গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

কাঠামো



অচিন্ত্য সাহা


ভোরের আলো ফুটতে এখনো ঢের দেরী। চারপাশে নিমনিমে অন্ধকার। একটা হেঁসো হাতে নিয়ে সুদিন পাল নদীর পাড়ে আসে। দুদিন আগে জগদ্ধাত্রী পুজো শেষ হয়েছে। জলাঙ্গী নদীর পাড়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে প্রতিমার কাঠামো। কথিত আছে দুই রাত্রি না পেরোলে বুড়িমার কাঠামো তুলে নিয়ে যাওয়া যায় না। নিলে কী হবে তা কেউ বলতে পারে না। এখনো দু'রাত পেরোয়নি তার আগেই সুদিন বিসর্জনের ঘাটে চলে এসেছে। এতগুলো কাঠামো তুলতে তুলতে রাত শেষ হয়ে যাবে। তখন আর কোনো বিপত্তি থাকবে না।

অন্ধকারে আরও দুটি চতুষ্পদীকে দেখা যাচ্ছে। ওরা কাঠামো থেকে শুকনো খড় তুলে নিয়ে চিবোতে ব্যস্ত। নদীর বিসর্জন ঘাটে ওরা বছরভর বিচরণ করে। এখন তো 'বারো মাসে তেরো পার্বণ' নয় বরং বারো মাসে তিনশো পঁয়ষট্টিটি পার্বণ। পার্বণের আনন্দকে সঙ্গী করে মানুষের বেঁচে থাকা। কিন্তু তার পরে যে আবর্জনার স্তূপ জমা হয় সেই জঞ্জাল কী করা হবে কোথায় ফেলা হবে - এইসব জটিল প্রশ্ন দূরে ঠেলে দিয়ে মানুষ আবর্জনা ফেলার নিরাপদ জায়গা হিসেবে নদীর পাড়কে বেছে নেয়। নদী নিশ্চুপ থেকে সবই দেখে কিন্তু কিছু বলতে পারে না। গরুগুলো নদীর বুক থেকে জঞ্জাল হঠানোর চেষ্টায় কাঠবিড়ালির ভূমিকা পালন করে।

সুদিনের মতো কয়েকজন আছে যারা নদীর পাড় ঘুরে ঘুরে কাঠামো সংগ্রহ করে এবং সংগৃহীত কাঠামোগুলো পরের পুজোতে কাজে লাগায়। তার ফলে নদীর পাড় কিছুটা আবর্জনা মুক্ত হয়। কিন্তু কাঠামোর উপর যে মাটির প্রলেপ দেওয়া থাকে সেটা নদীগর্ভে জমা হয়ে মানব শরীরে খারাপ কোলেস্টেরল জমা হওয়ার মতো নদীর শরীরকে আক্রমণ করে। নদী সেই মারণ রোগের শিকার হয়ে শুকিয়ে যায় এবং অস্তিত্ব রক্ষার বৃথা চেষ্টা করে। বর্ষাকালে প্রকৃতির খেয়াল খুশিতে যদি প্রবল বর্ষণ হয় তবে নদী যেন একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। তখন নদীর উচ্ছ্বাস দেখে মনটা আনন্দে ভরে যায়। নদীগর্ভে জমে থাকা নোংরা আবর্জনা সে নিজেই পরিষ্কার নেয়। কিন্তু মানুষ! আপনার স্বার্থ চরিতার্থ করতে নদীর ওপর অহেতুক অত্যাচার করে। তাই কখনো কখনো নদী বলতে চায় - তোমরা যে আবর্জনার স্তূপ আমার গর্ভে নিক্ষেপ করেছ তা তোমাদের পরিষ্কার করতে হবে না কিন্তু নতুন করে আমার বুকে পাথরচাপা দিও না। যেটুকু আছে তা আমি নিজেই...

ভোরের আবছা অন্ধকারে সুদিন একা একাই হেঁসো-র সাহায্যে অনেকগুলো কাঠামো নদীর পাড়ে জমা করে। গতবারের কাঠামোগুলো সবটাই যোগেশ পালের ছেলেরা নিয়ে গেছে। শেষে দুই একটা ভাঙাচোরা টুকরো পড়ে ছিল সেটা কুড়িয়ে কাছিয়ে সুদিন নিয়ে গিয়েছিল। সেগুলো জ্বালানি ছাড়া আর কোনো কাজে লাগেনি। তাই এবারে দেরি না করে রাত থাকতে থাকতেই চলে এসেছে। তড়িঘড়ি হেঁসো চালায় সে। বলা যায় না যোগেশ পালের ছেলেরা চলে আসতে পারে। ওরা খুব একরোখা, বদমেজাজী, রুক্ষ এবং উদ্ধত স্বভাবের। মাঝে মাঝেই ওদের সাথে পাড়ার বাসিন্দাদের ঝামেলা হয়। কালো কষ্টিপাথরের মতো গায়ের রঙ, আর তেমনই দশাসই চেহারা। সন্ধ্যে হলেই ওদেরকে চেনা যায় না। আনন্দময়ী তলার লিকারের দোকান থেকে দেশি মদ কিনে আকণ্ঠ পান করে চেঁচামেচি করে। পুলিশকে জানিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। থানা থেকে দুই একবার এসে ধমক দিয়ে গেছে মাত্র, এছাড়া কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ করেনি। এতে ওদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে গেছে।

ওরা এলেই ঝামেলা পাকাবে। সুদিন চটপট কাজ সেরে ওরা আসার আগেই সবটা গুছিয়ে নিয়ে কেটে পড়বে। এতগুলো কাঠামো একসাথে নিয়ে যাওয়াও কষ্টকর। ভ্যানচালক ভোলাকে ব'লে রেখেছে যত দ্রুত সম্ভব চলে আসতে। হয়তো দু'বার খেপ দিতে হবে। এতগুলো কাঠামো সুদিন একা নিয়ে যেতে পারবে না। ঘূর্ণির মৃৎশিল্পী রমেশ পাল ইদানিং ঠাকুরের মূর্তি নির্মাণ করা শুরু করেছে। রমেশ সুদিনকে বলেছিল,

- কাকা তুমি তো অনেক কাল আগে থেকে প্রতিমা বানাচ্ছ তা আমাকে একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিও কীভাবে কী করতে হবে কেমন?

- সে আমি দেবো 'খন। তুই কিচ্ছু ভাবিস নে খোকা। কাজটা ভালো করে শিখে নিলে ভবিষ্যতে তার ফল পাবি।

প্রতিমা গড়ার কারিগর হিসেবে সুদিনের বেশ নাম আছে। রমেশকে অনেকগুলো কাজ দিয়েছে। কাঠামো বেশি থাকলে ওর কাছে বিক্রি করে দেয়। এবারেও সেটাই ভেবে রেখেছে। কাঠামোগুলোর অর্ধেকটা রমেশকে বিক্রি করে দেবে। বাকিটা দিয়ে সুদিন নিজেই মূর্তি গড়বে। এখন বাঁশ, কাঠ, সূতলির যা দাম, তার সাথে মাটি। ভালো মাটি পাওয়া যায় না। ঠাকুরের মূর্তি গড়িয়ে খুব একটা লাভ হয় না। তবুও করে, পেটের দায়ে।

সুদিনের পরিবারে ওর একমাত্র নাতনি রিয়া ছাড়া আর কেউ নেই। রিয়ার বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হয়ে আছে। সামনের ফাল্গুনে ওদের চারহাত এক করে দিয়ে নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারবে। কাঠামো বিক্রির টাকা জমিয়ে নাতনির জন্য একটা সীতাহার গড়িয়ে দেবে। রিয়ার ঠাকুমা মারা যাবার সময় বলেছিল,

- আমার সীতাহার পরার খুব সখ ছিল। তুমি তো আমাকে দিতে পারলে না। আমার জন্য যে টাকা রেখেছ সেটা দিয়ে নাতনিকে ওর বিয়ের সময় একটা হার গড়িয়ে দিও।

এখন সোনার যা দাম তাতে সোনার জিনিস গড়া খুব কঠিন কাজ। যশোদা জুয়েলার্সের মালিক শিবপ্রসাদবাবুর বাড়িতে ধূমধাম করে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। সুদিন শিবুবাবুর বাড়ির প্রতিমা গড়ে দেয়। আজ বছর দশেক হলো সেখানে কাজ করে। প্রতি বছর মূর্তি নির্মাণের পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র এক টাকা নেয়। শিবুবাবু কারণ জানতে চাইলে সুদিন বলেছিল,

- বাবু আমি যতদিন বাঁচবো আপনার বাড়িতে মূর্তি গড়ে দেবো। শুধু আমার নাতনির বিয়ের সময় ওকে একটা সীতাহার গড়িয়ে দেবেন।

- তোর নাতনির এখন বয়স কত?

- বছর দশেক হবে।

প্রথমে একটু অবাক হলেও পরে শিবুবাবু বুঝতে পেরেছিলেন এখন সুদিনের নাতনির বয়স দশ বছর। ওর বিয়ে হতে হতে আরও দশ বছর, দশ বছর ধরে যদি সুদিন মূর্তি নির্মাণ করে তবে তার পারিশ্রমিক হিসেবে যা পাবে তাতে অনায়াসে ওর নাতনির গলার হার গড়িয়ে দেওয়া যাবে। শিবুবাবু স্মিতহাস্যে বলেছিলেন,

- সে হয়ে যাবে। তুই কিছু চিন্তা করিসনে।

সুদিন মনে মনে ভাবে - এবার শিবুবাবুকে হার-এর কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। বড়ো মানুষের কথা তো! মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক।

নদীর ওপারে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ। শরতের স্পর্শে মাঠ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। এবারে বৃষ্টি বেশ ভালোই হয়েছে। চতুর্দিকে গাছ-গাছালিতেও প্রাণের সবুজ স্পর্শ লেগেছে। নদী-নালাতেও এখন বেশ জল। জলাঙ্গীতে অনেক দিন পর প্রাণের স্ফূরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নদীর এই রূপ দেখতে বেশ লাগে। জলাঙ্গীর সন্তান-সন্ততিরা অধিকাংশই মরে গেছে। নদিয়া মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের কঙ্কাল। সন্তানদের জন্য জলাঙ্গীর অন্তরাত্মা কাঁদে, ইচ্ছে করে যারা সন্তানদের অকালে শুকিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী তাদের উপর মধুর প্রতিশোধ নেয়। প্রবল আক্রোশে ঢেউয়ের দোলা দিয়ে ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট, ক্ষেত-খামার ভেঙেচুরে ভাসিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিতে ইচ্ছে করে নদীকে হত্যা করার পরিণাম কত ভয়ংকর হতে পারে। ব্রিজ নির্মাণ করে, বাঁধ দিয়ে, আবর্জনার স্তূপ জমা করে, কলকারখানার নোংরা বিষাক্ত জল ঢেলে যাঁরা প্রতিদিন নদীকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে তাঁদেরকে সমুচিত শিক্ষা দিতে ইচ্ছে করে।

সুদিন পাল একমনে কাজ করে চলেছে। ধীরে ধীরে পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে উঠছে। আর কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠবে। চারিদিক আলোয় আলোকিত হয়ে আর একটা নতুন দিনের সূচনা হবে। খুব ধূমধাম করে নাতনির বিয়ে দেবে। সেই ছোট্ট রিয়া। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়ে এখানেই বেড়ে উঠেছে। নববধূ বেশে ওকে কেমন লাগবে সেটা ভেবেই সুদিনের মনটা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। মনে মনে স্বপ্নের ছবি আঁকতে শুরু করলো। হঠাৎ অনুভব করে ওর পায়ে কীসে যেন কামড়ে দিল। আবছা আলোয় দেখতে পেল একটা বিষধর খরিষ একেবেঁকে এগিয়ে চলেছে। মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারলো কী ঘটেছে। প্রবল জ্বলুনির সাথে যন্ত্রণা শুরু হলো। হেঁসো ফেলে দিয়ে দু'হাতে পা চেপে ধরে সে বসে পড়লো। কোমর থেকে গামছা খুলে খুব কষে পায়ে বেঁধে বাঁধের উপর দিকে উঠতে লাগলো। কিন্তু নদীর ঢাল খাড়া হওয়ায় সে বেশিদূর এগোতে পারলো না। যেখানে কাঠামোগুলো জড়ো করা ছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সেই পর্যন্ত গিয়ে কাঠামোর উপর পড়ে গেল। মুখ দিয়ে ফেনা গড়িয়ে গেলো। একবার রিয়ার মুখটা মনে করার চেষ্টা করলো - ভোরের আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন, নদীর বুকের ঢেউ স্তব্ধ হয়ে গেছে, ভোরের পাখিদের কলরব শোনা যাচ্ছে। এতকিছুর মধ্যে রিয়াকে কোথাও দেখতে পেল না। কাঠামোগুলোকে আঁকড়ে ধরে সুদিন চিরনিদ্রায় শায়িত হলো।

ভ্যানচালক ভোলা এসে দেখলো - অনেকগুলো কাঠামো জড়ো করে সেগুলোকে সযত্নে আঁকড়ে ধরে সুদিন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।