
কবিরা অনুভূতির আলো-ছায়ায় একটা চেতনার জগৎ তৈরি করে। এটি তাঁদের নিজস্ব ভাষা ও ভাবের জগৎ। একজন কবিকে চিরটাকাল একাই পথ চলতে হয়। যে কবির কবিতার সাম্রাজ্যে পাঠকবৃন্দ সহজ নিঃশ্বাস নিতে পারবেন সেই কবি ততই পাঠকের হৃদয়ের গহীন প্রাসাদে ঠাঁই নেন। জীবনে আনন্দ যেমন আছে তেমনি দুঃখও আছে। আনন্দ ও দুঃখের অভিজ্ঞতায় কবির অন্তরে চেতনার ঢেউ আছড়ে পড়ে। জীবনকে দেখার নতুন একটা সড়ক নির্মাণ করেন কবিরা। যে সড়ক সৌন্দর্যের আরাধনা করে। যেখানে রঙিন আকাশ সাদা মেঘে ছেয়ে থাকে। সড়কের পাশে হ্রদে জমে থাকে নীল পানি। আকাশে একঝাঁক কবুতর উড়ে গেলে তার প্রতিফলন দেখা যায় হ্রদের পানিতে। দূরের মাঠে বিকেলের সোনালি আলোয় একপাল গরু ঘাস খায় পরম প্রশান্তিতে। সড়কের একপাশ দিয়ে দুবেণী হেঁটে যায়। কবির হৃদয়ে এইসব বোধ থেকে হেমন্তের ভরা ফসলের মতো সৃষ্টি হয় কচি চালকুমড়োর মতো সবুজ কবিতা। আমরা আজকে যে কবির কবিতার অন্দরমহলে প্রবেশ করতে চলেছি, তিনি বাংলা কবিতায় পাঁচ দশক ধরে দুর্বার গতি সম্পন্ন অশ্বের পিঠে সওয়ার হয়ে এগিয়ে চলেছেন আশা ও নৈরাশ্যের বুননে। তাঁর অন্তরে চেতনার যে শিখাটুকু জ্বলে ওঠে তা মহাদুর্যোগের ঝড়ে নেভেনা। তিনি ক্রমাগত কবিতার রঙবেরঙের আলো খুঁজতে ব্যস্ত। ছন্দের দারুণ ছন্দময়তা তাঁর কবিতার ডানাকে করেছে বেশি পরিস্ফুট যা তাঁর পূর্বসূরীদের কাব্য ঐতিহ্যের ঝান্ডা বহন করছে। সত্তর দশকের এই কবিতার অশ্বারোহী এখনও প্রাণবন্ত সতেজ ও সবুজ তাঁর কবিতার রাজত্বে। তিনি নাসির আহমেদ।
কবিতার মধ্যে দর্শন থাকলে সেই কবিতা কাল পেরিয়ে মহাকালের দরজায় কড়া নাড়ে। শুধু কবিতার জন্য যে মানুষ পঞ্চাশ বছর ধ্যানে ও ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দেন তাঁর কবিতায় নিশ্চয়ই হীরে মানিক জহরত পাওয়া যাবে। শখের বশে কবিতা লেখা আর ধ্যান জ্ঞান চিন্তা চেতনার সবটুকু উজাড় করে নিবেদিত হওয়ার মধ্যে বিরাট পার্থক্য আছে। আধুনিক বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ কবি আল মাহমুদ আমাকে বলেছিলেন, "কবিতা একটা জীবন চায়। এবং কবি হওয়ার আগে মানুষ হতে হয়..." সংবেদনশীল মানুষ। সব কবির সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। এটি সম্ভবও না। শুধু তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে তাঁকে আন্দাজ করা যায়। তাঁর গতিবিধি ও দর্শন সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আমার সৌভাগ্য, আমি ব্যক্তি নাসির আহমেদ ও কবি নাসির আহমেদ দুই সত্তার সঙ্গেই পরিচিত। এ' লেখায় এ' মুহূর্তে ব্যক্তি নাসির আহমেদ বিষয়ে কিছু বয়ান রাখছি প্রথমে। যিনি বাংলা কবিতায় সত্তর দশকের গুরুত্বপূর্ণ একজন ছান্দসিক কবি।
প্রখর রৌদ্রের উত্তপ্ত দিনে
গত শতাব্দীর অস্তমিত সূর্যের শেষ আলোর রশ্মি নিভে যাওয়ার আগেই আমি রাজধানীতে হাজির হই জীবন ও জীবিকার তাগিদে। তখন বাংলাদেশ থেকে তিনটি দৈনিক পত্রিকা দোর্দণ্ড প্রতাপে প্রকাশিত হতো। 'দৈনিক ইত্তেফাক', 'দৈনিক জনকণ্ঠ' ও 'দৈনিক ইনকিলাব'। এছাড়া আরও কিছু দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। কিন্তু রাজনীতি নিয়ে, রাজনৈতিক মতাদর্শে উজ্জীবিত দুটি দৈনিকের পরস্পর পরস্পরের সাথে বৈমাত্রেয়সুলভ আচরণ ছিল। কিন্তু দুটি পত্রিকার পাঠক ছিল অগণিত। 'দৈনিক জনকণ্ঠ' দেশের চার জায়গা থেকে একযোগে প্রকাশিত হতো। এটিও একটি চমক জাগানিয়া কনসেপ্ট। আর 'দৈনিক ইনকিলাব' প্রকাশিত হতো ঢাকা থেকে। সেই সময়ে 'দৈনিক জনকণ্ঠ' পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি নাসির আহমেদ। প্রতিমাসে জনকণ্ঠ সাময়িকী 'তরুণ লেখক সংখ্যা' নামে এক পাতার সাময়িকী প্রকাশ করত। যা আমাদের নব্বই দশকের তরুণ লেখক যশপ্রার্থীদের কাছে স্বপ্নের মতো বিষয় ছিল। তাঁর সঙ্গে ধীরে ধীরে এভাবে একটা শক্ত কবিতার বন্ধন গড়ে ওঠে। সম্প্রতি তাঁর কয়েকটি কবিতা পাঠ করে মুগ্ধ হয়ে বসে যাই লিখতে। তাঁর কবিতার অন্দরমহলে ঢুকে যা খুঁজে পেয়েছি তা নিয়েই আজকের বয়ান। প্রথমে কবিতাগুলো রাখছি -

নাসির আহমেদের কয়েকটি কবিতাঃ
কাঙ্ক্ষিতা প্রিয় নারী
স্বর্গের অপ্সরী নও, সুন্দরী রমণী এ মাটির!
হয়তো বা মর্ত্যলোকে দীপ্ত ব্যতিক্রম!
হেঁটে যাচ্ছ নাগরিক পোশাকে উত্তম তুমি
আশ্চর্য মায়াবী আলো জ্বেলে দুই চোখে।
সে আলোয় ডানা মেলে কোনো কোনো পতঙ্গ-হৃদয়।
কামের দেবতা নই, তুমি নও উর্বশী স্বর্গের
যুগল চন্দ্রের প্রভা যদিও স্বর্গীয়!
নাভিমূলে অলৌকিক কস্তুরীর ঘ্রাণ,
সেই ঘ্রাণে বিহ্বল কামের আগুনে দেয় ঝাঁপ।
অগ্নির দেবতা প্রমিথিউসের মতো কিন্তু মহত্তম নয়!
ক্ষুধার্ত কামুক যারা এসেছে আসুক
প্রেমিক আসেনি কেউ জীবনে তোমার!
ক্ষুধা-তৃষ্ণা কামে-ঘামে প্রেমিকও সাঁতরায় বটে,
তবে তা স্বর্গীয়।
চিত্রাঙ্গদার মত ব্যক্তিসত্তা নিয়ে অহংকারী
শুধু রূপে নয়, তুমি আমার কাঙ্ক্ষিতা প্রিয় নারী।
অন্যরকম দুঃখ শ্রাবণের
ঝরতো দিনরাত অঝোর ধারাজল শ্রাবণ ঘনঘোর কান্না।
মধ্যযুগ থেকে আজো তো বহমান কাব্যে, শিল্পে সে বিরহী গাথা-গান।
অমর মহাকবি সেই যে কালিদাস - কোথায় রামগিরি পর্বতের চূড়া! নির্বাসিত সেই যক্ষও তো নেই!
তবু কী বিস্ময় আষাঢ়-শ্রাবণের বিরহ ছুঁয়ে যায় তোমাকে!
আমার এ শহরে বৃষ্টি নেই, দেখো রৌদ্রঝলসিত বর্ষা। এখানে রাস্তায় বর্ষাতিও নেই, নেই তো নানারঙা
বাহারী রেনকোট, কিংবা লাল-নীল ছাতায় বৃষ্টির মায়াবী সুরময় নৃত্য।
নগরী দিনরাত গরমে হাঁসফাঁস,
ক্যালেন্ডারে শুধু বর্ষা!
তোমার ও-শহরে নির্জনতা ছুঁয়ে হয়তো জানালায় বৃষ্টি, একাকী বসে ভাবো সে কোন শ্রাবণের একলা দুপুরের খণ্ড কিছু গত চিত্র।
সময় বয়ে যায়, স্থবির কিছু নয় - বদলে যায় কত স্বপ্ন! আমার এ শহরে শ্রাবণধারা নয়, মানুষ কাঁদে আজ অক্ষমতা আর অবাঞ্ছিত সব দুঃখে!
হঠাৎ অপঘাত মৃত্যু কেড়ে নেয় যখন ইস্কুলে শিশুদের - তখনও বিরহের কান্না
কাঁদে দেশ,
বৃষ্টি আসে নাই, এসেছে ডানাভাঙা
বিমানে চেপে শুধু অগ্নিময় মহামৃত্যু।
তুমিও তো সীমাবদ্ধ
অলৌকিক মায়াবী জ্যোৎস্নার মধ্যে একদিন
হেঁটে গেছো তুমি।
মুগ্ধ বিহবল হয়ে সৌন্দর্যতাড়িত উড়ে গেছি
তোমার জ্যোৎস্নায়,
যেন মেঘ আর চাঁদ লুকোচুরি।
এ-যে এক মোহমায়া আশ্চর্য হরণ!
বুঝতে বুঝতে সব সৌন্দর্য হারালো অন্ধকারে।
ক্রুরতার তীক্ষ্ণ ছুরি ফালাফালা করেছে সবুজ ভালোবাসা!
অপুষ্ট আপেল যেন সোনালি রঙের আগে অকালে নিহত।
চলে যাচ্ছি স্বপ্নাহত এই অন্ধকার চিরে দূরে -
বহুদূরে নীল সেই আলোর প্রাঙ্গনে -
যেমন গভীর ঝড়-বৃষ্টিসীমা পার হলে
শুধু নীলাকাশ।
শরীরী ভূগোল ছেড়ে চলে যাচ্ছি
প্রকৃত সৌন্দর্যে।
আকাশের ওপারে আকাশ আছে জানি;
কালক্রমে রমণীরও সকল সৌন্দর্য সীমাবদ্ধতায় বাঁধা
তুমিও তো সীমাবদ্ধ মায়াবী সুন্দর! শুধু বস্তুগত।
চলে যাচ্ছি নৈর্বক্তিক চিরসুন্দরের কাছে একা।
আলোর প্রাঙ্গণে যাচ্ছি - অবিরাম আলো!
জোনাকি রঙের নীল রহস্য-আলোয় জ্বলে
অনন্ত প্রকৃতি।
তবু বৈশাখ
বৈশাখ মানে ঝোড়ো তাণ্ডব উত্তাল নদী দুরন্ত ঝড়!
ধ্বংসের পর নতুন সৃষ্টি, শস্যের পলি নব নব স্তর।
এই বৈশাখে ধ্বংসই শুধু? সৃষ্টি সুখের উল্লাস কই!
অবেলায় কেন কালবৈশাখী, কচি আমগুলি কাঁপে
থর থর!
বোশেখী মেলার নাগরদোলায় ভয়ে কাঁপে শিশু কেন শঙ্কায়!
আনন্দ কই? সে কি আসবে না!
হালখাতা খোলা হবে না এবার?
জীর্ণমলিন মুমূর্ষু কেন যাচ্ছে না উড়ে চৈতি হাওয়ায়?
পথ চেয়ে কেন অবেলায় আজ
মা আমাকে খোঁজে ঘরের দাওয়ায়!
তবু বৈশাখ এসেছে যখন
বলতেই হবে - এসো হে নবীন
মুছে দাও এই শঙ্কার দিন,
হিংস্রতা যত জীর্ণ মলিন।
আবার কি এলো গ্রহণের কাল
কোথাও ঘটছে অজ্ঞাত কোনো তাণ্ডব ভয়াবহ!
সাংঘর্ষিকও, নিঃশ্বাস নিতে পারছি না মোটে বায়ু দুর্বহ!
হঠাৎ বাতাসে কেন এত পোড়া বারুদের ঘ্রাণ!
আকাশে মেঘের ঘন কালো ভয় ডাকে গুরু গুরু
হয়তো কোথাও অশুভ যুদ্ধ হয়ে গেছে শুরু।
প্রকৃতি এখনো সংকেতে কথা বলে!
জলোচ্ছ্বাসের কিংবা ঝড়ের আগেই পিঁপড়ে জানে
পিলপিল পায়ে চলে নিরাপদ আশ্রয় সন্ধানে।
ঈষাণের কোণে ওই দেখো আজ মেঘেও আগুন জ্বলে।
এমন শরতে গুরু গুরু মেঘ কেন বর্ষার?
বৃষ্টির দিন বিগত যদিও তবু এই আলামত!
ভালো নয় মোটে।
স্বদেশ তোমার আবার হারাবে পথ!
আলোকোজ্জ্বল সকালে তাই কি রাতের অন্ধকার!
শরতের সাদা কাশফুলগুলো সহসা হয়েছে লাল!
তবে কি আবার ভয়াবহ সেই কৃষ্ণপক্ষ, গ্রহণের কাল?
প্রকৃতির কাছে পাই
শরতে-হেমন্তে স্মৃতি ফিরে আসে নরম উলের রং নিয়ে!
সেই কবেকার স্মৃতি মায়ের কল্যাণী হাতে খোকার নতুন সোয়েটার!
ফিরে আসে পাড়াগাঁর হারানো সবুজ দিন,
স্কুলগামী কিশোরীর বেণীর রঙিন ফিতা
আর তার চুলের মায়াবী ঘ্রাণ!
শরতে হঠাৎ ফিরে আসে মৃদু কুয়াশায় ভেজা
ধূসর সন্ধ্যার ঘাস, বুনোপথ, লতাপাতা, আর
অস্পষ্ট গাউনপরা দূরের গাছেরা।
ফিরে আসে গন্ধসহ কৈশোরের ঘাস-পাতা, শেফালী বকুল!
বৃক্ষহীন নির্দয় শহর অকস্মাৎ স্নিগ্ধ ক্লোরোফিলে ভরে ওঠে!
দুর্বৃত্তায়নে দগ্ধ এই দুঃসময়ে
শরতের স্নিগ্ধ হাওয়া স্মরণ করিয়ে দেয়
শিশির-মমতা!
স্মরণ করিয়ে দেয় ভুলে যাওয়া পাখিদের নাম।
সন্ধেবেলা মায়ের শিশিরনম্র হাতেভাজা পুলিপিঠা
সসৌরভ ফিরে আসে হঠাৎ শরতে।
ঢাকের শব্দের সঙ্গে শুভ্র কাশবন ছোঁয়া হাওয়া
শারদীয় দুর্গোৎসব, ধূপের মায়াবী গন্ধ নিয়ে ফিরে আসে।
ফিরে পাই ফেলে আসা
শৈশবের মাতৃস্নেহ প্রকৃতির কাছে।
ভেজাল বিষয়ে অল্প কথা
সবকিছুতে ভীষণ ভেজাল, প্রেম-বিরহ-সংসারেও
এমনকি এই সত্য বলা তাতেও কিছু ভেজাল আছে!
গাছে গাছে কত যে ফল, বাগান ভরা এত যে ফুল
তাতেও দেখি ভেজাল গন্ধ!
হায়রে এমন কপাল মন্দ! স্বাধীনতার সোনার ফসল এই যে সোনার বাংলা আমার -
তারও দেখি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেশপ্রেমের ভেজাল কাঁটা!
রক্তে পাওয়া গণতন্ত্র, তার পথেও বাধার প্রাচীর,
তাতেও এখন মিশ্র ভেজাল!
ওই বেচারা গরিব মানুষ গোয়ালা তার দুধে কিছু
পানি মিশায়,
দিচ্ছো তাকেও শাস্তি ভীষণ জরিমানার!
শাকসবজি, মাছে মেশায় ফরমালিন ঐ অসাধু লোক -
তাকেও কিছু শাস্তি দিচ্ছো মাঝে মাঝেই।
কিন্তু ভালোবাসায় এমন বিষের ভেজাল দিচ্ছো তুমি,
তুমিই সাধু - বিচার তোমার হয় না আমার সোনার দেশে!
পানশালায় এক রাতে
বিয়ারের ক্যান খোলার শব্দে
ফস করে জ্বলে উঠল কিছু
যেন দেশলাইয়ের একটি কাঠি!
কেউ সিগারেট ধরায়নি যদিও!
একটা তরল আগুন-শব্দ
আমাদের কক্ষ জুড়ে ছড়ালো উত্তাপ!
আমরা আমাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস
লুকিয়ে বললাম সমস্বরে - চিয়ার্স! চিয়ার্স!
জলহীন নদী-স্বভাবের আমরা আমাদের
ভালোবাসার সম্পর্কগুলোকে নদী ভেবে
স্রোতস্বিনী হতে চাই প্রতিদিন।
কী আশ্চর্য নদী কই! চারপাশে দেখি শুধু নদীর কঙ্কাল।
এই উপলব্ধি মাত্র পানপাত্র ফেলে ফিরে আসি।
তারপর আর কোনোদিন
আমি নেশাই করিনি।
কবিতা অস্পষ্ট চিত্রকলা
কবিতা কোথায় থাকে, কবিতা কেমন? - এই প্রশ্নে নিরন্তর নিজেকেই করছি খনন।
কোনো মীমাংসায় যেতে আজও পারি নাই।
কোথায় সুন্দর আর কবিতা কোথায়!
কেবলই বিস্ময় বাড়ে রক্তাক্ত অস্তিত্ব।
দিন দিন কালো চুল শুভ্র কাশবন!
বড়শিতে বিদ্ধ কোনো জীবন্ত মাছের ছটফট
টের পাই রক্তের ভিতরে। প্রশ্ন শুধুঃ
কবিতা কোথায়? -
"কবিতা সর্বত্র পাবে" মার্কিন কবির সেই উক্তি মনে পড়েঃ
পুষ্পিত উদ্যানে খুঁজি, সবুজ অরণ্যে, শাড়ির আঁচলে,
এমনকি ফুটপাতে, এলোমেলো ময়লার ভাগাড়ে,
ভন ভন মাছি ওড়ে মাছের কানকোর বর্জ্যে, আছে সেখানেও!
প্রেম আর প্রতিবাদে যেকোনো বোধেই ছলাকলা
দোলা দেয় মর্মলোকে পরাবাস্তবের চিত্রকলা!
তোমাকে যতটা চিনি, ততোটাই রহস্য অচেনা!
অনুভব করি প্রেম কত যে গভীর!
শুধু শুধতে পারি না তার দেনা!
কবিতা দূরের নদী দিগন্ত রেখায় মিশে আছে
যতটা কল্লোল শুনি মনে হয় এই বুঝি কাছে!
যতই এগোতে থাকি ততোধিক দূরে সরে যায়!
কবিতা অধরা নারী, অর্ধেক দেখেছি যাকে শুধু কল্পনায়।
শিরোনামহীন
কয়েক টুকরো
বাতাস বহন করে ফুলের সৌরভ
এমনকি পচাগলা ঘ্রাণও
বাতাসকে ভালোমন্দ দোষ দেয়া ঠিক নয়
বাতাস না হলে বাঁচবে কি এই প্রাণও?
তোমাদের মিথ্যাচার দেখি আর ভাবি
হায় তোমাদেরই হাতে এই সমাজের চাবি!
অসহায় সত্য আজ যেন দেশান্তরি
একচ্ছত্র আধিপত্যে মিথ্যাই বাঁচার ধন্বন্তরী!
হারানো চাবির খোঁজে ক্লান্ত হয়ে শেষে
ঘরের দুয়ারে এসে ঘুমিয়ে পড়েছ?
আপন ঘরের তালা বন্ধ এই দেশে
জনগণও চাবিহীন উদ্বাস্তু এখন। লক্ষ্য করেছ?
বয়সের মাপে সব মাপা ঠিক নয়
কখনো কখনো খুব তরুণও প্রবীণ মনে হয়।
এমন প্রবীণও থাকে তারুণ্যের জ্বলন্ত আগুন!
প্রেমেকামে সশরীর সর্বদা ফাগুন।
জগতে তোমারই জয়-জয়কার
ঘন সবুজের আবছায়া আলোছায়া
তারই ফাঁকে ফুটে আছে রাশি রাশি ফুল
দিন ও রাতের মধ্যবর্তী কী যে রহস্যময় মায়া!
যেন উর্বশী মর্ত্য-ধুলোয় ছড়িয়ে দিয়েছে চুল!
অপ্সরী নাকি মানবী! দ্বিধায় থমকে রয়েছে চোখ
পুষ্পের ফাঁকে আহ কী মায়াবী পুষ্পিতা সেই মুখ!
নির্জন বনভূমি শুধু জানে,
জানে না তা কোনো লোক
হৃদয়ে আমার ফুটেছে এ কোন
স্বর্গ হারানো শোক!
কৌতূহলের মায়া-মরিচিকা এ-যে আলোকের ধাঁধা
বুঝিনি তো আগে রহস্য-ফাঁদে
দৃষ্টি পড়েছে বাঁধা!
বুঝেছি যখন, তখন সে নারী সৈকতে চোরাবালি
আছে শুধু গাঢ় অন্ধকারের মতো হতাশার কালি।
এই বিভ্রম কবি-শিল্পীর নন্দনময় চির হাহাকার
তুমি তো কবিতা, তুমিই শিল্প! জগতে তোমারই
জয়-জয়কার!
হয়তো তোমার জন্যই
হয়তো তোমার জন্যই আজ এই কবিতাটি লেখা
কী হতো কখনো তোমার সঙ্গে যদি না-ই হতো দেখা!
যেমন মাতৃভাষার বর্ণমালা ছাড়া কোনোদিন
প্রকৃত আবেগ হয় না প্রকাশ, ভাষাঋণ চিরদিন।
ঠিক সেরকম তুমিও আমাকে করে গেলে খুব ঋণী
অজান্তে কত কী যে ঘটে যায়! নিজেকেও নিজে চিনি?
চিনি না বলেই দিয়ে গেছো তুমি প্রেরণার মহাঢেউ
হয়তো তোমার জন্যই লিখি, জানবে কখনো কেউ!
তুমি তো প্রেমের মোহন মায়াবী টান
নিষ্কাম প্রেমে আমৃত্যু তুমি অস্থির কবিপ্রাণ।
তোমার জন্য গোপনেই ফোটে অকথিত কথাফুল
হয়তো ভাববে কবির কাব্য, বৃথাই হুলস্থুল।
রাত জেগে জেগে মুগ্ধ তুলিতে আঁকি যে মুখের রেখা
একবার শুধু তার সাথে হয়, দু'বার হয় না দেখা।
নাসির আহমেদের কবিতার সরল তরজমা
বাংলা কবিতার ভুবনে নাসির আহমেদ এক অনন্য নাম, যিনি সমসাময়িক জীবন, প্রেম, প্রকৃতি ও সমাজবাস্তবতাকে একসূত্রে গেঁথে এনেছেন কাব্যিক বয়ানে। তাঁর কবিতায় যেমন আছে রোমান্টিক আবেগের উচ্ছ্বাস, তেমনি আছে আধুনিক মানুষের বেদনা, রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষতচিহ্ন কিংবা পরাবাস্তব কল্পনার ছায়া। পাঠকের কাছে এই বারোটি কবিতা যেন একেকটি ভিন্ন দ্বীপ, অথচ একসাথে তারা গড়ে তুলেছে একটি সুসমন্বিত কাব্যলোক - যেখানে প্রেম, প্রকৃতি, দুঃখ, প্রতিবাদ ও মানবিকতার আহ্বান মিলেমিশে যায়। এই প্রবন্ধে আমরা সেই কাব্যলোকের ভেতর দিয়ে একটানা যাত্রা করব।
প্রেম ও নারীর প্রতীকী রূপ
প্রথম কবিতা 'কাঙ্ক্ষিতা প্রিয় নারী'-তে নাসির আহমেদ নারীর সৌন্দর্যকে কেবল শারীরিক রূপে দেখেননি, বরং তাকে মানবিক ব্যক্তিসত্তা দিয়ে নির্মাণ করেছেন। এখানে নারী দেবলোকের উর্বশী নন, বরং মর্ত্যের শহুরে জীবনযাপনে দীপ্ত এক ব্যতিক্রমী সত্তা। কবির ভাষায় নারীর চোখের আলো যেন পতঙ্গ-হৃদয়ের ডানা মেলার অনুপ্রেরণা। প্রেম ও কাম একে অপরের সীমানা ছুঁয়েছে, তবে তা নিছক ভোগবাদী নয়; বরং চিত্রাঙ্গদার মতো অহংকারমিশ্রিত ব্যক্তিসত্তায় নারী হয়ে উঠেছেন কাঙ্ক্ষিতা। এই কাব্যভাষায় প্রেমের সাথে দর্শন যুক্ত হয় - যেখানে নারী হয়ে ওঠেন কেবল রূপসী নয়, এক স্বতন্ত্র মানবিক প্রতীক।
এই প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্কের ছায়া আমরা আবার পাই 'তুমিও তো সীমাবদ্ধ' কবিতায়। এখানে কবি স্বীকার করেছেন রমণীর সৌন্দর্যের সীমাবদ্ধতা, যা শেষ পর্যন্ত বস্তুগত। জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোতে শুরু হলেও যাত্রা শেষ হয় নৈর্ব্যক্তিক চিরসুন্দরের দিকে। এটি নিছক প্রেমের কবিতা নয়; বরং এক ধরণের প্লেটোনিক যাত্রা - যেখানে কবি সৌন্দর্যের সীমা পেরিয়ে খুঁজছেন পরম আলোর প্রাঙ্গণ। নারীর শরীরী ভূগোলকে পেরিয়ে তিনি যেতে চান "জোনাকি রঙের নীল রহস্য-আলোয় জ্বলে অনন্ত প্রকৃতি"-র কাছে। এখানে পরাবাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতা একসাথে মিশে গেছে।
প্রকৃতি, ঋতু ও সময়ের বয়ান
নাসির আহমেদের কবিতায় প্রকৃতি কেবল দৃশ্যমান উপাদান নয়, বরং গভীর সামাজিক ও আবেগিক প্রতীক। 'অন্যরকম দুঃখ শ্রাবণের' কবিতায় আমরা দেখি মধ্যযুগীয় কালিদাসের বিরহগাথা থেকে আধুনিক নগরের বেদনা পর্যন্ত যাত্রা। শহরে বৃষ্টি নেই, আছে কেবল ক্যালেন্ডারের বর্ষা, আর মানুষের মুখে অক্ষমতার কান্না। শ্রাবণের ঐতিহ্যবাহী বেদনা এখানে রূপান্তরিত হয়েছে সমকালীন ট্র্যাজেডিতে - যেখানে বৃষ্টির অনুপস্থিতির জায়গায় এসেছে ডানাভাঙা বিমানের অগ্নিময় মৃত্যু। প্রকৃতির চিরন্তন রূপের সাথে আধুনিক বিপর্যয় একীভূত হয়েছে।
একইভাবে 'তবু বৈশাখ' কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রাম সমান্তরালভাবে এগিয়েছে। বৈশাখ মানে ধ্বংস ও সৃষ্টির দ্বন্দ্ব। ঝড়-ঝঞ্ঝার ভেতর কচি আমের কাঁপন, শিশুদের নাগরদোলার ভয়, কিংবা মায়ের ডাকে হারিয়ে যাওয়া সন্তানের প্রতীক্ষা - সবকিছু মিলিয়ে বৈশাখ হয়ে ওঠে এক দ্ব্যর্থক প্রতীক। এখানে আধুনিকতাবাদের বৈপরীত্যবোধ স্পষ্ট ধ্বংসের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির আশা।
'আবার কি এলো গ্রহণের কাল' কবিতায় প্রকৃতি রূপক হয়ে ধরা দিয়েছে জাতীয় সংকটের প্রতীক হিসেবে। মেঘে আগুন জ্বলা, বারুদের গন্ধ, কাশফুলের লাল হয়ে যাওয়া - সবই অশুভ যুদ্ধ ও অন্ধকার সময়ের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতির সংকেতকে কবি পড়তে জানেন, আর সেই সংকেতই রাজনীতি ও সমাজের অস্থিরতা বোঝার পথ হয়ে ওঠে। এখানে প্রকৃতি ও ইতিহাস একাকার।
অন্যদিকে 'প্রকৃতির কাছে পাই' কবিতায় আছে নস্টালজিয়ার স্নিগ্ধ স্রোত। শৈশবের সোয়েটার, বেণীর রঙিন ফিতা, শেফালির গন্ধ, পিঠার স্বাদ - সবই শরতের কুয়াশা ও কাশবনের সাথে মিশে আসে। এ এক আত্মপরিচয়ের সন্ধান, যেখানে প্রকৃতি হয়ে ওঠে স্মৃতির ভান্ডার। দগ্ধ সময়েও প্রকৃতি মানুষকে ফিরিয়ে দেয় মমতা ও মাতৃস্নেহ।
সমাজবাস্তবতা ও প্রতিবাদ
কবি কেবল প্রেম ও প্রকৃতির গায়ক নন; তাঁর কবিতায় আছে সামাজিক প্রতিবাদের ধারাও। 'ভেজাল বিষয়ে অল্প কথা' কবিতায় তিনি আধুনিক জীবনের দূষণকে সরাসরি উচ্চারণ করেছেন। ভেজাল কেবল খাদ্যে নয়, প্রেম, সংসার, এমনকি দেশপ্রেমেও প্রবেশ করেছে। 'রক্তে পাওয়া গণতন্ত্র'-এর ভেজাল, কিংবা ভালোবাসার ভেতরে বিষের মিশ্রণ - এসব চিত্র স্পষ্টতই আধুনিক সমাজের রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটকে প্রতিফলিত করে। এখানে কাব্যভাষা হয়ে উঠেছে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক, তবে তবুও তার মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর হতাশা।
'পানশালায় এক রাতে' কবিতায় কবি আবারও দেখিয়েছেন মানুষের সম্পর্কের ভেতরকার ভেজাল। "চিয়ার্স" বললেও পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস লুকানো থাকে। নদীর মতো প্রবাহমান প্রেমকেও পাওয়া যায় না, কেবল নদীর কঙ্কাল দেখা যায়। এখানে আধুনিকতাবাদের নিঃসঙ্গতা, অস্তিত্ববাদী শূন্যতা স্পষ্ট।
'শিরোনামহীন' কবিতার টুকরো অংশগুলোও সমাজবাস্তবতার তীক্ষ্ণ ছবি আঁকে। বাতাস যেমন ফুলের ঘ্রাণ ও পচা দুর্গন্ধ দুটোই বহন করে, তেমনি সমাজও বহন করছে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব। "জনগণও চাবিহীন উদ্বাস্তু এখন" - এই লাইন একদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রকাশ করছে, অন্যদিকে মানুষের অসহায়ত্বকে তুলে ধরছে।
কবিতা, ভাষা ও সৃজনশীলতার অনুসন্ধান
নাসির আহমেদ কেবল বিষয়বস্তুর কবি নন; তিনি কবিতা নিয়ে ভাবেন, কবিতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। 'কবিতা অস্পষ্ট চিত্রকলা' কবিতায় তিনি কবিতার অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ান। ফুল, অরণ্য, আঁচল কিংবা ভাগাড় - সবখানেই কবিতার সম্ভাবনা আছে। এ এক পোস্টমডার্ন অনুসন্ধান, যেখানে উচ্চ ও নিম্ন, সুন্দর ও অশুভ - সবকিছু কবিতার উপাদান হতে পারে। কবিতা কখনো দূরের নদী, কখনো অধরা নারী - এই দ্ব্যর্থকতা কবিতারই অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য।
ভাষা, জাতিসত্তা ও প্রেমের মিলন
সবশেষে 'হয়তো তোমার জন্যই' কবিতায় প্রেমিকাকে মাতৃভাষার সাথে তুলনা করেছেন কবি। যেমন মাতৃভাষা ছাড়া প্রকৃত আবেগ প্রকাশ অসম্ভব, তেমনি প্রিয় নারী ছাড়া কবির সৃজনশীলতা অসম্পূর্ণ। এখানে প্রেম ব্যক্তিগত হলেও তার ভেতরে লুকানো আছে জাতীয় চেতনা। ভাষা, প্রেম ও কাব্য - সবই মিশে গেছে একসূত্রে।
নন্দনতত্ত্ব ও কাব্যধারা
এই বারোটি কবিতার ভেতর দিয়ে আমরা নাসির আহমেদের কাব্যধারার একটি বহুমাত্রিক রূপ পাই।
রোমান্টিসিজম প্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য, নস্টালজিয়া।
আধুনিকতাবাদঃ নগরের হতাশা, বিচ্ছিন্নতা, যুদ্ধ ও অশুভ সময়।
পরাবাস্তবতাঃ আলোর প্রাঙ্গণ, রহস্যময় নারী, অস্পষ্ট চিত্রকলা।
সমাজবাস্তবতাঃ ভেজাল, রাজনৈতিক সংকট, জনগণের অসহায়ত্ব।
এই সমন্বয়ই তাঁকে সমসাময়িক বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
শেষ কথা
নাসির আহমেদের কবিতাগুলো পাঠককে এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার ভেতর নিয়ে যায়। একদিকে আছে প্রেম ও সৌন্দর্যের আকর্ষণ, অন্যদিকে আছে সমাজবাস্তবতার তীব্র সমালোচনা। কখনও তিনি পরম আলোর সন্ধানী দার্শনিক, কখনও নিঃসঙ্গ শহরের সাক্ষী, আবার কখনও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতা যেমন ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ, তেমনি সামষ্টিক চেতনারও প্রতিফলন।
এই বারোটি কবিতা একসাথে পড়ে মনে হয় আমরা যেন একটি কাব্যিক গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে আছি - যেখানে প্রতিটি ক্যানভাসে ভিন্ন রঙ, ভিন্ন আবেগ, ভিন্ন প্রতীক। কিন্তু সব মিলিয়ে এগুলোই নির্মাণ করে নাসির আহমেদের কাব্যবিশ্ব, যা বাংলা কবিতার ভুবনে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন স্থাপন করে তিনি হয়েছেন সত্তর দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
আলোকচিত্রঃ লেখক।
