বিবিধ

খাল-বিলের আখ্যান (দ্বিতীয় খণ্ড - ষষ্ঠ পর্ব) [ধারাবাহিক]



মমতা বিশ্বাস


চন্দ্রনাথবাবু করোনা অতিমারির সময় থেকে নিজেকে গোটাতে থাকেন। পরিচিত মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বললেই চলে। কেউ কখনও আসলে, মেজাজ ভালো থাকলে অনেক কথা বলেন; নয়তো দায়সারা গোছের দুই একটা কথা বলে নিজের ঘরে ঢুকে যান। শুধু বড়ো নাতিকে পড়ানোর উৎসাহে ভাঁটা পড়েনি। একমাত্র সঙ্গী, সে। এই দুই অসমবয়সী বালক ও বৃদ্ধের গল্প চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। চন্দ্রনাথ তাঁর শৈশব থেকে শুরু করে গ্রাম ছেড়ে আসার গল্প শোনান, নাতিকে। দেড় বছর বয়সে মাকে হারিয়ে ছিলেন। মায়ের মুখ কেমন ছিল, মনে নেই। দিদিমা বুকে তুলে নিয়েছিলেন। আর তাঁর মেজদাদা - তাঁকে দেখভালের জন্য দুইবছর স্কুল ছুট হয়েছিলেন। দিদিমা, মেজনাতিকে বলেছিলেন, "মেজোখোকা, তুই স্কুলে গেলে আমি একা সবদিক সামলাতে পারব না। বড় দাদার বইগুলো বাড়িতে পড়িস। মাছ, শাক সেসব তো মাঠঘাট থেকে গুছিয়ে আনতে হবে! এতগুলো মানুষ। চলবে কী করে?"

"মাতৃহারা পাঁচ নাতি-নাতনিকে নিয়ে তিনি পেরে উঠতেন না। আমাকে সামলাতে গিয়ে আর দিদিমাকে সংসারের বিভিন্ন কাজে সাহায্য করতে গিয়ে দুইবছর পিছিয়ে পড়েছিলেন, মেজদাদা। সময় পেলেই বড় দাদার বই নিয়ে পড়তেন।"

এসব কথা বলতে বলতে অন্যমনস্কভাবে ভাবতেন রাজনীতিতে নিজের ভাবমূর্তির বজায় রাখার দোহায় দিয়ে মেজদাদার প্রতি সুবিচার করেননি, তিনি। শৈশবে মেজদাদা তাঁকে যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, তিনি তো পারেননি দাদার অভাবী সংসারের সহায়ক হতে। নীতি-আদর্শের বড়ো বড়ো বুলি আওড়ে - স্কুলে সংস্কৃতের ভ্যাকান্সিতে বড় ভাইপোকে ঢুকিয়ে দিতে, কেন পারলেন না? ক্ষমতা তো ছিল। এবিটিএ-র আঞ্চলিক কমিটির সেক্রেটারি হয়েও। নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে সেই আদর্শ-নীতি কর্পূরের মতো উবে গেল! অপত্য স্নেহ ! ভয়ঙ্কর জিনিশ। অনুশোচনা হয় ! আক্ষেপের আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যান। এসব কথা কাউকে বলতে পারেন না। আর বলা যায় না বলেই, হয়তো এত রাগ হয়। অন্য দাদা দিদিদের উপর শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা এতটুকু কমতি ছিল না; কিন্তু মেজদাদা আর মেজবউদি - তাঁদের স্থান আরও উচ্চে ! মায়ের অভাব পূরণ করেছেন দিদিমা আর মেজবউদি।। মেজদাদার ধরে আনা কলমা বিলের বান, বাছা, মাগুর,জিয়োল মাছের ঝোল মেজবউদি সবসময় তাঁর জন্য তুলে রাখতেন, স্নান করিয়ে দিয়েছেন, গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন। দিদিমার মুখে শুনেছেন রামায়ণ, মহাভারতের গল্প, তাঁর মায়ের গল্প, কলমা বিলের গল্প।

দাদুকে অন্যমনস্কভাবে চুপ করে থাকতে দেখে আর্য বলে উঠে দাদু আজ কী পড়াবে?"

তিনি বলে উঠেন, "আজ আর অঙ্ক নয়; ব্যাকরণ নিয়ে আলোচনা করব। খাতাটা এগিয়ে দে।"

যদিও আলোচনাটা ব্যাকরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না আর্য ভালোভাবেই জানে। খাতা কলম এগিয়ে দেয়।

"বুঝলি, প্রত্যেকটা শব্দের একটা মূল বা রুট আছে। শব্দ তৈরির কৌশল বিভিন্ন রকমের; যেমন প্রত্যয়জাত শব্দ, সমাসবদ্ধ শব্দ, সন্ধিবদ্ধ শব্দ। কৃষ্ণনগর শব্দটাকে কেউ কেউ কেষ্টনগর বলেন। কৃষ্ণ তৎসম শব্দ, সেটা পরিবর্তিত হয়ে কেষ্ট হয়েছে। কেষ্টর সঙ্গে নগর যুক্ত হয়ে কেষ্টনগর হল; শব্দটি মিশ্র শব্দ। আবার দেখ আমাদের গ্রামের নাম ম্যাচপোঁতা। ম্যাচপোঁতা শব্দটা অতৎসম শব্দ। আমাদের মাতৃভাষার শব্দভাণ্ডার খুবই সমৃদ্ধ, বুঝলি। দেশি, তৎসম, তদ্ভব, অর্ধ্বতৎসম, অর্ধ্বতদ্ভব, প্রাদেশিক শব্দ, বিদেশী ও মিশ্রশব্দ, মুণ্ডমান শব্দের বিশাল ভাণ্ডার। ইতর শব্দও আছে। সবকিছুর নামের পিছনে ইতিহাস থাকে। মাঝপোতা থেকে মেঝপোতা তারপর পরিবর্তিত হয়ে ম্যাচপোঁতা হয়েছে।

আসলে কলমা হল জলঙ্গীর পরিত্যাক্ত নদীখাত। কলমা বিলে চর জেগে উঠলে ঘোষেরা গরু-মোষ চরাতে এসে বাথান বানিয়ে থেকে যায়। ধীরে ধীরে চাষবাস শুরু করে। বিলের জেগে ওঠা চরের মাঝে বাঁশ খুঁটিপুঁতে বাথান ও বাসস্থান গড়ে তুলেছিল; তাই মাঝপোতা। কী অদ্ভুদ মনে হচ্ছে তাই না। কলমার তীরে আর একটা গ্রামের নাম ধাপাড়িয়া। ঐ যে যেখানে ভাদ্র সংক্রান্তিতে নৌকাবাইচ হয়। গতবছর ঠাকুরমার সঙ্গে গেলি না? আগেকার দিনে গ্রামের বাড়ি ঘর ছিল খড় দিয়ে চাওয়া ঘরের চালের সঙ্গে চাল লাগানো। পল-বিচুলি বা পাটকাঠির গাদায় আগুন লাগলে দপদপিয়ে পাড়া জ্বলে উঠত। দপদপিয়ে থেকে ধড়ফড়িয়ে; রূপান্তরিত হয়ে ধাপাড়িয়া হয়েছে। এই সব ব্যাখ্যা আমি শুনেছি আমার শিবপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে। তিনি পণ্ডিত মানুষ। সংস্কৃত ভাষা আর বাংলা ভাষার উপর অসম্ভব দখল ছিল। তিনি রবীন্দ্র সাহিত্যের ভাষা নিয়ে গবেষণা করেন। আঞ্চলিক শব্দ সংগ্রহ করতেন। বই আছে স্যারের। কলেজ, বিশ্বভারতীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে সারাজীবন নিজের গ্রামের স্কুলে চাকরি করে গেলেন। এমন মানুষ এখন আর মেলে না। এযুগের মানুষের কাছে পাগল বলে সাব্যস্ত হবে। এখন মানুষ পদ, ক্ষমতার পিছনে ছুটছে আর ছুটছে। গ্রাম্যজীবন কত সহজ ছিল। ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য শহরমুখি হতে চাইত না। আনন্দ- স্ফূর্তি ছিল জীবনে। আমার বাবাও খুব রসিক ছিলেন। একবার কী হয়েছিল বুঝলি খোকন, তখনকার সময়ে আমাদের ম্যাচপোঁতা থেকে বেথুয়ার তালগাছের সারি দেখা যেত। মাঝে কোনো বসতি ছিল না। কলমা বিলের বিস্তার ছিল রাধানগর, পাটিকাবাড়ি পর্যন্ত। নৌকায় যাতায়াত। বাবা, বিশেষ কোনো কাজে নৌকায় করে পাটিকাবাড়ি যাচ্ছিলেন। নৌকা বোঝায় যাত্রীদের মধ্যে এক নববধূ ছিলেন। আলতা রাঙানো পা। অপর প্রান্তে বসে আছেন দারোগা। দারোগাকে অপ্রস্তুতে ফেলার সুযোগ পেয়ে গেছেন; তা কি আর ছাড়েন। নববধূকে বলেন, "মা জননী, নৌকার খোলে জল, ওখানে পা রাখলে ধুয়ে যাবে। তোমার চরণ দুটি দারোগার মুখে রাখো। দারোগা এই কথা শোনার পর রাগে কটমট করে তাকাচ্ছে, বাবার দিকে। তিনি তো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন সে রসিকতা। নৌকাযাত্রীরা একবার আমার বাবার দিকে তাকাচ্ছে,আর একবার দারোগার মুখের দিকে। খুশি আর অখুশির আলো-ছায়া, যাত্রী-যাত্রিনীদের মুখের উপর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যারা বুঝেছিলেন ব্যাপারটা, খুব কষ্ট করে হাসি চেপে রেখেছেন। বাবা নৌকা থেকে নামার সময় দারোগাবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, "আপনার মুখে নয়, নৌকার বিশেষ একটি অংশে মা লক্ষ্মীকে চরণ রাখতে বলেছিলাম। আপনার বোধ হয় জানা নেই, নৌকারও দারোগা আছে,দারোগাবাবু!"

"আচ্ছা দাদু, বইয়ের আলমারিতে তোমার বাবার লেখা একটা বই আছে না?"

"হ্যাঁ - 'ভক্তি গীতাঞ্জলি'। গান বাঁধতেন। কিছু ভক্তিমূলক গানের বই। বড়দাদা ছাপিয়েছিলেন। বউমা, নাতি-নাতনিদের দিয়ে লিখিয়ে নিতেন। শৈশবে বাবা-মা'কে হারিয়ে মাতুলালয়ে মানুষ হন। ম্যাচপোঁতা বাবার মামাবাড়ি। পাঠশালায় পড়ার সুযোগ হয়নি। প্রথাগত বিদ্যালাভে বঞ্চিত ছিলেন। নৈশ্য বিদ্যালয়ে কিছুটা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ঐ পুঁজি সম্বল করে রামায়ণ, মহাভারত, শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত এবং আরও বিভিন্ন ভক্তিমূলক গ্রন্থ অনুশীলন করেন। শাস্ত্রালোচনার বিভিন্ন আসরে পাঠ ও ব্যাখ্যা করতেন। শতবর্ষের দোর গোড়ায় দাঁড়ানো মানুষটির স্মৃতিশক্তি অটুট ছিল। বার্ধ্যেকের খেয়ালে ভক্তিগীতি রচনা করেছেন। কলমার তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ নিয়ে গান বেঁধেছেন। ধাপাড়িয়ার বসন আলির সঙ্গে খুব ভাব-ভালোবাসা ছিল। বসন আলির বাঁধা গান নৌকা বাইচের সময় আমরা গাইতাম।

একবার গ্রামের জোতদার বড়ো পুকুর জোর করে দখল করে নিলে গান বাঁধলেন,

"ঐ যে বিপ্রদাসের দক্ষিণ পাশে গর্ত যে আছে,
মাঝখানে এক চামচে বলে আমার হয়েছে - আল্লা... ও...ও...ও। আল্লা... ও...ও...ও।"

ঐ এককলিই মনে আছে। আর মনে নেই।

৫৭ বঙ্গাব্দে বড়ো বন্যা হয়। মানুষের দূর্গতির অন্ত ছিল না। সেই দূর্যোগ নিয়ে বাঁধা গান সকল গ্রামবাসির অন্তর নিংড়ানো দুঃখ-দুর্দশার প্রকাশ -

'সাতান্ন সালে,এই বন্যার জলে
এবার চাষি পেলে বড়ো দুঃখ।'

গানটি গ্রামবাসীদের মুখে মুখে ঘুরত। আজ এই পর্যন্ত থাক, খোকন। এই যে খোকন শব্দটা কীভাবে গঠিত হল? খোকা থেকে খোকন; অর্থাৎ অন্তে ব্যঞ্জনাগম ঘটেছে। খোকা হল দেশি শব্দ।"

"দাদু, আজ থাক। তোমার স্নানের বেলা হয়ে গেছে। আগামী দিনে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিও।"

(ক্রমশ)