
১৭ই এপ্রিল, ২০২৫ মধুসূদন মঞ্চে দেখলাম নান্দীমুখ প্রযোজিত নতুন নাটক 'জাস্টিস'। এককথায় ভালো-মন্দ সাদা-কালো বিচার করা সহজ নয়।
অনিল ঘড়াই-এর লেখা গল্প 'টিকলি'র নাট্যরূপ নিপুণ হাতে দিয়েছেন তীর্থঙ্কর চন্দ। গত বছর ঘটে যাওয়া নৃশংস ধর্ষণ এবং খুনকে কেন্দ্র করে এ নাটক গড়ে উঠেছে। প্রথম দৃশ্যের জেলবন্দীর সঙ্গে দেখা করতে আসার দৃশ্য অসমাপ্ত রেখে ফ্ল্যাশব্যাকে ঘটনার স্রোত পিছিয়ে নেওয়া শ্রদ্ধেয় নির্দেশক অসিত বসুর দ্বারাই সম্ভব। এবং নাট্যকার তীর্থঙ্কর ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতকে দক্ষতার সঙ্গে যেন বুনে গেছেন নাটকের শেষ দৃশ্যে ফিরে আসা পর্যন্ত। সত্য ঘটনার প্রতিঘাত প্রতি মুহূর্তে দর্শককে চমকে দেয়। অভিনয়ের পাশাপাশি কলাকুশলীদের নৈপুন্য 'জাস্টিস'কে করে তুলেছে সময়ের দলিল।


সিদ্ধার্থের চরিত্রে চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় অসম্ভব স্বাভাবিক চরিত্রায়ণ করেছেন যাকে অভিনয় বলা চলে না, স্তানিস্লাভস্কির ভাষায় 'বিহেভিয়র' বলা উচিৎ। বিশেষ করে টিকলিকে ধর্ষণের পর তাকে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় আবিষ্কার করার মুহূর্তে তাঁর শব্দহীন উচ্চকিত কান্না দর্শকের মস্তিষ্কে এবং হৃদয়ে চাপ বেঁধে বসে, শরীর ভারী হয়ে যায়। বাকি দৃশ্যগুলিতে তিনি অত্যন্ত সাবলীল। জেলের গার্ড অনিন্দ্য গাঙ্গুলী প্রথম দৃশ্যে নিজের বিরক্তিকর একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। আবার শেষ দৃশ্যে প্রায় সংলাপহীন নিশ্চুপ অভিব্যক্তিও তার চরিত্রের সমবেদনার রূপ ফুটিয়ে তোলে। বিপ্লব দত্তের মিঠাইলাল সাদাসিধে গ্রাম্যতা এবং তার আবেগ যথাযথ রূপে প্রকাশ করেছে। ঝগরুরূপী অশোক চট্টোপাধ্যায় দুর্ধর্ষ মাতাল আবার কখনো কপট আবেগ, কখনো অসহায়ত্ব দুর্দান্ত ভাবে প্রকাশ করেছেন। দর্শক হিসেবে এতোটাই রাগ হচ্ছিল তাঁর চরিত্রায়ণ দেখে যে মনে হয়েছিল স্টেজে উঠে চড়-থাপ্পড় মারা উচিৎ।


পরমার চরিত্রে সোনালি চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়কেও অভিনয় বললে ভুল হবে। তিনিও মায়ের চরিত্রকে ব্যবহার করেছেন আবেগ, স্নেহ, আশঙ্কা সর্বোপরি রাগের চরম বহিঃপ্রকাশে। তাঁর মাতৃত্বের রূপে ব্যক্তিগত আমিকে বড্ড ভাবাচ্ছে - যেন ম্যাক্সিম গোর্কির 'মাদার' নবরূপে সম্মুখে দাঁড়িয়ে। সোনালীকে বারেবারে মাতৃরূপে প্রাপ্তিও এক সম্পদ। টিকলি চরিত্রে মৌমিতা দে বেশ কঠিন শর্ত পালন করেছে এমন একটা ভিক্টিমের চরিত্রের রূপ দিতে। সত্যিই মৌমিতাকে হার্ডল পেরোতে হয়েছে। লক্ষ্মণ, দশরথ এবং তাদের চেলারা যথাযথ গুল্ডামী দেখিয়ে দর্শকের রাগ উদ্রেক করতে পেরেছে। নেতামন্ত্রীর পা চাটা চাটুকার পুলিশ বিনোদ বর্ধন চরিত্রে দেবদাস চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর অভিনয়ে দর্শকের রাগের মাত্রা বাড়িয়ে দেন।

আবহ প্রতি দৃশ্যে মানানসই হয়ে উঠেছে। মঞ্চ পরিকল্পনা প্রসেনিয়ম থিয়েটারের যুক্তি মেনেই দৃশ্য অনুযায়ী রূপ পাল্টেছে। আলোর প্রক্ষেপণ তো শ্রদ্ধেয় তাপস সেনকে স্মরণে আনল। আলোর প্রক্ষেপণে বাদল দাস সফল হয়েছেন। নদী ও বনের দৃশ্যে বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়ানো নরম আলো এবং আলোর নদীর ঢেউ যেন দৃশ্যকে স্বপ্নময় করে তুলেছে। আবার যখন সেই মায়াময় পরিবেশকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললো লক্ষ্মণ ও তার দল সেই দৃশ্যের আতঙ্ক আর কর্কশতা কেমন করে যেন প্রকৃতির বুকে ছুরি মেরে ফালাফালা করে দিল প্রকৃতিরূপী টিকলিকে। বড় যন্ত্রণা বিদীর্ণ আবহ আলো ও দৃশ্য এঁকেছেন অসিত বসু। মঞ্চ নির্মাণে মদন গোপাল হালদার সম্পূর্ণভাবে সফল।



এই অস্থির সময়ে এমন একটি প্রযোজনা সত্যিই বড় প্রয়োজন ছিল। এই সময়ের সাড়া জাগানো নাটক 'জাস্টিস' মঞ্চস্থ হয়ে চলুক বহু বহু বার সারা দেশজুড়ে। ইতিমধ্যেই বহু গুণী ব্যক্তি নাটকটি দেখেছেন। তাঁদের অন্যতম পবিত্র সরকার, বিমান বসু, শংকর চক্রবর্তী প্রমুখ।
চিত্রঋণঃ লেখিকার কাছ থেকে ও অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
