গল্প ও অণুগল্প

নীড়ের ছায়া



চৈতন্য দাশ


রাত্রি গভীর। শহরের জানালায় অন্ধকারের জলছবি। এক আভায় মোড়ানো শরীর নিয়ে কাঁচের ওপারে বসে আছে নীরা।

আলো-আঁধারির মাঝে নীড়ের অপেক্ষায় নীরার গায়ের ত্বক যেন হেমন্তের রোদে ধোঁয়া ওঠা ভেজা পাতার মতো কাঁপছিল।

নীড় তখনও আসেনি। তার মেসেজটা এসেছিল কিছুক্ষণ আগে, "একটু দেরি হবে, কিন্তু আজ রাতে তোমাকে ছুঁয়ে, পুরো চাঁদটাকে নিজের করে নিতে চাই।"

নীরার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরন খেলে যাচ্ছিল। ঠিক যেন শরতের বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলে কারও আঙুল বুলিয়ে দেওয়া অনুভব। সে জানে, আজকের রাত অন্যরকম। শুধু শরীর নয়, আজ হয়তো কিছু ভেতরের দুঃসহ শব্দ ভেঙে ছড়িয়ে পড়বে।

‌নীড় এলো। দরজায় শব্দ, নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়া আকাঙ্ক্ষার মতো। দরজা খুলতেই চোখে পড়ল, নীড়ের ক্লান্ত অথচ ঘন এক দৃষ্টি। সে এমন ভাবে তাকিয়ে রয়েছে, যেন জানে, আজ কী হতে চলেছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে যেন প্রথমবারের স্পর্শ-ভেজা লালসা।

নীরা বলল, "এই শহরটা আজ কেমন নিঃশব্দ হয়ে গেছে।"

নীড় ধীরে এসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "নিঃশব্দ মানেই তো গভীর কিছু ডাকছে।"

তাদের দু'জোড়া ঠোঁট এক হল, কিন্তু সেটা কোনো তড়িত স্পর্শ ছিল না, বরং দীর্ঘ অপেক্ষার পুঞ্জীভূত আর্দ্রতা। সময়ের ঘনত্বে ধীরে ধীরে গলে যাওয়া ভালোবাসা।

ঘরজুড়ে তখন মোহের জোয়ার। নীরার সাদা টপের বোতাম খুলতে খুলতে নীড় বলল, "তোমার ত্বক যেন গোধূলির মেঘ। ধরা যায় না, ছুঁতে ঘামে ভিজে যায়।"

নীরা হেসে বলল, "তোমার কথায় শরীরও কবিতা হয়ে যেতে চায়।"

নীড় নীরার ঘাড়ে ঠোঁট রাখে। ঠোঁট, জিহ্বা, নিঃশ্বাস - তিনটি ভাষা একসঙ্গে কথা বলে। তার শরীর ধীরে ধীরে উত্তর দেয়। তারা বিছানায় না পড়ে যেন গলে পড়ে।

নীড়ের একটি হাত যখন নীরার স্তনের গোলক বেয়ে নিচে নামে, তা শুধু কাম নয়, স্মৃতির ভাষাও। পুরোনো রাত্রির ছায়া যেন ফিরে এসেছে আরও গভীর হয়ে।

নীরার চোখ তখন আধভেজা। সে জানে, এই মুহূর্ত ক্ষণিকের, তবু তাতছে।

নীড় তার ঠোঁটে নামিয়ে আনে আলতো কামড়। বুকের মাঝখান থেকে উঠে আসে অস্ফুট আর্তি। তাদের শরীর কথা বলে, আলতো কণ্ঠে, মোহময় তালে।

নীড় বলে ওঠে, "তোমার উরুতে আমার নাম রেখে দাও, যেন সময়ের গভীরে আমি নিজেকে খুঁজে পাই।"

নীরা ফিসফিস করে, "তুমি কি জানো, তোমার প্রতিটি ছোঁয়ায় আমি একটু একটু করে হারিয়ে যাই, আবার নিজেকে ফিরে পাই। এটাই কি তবে প্রেম?"

নীড় কোনো কথা না বলে তার নাভির নিচে ঠোঁট রাখে। শিরায় শিরায় কম্পন।‌ কোনো শব্দ নেই। শুধু নিঃশ্বাসে মিশে যাওয়া জলঘূর্ণির মতো অনুভব।

রাত তখন আরও গভীর। নীরা চিৎ হয়ে শুয়ে নীড়ের স্পর্শে হালকা কাঁপছে। নীড় ধীরে ধীরে তার মাঝখানে প্রবেশ করে, এক গভীর আহ্বানে, যেন শব্দহীন এক সংগীতের সূচনা।

নীরা আবার ফিসফিস করে, "এবারে ধীরে করো, যেন প্রতিটি ঠেলা আমাকে খুলে দেয়। প্রতিটি চাপ আমাকে নতুন করে চিনতে শেখায়।"

নীড় তার ঠোঁট চেপে ধরে, যেন কামনা, শীৎকার হয়ে উঠতে না পারে। শরীরের উত্তাপে পুরো ঘরটা যেন ধীরে ধীরে ঘামতে থাকে, জানালায় কুয়াশা জমে!

শুধু তাদের শরীরই মিলিত হচ্ছে না, দুটো আত্মা একে-অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। চোখে চোখ, ঠোঁটে ঠোঁট, শরীরে শরীর...

তারা নিঃশব্দ। কেবল দেহে লেগে থাকা ঘামের গন্ধ আর পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস ভেসে বেড়াচ্ছে।

নীরা তখন বুকের ভেতর মাথা রেখে বলে, "নীড়, এই যে তুমি এলে... চলে যাবে না তো?"

নীড় বলল, "আমি কখনও যাইনি, নীরা। আমি তো প্রতিদিন তোমার স্বপ্নে, তোমার ভেতরে, তোমার ত্বকের নিচে বিচরণ করি।"

নীরা চুপ থাকে। তার অতীতের একাধিক পুরুষ, ছিন্ন অভিমানের রাতগুলো হঠাৎ তার চোখের কোণে জল এনে দেয়। সে জানে, প্রেমে যেমন মিল আছে, তেমনি হারানোর বেদনাও লুকিয়ে থাকে।

পরদিন সকাল। সূর্যরশ্মি পর্দার ফাঁক গলে মুখে এসে পড়েছে। নীরা ধীরে ধীরে উঠে চুলে আঙুল চালায়। আয়নায় নিজেকে দেখে, চোখের নিচটা হালকা কালচে, কিন্তু মুখে এক প্রশান্ত দীপ্তি।

নীড় তখনও ঘুমোচ্ছে। তার পিঠে আঙুল বুলিয়ে নীরা ভাবে, এই পুরুষটি যেন তার জীবনের এক অচেনা চিঠি, প্রতিটি পৃষ্ঠা খুললেই নতুন ভাষা, নতুন ছোঁয়া।

নীরা কফি বানায়। জানালার ধারে বসে নীড় বলে, "তুমি জানো, আমি সবসময় ভেবেছি শরীর শুধু ক্ষণিকের, কিন্তু তোমার সঙ্গে আমার শরীর হয়ে উঠেছে চিরস্থায়ী কিছু।"

নীরা উত্তর দেয়, "শরীর যদি পবিত্র ভাষা হয়, তবে তোমার সঙ্গে আমার মিলন হল প্রার্থনার মতো।"

...কিছু দিন কেটে যায়। তারা নিয়মিত দেখা করে। কথা হয় গভীর রাতে। কাছাকাছি এলে গায়ে গা জড়িয়ে ঘুমায়। শরীরের গভীরতা ছাড়িয়ে মনও ধীরে ধীরে বাঁধা পড়ে।

একদিন বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে নীরা নীড়কে জিজ্ঞাসা করে, "তুমি কি কখনও আমাকে ছাড়তে পারবে?"

নীড় চুপ থাকে। ছাদের ওপর সিগারেটের ধোঁয়া হালকা মেঘের রূপ নেয়।

সে জানে, সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন, কিছু সম্পর্ক কেবল রাতের জন্যই জন্মায়। নীরা তার জন্য শরীর নয়, পূর্ণতা। কিন্তু এই পূর্ণতা রক্ষার জন্য নিজেকে ভাঙতে হয়, তা সে পারবে কিনা জানে না।

এক সন্ধ্যায়, তারা শেষবারের মতো মিলিত হয়।

নীড় জানে, আজ রাতে নীরাকে ভালোবাসতে হবে এমনভাবে যেন এটাই শেষ মিলন। যেন প্রতিটি চুম্বন হয়ে ওঠে এক চিরস্থায়ী বিদায়ের মুখবন্ধ।

বিছানায় তারা আবারও এক হয়, যেন আগুনের দুই শিখা। নীড় নীরার চুলের ভেতর হাত রেখে বলে, "তোমাকে আমি রেখে যেতে চাই না, কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম সবাই মানে না, তাই..."

নীরার চোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে, "আমি জানি, অসময়ে কার্বাইডে পাকা ফলের মতো, প্রেম-ভালোবাসা পোক্ত হওয়ার আগেই শরীরের স্পর্শ পেয়ে গেলে, তার ভবিষ্যৎ ক্ষণস্থায়ী। তবে আমার হৃদয়ে তুমি ছিলে, তুমি আছো। আমি তোমাকে দিয়ে নিজের শরীরকে আবার চিনেছি, নিজের মনকে ছুঁয়েছি।"

...কয়েকটা বছর কেটে গেল। নীরা এখন একা থাকে। সন্ধ্যায় বই পড়ে, কবিতা লেখে। মাঝে মাঝে তার শরীর খেলে ওঠে সেই পুরোনো সন্ধ্যার মতো। আয়নায় নিজের ত্বকে এখনও দেখে নীড়ের ছায়া।

নীড়? সে কোথায় এখন? হয়তো অন্য কোনো শহরে, অন্য কোনো নীরার কপালে ঠোঁট রেখে বলছে, "তোমার ত্বক আমার বাড়ি।"

কিন্তু নীরা জানে, শরীরের সব চিহ্ন মুছে যায় না। কিছু চুম্বন স্মৃতি হয়ে জেগে থাকে। কিছু সম্পর্ক হারিয়েও হারায় না! ছায়ার মতো থেকে যায়। যেমন নীড়ের ছায়া।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।