
ভারতের অন্যতম প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত। এই মহাগ্রন্থে ধর্ম, ভাগ্য, প্রতিশোধ, রাজনীতি, চক্রান্ত সবকিছুর সমাহার ঘটেছে। বিভিন্ন কাহিনী, নানাবিধ চরিত্র এই মহাকাব্যকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। শিখণ্ডী এই মহাকাব্যিক চরিত্রের মধ্যে এক অনন্য সাধারণ উপস্থাপনা। শিখণ্ডী এবং কুরুবীর ভীষ্ম আশ্চর্যজনক ভাবে নিয়তির কবলে জড়িয়ে আছেন।
শিখণ্ডীর কাহিনী শুরু হয় অম্বা নামে এক রাজকন্যার জীবন থেকে। কাশীরাজের জ্যেষ্ঠ কন্যা অম্বা। তার আরও দুই বোন অম্বিকা ও অম্বালিকা। তিনটি কন্যাই রূপবতী ও মর্যাদাময়ী। কাশীরাজ তাঁর কন্যাদের জন্য স্বয়ংবর সভার আয়োজন করেন। ভীষ্ম ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের বিবাহ দেওয়ার জন্য এই স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত হন। বলপূর্বক ভীষ্ম এই তিন কন্যাকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন।
ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চল এখন যাকে আলওয়ার বলা হয়, তখন তার নাম ছিল সৌভদেশ। শাল্ব সেই দেশের পরাক্রান্ত রাজা। অম্বা শাল্ব রাজার প্রণয়িনী ছিলেন। কাশীরাজও এই প্রণয়ে আপত্তি করেন নি। স্থির হয়েছিল স্বয়ংবর সভাতে অম্বা শাল্বরাজকে মাল্যদান করবেন। ভীষ্ম আসার ফলে এই সমস্ত পরিকল্পনা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। শাল্বরাজা ভীষ্মকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। ক্ষুব্ধ, অপমানিত শাল্বরাজা নিজের রাজ্যে ফিরে গেলেন।
হস্তিনাপুরে এসে অম্বা ভীষ্মকে জানালেন তিনি সৌভরাজ শাল্বের সঙ্গে প্রণয়ে আবদ্ধ। ভীষ্ম সেই মুহূর্তে অম্বাকে সৌভদেশে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু শাল্বরাজ অম্বাকে প্রত্যাখ্যান করেন। মহাভারতে আছে - সাপ যেমন পুরোনো খোলস ছেড়ে ফেলে, অম্বাকে সেইভাবে ত্যাগ করলেন শাল্বরাজ। ভীষ্মের অপহরণ ও শাল্বর প্রত্যাখ্যান অম্বাকে লাঞ্ছিত ও ক্রুদ্ধ করে তোলে। যে ভীষ্মকে নিয়ে অম্বার কোনও চিন্তা ছিল না, কোনও সম্পর্ক ছিল না, সেই ভীষ্মের কারণে তাঁর এই অবমাননা। ফলে ভীষ্মের ক্ষতি করাই অম্বার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ালো। যদিও ভীষ্ম অম্বার কোনও ক্ষতি করেননি, এবং শাল্বরাজের কাছে অম্বাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন, কিন্তু অম্বার মনে হলো তাঁর জীবনের বিপর্যয় ভীষ্মর জন্যই হয়েছে। তাঁর সমস্ত দুঃখের জন্য ভীষ্মই দায়ী। অতএব প্রতিশোধ যদি কারও ওপর নিতে হয়, তো ভীষ্মের ওপরেই তা নিতে হবে।
অম্বা পিত্রালয়ে ফিরলেন না। নগরীর সীমা পেরিয়ে গভীর বনের প্রান্তে আরণ্যক ঋষি মুনিদের আশ্রমে গেলেন। অম্বাকে তাঁরা রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু অম্বাকে আশ্রয় দিয়ে আশ্রম জীবনে উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি করতে চাইলেন না। অম্বা বুঝেছিলেন কোনও ক্ষত্রিয়রাজা অম্বাকে সমর্থন করে ভীষ্মের বিরাগভাজন হতে চাইবেন না। এই আপৎকালে আশ্রমে উপস্থিত হলেন রাজর্ষি হোত্রবাহন। তিনি রাজাও বটে আবার ঋষিপুরুষও। তিনি পরশুরামের মিত্র এবং অম্বার মাতামহ। হোত্রবাহন অম্বাকে পরশুরামের কাছে পাঠালেন। পরশুরাম ভীষ্মকে জানালেন অম্বার বর্তমান অসম্মানের জন্য ভীষ্মই দায়ী। কিন্তু ভীষ্ম বিনীতভাবে পরশুরামকে তাঁর কথার অযৌক্তিকতা বুঝিয়ে দিলেন। ফলে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হল। পরশুরাম ভীষ্মের কাছে প্রতিহত হলেন। তখন পরশুরাম অম্বাকে পরামর্শ দিলেন ভীষ্মের শরণাপন্ন হতে।
অম্বা ভীষ্মের কাছে গেলেন না। বরং ভীষ্ম বধের প্রতিজ্ঞা নিয়ে অম্বা বনে তপস্যা করতে চলে গেলেন। কারণ যাঁকে মারতে চান তাঁর কাছেই পরশুরাম ফিরে যেতে বলেছেন - এটা মেনে নেওয়া অম্বার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই পর্যায়ের বর্ণনা মহাভারতে ব্যাসদেব খুব নিস্পৃহভাবেই দু-এক ছত্রে শেষ করেছেন এই বলে যে অম্বার সব খবর ভীষ্ম রাখতেন এবং ভীষ্ম কেমন করে যেন বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর মৃত্যু অম্বার কারণেই হবে। আর ভীষ্মও বুঝি অম্বার হাতেই মরতে চান। ভীষ্ম এবং অম্বার এই পারস্পরিক মনস্তত্ত্ব গভীর অনুসন্ধানের বিষয়।
কালক্রমে অম্বার তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে রাজা দ্রুপদের ঘরে জন্মানোর আশীর্বাদ করেন। তবে কন্যা লাভ করলেও দ্রুপদ নবজাতককে ছেলে বলে প্রচার করেছিলেন। দ্রুপদের ঘরে এই শিশু শিখণ্ডী নামে পরিচিত হল এবং উপযুক্ত বয়স হলে ভ্রাতা ধৃষ্টদ্যুম্নের সঙ্গে সেও দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা শুরু করল। গুপ্তচরদের মাধ্যমে ভীষ্ম জানতেন শিখণ্ডী আসলে অম্বা। যে পুত্রবেশ ধারণ করে রয়েছে। সব জেনেও ভীষ্ম শিখণ্ডীর অস্ত্রশিক্ষায় কখনও বাধা দেননি। বরং ভীষ্ম অপেক্ষা করতে থাকেন মৃত্যুর মাহেন্দ্রক্ষণের। এরই সঙ্গে চলতে থাকে হস্তিনাপুরের জটিল রাজনীতি ও কূটনীতি।
অষ্টাদশ পর্ব অর্থাৎ মহাভারতের অন্তিম পর্বে শুরু হল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ। ভাইয়ে ভাইয়ে জমির লড়াই। ভীষ্ম কুরু-সেনাপতি। তিনি অজেয় এবং অমর। অর্জুন তাঁকে পরাস্ত করতে অক্ষম। এই যুদ্ধ ভীষ্মকে বিষণ্ণ ও ক্লান্ত করেছে। ভীষ্মের মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়েছে। এবার তিনি বিশ্রাম চান। মৃত্যুদেবতাকে এবার তিনি আহ্বান করতে চাইছেন। তাই শিখণ্ডীর কথা ভীষ্মের মনে পড়ল। শিখণ্ডী তো এই যুদ্ধে পুরুষবেশে পাণ্ডবপক্ষে উপস্থিত। ভীষ্ম জানেন তিনি কোনওভাবেই পাণ্ডবদের বধ করবেন না। অন্যদিকে শিখণ্ডী-নাম্নী তপস্বিনী অম্বার ঋণও তাঁকে শোধ করতে হবে। ভীষ্ম তাঁর মৃত্যুবাসরের শেষশয্যা তাই গ্রহণ করতে চান শিখণ্ডীর তপস্যার বাণ সর্ব অঙ্গে ধারণ করে।
অর্জুনকে ভীষ্ম গোপনে খবর পাঠালেন।। জানালেন শিখণ্ডী যদি যুদ্ধক্ষেত্রে থাকেন, তবে তিনি বাণ ছুঁড়বেন না। কারণ পুরুষের বেশধারী নারীকে তিনি অস্ত্রাঘাতে জর্জরিত করবেন না - এটা তাঁর নীতিবিরুদ্ধ।
অর্জুন শিখণ্ডীকে সামনে রেখে কুরুবৃদ্ধ পিতামহকে শরবিদ্ধ করলেন। যুদ্ধক্ষেত্র অর্জুনের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হল। দিনান্তের গভীর অন্ধকারে শিখণ্ডী তাঁর সমস্ত পুরুষসত্তা বিসর্জন দিয়ে ক্রন্দনমুখী রমণীরূপে নিঃশব্দে ভীষ্মের চরণপ্রান্তে উপস্থিত হলেন। প্রতিশোধ শেষে শিখণ্ডীর হৃদয়ে এখন শুধু শূণ্যতার হাহাকার। চন্দ্রালোকে ক্রন্দনরতা শিখণ্ডীকে দেখে ভীষ্ম মৃদু হাসলেন। শিখণ্ডীর মনে হলো বিস্তীর্ণ চরাচরে তাঁর সামনে পড়ে রয়েছে এক নিষ্ফল জীবন। কি অর্থহীন এই বেঁচে থাকা।
