
কপিলদেবের অপরাজিত ১৭৫ রান ৪২ বছর পেরোল গত ১৮ জুন, ২০২৫ তারিখে।
৪২ বছর আগের ঐতিহাসিক ম্যাচের স্মৃতিচারণ আজ। তারিখটা ছিল ১৮ জুন ১৯৮৩, স্থান টানব্রিজ ওয়েলসের নেভিল গ্রাউন্ড। ওই ম্যাচটা মনে করে ইতিহাস এখনও মুচকি হেসে ওঠে নিজের মনে, ৪২ বছর পরেও।
ভারত বনাম জিম্বাবোয়ে সেদিনের ম্যাচটি ছিল ১৯৮৩ বিশ্বকাপে গ্রুপ বি-তে ভারতের ৫ম ম্যাচ। আগের ৪টি ম্যাচের মধ্যে ২টিতে জিতে (১ম পর্বে ওঃ ইন্ডিজ আর জিম্বাবোয়ে) ও দুটিতে হেরে (১ম পর্বে অস্ট্রেলিয়া ও ফিরতি ম্যাচে ওঃ ইন্ডিজ) ৮ পয়েন্টে দাঁড়ানো ভারতকে সেমিফাইনালে যেতে হলে বাকি ২টি ম্যাচে (ফিরতি ম্যাচে জিম্বাবোয়ে ও অস্ট্রেলিয়া) জিততেই হতো। অন্যথায় বিদায় ছিল অনিবার্য। এই পশ্চাৎপটে ভারত-জিম্বাবোয়ে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক শনিবার, ১৯৮৩ সালের ১৮ জুন তারিখে।
তার অনেক বছর পরে সুনীল গাভাসকার নামে ভারতের হয়ে “কিছুটা ক্রিকেট খেলা ও বোঝা” এক ভদ্রলোক সেদিন খেলা একটি ইনিংস নিয়ে বলেছিলেন, "এর চেয়ে উত্তেজক, দায়িত্বশীল এবং রোমাঞ্চকর একদিন-এর ইনিংস আমি কখনও দেখিনি", যে ইনিংসকে 'উইজডেন' মেনে নিয়েছিল সর্বকালের সেরা পাঁচ ওডিআই ইনিংসের অন্যতম হিসাবে। দুঃখের বিষয়, সেদিনের ওই অলৌকিক ইনিংস কোনও ভিডিওতে ধরা নেই। এমনকি, টানব্রিজ ওয়েলসের নেভিল গ্রাউন্ডের সাজঘরে ওই অলৌকিক ইনিংসের কোন স্থিরচিত্রও নেই।




কিন্তু ওই ইনিংসের একটি প্রামাণ্য স্মৃতিচিহ্ণ আজও ধরে রেখেছেন জেফরি রিচার্ডস নামে এক ভদ্রলোক। সেদিন কপিলদেবের কভারের ওপর দিয়ে মারা একটি লফটেড কভার ড্রাইভ (ওভার বাউন্ডারি) মাঠ থেকে ৯০ মিটার দূরের জেফরি রিচার্ডসের বাড়ির ছাদের টালি ভেঙ্গে দিয়েছিল। আজও জেফরি রিচার্ডস টানব্রিজ ওয়েলসে বেড়াতে যাওয়া ভারতীয় ভ্রমণকারীদের সযত্নে দেখান তার বাড়ির কোন্ টালিটা ভেঙে গিয়েছিল সেদিন কপিলদেবের সেই অলৌকিক ছয়ে। এটাই এখনও একমাত্র চাক্ষুষ প্রামাণ্য দলিল, ওই ইনিংসের।
ইনিংসটি যিনি খেলেছিলেন, সেই বেচারা ভারতীয় অধিনায়ক কপিলদেব রামলাল নিখাঞ্জ সেদিন মাঠে নামার আগে সময়াভাবে ভালো করে স্নানটুকুও করে উঠতে পারেন নি। কোনোকিছু ভাবার সময়ও সেদিন কেউ তাঁকে দেননি। কারণ, ভারতের ৪ উইকেট ৯ রান, এমন এক অবস্থায় তাঁকে মাঠে নামতে হয়েছিল খুব তাড়াহুড়ো করে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ঘন কালো সম্ভাবনার মেঘ তখন ছেয়ে ফেলছিল ভারতীয় ক্রিকেটের আকাশ। টসে জিতে ব্যাট নিয়েছিলেন ভারত অধিনায়ক আর আউট হয়ে গিয়েছিলেন সুনীল গাভাসকার (০), কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত (০), মহিন্দার অমরনাথ (৫) ও সন্দীপ পাতিল (১)। ভারতীয় অধিনায়ক মাঠে নামার একটু পরেই যশপাল শর্মা (৯) আউট হন এবং ভারত হয়ে গিয়েছিল ৫ উইকেটে ১৭। তারপরে ষষ্ঠ উইকেটে ৬০ রান তোলার পরে নিজের ২২ রানে আউট হন রজার বিনি, দলের রান তখন ৬ উইকেটে ৭৭। এবং তারপরেই রবি শাস্ত্রী (১) আউট হয়ে যাবার ফলে ভারত হয়ে যায় ৭ উইকেটে ৭৮।
লাঞ্চ যখন হলো, ভারত তখন ৩৫ ওভারে ৭ উইকেটে ১১০-এ দাঁড়িয়ে, অধিনায়কের সঙ্গে তখন অপরাজিত মদনলাল শর্মা প্যাভিলিয়নে ফিরলেন। একটা চেয়ারে লাঞ্চের জন্য কিছু খাবার রাখা ছিল আর এক গ্লাস জল চাপা দেওয়া ছিল, উল্টোদিকে ছিল আর একটি খালি চেয়ার। সেখানে সেদিন তাঁর একজনও টিমমেট ছিলেন না। অধিনায়কের কাছে হেনস্থা হওয়ার ভয়ে বিদ্ধ তারা সবাই জাস্ট পালিয়ে গিয়েছিলেন সেখান থেকে। ৮ম উইকেটে ৬২ রান তুলে, লাঞ্চের কিছু পরে মদনলাল (১৭) আউট হতেই ভারত পৌঁছে যায় ৮ উইকেটে ১৪০ রানে। তখন উইকেটে এসেছিলেন সৈয়দ কিরমানি।

এরপরেই ১৯৮৩-র ইংল্যান্ডের প্রখর গ্রীষ্মকালকে নিজের ক্রিকেট কেরিয়ারের বসন্তদিনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিলেন কপিলদেব নামক জিনিয়াস। তাঁর তুফানী ব্যাটের দাপটে মাঠ জুড়ে বইতে শুরু করল এক উদ্দাম ঝড়, যাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেল জিম্বাবোয়ের বোলিং। সৈয়দ কিরমানিকে অন্য প্রান্তে রেখে শুরু হল তাঁর ব্যাটের 'নটরাজীয় প্রলয় নাচন'। রেকর্ড ১২৬ রান উঠল নবম উইকেটে, যার মধ্যে কপিলদেবের অবদান ছিল ১০২ রান আর সৈয়দ কিরমানি করেছিলেন অপরাজিত ২৪। এর মধ্যে শুধু একবার ব্যাটটা বদলেছিলেন নিজের শতরান পূর্ণ করা অধিনায়ক। ভারতীয় ইনিংস শেষ হয়েছিল ৬০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৬৬ রানে। ভারত অধিনায়কের স্ট্রাইক রেট ছিল অকল্পনীয় ১২৬.৮১। তিনি অপরাজিত ছিলেন ১৩৮ বলে করা ১৭৫ রানে (৬টি ছয় আর ১৬টি বাউন্ডারি)। সেটাই ছিল ওডিআই-তে ভারতের প্রথম শতরান। সেদিন দলের মোট রানের ৬৫.৭৯ শতাংশ রান একাই করেছিলেন কপিলদেব।
জিম্বাবোয়ে ৫৭ ওভারে ২৩৫ রানে অল আউট হয়ে গিয়ে ম্যাচটা হেরেছিল ৩১ রানে। মদনলাল ৩টি, বিনি ২টি এবং কপিলদেব, বলবিন্দার সিং সান্ধু ও মহিন্দার অমরনাথ নিয়েছিলেন ১টি করে উইকেট।

তার ঠিক এক সপ্তাহ পরের শনিবারেই বিশ্বকাপ জেতার জ্বালানী ভারত পেয়ে গিয়েছিল ওই ১৮ জুন, ১৯৮৩ তারিখের কপিলদেবের ইনিংসেই। “কপিলদেব কা জবাব নেহি” শব্দবন্ধের জন্মদিনও ছিল ওই দিনটাই।
ওই দিনটা মনে করা এক সুখস্মৃতি, ৪২ বছর পরেও।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
