প্রবন্ধ

বটতলার চটিবইঃ এক অন্য ভাবনা



দ্বিজরাজ সান্যাল


বটতলার বই-এর নাম শুনলেই অধিকাংশ সুশীল ভদ্র রুচিবান পাঠকের ভ্রুকুঞ্চিত হয়। যৌনতাপূর্ণ নিম্নরুচির সস্তা পুঁথির কথাই সবার আগে ভেসে ওঠে মনে। বটতলার বইগুলো কাম-ক্রোধ-মদ-মোহ-লোভ-মাৎসর্য এই ষড়রিপুর ফেরিওয়ালা ছাড়া উৎকৃষ্ট কিছু ভাবতে মন তাদের সায় দেয় না। কিন্তু এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। জেমস লং সাহেবের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৮৫৭ সালে এই 'বটতলা' মার্কামারা বই বিক্রীত হয়েছিল মোট ৫,৭১,৬৭০টি। তার মধ্যে পুরাণ, হিন্দু ধর্মগ্রন্থ এবং শিক্ষা বিষয়ক বই ছিল ২,৪১,৪৫০টি আর যৌনতা সম্বন্ধীয় বই মাত্র ১৪,২৫০টি। এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে বটতলার সাহিত্য পুরোটাই কুরুচিকর ছিল না, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে একে কলঙ্কিত করা হয়েছিল।

বাংলা ছাপাখানার আঁতুড়ঘর ছিল কলিকাতা নিকটবর্তী হুগলির শ্রীরামপুর। ছাপাখানা প্রথম দেখে বিস্মিত বাংলার মানুষ কপালে জোড়া হাত ঠেকিয়ে মাথা নুইয়ে বলেছিল, এ তো দেখি সাহেবদের ঠাকুর। সেই ঘোর অচিরেই কাটিয়ে ১৭৭৮ সালে হুগলি থেকে প্রকাশিত ব্র্যাসি হেলহেডের বই 'এ গ্রামার অব বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ'-এ সর্বপ্রথম বাংলা হরফ ব্যবহার করা হয়। 'লাইনোটাইপ' অর্থাৎ 'চলমান বাংলা ঢালাই হরফ'-এর প্রবর্তন করে চার্লস উইলকিন্স আর পঞ্চানন কর্মকার, বাংলা প্রকাশনার এক নবদিগন্ত উন্মোচিত করেন। যার ফলস্বরূপ কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রায় ৪২টি ছাপাখানা খোলে এবং তারা বাংলায় ছাপতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এই পঞ্চানন কর্মকার মহাশয়কেই ছাপাখানার আবিষ্কারক ইওহানেস গুটেনবার্গের নাম স্মরণ করে 'ভারতের গুটেনবার্গ' বলা হয়। পার্থক্য শুধু এটাই - জার্মানির মানুষ ইওহানেস পারিবারিক সূত্রে ছিলেন স্বর্ণকার আর পঞ্চাননবাবু কর্মকার।

প্রথমদিকে বাংলার এই ছাপাখানাগুলোতে বাইবেলের বাংলা অনুবাদ, বেঙ্গলী গেজেট আর হাজার হাজার সরকারী হুকুমনামা ছাপা হতো। ১৯টির মতো আইনের বই-ও বঙ্গানুবাদ হয়েছিল। তারপর মুদ্রিত হতে শুরু করে বাংলা সংবাদপত্র আর সাময়িকী। এরই মধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম-এর বাংলা অধ্যাপক উইলিয়াম কেরির নেতৃত্বে বাংলার মুদ্রণ শিল্পের আরও উন্নতি এবং প্রসার হয়। শ্রীরামপুর 'মিশন প্রেস' এবং পরবর্তীকালে 'ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস'-এর হাত ধরে শুরু হয় প্রকাশনার রমরমা ব্যবসা।

দেশের রাজধানী কলকাতায় বাংলায় প্রকাশনার চাহিদা ও গুণগত মানের কথা মাথায় রেখে তৈরী হয় পাঁচখানা পেল্লায় প্রেস। যার মধ্যে 'মিশন রো গভর্নমেন্ট প্রেস', বৌবাজারের 'ফেরিস' কোম্পানির প্রেস আর পটলডাঙ্গার লল্লুলালের প্রেস ছিল বিখ্যাত। নিজেদের আভিজাত্য বজায় রেখে বেশি মূল্যে নিয়মিত কাগজ, গেজেট, নোটিশ ছাড়াও কিছু বাংলা কাব্য, নভেল, বাংলা ব্যাকরণ, বেদ, উপনিষদ মুদ্রিত হতো এসব ছাপাখানা থেকে। তার থেকে লল্লুলালের মতো প্রকাশক ব্যবসায়ীদের প্রচুর মুনাফা হতো ঠিকই কিন্তু গুটিকতক অভিজাত শিক্ষিত রুচিবান পরিবার ছাড়া আপামর বাঙালি এ সাহিত্যকে মোটেও আমল দেয়নি। উচ্চ নন্দনতত্ত্ব মান্যকারী এই সাহিত্য ব্রাত্য থেকে গিয়েছে সাধারন মানুষের মনের আঙিনায়।

উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকেই রাজধানী কলকাতা জুড়ে শুরু হয়ে যায় জোরদার নগরায়ন। গ্রাম গঞ্জ শহরতলি এমনকি ভিনরাজ্য থেকে অজস্র মানুষ এসে ভীড় করে কলকাতায়, নতুন জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। কিছুটা ইংরেজি শেখা নব্যশিক্ষিত যুবকের দল ইংরেজদের নিজেদের প্রয়োজনে গড়ে তোলা অফিস কাছারিতে যোগ দেয়, সাহেবদের সঙ্গে নানা ব্যবসা শুরু করে। মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্বাধীন ব্যবসা ও ছোট ছোট নতুন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হল। ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে গ্রহণ করে সে হঠাৎ করেই পাঠের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ডুবে যায়।

বাঙালির সব ব্যাপারে জানার অত্যধিক কৌতুহল চিরদিনের। চণ্ডীমণ্ডপের আড্ডায়, বাজার হাটের সভা সমিতিতে আর বৈঠকী আলোচনায় তার সেই জিজ্ঞাসা আর পরিপূর্ণ হচ্ছে না। তাদের কারোরই তেমন পণ্ডিত হওয়ার বাসনা নেই। তবুও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, চাণক্যশ্লোক, দেশ-বিদেশের কাব্য থেকে শুরু করে নাটক, বড়লোকের কেচ্ছা, কারিগরী বিদ্যা, যাত্রা, স্ত্রীশিক্ষা, বেশ্যা-কথা, যৌনকাহিনি - ভাল মন্দ সবকিছু জানতে চায়, পড়তে চায় বাড়ি বসে, নিজের খুশিমতো। ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত বই-ই একমাত্র পারে পাঠকের এই প্রবল জ্ঞানপিপাসা মেটাতে। স্বভাবতঃই ব্যাপক চাহিদা তৈরী হয় বই-এর যার আধুনিক নাম বাজার। নামী প্রেসগুলো নিজেদের কৌলীন্যের কথা মাথায় রেখে অস্বীকার করে এই বাজারকে। ঠিক তখনই 'অপর' মান্যকারি নন্দনতত্ত্ব হিসেবে বিশাল সংখ্যক সাধারণ মানুষের জানবার ঔৎসুক্য মেটাতে জন্ম নেয় এই বটতলা সাহিত্য। এবং অচিরেই নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পাঠকের হৃদয়কে গ্রাস করে ফেলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গের ছাপাখানার ইতিহাসে বটতলা প্রকৃত অর্থে এক রেঁনেসার জন্ম দেয়।

শোভাবাজারের কালাখানা অঞ্চলে পেল্লায় এক বটবৃক্ষের শানবাঁধানো তলায় পুরবাসীরা তখনকার দিনে বিশ্রাম নিত, আড্ডা মারতো, গান বাজনা হতো, বই-এর পসরাও বসতো। ১৮১৮ সালে এতদ অঞ্চলে প্রথম ছাপাখানা খোলেন বিশ্বনাথ দেব (মতান্তরে বিশ্বনাথ দে)। সেই থেকেই নাম - 'বটতলার বই'। বহুদিন পর্যন্ত এই 'বান্দা বটতলা'-ই ছিল উত্তর কলিকাতার পুস্তক প্রকাশনার স্থায়ী ঠিকানা। বটতলা সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে যেমন আপামর সাধারণ মানুষের বাংলা পাঠের আগ্রহ ছিল সত্য, তেমনি সত্য ছিল ব্যবসা। এর এত চাহিদা ছিল যে লিখে এবং ছেপে সঙ্কুলান হতো না। স্বল্পমূল্যে ঢালাও বই বিক্রি করে অনেক মুনাফা হতো বলে অনেকে পৈতৃক চালু ব্যবসা ছেড়ে ছাপাখানা খু্লেছিল এবং তখনকার দিনে বছরে তিন চার লক্ষ টাকা লাভ করত। আর তাই বটতলার বই শুধুমাত্র এই অঞ্চলেই সীমায়িত থাকেনি। প্রথমে চিৎপুর, জোড়াসাঁকো, দর্জিপাড়া, গরানহাটা, বিডন স্ট্রীট, কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট হয়ে জন(জান) বাজার, ট্যাঙ্ক স্কোয়ার (ডালহৌসি স্কোয়ার) অবধি অর্থাৎ যেখানেই দেশি লোকের বাস ও কারবার ছিল সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে বটতলার বই আর ছাপাখানা।

স্বল্পবিত্ত মানুষের পাঠ-ইচ্ছা মেটাতে বটতলার বই-এর এই অল্টারনেটিভ বাজার অচিরেই সারা বাংলাকে গ্রাস করে। গ্রামীন মানসিকতা আর নাগরিক আকাঙ্ক্ষাকে মিশিয়ে বাঙালির মননের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় এই বটতলার জাগরণ। নামপত্রে বড় বড় বাংলা হরফে 'কলিকাতা' লিখে সাধারণ মানুষের নাগরিক জীবনের প্রতি হাতছানি উস্কে দিয়েছিল বটতলা মুদ্রিত প্রায় সব বই। বটতলার বই-এর নিজস্বতা, সিগনেচার ব্র্যান্ডিং-এর সাথে জনপ্রিয়তা ভীষণভাবে জড়িত ছিল। বিজ্ঞাপন, বইপ্রকাশ থেকে বিক্রি এবং আনুষঙ্গিক সবকিছুই হয়েছে সমকালীন জনপ্রিয়তার দাবি মিটিয়ে। বটতলার বই-এর বৈশিষ্ট্য ছিল নিম্নরূপঃ
১) বিষয়বস্তু, ২) ছবি, ৩) ভাষা, ৪) দাম, ৫) বিপনন, ৬) বিজ্ঞাপন।
 

১) বটতলার বই-এর বিষয় -

জনপ্রিয় সাহিত্যের দুটি লক্ষণ - বিষয়বস্তু হিসেবে চিরাচরিত সাহিত্যকে সে যেমন পছন্দ করে, অভিনবকেও তেমনই গ্রহণ করে সানন্দে। বটতলার সাহিত্যেও একই রকম ভাবে এই দুইয়ের সম্মিলন দেখা গেছে। একদিকে অন্নদামঙ্গল, রামায়ণ, মহাভারত, বিদ্যাসুন্দর এইসব বাজার পরীক্ষিত টেক্সট সে যেমন ছেপেছে, পাশাপাশি কামিনীকুমার, লালমন কেচ্ছা, নাটক-সর্বস্ব কৌতুক, ইংরেজি পাঠ, পারস্য ইতিহাস, অমরকোষ, চৌদ্দ আইন, বেশ্যা-গাইড, একেই বলে পোল (হাওড়া ব্রিজ নিয়ে), ডেঙ্গু জ্বরের পাঁচালী, ড্রেনের পাঁচালী, দুর্ভিক্ষ চিন্তামণি, দারোগা হওয়ার উপায় - সমকালীন নানান বিষয়বস্তুকে বটতলা সাহিত্য ধরতে চেয়েছে বারবার। আবার কখনও চিরায়ত সাহিত্যগুলো বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে বোধগম্য কররার জন্যে ঢেলে সাজিয়ে বলতে গেলে একপ্রকার মেড-ইজি বানিয়েছে। সংস্কৃত, ইংরিজি, উর্দু, ফরাসি - নানা উৎস থেকেও কাহিনি সংগ্রহ করতেন বটতলার লেখকরা। পুরাণ, পঞ্জিকা থেকে শুরু করে কারিগরি বিদ্যে, এমন কোনো বিষয় ছিল না যা বটতলার অজানা। সেদিক থেকে বটতলা বাঙালির কাছে ছিল যেন এক খোলামেলা বিশ্ববিদ্যালয়, আজকের দিনের 'ওপেন ইউনিভার্সিটি'। আরও লক্ষ্যণীয় বিষয়, কেউ একজন বই লিখলে দ্বিতীয়জন একই বিষয়ের ওপর আরেকখান বই লিখে প্রথম জনকে নস্যাৎ করত, আবার দ্বিতীয়জনকে নস্যাৎ করে তৃতীয়জন। প্রথমজন তখন আবার জবাব দিতেন। পাঠক আর লেখকের মধ্যে এই সোশ্যাল স্পেসটাই তো যেকোনো জনপ্রিয় সাহিত্যের লক্ষণ। বটতলা সাহিত্য খুব ফ্লেক্সিবল ছিল বলেই লেখক কেন্দ্রে থেকে পাঠককে প্রান্তে ঠেলে দিতে পারেনি। বরং দুজনে ক্রমাগত কাউন্টার করতে করতে এগিয়ে নিয়ে গেছে সাহিত্যকে। আর তাই ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ অবধি বটতলা তার সাহিত্যসম্ভার নিয়ে পূর্ণ বিকশিত হয়েছে বাংলার সাহিত্য জগতে, পাশাপাশি বাণিজ্যও করেছে ঢের।

অথচ তখনকার দিনে উচ্চরুচির উচ্চবর্গের ছাপাখানার প্রকাশকরা এসব হীন ব্যাপার বলে নিজেদের জ্ঞান-আধিপত্য দিয়ে 'অপর' বানিয়ে রেখেছিল বটতলা সাহিত্যকে। বড়লোকের কামাতুর দুলালদের মনোরঞ্জনের চাহিদা মেটাতে যৌনতাপূর্ণ নিতান্ত নগণ্য কিছু বটতলার বইকে দৃষ্টান্ত দেখিয়ে অশ্লীলতার ছাপ্পা মেরে গোটা বটতলা সাহিত্যের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে এই উচ্চরুচির প্রেসওয়ালারা। তাই প্রচার করলে তারা - বটতলার বই আলমারি থেকে যত্নে পেড়ে আনা বই নয়, বালিশের তলায় চাপা দিয়ে রাখা মলিন মলাটের বই, তা সে কৃত্তিবাসী রামায়ণ-ই হোক বা হরিদাসের গুপ্তকথা। 'যাত্রাপথ' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ অবধি বটতলা সাহিত্য নিয়ে ছড়া কেটেছেন -

"কৃত্তিবাসী রামায়ণ সে বটতলাতে ছাপা

দিদিমায়ের বালিশ-তলায় চাপা

আলগা মলিন পাতাগুলি, দাগি তাহার মলাট

দিদিমায়ের মতোই যে বলি-পড়া ললাট"।

বটতলার বই নিয়ে এই ছুৎমার্গ ছিল এক ধরনের ভিক্টোরিয়ান মানসিকতা যা পুরো সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কালচারাল হেজিমনি। বড় বাড়ির উচ্চ-রুচি, উচ্চ-নন্দনতত্ত্ব আর আভিজাত্যের চরম অবজ্ঞাই ধরা পড়েছে এখানে। কিন্তু তাতে বটতলার কোনো হেলদোল নেই। সে এগিয়েই চলল তরতর করে নিজস্ব স্টাইলে।

২) বটতলার বই-এর ছবি -

বই-এর জনপ্রিয়তার সঙ্গে 'ইমেজ' মানে ছবি ভীষণভাবে জড়িত। বৃহত্তর জনমন লেখার সূক্ষ্মতা সেভাবে অনুধাবন করতে চায় না বরং ছবির মধ্যে দিয়ে সে বোঝাবুঝির সহজ রাস্তাটা খুঁজে পেতে চায়। আমাদের ট্র্যাডিশনে পটচিত্র বা ব্রতকথায় যে আলপনা থাকত, কথকঠাকুরকে সেটা একটা ভিসুয়াল সাপোর্ট দিত। স্মৃতির পক্ষে ইমেজ অনেক বেশি ক্ষমতা ধরে এই সাইকোলজি থেকেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে ছবি ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে বটতলা সাহিত্যে বই-এর জগতে একটা 'বুম' এল, দ্রুত বিস্তার ঘটল। বটতলা সাহিত্যে প্রথমে কাঠ খোদাই, তারপর দস্তার ওপর ব্লক বানিয়ে ছাপা হতো ছবি। একমাত্রিক সলিড রেখা-নির্ভর ছবি দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে হাফটোন আর শেডের ব্যবহারে অসামান্য সব ছবি এঁকে নিজস্ব এক ঘরানা তৈরী করল বটতলা। জন্ম হল 'পপুলার আর্ট'-এর। ১৮১৬ সালে 'ফেরিস' কোম্পানির প্রেস 'অন্নদামঙ্গল কাব্যে' প্রথম ছবির ছাপলেও বটতলার বইতে প্রথম ছবি ছাপা হয় ১৮৩১ সালে। বই-এর প্রচ্ছদে 'সচিত্র' কথাটি অবশ্য করে উল্লেখ করা থাকত। ছবিওয়ালা বই-এর দাম খুব বেশি রাখত না বটতলা। কালিঘাট থেকে পটচিত্র কেনার থেকে অনেক সস্তাতেই ঠাকুরের সচিত্র বই কিনে পাঠক ছবি সাজিয়ে রাখত বাড়ির ঠাকুরঘরে। ভাল বাজার দেখে বটতলার ছাপাখানার মালিকরা সে সময় অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন ছবি নিয়ে যা সমসাময়িক ইউরোপীয় স্টাইলের থেকে কিছু কম ছিল না। নাগরিক চর্চা হিসেবে বটতলার ছবি এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে তাকে উৎসাহিত করতে এবং বাজার ধরতে ১৮৫৪ সালে তৈরী হয়েছিল 'দি ক্যালকাটা স্কুল অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট', পরবর্তীকালে যা হয়েছে 'গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ'।

ধর্ম সংক্রান্ত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অন্যায়ের প্রতিমূর্তি কৃষ্ণবর্ণ অতিকায় রাবণকে রাম নিধন করছে বা সতীর দেহ মাথায় নিয়ে উদভ্রান্ত শিবের ছবি। বাঙালীর ব্যক্তিগত জীবনে অস্থিরতা থাকলেও বটতলার বই-এ মা কালীকে ভয়ঙ্করীর পরিবর্তে দেখানো হয়েছে ধীর শান্ত রূপে, বৈষ্ণবী ভাবধারার আদলে। পঞ্চানন কর্মকার প্রচ্ছদে রাধাকৃষ্ণ এঁকেছেন, যেখানে সখীরা আশ্চর্যজনকভাবে কৃষ্ণের চেয়ে আকারে বড়, যা ধর্মীয় বিশ্বাসে হওয়ার কথা নয়। পপুলার আর্টকে গুরুত্ব দিয়ে এখানে পাঠককে একটা স্পেস দিয়েছেন বটতলার শিল্পী, সখীদের পাঠকেরই প্রতিনিধি বানিয়েছেন। আবার 'দেবীযুদ্ধ' বই-এর মলাটে দেখা যাচ্ছে, কৈলাশে হর-পার্ব্বতীর সঙ্গে গাছে বসে দুজন সাধু আর একজন সাধারণ মানুষ - যে পথিক হতে পারে, ব্যাধ বা পাগলও হতে পারে। এতদিন উচ্চবর্গের নির্দেশে যে সাধারণ মানুষ স্থান পেত না, বটতলার বই ছবিতে সেই মানুষকেই অবধারিত অংশ বানিয়ে ফেলল।

পাবলিক স্পেসটাকে বটতলা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে সামাজিক বিষয় নিয়ে আঁকা ছবিগুলোয়। বড়লোকের বাড়ির সতীন নিয়ে লেখা রঙ্গব্যাঙ্গাত্মক পুস্তিকার মলাটের ছবি - দুই সতীন চুল টেনে ঝাঁটা হাতে ঝগড়া করছে। কিম্বা স্ত্রীশিক্ষা নিয়ে রাধাবিনোদ হালদার-এর সামাজিক প্রহসন 'পাস করা মাগ'-এর প্রচ্ছদের ছবি - এক উলঙ্গ নারী, যেন লাজলজ্জাহীন নষ্টা। সঙ্গে আবার দু'লাইনের ছড়া - "স্ত্রী স্বাধীনে এই ফল/পতি হয় পায়ের তল"। লিঙ্গ বৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে আঁকা এমন সব সামাজিক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ছবি পৌঁছে দিয়ে বটতলা তার পাঠকদের সামনে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সে সময়ে সর্বাধিক আলোচিত গৃহবুধু এলোকেশী আর সাধু মোহন্তের ব্যাভিচারের সত্যকাহিনি নিয়ে লেখা কাহিনি-চিত্র 'উঃ মোহন্তের এই কাজ'-এর মলাটে আমরা প্রথম দেখতে পাই রঙিন লিথোগ্রাফ, যেখানে সরলা এলোকেশী শুয়ে আছে আর মোহন্তের পলায়নোদ্যত পা দুটি দেখা যাচ্ছে।

একথা সত্য অধিক মুনাফার জন্যে পুরুষের নিষিদ্ধ কামনার যোগান দিতে বটতলার বইতে নারীচিত্র আঁকার প্রবণতা বেশি ছিল এবং সেগুলো বেশ অশ্লীলও ছিল। এরপর ফটোগ্রাফ যখন পপুলার হলো, বটতলাও সঙ্গে সঙ্গে তার প্যাটার্ন বদলালো। 'কমলিনী সাহিত্য মন্দির'-এর এক টাকার উপন্যাস 'বিয়েবাড়ি'তে নায়িকাকে সিনেমার সেটের মতো রেলিং দেওয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মোটকথা, ছবির জগতে যখন যেমন অগ্রগতি হয়েছে বটতলা তাকে অনুসরণ করেছে, কখনই দুয়ার বন্ধ করে রাখেনি উচ্চবর্গীয় ছাপাখানাগুলোর মতো।

৩) বটতলার বই-এর ভাষা -

বটতলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর ভাষা। যথাসম্ভব চলতি ভাষা আর আটপৌরে শব্দের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সমসাময়িক মেজাজটাকে ধরতে চেয়েছে বটতলা খুব সহজ সাবলীল ভাবে। যার ফলে নব্য শিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত বৃহত্তর পাঠককূলের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে বটতলা। সাধারণ জনমানসে ভাষার নতুন শব্দ, বাক্যের অর্থ জানার বিরুদ্ধে একটা ভয়, অনীহা কাজ করে। তাই সে ওই ভাষার সাহিত্য বা টেক্সট কে গ্রহণ করে না। যে ভাষা সে বোঝে সে ভাষাতে লিখলে তবেই সেই সাহিত্য জনপ্রিয় হয়। উচ্চবর্গীয় নন্দনতত্ত্ব মান্যকারি প্রকাশকরা এই সরল সত্যকে অস্বীকার করলেন। রচনাকারের জ্ঞানের আধিক্য এবং স্বকীয়তা বজায় রাখতে গিয়ে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর "নববিবি বিলাস" পুস্তকে লিখছেন- "স্ত্রীলোকের কৌমারাবস্থায় পিতা রক্ষক ও যৌবনকালে স্বামী রক্ষক এবং বার্দ্ধক্যে পুত্র রক্ষক অতএব স্ত্রীজাতির স্বাধীনতা কোনকালেই অপ্রসিদ্ধ এমতে যে কাল পর্যন্ত্য পিত্রালয়ে কুমারী বাস করেন তৎকালে পিতার রক্ষনাবেক্ষণে শুক্লপক্ষের শশীর ন্যায় বর্দ্ধিতা হয়েন এবং কৌমারাবস্থায় ইন্দ্রিয় দোষ সম্ভাবনায় অসম্ভাবনা প্রযুক্ত নির্দ্দোষে নির্মল সুশীতল ধবল গঙ্গাজলের ন্যায় পবিত্র চরিত্রের কালযাপন করেন..."। তৎসম শব্দাধিক্যের যতিচিহ্নহীন খটমট এই টেক্সট এর অর্থ সাধারণ অর্ধশিক্ষিত মানুষ কিছুই বুঝতে পারল না। উল্টোদিকে প্যারিমোহন সেন নিজের জ্ঞানগম্মি আভিজাত্যের তোয়াক্কা না করেই বটতলার জন্যে তাঁর ১৬ পাতার 'রাঁড় ভাঁড় মিথ্যাকথা তিন লয়ে কলিকাতা' প্রহসনে লিখলেন- "...ধর্ম্মপথে আর সুখ নেই আজকাল ধর্ম্মপথে থাকলেই যেন দুঃখ এসে অমনি ধরেছে, আমি ক্রমে ক্রমে সাধুর পথে যাব স্থির করেছিলাম, দূর হউক আর সাধুত্বে কাম নাই, সহরের ভাবগতিক দেখে আমার মনে কেমন কেমন করিতেছে। একবার সহরের মজা লুটে দেখিই না কেন"।

সাদামাটা আটপৌরে মানুষের মুখের এই ভাষা স্বাভাবিক ভাবেই সকল পাঠকের মন জয় করল। বিপুল জনপ্রিয়তা পেল বটতলা সাহিত্য।

৪) বটতলার বই-এর মূল্য -

এ ক্ষেত্রেও বটতলা পুরোপুরি সফল। উচ্চ নন্দনতত্ত্ব মান্যকারি প্রকাশকদের বই-এর দেখনদারি নিয়ে বেশ ছুৎমার্গ ছিল। ইংল্যান্ড থেকে পাউণ্ডে হরফ কিনে প্রথম শ্রেণির কাগজে বই ছাপত তারা যাতে এ' পাতায় ছাপার রেশ উল্টোপিঠে না থেকে যায়। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই বই-এর দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের আয়ত্ত্বের বাইরে চলে যেত। বৃহত্তর বাজার ধরতে বটতলা ঠিক এই জায়গাটাতেই সমঝোতা করেছিল। পঞ্চানন কর্মকারের থেকে মাত্র দেড় টাকা প্রতি হরফ কিনে নিজের ছাপাখানার সাজঘর সাজালো বটতলা। তারপর তৃতীয় শ্রেণীর কাগজে বই আর তার থেকেও কম দামী কাগজে মলাট ছেপে বটতলা বই-এর মূল্য অনেকটা কম রাখতে পারল। তাছাড়া এখানকার প্রকাশকদের মধ্যে দাম কম রাখার একটা ঝোঁকও ছিল। সাধারণ মানুষের কোনো সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নেই। দাম কম হওয়ার সুবাদে যে বই এতদিন কিনতে পারত না, কিনতে পারল তারা। তৈরী হল একদল নতুন ক্রেতা। জনপ্রিয় হল বটতলার বই, অর্থকরীভাবেও খুব সফল। বটতলার নিকৃষ্ট গুণমান নিয়ে আর এক প্রস্থ হাসাহাসি করলেন গুণীজনেরা, ছড়া কাটলেন কিন্তু সে সবে তোয়াক্কা না করে বটতলা বই ছেপে লাখ লাখ টাকা মুনাফা করতে লাগল। যা দেখে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমবাবু পর্যন্ত তাঁর 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫ খ্রীঃ) উপন্যাসে বটতলা দেবীর নিকট নিজের লেখনীশক্তির বৃদ্ধি কামনা করেছেন যাতে তিনি প্রভূত অর্থ উপার্জন করতে পারেন।

৫) বটতলার বই-এর বিপণন -

বটতলার বই-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর সহজলভ্যতা। ছাপানো বই ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রকাশক আর লেখকের ঠিকানাই ছিল তখন একমাত্র ভরসা। মূলতঃ উত্তর আর মধ্য কলকাতা জুড়ে ছিল বটতলার বিস্তার। ফলে গ্রাম মফঃস্বলের পাঠকের কাছে সহজে মেলার কথা না কলকাতায় ছাপানো বই। তারও উপায় বের করে ফেলেছিল বটতলার বই ব্যবসায়ীরা। বইওয়ালা-ফেরিওয়ালারা মতো বই বিক্রি করার আইডিয়া বাংলায় প্রথম এসেছিল এই বটতলার হাত ধরেই। অন্যান্য জিনিষের মতো প্রচুর বই ফেরি হতো গ্রাম মফঃস্বলে। ক্রেতা-বিক্রেতা পরিচিত মুখ বলে ধার বাকিও চলত। বাড়ির মা-বৌ, বিধবা পিসি-মাসি, ঝি-চাকর যারা কোনোদিন বই কেনার কথা ভাবেনি তারাও স্বভাবতঃই ক্রেতা হল। সময় সময় ফ্রী-তে আলতা সিঁদুর সুগন্ধী তেল দেওয়ার 'স্কীম' ক্রেতাদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ ছিল। ঘুরে ঘুরে বিক্রির একটা বিরাট দল বটতলার বইকে জনপ্রিয় করার পাশাপাশি এর অর্থনীতির আবর্তে নিজেদের জীবিকার সন্ধান পেয়েছিল। এছাড়াও লক্ষাধিক গরীব মানুষের পকেটের সাশ্রয় করার জন্যে ৬ টাকার বই ২।। (আড়াই) টাকায় বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে বই-এর সেল বাড়ানো হতো।

৬) বটতলার বই-এর বিজ্ঞাপন -

বটতলার বই-এর জনপ্রিয়তার পেছনে বিজ্ঞাপনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রচলিত ধারায় শিষ্ট ভাষায় শিষ্ট বিজ্ঞাপন ছাপা হতো প্রতিষ্ঠিত পত্র-পত্রিকায়। কিন্তু বটতলা এখানেও প্রচলিত ধারার উলটো পথে চলেছিল। সাময়িক পত্রিকাগুলোতে তারা খুব কম বিজ্ঞাপন দিত কারণ তাদের 'টার্গেট রিডার'দের খুব একটা যোগাযোগ ছিল না ওই কাগজের সঙ্গে। ঘরে ঘরে ব্যবহৃত পঞ্জিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা খুব সহজেই পৌঁছে গেল 'মাস' ও 'ক্লাস' উভয়ের কাছে। পাঠক আকর্ষণের জন্যে বিস্তারিতভাবে লেখা হতো বিজ্ঞাপনের বয়ান। বিচিত্র টাইপোগ্রাফিতে নামাঙ্কন এবং প্রয়োজনে ছবিও ব্যবহার হতো। কিছু কিছু নমুনা দিয়ে আমরা দেখব বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও কি সুন্দর স্বকীয়তা সৃষ্টি করেছিল বটতলা।

সেকালের বিখ্যাত ডিটেকটিভ গল্পলেখক পাঁচকড়ি দে-র 'মনোরমা' উপন্যাসের বিজ্ঞাপনে লেখা হল "কামাখ্যাবাসিনী সুন্দরীরা প্রেমোন্মদিনী হইয়া জগতে কি না করিতে পারে। তাহারই ফলে সেই কামিনীর কোমল করে এক রাত্রে পাঁচপাঁচটি নরহত্যা"। যা পছন্দ করবে জনগন তাকে ব্যবহার করে রহস্য উপন্যাস লেখাতেই বটতলার ঝোঁক। পাঁচকড়ি দে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'নীলবসনা সুন্দরী'তে আবারও মহিলা তাস ব্যবহার করলেন। 'পরিমল' নামের এক উপন্যাসের বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছে - "নারীর রূপতৃষ্ণা এবং বিষয় লালসায় মানব কিরূপ দানব হইয়া উঠে" - সঙ্গে ছাপা হয়েছে একটি ছবি যেখানে দু' দুটি খুনের পর এক মহিলাকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালাচ্ছে দুই পুরুষ। নারীকে কেন্দ্র করে তখনকার আপামর পাঠকের অজানা রহস্যের অমোঘ টানে বারবার তৈরী হয়েছে বটতলার কনটেন্ট।

নারীর প্রতি পুরুষের অনিবার্য টান - এই ব্যাপারটা বটতলার বিজ্ঞাপনে বারবার এসেছে অকপট ঘোমটাহীন স্পষ্টবাক হয়ে। 'উদাসিনী রাজকন্যার গুপ্তকথা' বই-এর বিজ্ঞাপনে লেখা হল - "বড় ঘরের বড় কথা, যুবতী সুন্দরীর গুপ্ত প্রণয়, কুলটা ও বিধবার অভিসার"। সামাজিক অনুশাসনের ধার না ধেরে, উচিত অনুচিতের অভিভাবকত্ব না করে বটতলা সাহিত্য শুধুমাত্র গল্পটা বলে গেল পাঠককে। এখন পাঠকই ঠিক করুক সে দুধটুকু নেবে নাকি জল খেয়ে পেট ফোলাবে।

ঔপনিবেশিক ভার বহনের দায় না নিলেও বটতলা কিন্তু সে কাজও করেছে। তাই তো 'সরল ইংরাজী শিক্ষা' বই-এর বিজ্ঞাপন ভাষা - "এখন ইংরাজি ভিন্ন গতি নাই" কিম্বা 'ইংলিস টিচার' বইতে প্রকাশক বিজ্ঞাপন করছে - "এই পুস্তক দ্বারা অতি অল্পদিনে ইংরাজিতে কথাবার্তা বলা, চিঠিপত্র লেখা প্রভৃতি সমুদয় বিষয় সুন্দররূপে শিক্ষা করিতে পারা যায়"। এই বিজ্ঞাপনগুলো থেকে আমরা একটা ঔপনিবেশিক আইডেনটিটি দেখতে পাই। আর এই ঔপনিবেশিক সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ বটতলা যেমন বিজ্ঞাপন দিয়েছে নারীর গুপ্তকথা এমনকি বিদেশী সেক্সগাইড বিষয়ক বই-এর, তেমনি 'প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তমা', 'সতী সাধ্বী অন্য নাম রমণী তোমার', 'গৃহস্থ জীবন' বই-এর বিজ্ঞাপনে পুরুষকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে লিখেছে - "এই বই নিজে পড়ুন এবং স্ত্রীকে পড়ান"। এভাবেই একটা বহুমুখী মিশ্র দ্বন্দ্বকে ধরতে চেয়েছে বটতলা সাহিত্য।

সর্বশেষ বটতলার চটিবই নিয়ে বেশি বাক্যব্যয় না করে এটুকুই বলতে পারি শুধুমাত্র মূল্য কমানোর জন্যে বেশির ভাগ বটতলার বই ছাপা হতো ১৬ থেকে ২৪ পাতার মধ্যে। রদ্দি মার্কা কাগজে সস্তার রঙীন প্রচ্ছদে। তাদের এই ক্ষীন কলেবরের জন্যেই এই বইগুলোকে বলা হতো 'চটিবই'। এর সঙ্গে যৌনতার বা অশ্লীলতার কোনো সম্পর্কই ছিল না। অথচ ভাগ্যের এমনই পরিহাস আজকের দিনে এই 'চটি' শব্দটিই যেন ব্রাত্য করে দিয়েছে প্রায় একশো বছর ধরে বাংলার আপামর পাঠককে পাঠে মগ্ন করে রাখা প্যারালাল পপুলার এই বটতলা সাহিত্যকে।