আমেরিকায় জাদুবিদ্যা (১৭৩৪-১৮৭৫)
"সম্পূর্ণ সান্ধ্যকালীন প্রদর্শনীর স্বর্ণযুগ"

হ্যারি ব্ল্যাকস্টোন (১৮৮৫-১৯৬৫)
আরেকজন জনপ্রিয় আমেরিকান জাদুকর ছিলেন হ্যারি ব্ল্যাকস্টোন, যিনি থার্সটন ও দান্তের প্রতিযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ব্ল্যাকস্টোন একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রীও ছিলেন এবং শিকাগোর ম্যাজিক ডিলার অগাস্ট রোটারবার্গ-এর জন্য ট্রিক বক্স তৈরি করতেন। তাঁর আসল নাম ছিল হেনরি বাউটন এবং তিনি ১৮৮৫ সালে শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন।

হ্যারি ব্ল্যাকস্টোন (জুনিয়র) [১৯৩৪-১৯৯৭]
তিনি মঞ্চে তাঁর ভাই পিটার-এর সঙ্গে কমেডি ম্যাজিক শো করতেন, যেটি পরে একটি পূর্ণাঙ্গ সান্ধ্যকালীন জাদু প্রদর্শনীতে রূপ নেয়। হ্যারি মঞ্চে পারফর্ম করতেন আর পিটার বিভ্রম তৈরি করতেন। ১৯২০-র দশক নাগাদ তাঁদের দলে প্রায় ডজনখানেক কর্মী ছিল।

হ্যারি ব্ল্যাকস্টোন (জুনিয়র)-এর জাদু প্রদর্শনীর প্রচারচিত্র।
ব্ল্যাকস্টোন তাঁর শো-গুলোতে একটি স্বতঃস্ফূর্ত, মজার পরিবেশ রাখতেন - অনেক সুন্দরী সহকারী এবং দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সহযোগে।
১৯২৬ সালে ব্ল্যাকস্টোন মিশিগানের স্টারজিয়ন লেকের কলোন শহরে অ্যাঞ্জেল আইল্যান্ডে একটি খামারবাড়ি কেনেন। সেখানে তিনি গ্রীষ্মকালীন প্রস্তুতির জন্য একটি নিরিবিলি জায়গা পান। তিনি তাঁর পুরো টিম, সরঞ্জাম, পশুপাখি নিয়ে সেখানে গ্রীষ্মকাল কাটাতেন।
নতুন বিভ্রম অনুশীলন করা হতো, মঞ্চের দৃশ্যপট রাঙানো হতো, পশুদের যত্ন নেওয়া হতো - এভাবেই ব্ল্যাকস্টোন পুরো গ্রীষ্মকাল কাটাতেন।
ব্ল্যাকস্টোন কলোন শহরে অনেক বন্ধু তৈরি করেছিলেন এবং এই গ্রামই ছিল তাঁর বাসস্থান ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত। এরপর তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান। কলোন শহরের একটি প্রধান সড়ক এখন তাঁর নামেই পরিচিত।
অস্ট্রেলিয়ার জাদুকর পার্সি অ্যাবট, যিনি কলোনে 'Abbott's Magic Manufacturing Company' প্রতিষ্ঠা করেন, তিনিই প্রথম ১৯২৭ সালের গ্রীষ্মে ব্ল্যাকস্টোনের অতিথি হয়ে সেখানে আসেন।
ব্ল্যাকস্টোনের শো বহু বছর ধরে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে অন্যতম আকর্ষণ ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি ফিল্ম ও রেডিওতেও উপস্থিত হন। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় কাটান এবং ১৯৬৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্ল্যাকস্টোনের শিল্পকর্ম ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র হ্যারি ব্ল্যাকস্টোন (জুনিয়র), যিনি এক উদ্যমী তরুণ জাদুকর। তিনি তাঁর পিতার বিখ্যাত 'ভ্যানিশিং বার্ডকেজ' সহ আরও অনেক নতুন এবং পুরোনো কৌশল পরিবেশন করেন, একই রকম উদ্দীপনা ও দক্ষতার সঙ্গে দর্শকদের সম্পৃক্ত করেন।
তিনি অ্যাবট কোম্পানির গ্রীষ্মকালীন জমায়েত (Get-together)-এ খুবই জনপ্রিয়, পাশাপাশি স্টেজে, নাইটক্লাবে এবং টেলিভিশনেও সারাবছরই পারফর্ম করেন।

আরেকজন বিখ্যাত বিভ্রম জাদুকর হলেন দ্য গ্রেট লেভান্তে (আসল নাম লেসলি জর্জ কোল), অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯২ সালে।
তরুণ বয়সে লেভান্তে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড জুড়ে ভ্রমণ করেছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি এক বিশাল সফরে বের হন। পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন পূর্ব থেকে পশ্চিমে এবং এসে থেমেছেন ইংল্যান্ডে। লেভান্তে একজন দক্ষ ইল্যুশনিস্ট এবং তাঁর শো-তে 'হিউম্যান প্রজেকটাইল'-এর মতো কৌশল প্রদর্শিত হয়েছে, যেখানে একটি বড় কামানের গোলা, যার ভেতরে একজন মেয়ে ছিল, মনে হয়েছিল কঠিন ধাতব পাত ভেদ করে ছুটে গেছে। তিনি 'সাবস্টিটিউশন ট্রাঙ্ক' এবং 'চাইনিজ থাম্ব টাই' কৌশলেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।
একটি স্মরণীয় ঘটনা, ১৯৩৯ সালে লেভান্তে একদল ব্রিটিশ জাদুকরের সঙ্গে আমেরিকায় যান 'ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অব ম্যাজিশিয়ানস'-এর কনভেনশনে অংশ নিতে, যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ক্যালামাজু, মিশিগানে। তাঁদের ভ্রমণ আয়োজন করেছিলেন লেভান্তের প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাবট। ব্রিটিশ জাদুকররা কনভেনশনে একটি স্মরণীয় শো করেন এবং পরে নিউ ইয়র্কে তা পুনরায় পরিবেশন করেন।

জন ক্যালভার্ট (১৯১১-২০১৩)
যদিও অনেক বিখ্যাত ইল্যুশনিস্টই বিশ্বভ্রমণ করেছেন, তবে খুব কম জনই ক্যালভার্টের রেকর্ড ছুঁতে পেরেছেন। ক্যালভার্ট, ১৯১১ সালে ইন্ডিয়ানার এক হুজিয়ার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং লেভান্তে, দূর প্রাচ্য এবং ইউরোপে যেমন পরিচিত, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রেও। চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি একজন জাদুকর ও সিনেমা তারকা হিসেবে পাঁচটি মহাদেশে অসাধারণ কেরিয়ার গড়েছেন।
ক্যালভার্ট প্রাণবন্ত, রঙিন শো উপস্থাপন করেন, যেখানে থাকে অনেক ইলিউশন ও সুন্দরী মেয়েরা। তিনি এমন সব নতুন ও অভিনব পদ্ধতিতে কৌশল দেখান, যা পরিচিত হলেও ভিন্ন স্বাদ এনে দেয়। তিনি হাতসাফাইয়েও অত্যন্ত দক্ষ। ক্যালভার্ট সম্ভবত একমাত্র জাদুকর, যিনি হাতা গুটিয়ে মুদ্রা লুকোন এবং বলা হয়, তিনি ৬ ফুট উঁচু দেওয়ালের পিছন দিকে লাফিয়ে উঠতে পারেন এবং আঙুলের জোরে ইঁট ভাঙতে পারেন।
তাঁর ভ্রমণজীবনে ক্যালভার্ট বহু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি একবার, নিজের বিমান উড়িয়ে ন্যাশভিল যাওয়ার পথে, গ্রাউন্ড লাইট দেখে বিভ্রান্ত হয়ে একটি খামারে দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনায় তাঁর কয়েকজন সহকারী আহত হন এবং ক্যালভার্টৈর নিজেরও পা ভেঙে যায়। তবুও তিনি পরের দিন প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে ন্যাশভিলে শো করেছেন, ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায়।

জন ক্যালভার্ট-এর জাদু প্রদর্শনীর প্রচারচিত্র।
আরেকবার, জাপানে শো নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর ইয়ট এক টাইফুনে প্রায় ডুবে যায়। আবার আরেক ইয়ট চীনা সাগরে ধ্বংস হয়, আর উত্তর অস্ট্রেলিয়ার কাছে ডুবে যায় একটি ডুবে থাকা পাথরে ধাক্কা লেগে। জন ক্যালভার্টের জীবনের সত্য কাহিনী, যা জাদু ও রোমাঞ্চের মিলন, যেন আরব্য রজনীর গল্প।
১৯২৯ সালের মহামন্দা, নাট্য প্রযোজনার ক্রমবর্ধমান খরচ, টকিজ সিনেমা এবং টেলিভিশনের আগমন - এসবই তাঁকে ক্রমাগত পতনের দিকে নিয়ে যায় এবং অবশেষে 'গোল্ডেন এজ'-এর পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সান্ধ্যকালীন জাদু শো কার্যত বিলীন হয়ে যায়। প্রায় পঁচাত্তর বছর ধরে এই চমৎকার শো-গুলো, তাদের সুন্দর পোশাক, মুগ্ধকর সেট, মোহনীয় সহকারী এবং সুদর্শন শিল্পী - সব মিলিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য এনে দিত সত্যিই জাদুময় এক পৃথিবী। যাঁরা এগুলো তৈরি করতেন, তাঁদের অসাধারণ মেধা, কল্পনা ও নিষ্ঠা ছিল। তাঁরা ছিলেন প্রকৃতই প্রতিভাবান, সৃজনশীল ও দর্শকদের প্রিয়।
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
