
"আজ সমূহ সংশয়ের আঁধির মধ্যে রয়েছে স্বদেশ। এগোবার পথের কোনো স্থির নিশানা নেই কোথাও। এ আঁধি থেকে ত্রাণ কোন্ পথে কেউ নিশ্চিত জানে না। ভাবনার সংকটের এই খিন্ন সময়ে কখনও কখনও বিজয়লালের মতো চারিত্র-মূর্তির স্মৃতি মনে গভীর প্রশ্ন আনে।"
বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সত্যজিৎ চৌধুরী কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন কবির জন্মশতবর্ষে (১৯৯৭) প্রকাশিত একটি রচনায়। খুব ছোটোবেলা থেকেই কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের কথা শুনেছি। আমাদের গ্রামে অর্থাৎ নদিয়া জেলার বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে তাঁর জীবনের অনেকটা সময় প্রায় ২৮ বছর কেটেছে জলঙ্গী নদীতীরে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত 'লোক সেবা শিবির'-এ। বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে গ্রন্থাগার, বেসিক ট্রেনিং কলেজ, নার্সারি স্কুল, বালিকা বিদ্যালয়, গদাধরের মন্দির প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, প্রবর্তন করেন সর্বধর্ম সমন্বয় ভাবনার উৎসব 'গদাধরের মেলা'। তাঁর সঙ্গে অন্তরঙ্গতার সম্পর্ক ছিল এমন কিছু মানুষের কাছ থেকে জানতে পেরেছি - তাঁর কবিত্ব, তাঁর বাগ্মিতা, তাঁর বিপুল পড়াশুনো, পাণ্ডিত্য, দৃপ্ত হাঁটাচলা, তাঁর অসম্ভব সুন্দর হস্তলিপি, তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতা, তাঁর প্রাণোচ্ছলতা ও পরিহাসপ্রিয়তা, তাঁর নির্ভেজাল অসাম্প্রদায়িকতা ও অকৃত্রিম গুণগ্রাহিতা নিয়ে তিনি ছিলেন বড়োই আকর্ষণীয় এক ব্যক্তিত্ব।
স্বাধীনতার ৭৭ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের জন্মের ১২৬ বছরও পেরিয়ে এলাম আমরা। প্রায় ১০০ বছর আগে তিনি লিখেছিলেন 'সব-হারাদের গান'। আজ এই সময় এসে যখন তাঁর এই কবিতাগ্রন্থের পাতা উল্টে চলেছি, তখন আমার সামনে ফুটে উঠছে পরাধীন ভারতবর্ষের এক বিরাট ক্যানভাসে শিরদাঁড়া সোজা করে এগিয়ে চলা একজন মানুষের ছবি, স্বাধীনতা-পরবর্তী বেশ কিছুটা সময়ে একজন মানুষের গ্রামকে ভালোবেসে, গ্রামের মানুষকে ভালোবেসে নিরন্তর এগিয়ে চলার জীবন্ত সব ছবির কোলাজ। কানে ভেসে আসছে,
"নূতন করিয়া আমরা ধরায়
রচিব প্রেমের বৃন্দাবন
সবার উপরে মানুষ সত্য
গাহিব আমরা চারণগণ।"
কবি, কর্মী, দেশব্রতী বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরে ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে। পিতা কিশোরীলাল চট্টোপাধ্যায় কাজ করতেন ব্রিটিশ প্রশাসনের জজ কোর্টে। মায়ের নাম কিরণময়ী দেবী। প্রসঙ্গত বলে রাখি নিজের বাড়িতে সন্তানদের রাজনৈতিক কার্যকলাপ চরকা কাটা বাবা কিশোরীলাল সমর্থন করেননি। মা কিরণময়ী দেবী ছেলেদের সমর্থন করলেন, ফলে কিরণময়ীকে স্বামীর গৃহ ত্যাগ করতে হলো।

কৃষ্ণনগর সি. এম. এস. স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরে কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজে ইংরেজিতে অনার্স সহ বি.এ. পড়ার সময় মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগের আহ্বানে কলেজ ত্যাগ করেন এবং অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। গৃহত্যাগ করে অবিভক্ত নদীয়ার গ্রামে গ্রামে স্বরাজ ও অসহযোগের বাণী প্রচার করতে থাকেন এবং তাঁর কারাদণ্ডও হয়। বহরমপুর জেলে বিদ্রোহী কবি নজরুলের কারাসাথী ছিলেন তিনি। নজরুলের অন্তর্গত উদ্দীপনা আর সংগ্রামের শপথ বিজয়লালকে অর্থাৎ তাঁর কবিসত্তাকে দীপিত করে। বিজয়লাল রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। শান্তিনিকেতনে স্বল্পকাল শিক্ষকতাও করেন, ১৯২৪-২৫-এ। ১৯২৮-এ তিনি কলকাতার 'বঙ্গবাণী' পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৯২৮-৩০ এই সময়পর্বে 'সবহারাদের গান', 'ডমরু' ও 'কালের ভেরি' প্রকাশ পায়। এর মধ্যে শেষ দুটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ হয়। নদিয়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি রূপে আইন অমান্য আন্দোলন পরিচালনা করেন। 'বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ' যখন প্রকাশ পায় তখন সরকার কর্তৃক সেটিও নিষিদ্ধ হয়। গৃহে অন্তরীণ থাকার সময় গোপনে গৃহত্যাগ করেন এবং গ্রামে গ্রামে আত্মগোপন করে স্বরাজের বাণী প্রচার করেন।
১৯৩৪-৪০ সাংবাদিক রূপে 'আনন্দবাজার পত্রিকা'য় কর্মরত ছিলেন। 'দেশ' পত্রিকার অন্যতম সংগঠক এবং প্রথম সহ-সম্পাদক ছিলেন কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়।
সাগরময় ঘোষ লিখেছেন -
"বিজয়লাল সম্পর্কে আমার একটা আলাদা সম্ভ্রম ও কৃতজ্ঞতাবোধ আছে এইজন্য যে তিনি প্রথম আমাদের সংস্থার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি সংযোগ স্থাপন করেন। যার ফলে রবীন্দ্রনাথের প্রচুর লেখা তাঁর জীবিতকালে 'আনন্দবাজার' ও 'দেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।"
'বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ', 'রিয়ালিস্ট রবীন্দ্রনাথ', 'মানুষের অধিকার', 'রাশিয়ার কথা', 'সাম্যবাদের মর্মকথা', 'রবীন্দ্রসাহিত্যে পল্লীচিত্র'', 'মুক্তিপাগল বঙ্কিমচন্দ্র'', 'মনের গভীরে', 'অগ্রদূত', 'সেনাপতি গান্ধী', 'রবিতীর্থে', 'কম্যুনিজম্' প্রভৃতি গ্রন্থগুলি কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য সৃজন। প্রসঙ্গত বলি রবীন্দ্রনাথ অনেকগুলি চিঠি লিখেছেন তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের কবি প্রতিভা নিয়ে সেই সময় নানা রচনা প্রকাশিত হলেও রবীন্দ্রনাথের গদ্য রচনা নিয়ে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ই প্রথম লিখে ফেলেন পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। সেই গ্রন্থ পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ খুশি হন, সে কথা তিনি তাঁকে চিঠি লিখে জানান। ১৯৩৬ সালে শান্তিনিকেতন থেকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়কে লিখছেন -
" 'তোমার মনের খেলা' বইয়ে সরলভাষায় সরসভাবে মনস্তত্ত্ব আলোচনা করেছ - 'রিয়লিষ্ট রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে সেই তত্ত্ববিচারকে যেন রান্নাঘর থেকে এনে ভোজের সভায় সাজিয়েছ। সাহিত্যের সংস্রবে এর মধ্যে সাহিত্যরস ভরে উঠেছে - যাদের স্বাদ গ্রহণের শক্তি আছে তাদের কাছে উপাদেয় হবে।"
১৯৪০ সালে স্বাধীনতা, সাম্য ও মানবতার জয়গান করে বিজয়লাল শুরু করেন 'চারণ আন্দোলন' - রচনা করেন চারণগীতি। গ্রামে গ্রামান্তরে সেই গান অনেককে নিয়ে গাইতে শুরু করেন। লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য দেশকে প্রস্তুত করা। মনে পড়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় সেই গান -
"চাই স্বাধীনতা, সাম্য চাই,
গাহ দিকে দিকে চারণদল।
পীড়িত দলিত, বন্দী নর,
সবলে দু'হাতে ভাঙ্ শিকল।"
১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার রাজপথে শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্টের আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হন বিজয়লাল এবং অচৈতন্য অবস্থায় আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। পরে কৃষ্ণনগর প্রত্যাবর্তন করেন এবং কৃষ্ণনগর জেলে বিনাবিচারে বন্দী হন। কারামুক্তির পর কৃষ্ণনগর নগেন্দ্রনগরে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার এবং একটি হরিজনপল্লীতে নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একজন মানুষের কথা যিনি কৃষ্ণনগর শহরের সবার কাছে পরিচিত ছিলেন 'মাস্টারমশাই' নামে, তিনি প্রয়াত শ্রদ্ধেয় দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী। নিরক্ষর হরিজনপল্লীর অবৈতনিক শিক্ষকের কাজ পেয়েছিলেন বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে। মাস্টারমশাই লিখছেন -
"কবি ইস্কুলের জমি কেনা আর ঘর তৈরীর টাকা সংগ্রহ করলেন এক অভিনব উপায়ে। দু'আনা দামের টিকিট করে ভারতের আদর্শ ও সাধনা বিষয়ে পরপর চারটি বক্তৃতার ব্যবস্থা করে কয়েকশ' টাকা তুলেছিলেন।"
শহরের মোহ ত্যাগ করে গান্ধীপন্থায় গ্রামসংগঠনের উদ্দেশ্যে জলাঙ্গী নদীর তীরে বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে এসে 'লোক সেবা শিবির' স্থাপন করেন বিজয়লাল। দেশবিভাগের পর জীবন বিপন্ন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার জন্য তাঁর অবিরাম প্রয়াস ছিল। কথিকার শুরুতেই বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে তাঁর বিপুল কর্মযজ্ঞের কথা বলেছি।

'আকাশবাণী'র সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। 'আকাশবাণী'তে বহু কথিকা পাঠ করেছেন তিনি। ইংরেজি সাহিত্য এবং সংস্কৃত সাহিত্যে বিপুল পান্ডিত্য ছিল তাঁর। বিদেশী সাহিত্য নিয়ে চর্চা করেছেন। এডওয়ার্ড কার্পেন্টার, হুইটম্যান, শেলী, বায়রনের কবিতা তাঁর মনে প্রভাব ফেলেছিল। লিখছেন -
"মার্কিন কবি ওয়ালট্ হুইটম্যানের 'Leaves of Grass' ছাত্রাবস্থাতেই মনের উপরে সুগভীর রেখাপাত করে। এই কাব্যগ্রন্থখানি পড়িয়া গণতন্ত্রের আদর্শে প্রথম অনুরাগ জাগে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মহিমায় বিশ্বাস করিতে শিখি। 'সবহারাদের গান'-এর মধ্যে তাঁহার বাণীর প্রতিধ্বনি সহজেই শুনিতে পাইবেন।"
সারা জীবন ভেবেছিলেন মানুষের মুক্তির কথা, ভেবেছিলেন সম্প্রীতির কথা, থাকতে চেয়েছিলেন সব হারাদের পাশে। ১৯৭৪ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। ইচ্ছা ছিল তাঁর গড়ে তোলা স্বপ্নের বাস্তু বড় আন্দুলিয়ার সংলগ্ন জলাঙ্গী নদীতীরে যেন তাঁকে দাহ করা হয়। তাই হয়েছিল।
আজকের এই বিপন্ন সময়ে আমাদের পরস্পরের মধ্যে যখন এক পৃথিবী দূরত্ব তখন কবির ছন্দে প্রাণের সঙ্গে প্রাণকে বাঁধতে হবে, হাতে হাত রেখে পরস্পর মিলতে হবে, ভেদের প্রাকার ভেঙে প্রেমের স্বর্গ তৈরি করতে হবে।কবির পঙক্তি উদ্ধৃত করেই বলি আমাদেরও বিশ্বাস, "পূর্ণমানব বাঁধনহীন/ আনিবে ভুবনে নূতন দিন,/ আঁধার হইবে আলোকে লীন,/ উদিবে গগনে নব তপন।"
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
