আলো
অনন্ত বিষাদ যদি মুহুর্তের রেখা
টানে আর মুছে দেয় বিষণ্ণ দেয়ালে;
তবে পরিচয়হীন হোক সব শোক,
স্মৃতি ভুলে যাক সব নিজের খেয়ালে।
ভুলের আগুনটুকু ধিকিধিকি জ্বলে
তুমি কি সুখের আলো জ্বেলে রাখো জলে?
ঘ্রাণ
সহজে মেটার নয় এমন বিবাদ;
জল আর আগুনের ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ।
শিশিরের ঘ্রাণ জাগে ভোর হবে বলে,
স্নেহ বুঝি খোঁজো আজও অচেনা আঁচলে!
সঞ্চয়ে এমন সুখস্মৃতি শুধু জানে,
বিবাদের ঘ্রাণ খোঁজ কোন অভিধানে?
অনুবাদক
মুখোমুখি আয়নায় প্রতিবিম্ব কার?
আমাকে আমার কাছে করে ছারখার!
জীবন শুকিয়ে গেছে বেঁচে থাকা জানে,
একরাশ শোক বাঁচে সেই অভিমানে।
যন্ত্রণার দাম কম, সুখ খুশি জেনে;
অনুবাদ করেছে কে সে ভাষা না জেনে?
মুক্তি
আমাকে আমার কাছে কে চেনাবে রোজ?
আমি তো অতীত, আমি নিজেই নিখোঁজ।
তবুও নিজের কাছে বারবার ফিরি;
অচেনা এ দেশ তবু আজও ধানসিঁড়ি।
নদী ডাকে কবিতায়; আনন্দে জীবন
নিজের সম্মুখে একা, মুক্ত আবরণ।
অতিথি
চশমার কাঁচে জমে বিষণ্ণ কুয়াশা,
পাকদণ্ডী পথে পথে মেঘে ওড়ে আশা।
বিরহ সুখের হয় যদি এ ভ্রমণ
স্মৃতি ভুলে একা হয় স্মৃতির রমণ।
পাইনের বনে বনে নিঃসঙ্গ স্মৃতি
পাহাড়ের কোলে যেন অচেনা অতিথি।
স্মৃতি
বিপন্ন স্মৃতির আলো খোঁজে তার ছায়া,
অন্ধকারে ইন্দ্রজাল ছড়িয়েছে মায়া।
তবু মেঘ করে আসে, বৃষ্টিধারা নামে,
সবুজ স্মৃতির পাতা জানে কী আরামে
চোখ বুজে শোনে গান, অভিমানী সুর
স্মৃতি পাশে পাশে হাঁটে, দু-পায়ে নুপুর।
উদ্যাপন
আমি কি আমার কাছে হেরে যেতে পারি?
আড়ি-ভাব খেলা শেষে দিতে পারি আড়ি?
জীবন ছড়িয়ে পড়ে, আমারই সে ভুল;
গোটানো জীবন জুড়ে মরসুমি ফুল।
আলো করে রাখে যেন হেরে যাওয়া মন,
আমাকে বসিয়ে পাশে করে উদ্যাপন।
প্রস্তুত
ভুলের মাশুল দিতে তুমি কি প্রস্তুত?
জীবন ধরেছে বুঝি চেনা রংরুট?
এবার নিজের মতো পান্থশালা খুঁজে
হেঁটে যাও দূর পথে ভুল, ঠিক বুঝে।
লোনাজলে বাতাসের বদলায় ঘ্রাণ
সাগর বাসে কি ভালো পাহাড়ের গান?
হিসাব
হিসাব সহজ নয়; জটিল, কঠিন
সময়ের জলছবি জীবনের ঋণ।
সুদাসল বেড়ে আজ বিরাট, বিশাল;
পরিশোধ হবে না তা জানে মহাকাল।
অভিমানী দুটি মন হিসাব না রেখে
ঝুলিয়ে রেখেছে সব পুরোনো পেরেকে।
আদর
আদরের বহু ভাষা, বিবিধ অক্ষর;
নিজেকে চেনার ভাষা খোঁজে অবসর।
নিজেকে আদর করে পাবে কোন সুখ?
ছায়া খুঁজে পেতে চায় আদুরে অসুখ।
অথচ রোদের মুখে অসুখের ভাষা
নতুন ঠিকানা খোঁজে, বহুতলে বাসা।
পাহারাদার
কে আদম? কে বা ইভ? কোথায় যে তারা!
তবু দেখ অলি, গলি সর্বত্র পাহারা।
আপেল বাগানে বুঝি চাষবাস শেষ!
কম দামে ঘর খোঁজে দুর্গা, প্রমথেশ।
ভ্রমণের শর্টরুটে মায়ার সংসার
বাঁচানো কঠিন বড় জানে চৌকিদার।
চাকা
পতনের ভয় নেই, উত্থানেরই ভয়
জীবন কঠিন করে প্রখর সংশয়।
হারানোর ভয় নেই না পেলে জীবনে,
উত্থানের ভয় শুধু হঠাৎ পতনে।
সমস্ত চাকার গল্প; নামা, ওঠা, নামা
জীবন চলার নাম, বাজিয়ে দামামা।
অগোছালো
কীভাবে সাজাবে তুমি অগোছালো ঘর?
দিন শেষে খিদে বাড়ে; কই অবসর?
আমার হিসাব শেষে দেখি বাড়ে ঋণ;
অগোছালো জীবনের পথে অন্তরীন।
মায়ার ইশ্বর আর প্রিয় শয়তান
দুজনের রূপকথা আধুনিক গান।
পাপ
পাপ লেখ, অনুতাপ লেখার সময়
যতিচিহ্নে লেখা হোক জয়, পরাজয়।
সব পূণ্য আঁকা হোক পুজোর প্রসাদে
সন্দেহের ফুল, মালা ভক্তি বুঝি বাঁধে!
পাপ আর অনুতাপে হারানো বিশ্বাস
লেখার শরীরে ফেরে দ্বন্দ্বের সন্ত্রাস।
অ-সুখ
দিগন্ত রঙিন হলে মুখে পড়ে আলো;
তবু স্বপ্নজন্ম আজও গাঢ় সাদাকালো।
যত্নের প্রস্তুতি শেষে ঘুম না এলে সে
জেগে দেখে দিগন্তের রংবদল হেসে।
রঙিন কান্নার সুর দিগন্তের মুখে
সাদাকালো স্বপ্ন যেন ভেঙেছে অ-সুখে।
দীপাবলি
আলোর উৎসবে আঁকা অচেনা আঁধার
আলো, ছায়া লিখে রাখে কার কত ধার।
পথে পথে আল্পনার মায়া আঁকা রঙে
নিজেকে একার ভিড়ে খুঁজেছ নির্জনে।
সেই ভিড়ে মিশে তুমি খুঁজে পেলে যাকে
সে কি আলো? অন্ধকার! ছায়ার ফারাকে।
নদী
যে নদী মুখর হতে পেয়ে যায় ভয়,
তার গায়ে পলি জমে, আর পরাজয়
স্বীকার করার ফাঁকে মোহনার ঘর
ক্রমে দূরে সরে যায়, বাড়ে অবসর।
মানুষ গতির কাছে হেরে গেলি বুঝি
আমরা সবাই চেনা জলস্রোত খুঁজি।
আগুন
আগুন আমার প্রিয়, প্রত্যহ দহন
স্বেচ্ছায় গ্রহণ করি, সে অবগাহন
শীতল জলের মতো তরতাজা করে,
কিছু পাপ, অনুতাপ বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
আগুন নেভার পরে ছাই হয়ে বাঁচি
আত্মরতি সুখে জল, বহ্নি কাছাকাছি।
স্বাদ
তুমি তাকে সাঁকো ভাবো, আমি হাইফেন;
নজর বদলে যায় যদি লেনদেন
প্রতিবার ক্ষতি করে, শুধু লোকসান
হিসাব খাতায় লেখা ভুল সে বানান।
সাঁকোর নিচের জলে ডুবে গেলে চাঁদ
যতিচিহ্নে লুকিয়েছি চুম্বনের স্বাদ।
দাম
যন্ত্রণার দাম দিই জমে থাকা সুখে,
সুখ পেতে দিতে রাজি ব্যক্তিগত শোক;
নিজেকে দেখেছি আর ভয়ের সম্মুখে
আড়ালে লুকিয়ে গেছি, সংকোচের ঝোঁক।
ঝুঁকি নিয়ে ঝুঁকে গেছি, দিয়ে গেছি দাম
শোক আর যন্ত্রণায় পেয়েছি আরাম।
