
নিকষকালো গায়ের রঙে যে কী মাধূর্য্য লুকিয়ে থাকে, সেটা নসিমাকে না দেখলে কেউ বুঝবে না। নসিমার রোগা, ছোটখাটো শরীর, মুখখানা দেখলে বোঝা যায়, যদি একটুও স্বাস্থ্যের আঁচ লাগত, তাহলে অপূর্ব সুন্দর মুখশ্রী, নজর কাড়ার মতো হতো! কিন্ত সারাদিনে ওর কোনক্রমে দু'বেলা ভাত জোটে।
ভালোমন্দ খাওয়া তো দূরস্থান! আজ তিন বছর ধরে ও পড়ে আছে ভাইদের সংসারে। আজ কিছুটা আশার দোলাচলে পড়ে এসেছে বটে, কামরুলের ডাকে! ক্যানিং থেকে তিন বার নৌকা বদল করে আসতে হয় তিনজেলিয়াতে। সেই কোন সাত সকালে বাপের বাড়ি থেকে বেরিয়েছে!
মাথায় ঘোমটা, হাতে একটা ছোট ব্যাগ, (যার মধ্যে তার মোবাইল আর গাড়ী ভাড়া বাবদ দাদাদের দেওয়া কিছু টাকা) নসিমা এসে শুকনো মুখে, গোঁজ হয়ে বসে আছে গেস্ট হাউসের উঠোনে। সকাল থেকে কিছুই খায়নি।
তিনজেলিয়ার গেস্ট হাউসে আজ কলকাতা থেকে অনেক বাবুরা আর তাদের বউয়েরা এসেছে ক'দিনের জন্য বেড়াতে। বাবুরা নাকি গ্রাম দেখতে চান! নসিমা ভেবে পায় না, গ্রামে আবার কি দেখার আছে? গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার হল কামরুল। কামরুল আজ নসিমাকে ডেকেছে কারণ সে একবার শেষ ফয়সালা করতে চায়।
কামরুল গুনে গুনে তিন তালাক দিয়ে তিন বছর আগে যখন নসিমার কাছ থেকে তার সংসার, ছেলেমেয়ে কেড়ে নিলো তখন সে গ্রাম পঞ্চায়েতকে বলেছিল, নসিমার স্বভাব খারাপ, রান্না খারাপ,... ইত্যাদির কথা! কিন্তু কতদিন আর কাঁহাতক হাত পুড়িয়ে রান্না করে, ছেলেমেয়ে মানুষ করতে পারা যায়! নতুন করে সংসার পাতার সাধ ছিল বড়! অথচ বহু চেষ্টা করে যখন দেখল, খুঁতো বা অসুস্থ, বেশী বয়সী মেয়ে ছাড়া সে পাচ্ছেনা, তার মতো ভুঁড়িওয়ালা, টাকমাথা, দুই ছেলে মেয়ের বাবাকে নিকা করতে মেয়েরা চাইছে না, তখন এই বুদ্ধি তার মাথায় এলো! আর এদিক ওদিক, গোসাবা, ক্যানিং, এমনকি বাংলাদেশ সব জায়গাতেই চেষ্টা চালিয়ে দেখল, নতুন নিকার জন্য সুন্দরী, সুশীলা মেয়ে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। নাহয় নসিমাকেই আবার ডেকে আনা যাক! মনে মনে সে যে নসিমাকে ভালবাসে না, এমনটা তো নয়! কিন্তু রেগে গেলে ওকে লাথি মারতে তার কখনোই দ্বিধা বোধ হয়নি। কামরুল শহুরে ভালবাসার ধরনধারন ঠিক বোঝেনা! নিজেরই বউকে সে দরকার হলে যদি দু'চার ঘা দেয়, নিজের ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে সে যদি তার বউকে পেটায় তাতে কার কী এসে যায়? চিরকাল সে তার বাবাকে দেখে এসেছে, মা'কে চড় মারতে, হাত মুচড়ে দিতে। মাংসের ঝোলে নুন বেশী হওয়ার অপরাধে একবার বাবা মাটির তৈরী রান্নার উনুন লাথি মেরে ভেঙে দিয়েছিল! আবার বছরকার শাড়ী জামা নিজে পছন্দ করে কিনে এনেও দিতো। বউকে ভালবাসার এইতো রীতি! সেই রীতিনীতি আজ হঠাৎ কেন বদলে যাবে? সমস্যার শুরু হয়েছিল বছর পাঁচেক আগেই। মারধোর খেয়ে পড়ে থাকা, লাজুক স্বভাবের নসিমার হঠাৎ কেমন বদল আসতে লাগল! সে সরকারের 'সাক্ষরতা অভিযান'-এর কেলাস করতে যেত কাছেই স্কুল বাড়ীতে। সেখান থেকেই সই করতে শেখার সঙ্গে সঙ্গে তার কি রকম নানাদিকে জ্ঞান চক্ষুরও উদয় হতে লাগল!
মার খেতে অভ্যস্ত নসিমা রুখে দাঁড়াতে লাগল, মুখে মুখে তর্ক করতে লাগল! গায়ে হাত তুলতে গেলে হাত ধরে নিচ্ছে! মাইয়া মানুষের এইসব বজ্জাতি কতদিন আর সহ্য হয়? দিল তালাক দিয়ে একদিন! এবার আবার কামরুল যখন তাকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তখন নসীমার কেন এরকম অনিহা হবে! সে এখন বেঁকে বসে আছে, এ সংসার সে নাকি আর করতে চায়না। অথচ কামরুল খবর নিয়ে দেখেছে, অন্য কোনও পুরুষ মানুষের খপ্পরেও সে পড়েনি!
নিজের মেয়েকে কামরুল একদম হাতে করে তৈরী করেছে। গেরামের হাইস্কুলে সে মেয়ে এখন দশ কেলাসে পড়ে। বাবাকে খুশী রাখতে গেলে যে মা'কে পছন্দ করা চলবে না, একথা ঐ চালাক চতুর মেয়েটা অনেক ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিল। নিজের মা'কে সে, 'পাগলী', 'ডিসগাস্টিং মহিলা' ইত্যাদি রকম মধুর সম্ভাষণে প্রকাশ্যেই তাচ্ছিল্য করে। নসিমার সপ্তদশী কিশোরী মেয়ে মা'কে উঠোনে বসে থাকতে দেখে মুখ ব্যাঁকায়। নিজের সাজগোজ, পড়াশোনা নিয়ে সে এতটাই মত্ত থাকে যে তার চার বছরের ভাইটাকে দেখাশোনার সময় হয়না। হাতে সারাক্ষণ মোবাইল রাখে। আব্বা তাকে নতুন স্মার্টফোন কিনে দিয়েছে! মুখে তার ইংরেজি বুলি, শহরের মেয়েদের, বিশেষ করে সিনেমার নায়িকাদের সব আদবকায়দা সে রপ্ত করে ফেলেছে।
কিন্ত ঐ যে রোগা, কালো, ছোট্টো চার বছরের শিশুপুত্র তার, সারাদিন ল্যাংটো হয়ে গ্রামের এ পাড়া ও পাড়া ঘুরে বেড়ায়, সে আজও মা'কে দেখলে ঠিক কোথা থেকে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে! কথাও বলে অনেক, ঠিক পরিষ্কার বোঝা যায়না অবশ্য! পাড়ার লোকের কাছে শুনেছে নসিমা, এই বয়সেই নাকি গালি দিতে শিখেছে! হয়ত বাবারই কাছে। ওকে দেখলেই নসিমার দু'চোখ ফেটে জল আসে। ওর তো কোনও দোষ নেই অথচ প্রায় জন্মের পর থেকেই মায়ের ভালবাসা পেলনা!
কামরুল এসে সটান উঠোনে দাঁড়ায়, পরনে গামছা, তবে আজ বাবুদের খাতিরে গায়ে গেঞ্জি! সে তার ভাঁটার মতো গোলগোল চোখে নসিমাকে জরিপ করে। গেস্ট হাউসের বড়বাবুর উদ্দেশ্যে বলে, "ফয়সালা দিন বাবুরা, এই মেয়েছেলেকে যখন আবার আমি ডাকছি তখন ওর এত তেজ কিসের জন্য?"
বাবাকে খুশী করতে মেয়ে পাশ থেকে চেঁচিয়ে ওঠে, "ম্যাডাম আর স্যারেরা তো আর জানেনা, এই মহিলা কি জিনিস, ভাঙবে তবু মচকাবে না!"
ভদ্রলোক বাবুরা এইসব গ্রাম্য পারিবারিক সমস্যার থেকে গা বাঁচাতে চান। তারা বলেন, "ঠিক আছে, যাও। নিজেদের ঝগড়া নিজেরা মিটিয়ে নাও।" বলে তারা তাদের প্রাতঃকালীন কাজে মন দেন। কিন্ত ম্যাডামদের অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ে যায় সবকিছু। ওদের সহানুভূতি নসিমার প্রতি বর্ষিত হয়। নসিমা ওদেরকে দ্যাখায়, তার ওপর নির্যাতনের আঁচরগুলি, হাতে কালশিটের দাগ, পিঠে লাঠি দিয়ে মারার শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত! সেও তার স্বপক্ষে বলে, "কেন আবার আসব আমি, বলতে পারেন? এখন আপনাদের সামনে ভালমানুষ সাজছে, কিন্তু ও কীরকম মানুষ সে তো আমার থেকে বেশী কেউ জানেনা! আবার নতুন করে শুরু করবে ঝগড়া, অশান্তি, মারধোর। কী আর করব, আমারই পোড়া কপাল বলে, মেনে নিয়েছি, দাদারা তাদের সংসারে জায়গা দিয়েছে, ফেলে তো দেয়নি, আমার একটা পেট, চলে যাবে ঠিক!"
ফিরে যাবে, নসিমা এবার! আকাশে ঘন মেঘ করেছে, সে যদি বেলাবেলি না বেরোয়, এতটা পথ পেরিয়ে পৌঁছতে অনেকই রাত হয়ে যাবে। ভেবেছিল, হয়তো কামরুলের তেজ একটু কমেছে, মেয়েও হয়তো তাকে ফিরে পেতে চায়! কিন্ত কোথায় কী! কেউই একটুও বদলায়নি। তবে ছেলেটা যে কোথায় গেল, তাকে দেখতে পাচ্ছেনা কেন, কে জানে!
এমন সময় কোত্থেকে দৌড়তে দৌড়তে আসছে তার ছোট্ট ছেলে, হাতে একটা লাঠি, যেটা লম্বায় ওর দ্বিগুণ। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে মা'র কোমর জড়িয়ে ধরে বলে, "আম্মা, থাকো না! এবার যদি আব্বা তোমাকে মারে তাহলে আমি এই লাঠিটা দিয়ে আব্বাকে খুব মারব!"
নসিমার চোখের জল বাঁধ মানেনা আর! ছেলেটার শুকনো মুখ, তার বুক ভেঙে দ্যায়! কেমন করে ফিরে যাবে সে আর! কোলে তুলে নেয় ছেলেকে, প্রাণপনে জড়িয়ে ধরে।
এক অপার্থিব কালো রঙে আকাশ ঢেকে যায়, অঝোরে বৃষ্টি নামে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নসিমা নিজেদের বাড়ীর দিকে তাড়াতাড়ি পা চালায়।
সন্তান স্নেহ বঞ্চিত হয়ে সে আর থাকবে না। ছোট এই শিশুটির তাকে প্রয়োজন, আর তার নিরালম্ব নিঃসহায় জীবনে, নিজের ছেলের ভালবাসার থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?
