম্ভ্রান্ত বাড়িতে কাজের লোক নিলেও গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতে নিজেরাই নিজেদের কাজ করে নিতেন। বাইরের কাজের লোকের দরকার হতো না, হলেও অনেকে প্রয়োজন বোধ করতেন না। এদিকে সুমিতকে স্কুলে ভর্তি করার সময় হয়ে এসেছে। কিছু ভাবতে না পেরে সুমিতের মা সুলতা দেবী বেজপাড়া গ্রামের পাশ বয়ে চলা নদীর পাড় থেকে কচু শাক, কলমি শাক, গেঁড়ি গুগলি নিয়ে গাছা বাজারের এককোণে বসে পড়েন। কিন্তু গাঁ-গঞ্জের বাজারে তেমন একটা বিক্রি-বাট্টা হয় না। অল্প যা কিছু হয় তাতে দুজনের চলে না। পাড়ার নমিতাদি একদিন বললেন—শোনো সুলতা, তোমাকে একটা কথা বলি এই গ্রামের বাজারে পড়ে থাকলে হবে না। আমি রোজ ভোরের ট্রেনে কৃষ্ণনগর যাই। যদি মনে কিছু না করো তবে আমার সাথে যেতে পারো।
- না না দিদি। কী মনে করবো? আসলে আমি তো পথঘাট কিছু চিনি না। তুমি যদি আমাকে নিয়ে যাও তাহলে যেতে পারি।
সুলতা দেবীর সেই পথচলার শুরু। তারপর দীর্ঘ কুড়ি বাইশটা বছর একনাগাড়ে পরিশ্রম করে সুমিতকে কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়ে বড়ো করে তুলেছেন। আমি বেশ কয়েকবার সুমিতের সাথে ওদের বাড়িতে গেছি। সুমিতের মায়ের কঠোর জীবন সংগ্রাম আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে। সুমিতকে বলেছি - এমন একজন মা সত্যি ভাগ্য করে পাওয়া যায়। মাকে কোনোদিন অবহেলা বা অবজ্ঞা করিস না।
ইউনিভার্সিটির পাঠ শেষ হবার পর আর সুমিতের সাথে দেখা হয়নি। সুমিতের মায়ের খবরও জানিনা। ওদের সঙ্গে একবার দেখা করার জন্য মনটা উতলা হয়ে উঠলো। জানিনা সুলতা মাসি এখন কেমন আছে, সুমিতই বা এখন কোথায়, কী করে?
(ক্রমশ)
