এ পাড়াতেও পচা ড্রেনের গন্ধ ঝাপটা মারে নাকে, বাকি পাড়াগুলোর থেকে এ পাড়াটা আলাদা বিশেষ কিছু নয়, সেই কাঁঠালের ভূতি, প্লাস্টিকের প্যাকেট উপচে পড়া সব্জির খোসা, বাসি ডাল, হাগামাখা ডায়াপার, স্তূপ হয়ে থাকা ডাস্টবিন, ক'টা মুদির দোকান যার সামনে রয়েছে ডিমের ট্রে, আলু পেঁয়াজের বস্তা, লাল নীল ট্রে ভর্তি মাদার ডেয়ারির প্যাকেট আর সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়ানো একপাল লোক যাদের হাতে একটা মাসকাবারি বাকির খাতা অথবা একটা তেলের শিশি। ওতে মাপ করে একশো বা দেড়শো তেল সঙ্গে দুটো ডিম আর আড়াইশো আলু যাবে ঘরে, পেঁয়াজ কিনতে হলে সেদিন আবার আলুর পরিমাণ কমবে অবধারিত ভাবে। আসলে এটা ঠিক বস্তি নয়! বস্তির যে যে গুণ থাকে তা এই জায়গাটার নেই, আবার অমায়িক পাড়া, সেই যেখানে তুলসিমঞ্চওয়ালা বাড়ি থাকে, শিউলি কিম্বা কদম নিদেনপক্ষে একটা পলাশের গাছ নিজের মর্জিতে গজিয়ে উঠে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে এ জায়গাটা তেমনটাও নয়। আসলে এটা যেন একটা দড়কচা মারা কিছুই না হতে পারার যন্ত্রণা নিয়ে শুধুই আবাসস্থল হয়ে রয়ে গেছে। তার মাঝেই ঘর গজিয়েছে, ঘর গজালেই মানুষ আসবে আর মানুষ আসলেই তার নিত্য চাহিদা পূরণের জন্য যা যা দরকার সব আসবে।
পঞ্চুর বাপটার আজ পেট ফেঁপেছে, রাতে ওবেলার ভাতের সাথে হোটেল থেকে পাওয়া ডাল আর মুরগির কষাটা দিয়ে ভাত খাওয়ানোটা বড় ভুল হয়েছিল! এখনই চারবার লুঙ্গি বদলাতে হলো, আর বারদুয়েক এমন হলেই কেলো আর ঘরে বাড়তি লুঙ্গি নাই। হাতে সাবান ঘষে কাচতে কাচতে বিড়বিড় করে মিনতি, পেটের ভেতরটা গুড়গুড় করে কেমন যেন!
শঙ্খগুলো তুলে এনেছে দিবাকর, ডাঁই করে রাখা শঙ্খ থেকে পচা গন্ধ উঠে এসে হাওয়াটা ভারি করে, দিবাকর নানা গয়না বানায় ওই শঙ্খ থেকে। হার, এয়োতির শাঁখা ওর ঘরে এসে কিনে নিয়ে যায় সমুদ্র পাড়ে ঘুরতে আসা পর্যটকের দল। ওর গা থেকে পচা গন্ধ বের হয়। বিমল-এপর নিস্ফল প্যাকেট, বিড়ির ধোঁয়াও সে গন্ধ চাপা দিতে নারাজ, ও একা বসে থাকে রাতে।
"ও মিনতি আবার"!
"মরণ হয় না কেন রে তোর? শুয়ে শুয়ে আমার হাড়মাস কালি করলি। আর কতকাল জ্বলবো বলতো"?
হিড়হিড় করে লুঙ্গিটা খুলতে গিয়ে মিনতির চোখ আটকায় পঞ্চার বাপের পৌরুষে। সাগর থেকে ফিরে ধামসাতো এমন করে যেন উত্তাল সাগরে দাঁড় বাইছে কোনো উন্মত্ত দাঁড়ি। সাজোয়ান লোকটার বুকের তলে নিজেকে পিষে ফেলে দিতে মন চাইতো রোজ। কপালে সে সুখ তো ছিল না। মাসের পনেরো দিন নৌকা নিয়ে সাগরে মাছ ধরতো লোকটা। ইলিশের সময়ে একবেলার জন্য ঘরে আসতো কোনোদিন কখনও তাও না। রাতগুলো তখন খাঁ খাঁ করতো, ওদিকে এক আড়বাঁশি নিয়ে দিবাকর বসতো। কী যে বাজাতো বুঝতো না মিনতি কিন্তু গা ছমছম করতো, শরীলডা ভেঙেচুরে যেতে চাইতো। তক্তাপোষের ওপরে কাঁথাকানি টেনে এনে কান চাপতো প্রাণপণ মিনতি। তবুও হতচ্ছাড়া মনটা কেন যে ছুটতো দিবাকরের দিকে বুঝতো না মিনতি।
সেদিন ছিল মাঘী পুন্নিমে কান মাগুরের ঝাঁক এসেছিল নাকি নদীতে ওদিকে সাতদিন টানা সাগরে কাটিয়ে ঘরে ফিরেছিল লোকটা সকালে। পাশের ঘরে নমো নমো করে সত্যনারাণ রেখেছিল মিনতির বন্ধুনী। সন্ধ্যায় এক থাল করে ফল পেসাদ আর সিন্নী খেয়ে পাড়া বেড়াতে গেছিল পঞ্চার বাপ। রাতে খাবে বলে ডালের ভেতর ওল সেদ্ধ দিয়েছিল মিনতি সঙ্গে ফুলকপি ভাপিয়ে রেখেছিল বেসন ফেটিয়ে বড়া করবে বলে শিলপাঁটাতে সবে এক ছটাক পোস্ত ঢেলেছিল বাটবে বলে হুড়মুড়িয়ে এসে লোকটা বলেছিল,
"কাইন মাগুরের ঝাঁক আইসে রে নদীতে এখুনি বেরান লাগবে। ছোট নৌকা নিয়ে যাবো আর আসবো"।
দুটো কথা বলার বা শোনার সুযোগ না দিয়েই লোকটা চলে গেল!
থালার মতো চাঁদ উঠৈছিল আকাশে, ফটফটে জোছ্নার মধ্যে ওই বাঁশি শুনে সেদিন আর বাঁধ মানে নি পা, কখন যেন দিবাকরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল! কেমন যেন মেয়েলি লোকটা! বিভোর বিহ্বল হয়ে সুর তুলেছে ধৈবতে! চোখের পলক পড়ছিল না মিনতির। কোন ফাঁকে যে মদন বাণ হেনেছিল বোঝে নি কেউ, দিবাকরের ঘরের তক্তাপোষের ওপর থেকে ভোরবেলা উঠে এসে সোজা কলঘরে সেঁধিয়েছিল মিনতি। বেলা দশটার দিকে পঞ্চার বাপকে নৌকার একটা তক্তার ওপরে শুইয়ে কাঁধে করে বয়ে এনেছিল সাঙ্গপাঙ্গোরা।
সাগর-নদী যার হাতের তালুর সমান, সে নাকি দাঁড় বাইতে গিয়ে গোঁ গোঁ করে মুখ থেকে শব্দ বের করে শুয়ে পড়েছিল পাটাতনে, চেনা লোকজন ছিল সাথে তাই লোকটা ফিরেছিল। কিন্তু নদী কেড়ে নিয়েছিল সুখ।
আর সাগরে ফেরা হয় নি কখনও।
ঘরের একমাত্তর রোজগেরে বিছানা নিলে প্রথম দিকে আঁঠা থাকে খুব। ওষুধ পথ্থি সব নিয়ম মেনে চলতে থাকে, দিনে দিনে টান পড়ে পুঁজিতে, রসদে তখন আর আঁঠা থাকে না। ওদের সাথেও ঠিক এমনটাই হয়েছিল, ওদিকে ঈশ্বর নামের লোকটা এর মধ্যেই মিনতির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়েছিল পুরোপুরি। পেট হয়েছিল মিনতির। রান্নাঘরে পোড়া লাগা ভাতের সামনে বসে হিসেব করে দেখেছিল বারবার, তারপর পোড়া ভাত ফেলে হাঁড়ি মেজে নতুন করে চাল ধুতে ধুতে ঘরে শোওয়া লোকটার দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠেছিল। কান্নার আওয়াজে ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখে ঘরের চালের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল লোকটা। ভাতটার ভেতরে আধা ফালি করা আলুগুলো দিয়ে লোকটার বুকের ওপরে মাথা রেখে চুপচাপ শুয়ে ছিল মিনতি খানিকক্ষণ। তারপর বাপ হওয়ার খবর দিয়েছিল কানে কানে। লোকটা হু হু করে কেঁদেছিল, সেই কান্নায় সাগরের সুর ছিল না, নদীর গহীন ডাক ছিল না, কিন্তু আনন্দ ছিল।
দিনে দিনে গতর ভারি হচ্ছিল মিনতির। ঘরে সমানুপাতিক হারে বাড়ছিল দারিদ্র। রাতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারছিল না মিনতি, পঞ্চার বাপ পেটটাকে আগলে রেখে ঘুমাতো। বারবার দেখতে চাইত উদোম করে, মিনতির বিরক্ত লাগতো, এখনভাবে হয়তো ওভাবেই নিজের শেষ অস্তিত্ব বজায় আছে এটা বুঝে আনন্দ পেতো।
কলপাড়ে মিনতিকে এক ঝলক দেখেই দিবাকরের মাথায় কে যেন হাতুড়ির বাড়ি মারে! মনের ভেতর ভয় ভয় ভাব। আবার একটা কেমন শিরশিরে আনন্দ গুঁড়ি মেরে শিরদাঁড়া বেয়ে বুকের বাঁদিকে এসে বাসা বাঁধে। তার ফসল এতোদিনে উপযুক্ত পরিবেশে বাড়ছে অথচ এ গোপন খবর, কারুর কাছে প্রকাশ করতে পারবে না! অনাথ দিবাকরের উত্তরপুরুষ আসছে! এ যে কী সুখ! কী আনন্দ! কী তৃপ্তি! বলে, লিখে, চিৎকার করেও বোঝাতে পারবে না দিবাকর। ঘরে এসে তক্তাপোষের গায়ে হাত বুলিয়ে যায় ক্রমাগত। হঠাৎই বিদ্যুত চমকের মতো মনে পড়ে মিনতির ঘরের দশা, সোয়ামী বিছানায় শোওয়া, একলা মনিষ্যি এই সময়ে কি করবে? লোকের বাড়ির কাজ করতে গেলেও হাঁটতে হবে কয়েক মাইল বড় সড়ক ধরে। তারাও এই শরীল গতিক দেখে কাজ দেবে কি না সন্দ। কাজ পেলেও ক'দিন টানতে পারবে?
রাত তখন অনেক একদিকে রাখা আড় বাঁশিটা টানছে অন্য দিকে শঙ্খ। শঙ্খ ওর পেটভাতের যোগাড় দেয় এখন আরও পরিশ্রম করতে হবে, ওর সন্তান আসবে, এ সুখের কাছে পরিশ্রম কিচ্ছু না কিচ্ছু না। আলোটা জ্বালিয়ে শঙ্খ ভাঙতে বসে দিবাকর। ভোরের আগেই বেশ ক'খানা নকশি শাঁখা তৈরি করে ফেলে।
সাতসকালে দিবাকরকে ঘরের সামনে দেখে মিনতির বুক শুকিয়ে যায়। ঘরে শোওয়া লোকটার সাথে শরীরের জ্বালায় বেঈমানি তো করেই ফেলেছে কিন্তু তাতে পেটেরটার কোনো দোষ নেই। ও পবিত্র, ও ভালোবাসার সন্তান, ওর গায়ে কোনো পাঁক নেই, নিজের মনে কথা ক'টা বলে মিনতি, নিজেকে নিজেই আশ্বাস দেয় যেন।
ঘরে গিয়ে দিবাকর হাতল ভাঙা চেয়ার টেনে লোকটার পাশে বসে।
"কেমন আছো দাদা"?
"আছি এই পর্যন্ত তো"।
"একটা কথা বলবো বলে এসেছিলাম..."
"বলো কি বলবে"।
বুকের ভিতর দামামা বাজে মিনতির। কি বলবে ও? বলবে মিনতি অসতী! ছুটে গেছিল ওর কাছে নিজের হুঁশ খুইয়ে মান বেচে আসতে! সব বলবে দিবাকর! কেন যে সেদিন ওমন করে লোকটা গেল মাছ ধরতে, কেন যে মুখপোড়া চাঁদের আলোতে ওর বিবেক ওর ভালোবাসাতে আগুন জ্বললো কেন যে ছুটলো পাগল হয়ে! নিজের গলাটা টিপে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে মিনতির। পেটেরটা কি বোঝে মায়ের মন? নাহলে এমন ঝটাপটি করে কেন এখন?
"কই গো মিনু শুনছো দিবা ভাই কি বলছে? এসো এসো এখানে"।
মানুষটার গলায় সেই সুর, যে সুরে ডুবন্ত মানুষ একটা টুকরোকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। কী বলছে দিবাকর? শাড়িটাকে শরীলের সাথে ভালো করে পেঁচিয়ে উঠে যায় মিনতি।
"এই তো এসেছ মিনু, বসো বসো। দেখো দেকি দিবাকর কী সব বলতেছে"!
চমকে উঠে একবার দিবাকরের দিকে তাকায় মিনতি, ওদিকে মানুষটা বলে চলে,
"আমার শরীলডাতো আর সারবে না, দিবাকর বলতেছিল ও একলা মানুষ আগুপেছু নেই ও আমাদের মাসে মাসে কিছু টাকা দে সাহায্য করবে, আমিই বলেছি দু'বেলা যেন আমাদের এখানেই ও খায়। বলো না ভুল বলেছি কি"?
মিনতি ভেবে পায় না কি উত্তর করবে, মনে মনে নিজেকে ভয় পেতে শুরু করে, এদিকে দিবাকর সত্যিই ওদের সংসারের দায় নির্দ্বিধায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে তৈরি হয়।
"আজ না হয় ওর সংসার নেই কাল সংসার হবেই তখন এইজন্য ওর ঘরে অশান্তি বাধবে, তার চেয়ে আমরা নিজেরাই ঠিক সামলে নেবো"।
"কিছু মনে করেন না বৌদি একটা কথা বলি? আমি অনাথ, আমার বিয়েশাদি করার কোনো শখ নেই, আপনাদের বাচ্চাডার সাথে এট্টু খেলবো সময় কাটাবো ব্যস আমার আর কিছু লাগবে না"।
এক ঝলক দিবাকরকে দেখে রান্নাঘরে ঢুকেছিল মিনতি, চিৎকার করে বলতে চাইছিল,
"এ বাচ্চা তোমার না। এ আমাদের, দুজনের"।
ব্যথা উঠলে মিনতির বন্ধুনীর সাথে দিবাকরও ছোটে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, ফুটফুটে পঞ্চা আসে।
শরীলডা সারলে ছেলেকে রেখে ধীরে ধীরে কাজের সন্ধানে বের হয় মিনতি, প্রতিদিন একঘন্টা করে যাতায়াতের দূরত্বে কাজ পায় বেশ ক'টা বাড়িতে, রান্নার হাত বেশ ভালো ছিল মিনতির অতি অল্প জিনিসে কম সময়ে মুখরোচক কিছু বানিয়ে বহুবার ঘরের মানুষের মন জয় করেছে আগে। পরের দিকে আলু আর চাল এই হয়ে গেছিল উপকরণ, দিবাকর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হাল ধরাতে আলুর সাথে কখনও ডাল কখনও চুঁনো মাছও জুটতো, তবে ভাত বেড়ে বসলে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ঠিকরে উঠতো বুকের গভীর থেকে, একটা মিথ্যে স্বপ্ন দেখে একজন অন্যের ঘর সামলে চলেছে দিবারাত।
"দিবাকর তোকে মনে হয় অন্য চোখে দেখে রে"।
সদ্য ভাতক'টা খাইয়ে সগড়ি থালাটা নিয়ে রাখতে যাচ্ছিল মিনতি, মানুষটার কথায় হাত থেকে থালাটা পড়ে যায়, এঁটো জলে ঘর ভাসে। পেছন ফিরে দেখে মানুষটার চোখে যেন কেমন একটা হিংস্র ভাব। আধো অন্ধকার ঘর তার ভেতরে জ্বলছে যেন চোখদুটো। শিরশির করে ওঠে মিনতির গা। কোনোমতে থালাখানা রেখে ফিরে এসে পঞ্চাকে ঘুম পাড়ানোর অছিলায় বলে,
"দিবাকরকে সাহায্য দিতে এখন বারণ করলেই তো হয়, আমি তো চার বাড়ি কাজ জুটিয়েছি আরও দু' বাড়ি নয় বিকেলের দিকে ধরি নেবো"।
"মানুষডা বিপদে পাশে ছিল ভুলিস নে যেন! ছেলেটা বড় হতিসে ওর হাত-পা হতিসে আমি শোয়া মনিষ্যি ওর পাছে কি ছুটতে পারি? নেহাত দিবাকর ছেল, হাতের কাজের অবসরে এসে ওরে দেখে যায়, তাই তো শান্তিতে থাকি"।
গলার স্বরে তেমন কোনো রোষ খুঁজে পায় না মিনতি, ঘুমন্ত ছেলের পাশ থেকে উঠে রান্নাঘরের কাজ সারে আর অপেক্ষা করে দিবাকরের জন্য। কেন কে জানে দিবাকর না খেলে ওর গলা দিয়ে ঠিক ভাতগুলো নামতে চায় না।
বেশ অনেকখানি বেলা করে দিবাকর আসে খেতে, ভাত বেড়ে দিয়ে মিনতি খানিক দূরে বসে অপেক্ষা করে। গরাস মুখে তুলে দিবাকর বলে,
"ক'দিন ধরেই একটা কথা বলবো ভাবতেছি, সামনে পূজা শহরে তো বিভিন্ন ধরণের ঠাকুর হয় যাবা একবার দেখতি? পঞ্চা তুমি আর আমি"।
চোখটা ছলছল করে ওঠে মিনতির, ঠিক কতো বছর এই সাগর পাড়ের ঘরের বাইরের জগতটা ও দেখেনি নিজেরই মনে পড়ে না। জীবনটা এমন হবার কথা তো ছিল না, ঘরের ভাণ্ডার অফুরন্ত না থাকলেও চলে যাচ্ছিল ঠিকঠাক হঠাৎই কোন বিপর্যয়ে যে এমনটা হলো এখনও ভেবে কূলকিনারা পায় না মিনতি। ডাক্তাররা বলেছিল উচ্চ রক্তচাপে মানুষটার এই দশা হয়েছিল, গুনিণরা বলেছিল নদীর বাওবাতাস লেগেছিল। ঠিক কী, বেঠিক কী বোঝে না মিনতি।
দিবাকরের খাওয়া জায়গায় ন্যাতা বুলিয়ে বাসনকোসন মেজে ঘরে আসতেই পঞ্চার বাপ বলে ওঠে,
"কোথায় যাবি রে নাগরের সাথে"?
আবারও চমকায় মিনতি! এ কি কথা বলে চলেছে মানুষটা? সব কথা তার মানে ও শুনছে, মুখে হাসি টেনে কোনওমতে বলে,
"দিবাকর ভাই বলতেছিল শহরের ঠাকুর দেখবার জন্যি যাতে, আমি কোথাও যাবো না"।
"আমি নদীতে গেলে যদি ওর ঘরে রাত কাটাতে পারিস তবে ঘুরতেও যাতি পারিস"।
চমকে ওঠে মিনতি, গত দু'বছর ধরে যে কথা কাকপক্ষী জানে না বলে ওর মনে হতো সেকথা ঘরের মানুষ জানলো কি করে? সে তো ছিল নদীতে, আর একদিন বৈ তো ও ঘরে মিনতি যায় নি। ওদিক থেকে কিছু শব্দ আসছে কানখাড়া করে শোনে
"দিবাকরের দয়া দেখেছি, চোখদুটাও দেখেছি। পুরুষের চোখে লালসা থাকে সেই চোখেই ভালোবাসা, তোর জন্য তো ভালোবাসার সাগর লুকিয়ে রেখেছে দিবাকর। সত্যি কথা বলতো এই ছেলেটা কার"?
কানের ভেতর গরম সীসা ঢেলে দিলেও মিনতি হয়তো বরফের মতো শক্ত শীতল থাকতে পারতো এই একটা কথাতে একবারে চুরমার হয়ে যায় ও। লোকটা কি ভুলে গেছে তার এককালের অপরিসীম দৈহিক চাহিদার কথা? সাগর থেকে ফেরার পর ঘরে দোর বন্ধ থাকতো বলে আশপাশের বন্ধুনিদের টিকাটিপ্পনী, ভুলে গেছে কী সব? নাকি শুয়ে থেকে থেকে অলস মাথা থেকে এসব বের করে অশান্তি করে মিনতিকে ছোট করার তাল? বুঝতে পারে না মিনতি কিছু, চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে যায়।
"কি হলো যাবে না"?
"কোথায়"?
"হেই দুকুরে যে বলি গেলাম ভুলে গেলে নাকি"?
"আমার ঘর সমসার আছে, ওই ঘরে যে মানুষডা শুয়ে আছে সে আমার সোয়ামী, যে ঘরডাতে আমরা বসে কথা বলতেছি সেই ঘরডা বড় কষ্ট করে সংসার বানিয়েছি এডা কী বোঝো? পঞ্চা আমাদের ছেলে। আমার আর ওই মানুষটার ওর বাপ যদি কোনোদিন সেরে উঠে আমারে আর ওরে নিয়ে যেতে পারে তবে অবশ্যই যাবো, বাইরের লোকের সাথে আনন্দ করার কোনো ইচ্ছা তো আমার নেই"।
স্তব্ধ দিবাকরকে একা খাবারের সামনে বসিয়ে রেখে মিনতি বের হয়ে যায়। এই ছত্রিশ বছরের জীবনে অনেক ঝড় দেখেছে অনাথ দিবাকর, শেষ দু'বছর একটা আশা, একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল অবিরত। মনে মনে যদিও বুঝতো এ স্বপ্নের ভবিষ্যত সাগরের জলে থাকা সুক্তির জীবনের থেকেও বেশি অনিশ্চিত! তবুও কী মন মানে? মন যে বড় কঠিন জিনিস! ভাতদুটো কোনোরকমে খেয়ে দিবাকর উঠে চলে আসছিল পঞ্চার বাপ ওকে ডাক দিলো এমন সময়,
"ভাই দিবাকর একটা কথা বলি কিছু মনে কোরো না, দেখো গেল দু'বছর যাবত ক্রমাগত তুমি আমাদের সংসার বাইছো, এবার মনে হয় মিনতি পারবে টানতে, তোমারও তো বয়স হচ্ছে কতোদিন আর এমন করে কাটাবে"?
শেষ দিকের কথাগুলো কিছুই কানে ঢুকছিল না দিবাকরের, ঘোরের ভেতর বের হয়ে আসে ওই ঘর থেকে।
তখন অনেক রাত, বহুদিন পর আঁড়বাঁশিতে সুর তুলেছে দিবাকর। তক্তাপোষের ওপরে পঞ্চার বাপের বুকে মাথা দিয়ে মিনতি কান চাপা দেয়, ভুলে যেতে চায় যাবতীয় অতীত। এই ঘর, নিজের হাতে সাজানো সংসার এর ভেতরেই ওর যাবতীয় সুখ, হোক না লোকটা পঙ্গু! তবুও সে ওর নিজের একান্ত আপন, ওর সন্তানের বাপ।
আকাশে চাঁদ উঠেছে, বালির বুক ছুঁয়ে যাচ্ছে ঢেউ। নিবিড় আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ে আছে নর-নারী, মায়াতে আবদ্ধ হয়ে।
